Advertisement Banner

আমরা কি সমালোচনার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি?

মো. ফজলুল করিম
মো. ফজলুল করিম
আমরা কি সমালোচনার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি?
প্রতীকী ছবি

মানুষের আচরণে ভুল একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা–এটি জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সহজ ও রুটিন কাজেও মানুষ কিছু না কিছু ভুল করে। আর জটিল, চাপপূর্ণ বা বহু-ধাপ বিশিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে সেই ভুলের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। ক্লান্তি, মানসিক চাপ কিংবা মনোযোগের ঘাটতি এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেমানের মতে, মানুষের চিন্তাজগৎ মূলত দুই স্তরে কাজ করে–একটি দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয় চিন্তাপদ্ধতি এবং অন্যটি ধীর ও বিশ্লেষণমূলক চিন্তাপদ্ধতি। দ্রুত চিন্তাপদ্ধতি অনেক সময় মানসিক সহজীকরণ বা শর্টকাটের ওপর নির্ভর করে। ফলে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত ও ভুল মূল্যায়ন তৈরি হতে পারে। ফলে মানুষ অনেক সময় বাস্তবতার পরিবর্তে নিজের মানসিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে–মানুষ কেন অন্যের দোষ খুঁজতে এত আগ্রহী? সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষ অনেক সময় নিজের অস্বস্তিকর দিক অন্যের ওপর আরোপ করে আত্মরক্ষা করে। অন্যদিকে লিওন ফেস্টিঙ্গারের সামাজিক তুলনা তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ নিজের অবস্থান বুঝতে অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে। ফলে অন্যের দুর্বলতা অনেক সময় আত্মতৃপ্তির একটি মানদণ্ড হয়ে ওঠে।

কার্ল ইয়ুং-এর ভাষায়, “অন্যের যে আচরণ আমাদের বিরক্ত করে, তা অনেক সময় আমাদের নিজের অচেনা দিককে বুঝতে সাহায্য করে।” অর্থাৎ, অন্যের দোষ খোঁজার প্রবণতা প্রায়ই নিজের ভেতরের অসমাধানকৃত দ্বন্দ্বের প্রতিফলন।

সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো–যে মানুষ যত বেশি নিষ্ক্রিয় বা কম সম্পৃক্ত, তার মধ্যে সমালোচনার প্রবণতা তত বেশি। বিষয়টি সর্বজনীন সূত্রে ব্যাখ্যা করা না গেলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত না থাকলে অনেক সময় পর্যবেক্ষণের বদলে বিচার করার প্রবণতা বেড়ে যায়।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বর্তমান প্রজন্মের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একমাত্রিক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথ্যপ্রবাহের সহজলভ্যতা এবং উচ্চ প্রত্যাশার বাস্তবতা–সব মিলিয়ে তরুণদের একটি অংশ বাস্তবতার চেয়ে আদর্শ বা ইউটোপিয়ান মানদণ্ডে জীবনকে বিচার করে। ফলে বাস্তবতা ও প্রত্যাশার ব্যবধান অনেক সময় অসন্তোষ ও অতিরিক্ত সমালোচনার জন্ম দেয়।

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যেকোনো ঘটনা বা ব্যক্তিকে বিশ্লেষণ করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। তবে এই সহজলভ্যতা অনেক সময় গভীরতা কমিয়ে দেয়–ত্রুটি ধরা সহজ হয়, কিন্তু প্রেক্ষাপট বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সমালোচনা বাড়ে, কিন্তু সহমর্মিতা কমতে পারে।

অন্যদিকে, এই সমালোচনামূলক প্রবণতার একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এটি সমাজে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও পরিবর্তনের চাপ তৈরি করে। অনেক সামাজিক অগ্রগতির পেছনেই রয়েছে প্রশ্ন তোলা ও সমালোচনার সংস্কৃতি।

তবে সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সমালোচনা ভারসাম্য হারায়; যখন তা নির্মাণের বদলে ধ্বংসের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, তখন সমাজে অস্থিরতা বাড়ে এবং সম্পর্কগুলোও অবিশ্বাসের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

সমাজের সুস্থ অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন সমালোচনা ও গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে একটি ভারসাম্য। কারণ, সমালোচনা যেমন উন্নতির পথ দেখাতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত দোষ-অনুসন্ধান সম্পর্ক ও সমাজে অবিশ্বাস তৈরি করে। অন্যদিকে প্রশংসা ও সহমর্মিতা মানুষকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে এবং সামাজিক স্থিতি বজায় রাখে। তাই একটি পরিপক্ব সমাজের পরিচয় শুধু প্রশ্ন তোলার সক্ষমতায় নয়, বরং কখন থামতে হবে, কখন বোঝাপড়ার জায়গা দিতে হবে—সেই বিচারবোধ ও মানবিক সংযমেই তার প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত।

লেখক: অধ্যাপক, বিজিই বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত