অর্ণব সান্যাল

একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে স্ত্রীসহ তুলে নিয়ে গেছে আরেকটি দেশের সেনারা। ভিন্ন দেশে সেই প্রেসিডেন্টের বিচারও শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে সেই ‘পরাক্রমশালী’ দেশের প্রেসিডেন্ট বলে চলেছেন, তিনি ওই দেশ থেকে তেল নিয়ে নিতে চান। এমনকি আরও কিছু দেশেও হাত দিতে চান। তার গ্রিনল্যান্ড দরকার, কলম্বিয়া লাগবে, কিউবা নিজের হতে হবে, ইরান প্রয়োজন–আরও কত কী!
ঠিক একই রকম পরিস্থিতি ১০০ বছর আগে দেখা গিয়েছিল। ওই দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখতে হয়েছিল দুনিয়ার মানুষকে। জার্মানি তাদের পক্ষশক্তিদের নিয়ে নিজেদের এলাকার সীমা বাড়াতে চেয়েছিল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। এক কথায়, অন্য দেশ দখল করতে গিয়েছিল। তাতেই বেঁধে গিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধ।
শেষে অনেক জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ের পর থেমেছিল বিশ্বযুদ্ধ। ওই সময়কার আগ্রাসনকারীদের ফ্যাসিবাদী আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের বিরোধী পক্ষে ছিল আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ আরও অনেকে। এরপর থেকেই এক দেশের প্রতি অন্য দেশের ভৌগোলিক আগ্রাসনকে পুরো বিশ্বেই বেশ নিন্দার চোখে দেখা হতে থাকে।
অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির ফ্যাসিবাদী হিটলারের বিরোধিতা করা দেশ আমেরিকা এখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সেনা পাঠিয়ে আটক করে তুলে নিয়ে যায়। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবলীলায় জানিয়ে দেন, ভেনেজুয়েলার তেল তার লাগবে! এর সাথে আরও আরও অন্যের এলাকা আমেরিকার করায়ত্ত হওয়া প্রয়োজন বলে জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তাহলে, আগ্রাসন এখন কারা চালাচ্ছে? সেই আগ্রাসন কি হিটলারের মতোই? তবে কি আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। আমেরিকা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কিনা–সেই আলোচনা বা বিতর্ক এবারই প্রথম ওঠেনি। গত শতকের শুরু থেকেই এমন বিতর্ক জারি আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের অনেক লক্ষণ দেখা যায় আমেরিকায়। যদিও সারা বিশ্বকে প্রায়ই গণতন্ত্রের সবক দেয় আমেরিকা!

রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ফ্যাসিবাদ অত্যন্ত জটিল। একই সঙ্গে এটি নিয়ত পরিবর্তনশীলও। ১৯২০ থেকে ১৯৩০-এর দশকে ইউরোপে এর প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভব ও বিস্তার ঘটে। এবং তার প্রতিভূই মূলত হিটলার ও মুসোলিনি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ফ্যাসিবাদের রূপ পরিবর্তন হয়েছে ঢের। বিবর্তিত হয়ে ফ্যাসিবাদ এখন এমন রূপ নিয়েছে, যাতে শুধু ইতালি বা জার্মানির ধরন দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। ফ্যাসিজম নামক রাজনৈতিক আদর্শের ধারণাটিকেই নানা সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায়। এর বৈশিষ্ট্যও হরেক। বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীতে এসব বৈশিষ্ট্য আরও নানামুখী হয়েছে।
ফ্যাসিবাদ বললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সবাই বিবেচনা করে একটি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থাকে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও। এবং এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এটিই ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক বন্দোবস্তকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গড়ে ওঠে একই ভাবধারার একটি কার্টেল। এটিই একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোয় সকল সিদ্ধান্ত নিতে থাকে। এক ধরনের একচেটিয়া ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। অর্থ ও বাণিজ্যের বিভিন্ন বিষয় ও কৃষিসংক্রান্ত নির্দেশনাসহ উৎপাদন ও বিপণনের নানা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে থাকে এই কার্টেল। এটিই হয়ে দাঁড়ায় সর্বময় কর্তা। মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতা সুসংহত করতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এর পাশাপাশি রক্ষণশীল অভিজাত ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত সম্পদ ভোগ ও তা বৃদ্ধি করার সুযোগও দেওয়া হয়। যদিও পারিশ্রমিক বা মজুরির হার ও মাত্রা কমিয়ে আনার চেষ্টা চলে ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। শ্রমিকদের কম বেতন দিয়ে বাড়তি হিসেবে জাতীয় মর্যাদা গেলানোর প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়।
মজার বিষয় হলো, ফ্যাসিবাদ বলতেই যে হিটলার ও মুসোলিনির কথা আমাদের মাথায় খেলা করে, সেই সময়কার জার্মানি ও ইতালি ছাড়া আরও কিছু দেশেও এই ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পত্তন হয়েছিল। সেসব দেশের মধ্যে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকাও ছিল! এমনকি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরুর আগে মুসোলিনি ও হিটলারের এ ধরনের ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির প্রশংসায় ছিলেন আমেরিকা-ইউরোপের নেতারাও।
আমেরিকার মেরিল্যান্ডের লোয়োলা ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন থমাস জে ডিলরেনজো। তার মতে, ফ্যাসিবাদের অর্থনীতি হলো করপোরেটিজম। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে এটি যেমন ইতালি ও জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তেমনি ওই সময়ে এর একটি রূপ আমেরিকাতেও আবির্ভূত হয়েছিল। তখন মার্কিন মুলুকে একে বলা হতো, ‘পরিকল্পিত পুঁজিবাদ’। এই ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য এখনো আমেরিকাতে বর্তমান আছে ভালোভাবেই এবং এর প্রভাব ক্রমশ বাড়বে বলেই মনে করেন থমাস ডিলরেনজো।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল, নাম ‘ফ্যাসিজম ইন আমেরিকা: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’। এটি সম্পাদনা করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল ডি রোজেনফেল্ড ও জ্যানেট ওয়ার্ড। ফেয়ারফিল্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল রোজেনফেল্ড মনে করেন, আমেরিকায় ফ্যাসিবাদের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি এখন আর কল্পিত কোনো বিষয় নয়। যদিও সাধারণ মার্কিন জনগণ এখনো একে বাস্তব হিসেবে গণ্য করতে চান না। তারা মনে করেন, আমেরিকা যেসব মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রভাববিস্তারী হয়েছে, সেসবের পুরোপুরি বিরোধী হলো ফ্যাসিবাদ। মার্কিন জনগণের অধিকাংশ একে ঘৃণা করলেও আমেরিকায় ফ্যাসিবাদের ভিত্তি ক্রমে শক্তিশালী হয়েই চলেছে।
ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার ইতিহাসের অধ্যাপক জ্যানেট ওয়ার্ড মনে করেন, আমেরিকায় ফ্যাসিবাদের চর্চার ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রায় ১০০ বছর ধরে এই চর্চা ধীরে ধীরে জনতুষ্টিবাদ ও উগ্র ডানপন্থায় রূপায়িত হচ্ছে। এই বিষয়টি ক্রমশ অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই জনতুষ্টিবাদ ও উগ্রপন্থার প্রসঙ্গেই অবধারিতভাবে চলে আসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম। তিনিই এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার নির্বাচনী রাজনীতিতে তার আবির্ভাবের পর থেকেই মার্কিন রাজনীতির অনেক প্রচলিত আচরণগত নিয়মকানুন ভেঙে পড়েছে। ট্রাম্প এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ধার ধারেন না। ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে ভালোবাসেন। অন্য দেশ দখলে নেওয়ার বাসনা প্রকাশ্যে জানান। নিজের দেশের সরকার ব্যবস্থাকে মোটা দাগে একটি ‘ব্যবসা প্রতিষ্ঠান’ মনে করে থাকেন। ফলে আধিপত্য ও আগ্রাসনকে যদি ফ্যাসিবাদের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ধরা হয়, তবে এখনকার আমেরিকা বা ট্রাম্প সেই নিন্দিত ঘরানায় পড়েও যায়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, ট্রাম্প কি তাহলে ফ্যাসিস্ট? কিছুদিন আগেই নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ট্রাম্পকে প্রকাশ্যেই ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি ট্রাম্পের সামনেও বলেছেন। যদিও তাতে হাস্যরসের মোড়ক ছিল। আসল কথা হলো, ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট বলে অভিহিত করার চল খোদ মার্কিন মুলুকেই আছে। দেশকে বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প এবার এবং আগেও দিয়েছেন, সেটি ফ্যাসিস্ট নেতারই লক্ষণ বটে। ফ্যাসিবাদে সব সময়ই মহিমান্বিত অতীতকে ফিরিয়ে আনার বা তা নির্মাণের স্বপ্ন দেখানো হয়। ট্রাম্প এটি আগেও করেছেন এবং এখনো করছেন। ফলে এদিক থেকেও ফ্যাসিবাদী লক্ষণের তীব্রতা ট্রাম্পের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক জেসন স্ট্যানলি। তিনি ‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন, যা ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদ নিয়ে তার বিস্তারিত গবেষণা আছে। জেসন স্ট্যানলি ২০১৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাই এক কথাতেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, “ট্রাম্প ফ্যাসিবাদী রাজনীতিরই চর্চা করেন। তবে এর মানে এই নয় যে, তার সরকার ফ্যাসিবাদী। তবে হ্যাঁ, তিনি ফ্যাসিবাদী নানা কৌশল ব্যবহার করে থাকেন।”
অর্থাৎ, পুরো সরকার ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী না বানিয়েও নেতা ফ্যাসিবাদী হতে পারেন। এমন নেতারা বিভিন্ন কৌশলে নিজেকে ‘অনিবার্য ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং পুরো সরকার ব্যবস্থা যেন তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়, সেটি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালান। এমন বৈশিষ্ট্য যে ট্রাম্পের মধ্যে আছে, সেটি মুখ মুছে অস্বীকার করাটা কঠিনই বটে।
আর তাই খোদ আমেরিকাতেই ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ মনে করা জনতার সংখ্যা অনেক। তবে এর বিরোধী পক্ষও আছে বেশ। সমস্যা হচ্ছে, ট্রাম্পের কাছের লোকেরাই তাকে ফ্যাসিবাদী মনে করে থাকেন। আগের মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ ছিলেন জন কেলি। কেলি বছরখানেক আগে এক নির্বাচনী অনুষ্ঠানেই বলেছেন, ফ্যাসিবাদের সাধারণ সংজ্ঞা অনুযায়ী ট্রাম্প অবশ্যই ফ্যাসিস্ট। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প যেভাবে বিরোধী মত দমনে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের কথা বলেছেন, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অপমানজনক মন্তব্য করছেন, যেকোনো মতভিন্নতাকে কোণঠাসা করার কথা বলেছেন, নির্বাচনী কর্মকর্তার বিচার করার বা বিচার বিভাগকে ছিন্নভিন্ন করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তাতে ফ্যাসিবাদী অনেক লক্ষণই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞ ট্রাম্পকে শুধুই একজন উচ্চস্তরের পুঁজিবাদী বলেই মনে করেন। তাদের মতে, ট্রাম্প কেবল ব্যবসায়ী পুঁজিপতিদের নির্বিঘ্নে কাজ করতে দিতে চান, বেপরোয়া হতে দিতে চান। এবং এটি সম্ভব করার জন্যই তিনি যাবতীয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট মনে না করা মানুষের সংখ্যা একেবারে কম নয়। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক ইয়ান-ভারনার মুলার দ্য গার্ডিয়ানে লেখা এক নিবন্ধে সরাসরি বলে দিয়েছেন, ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট নন। তার ভাষায়, উগ্র ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী একজন নেতা হলেন ট্রাম্প। তবে তাকে ফ্যাসিবাদী বলা যাবে না। ফ্যাসিবাদ এক ধরনের একনায়কতন্ত্র। তবে সব একনায়ক ফ্যাসিস্ট নন। ট্রাম্প ভোগসর্বস্ব পুঁজিবাদের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। তবে যুদ্ধে মরে যাওয়াকে তিনি মহিমান্বিত করতে চান না, যদিও যেকোনো ফ্যাসিবাদী নেতা সর্বতোভাবে এটিই করে থাকেন। তাই ট্রাম্প কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী নন। অবশ্য তাই বলে, ট্রাম্প যে বিপজ্জনক নন, সেটিও বলা যাবে না।
অর্থাৎ, ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কিনা–সেই বিতর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে চলে আসাটা একটু কঠিনই। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত আছে। তবে এটি মানতেই হবে যে, ফ্যাসিবাদের বেশ কিছু লক্ষণ ট্রাম্পের মধ্যে, অন্তত বাহ্যিকভাবে বিরাজমান অবশ্যই। এখন তার মনের গহীনে কী ইচ্ছা আছে, তা তো আর কেউ জানে না!
তবে প্রেসিডেন্টের মধ্যে ফ্যাসিস্ট লক্ষণ থাকলেও যেমন তাকে পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট বলা যায় না, তেমনি পুরো দেশও ফ্যাসিবাদের কবলে পুরোপুরি পড়ে না। অনেক বিশ্লেষকই মনে করে থাকেন যে, আমেরিকা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র নয়। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হলো, দেশটিতে থাকা সরকার ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী নয়। এমনকি মার্কিন সমাজকেও ফ্যাসিবাদী বলা যাবে না। তবে হ্যাঁ, বিচ্ছিন্নভাবে দেশটিতে ফ্যাসিবাদের অস্তিত্ব রয়েছে। ফ্যাসিবাদী ঘরানার রাজনৈতিক নেতাও আছে। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি ফ্যাসিবাদী হলেই তো আর পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় তোলা যায় না।
আমেরিকার কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, দেশটি কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী নয়। এর মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, যেহেতু আমেরিকার সমাজ ব্যবস্থা ও পুরো সরকার ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী নয় এবং ফ্যাসিবাদের সব লক্ষণ স্পষ্ট নয়, সুতরাং আমেরিকাকে ফ্যাসিবাদী দেশ বলা যায় না। তাছাড়া আমেরিকার অর্থনীতি ও সমাজ এখনো ভোগবাদী রূপেই আছে। ফ্যাসিবাদের মতো চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ এখনো তৃণমূল পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। ফলে আমেরিকাকে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বলাটা কঠিনই।
‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামের বইয়ের লেখক জেসন স্ট্যানলি। তিনি গত বছরের নভেম্বরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ট্রাম্পের এখন যে অবস্থা, তাতে তাকে ফ্যাসিস্ট বলা যেতেই পারে। একই সঙ্গে স্ট্যানলি এও বলেছেন যে, আমেরিকা বর্তমানে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের কবলে পড়েছে। এখন সেটি ফ্যাসিবাদে রূপ নেবে কিনা, তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। তবে আমেরিকায় ফ্যাসিবাদী শাসনের নানা উপাদান সক্রিয় আছে।

একই ধরনের মন্তব্য রবার্ট হিগসেরও। ‘ক্রাইসিস অ্যান্ড লেভিয়াথান’ নামের বইয়ের এই লেখক অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের বিস্তৃত ধারণা দিয়েছেন। এই গবেষক বলেন, “আমেরিকায় অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের অস্তিত্ব বেশ ভালোভাবেই গেঁড়ে বসেছে। কিন্তু মার্কিন জনগণ এটি স্বীকার করে নিতে চায় না। তারা এটি মেনে নিতে পারে না যে, তারা এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাস করছে, যা নিখুঁতভাবে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের মধ্যে পড়ে। তারা তাই বারবার বলে যে, ফ্যাসিবাদী হতে হলে ডেথ ক্যাম্প থাকতে হয়, ইউনিফর্ম পরা সিভিল ফোর্স থাকতে হবে, হিটলার বা মুসোলিনির মতো খুনি নেতা লাগবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, এসব হলো দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের ইতালি ও জার্মানির ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ফ্যাসিবাদও বদলেছে এবং নানা সুনির্দিষ্ট কাঠামো লাভ করেছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তা ঘাঁটি গেড়েছে। চারদিকে একটু মনযোগ দিয়ে নজর দিলেই তা বোঝা যাবে।”
অর্থাৎ, বোঝাই যাচ্ছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা আমেরিকার ফ্যাসিবাদকে আলিঙ্গন করার আশঙ্কা ঠিক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয় নয়। শঙ্কার কারণ আছে ঢের। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই শঙ্কার আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটাই দেখা যায়। আশার কথা হচ্ছে, মার্কিন সমাজে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির একাট্টা হওয়ার ইঙ্গিতও মিলছে। তবে ট্রাম্প যেভাবে চলছেন, তাতে রাশ টানা সম্ভব না হলে, ভবিষ্যৎ হয়তো অন্ধকারেই ডুবে যাবে। আর তাতে কেবল বাদবাকি দুনিয়া ডুববে না, আমেরিকা নিজেও ডুববে। ওই যেভাবে হিটলার বা মুসোলিনির কারণে জার্মানি বা ইতালি ডুবেছিল একদা!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে স্ত্রীসহ তুলে নিয়ে গেছে আরেকটি দেশের সেনারা। ভিন্ন দেশে সেই প্রেসিডেন্টের বিচারও শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে সেই ‘পরাক্রমশালী’ দেশের প্রেসিডেন্ট বলে চলেছেন, তিনি ওই দেশ থেকে তেল নিয়ে নিতে চান। এমনকি আরও কিছু দেশেও হাত দিতে চান। তার গ্রিনল্যান্ড দরকার, কলম্বিয়া লাগবে, কিউবা নিজের হতে হবে, ইরান প্রয়োজন–আরও কত কী!
ঠিক একই রকম পরিস্থিতি ১০০ বছর আগে দেখা গিয়েছিল। ওই দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখতে হয়েছিল দুনিয়ার মানুষকে। জার্মানি তাদের পক্ষশক্তিদের নিয়ে নিজেদের এলাকার সীমা বাড়াতে চেয়েছিল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। এক কথায়, অন্য দেশ দখল করতে গিয়েছিল। তাতেই বেঁধে গিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধ।
শেষে অনেক জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ের পর থেমেছিল বিশ্বযুদ্ধ। ওই সময়কার আগ্রাসনকারীদের ফ্যাসিবাদী আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের বিরোধী পক্ষে ছিল আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ আরও অনেকে। এরপর থেকেই এক দেশের প্রতি অন্য দেশের ভৌগোলিক আগ্রাসনকে পুরো বিশ্বেই বেশ নিন্দার চোখে দেখা হতে থাকে।
অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির ফ্যাসিবাদী হিটলারের বিরোধিতা করা দেশ আমেরিকা এখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সেনা পাঠিয়ে আটক করে তুলে নিয়ে যায়। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবলীলায় জানিয়ে দেন, ভেনেজুয়েলার তেল তার লাগবে! এর সাথে আরও আরও অন্যের এলাকা আমেরিকার করায়ত্ত হওয়া প্রয়োজন বলে জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তাহলে, আগ্রাসন এখন কারা চালাচ্ছে? সেই আগ্রাসন কি হিটলারের মতোই? তবে কি আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। আমেরিকা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কিনা–সেই আলোচনা বা বিতর্ক এবারই প্রথম ওঠেনি। গত শতকের শুরু থেকেই এমন বিতর্ক জারি আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের অনেক লক্ষণ দেখা যায় আমেরিকায়। যদিও সারা বিশ্বকে প্রায়ই গণতন্ত্রের সবক দেয় আমেরিকা!

রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ফ্যাসিবাদ অত্যন্ত জটিল। একই সঙ্গে এটি নিয়ত পরিবর্তনশীলও। ১৯২০ থেকে ১৯৩০-এর দশকে ইউরোপে এর প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভব ও বিস্তার ঘটে। এবং তার প্রতিভূই মূলত হিটলার ও মুসোলিনি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ফ্যাসিবাদের রূপ পরিবর্তন হয়েছে ঢের। বিবর্তিত হয়ে ফ্যাসিবাদ এখন এমন রূপ নিয়েছে, যাতে শুধু ইতালি বা জার্মানির ধরন দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। ফ্যাসিজম নামক রাজনৈতিক আদর্শের ধারণাটিকেই নানা সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায়। এর বৈশিষ্ট্যও হরেক। বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীতে এসব বৈশিষ্ট্য আরও নানামুখী হয়েছে।
ফ্যাসিবাদ বললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সবাই বিবেচনা করে একটি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থাকে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও। এবং এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এটিই ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক বন্দোবস্তকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গড়ে ওঠে একই ভাবধারার একটি কার্টেল। এটিই একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোয় সকল সিদ্ধান্ত নিতে থাকে। এক ধরনের একচেটিয়া ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। অর্থ ও বাণিজ্যের বিভিন্ন বিষয় ও কৃষিসংক্রান্ত নির্দেশনাসহ উৎপাদন ও বিপণনের নানা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে থাকে এই কার্টেল। এটিই হয়ে দাঁড়ায় সর্বময় কর্তা। মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতা সুসংহত করতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এর পাশাপাশি রক্ষণশীল অভিজাত ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত সম্পদ ভোগ ও তা বৃদ্ধি করার সুযোগও দেওয়া হয়। যদিও পারিশ্রমিক বা মজুরির হার ও মাত্রা কমিয়ে আনার চেষ্টা চলে ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। শ্রমিকদের কম বেতন দিয়ে বাড়তি হিসেবে জাতীয় মর্যাদা গেলানোর প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়।
মজার বিষয় হলো, ফ্যাসিবাদ বলতেই যে হিটলার ও মুসোলিনির কথা আমাদের মাথায় খেলা করে, সেই সময়কার জার্মানি ও ইতালি ছাড়া আরও কিছু দেশেও এই ফ্যাসিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পত্তন হয়েছিল। সেসব দেশের মধ্যে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকাও ছিল! এমনকি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরুর আগে মুসোলিনি ও হিটলারের এ ধরনের ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির প্রশংসায় ছিলেন আমেরিকা-ইউরোপের নেতারাও।
আমেরিকার মেরিল্যান্ডের লোয়োলা ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন থমাস জে ডিলরেনজো। তার মতে, ফ্যাসিবাদের অর্থনীতি হলো করপোরেটিজম। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে এটি যেমন ইতালি ও জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তেমনি ওই সময়ে এর একটি রূপ আমেরিকাতেও আবির্ভূত হয়েছিল। তখন মার্কিন মুলুকে একে বলা হতো, ‘পরিকল্পিত পুঁজিবাদ’। এই ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য এখনো আমেরিকাতে বর্তমান আছে ভালোভাবেই এবং এর প্রভাব ক্রমশ বাড়বে বলেই মনে করেন থমাস ডিলরেনজো।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল, নাম ‘ফ্যাসিজম ইন আমেরিকা: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’। এটি সম্পাদনা করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল ডি রোজেনফেল্ড ও জ্যানেট ওয়ার্ড। ফেয়ারফিল্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল রোজেনফেল্ড মনে করেন, আমেরিকায় ফ্যাসিবাদের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি এখন আর কল্পিত কোনো বিষয় নয়। যদিও সাধারণ মার্কিন জনগণ এখনো একে বাস্তব হিসেবে গণ্য করতে চান না। তারা মনে করেন, আমেরিকা যেসব মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রভাববিস্তারী হয়েছে, সেসবের পুরোপুরি বিরোধী হলো ফ্যাসিবাদ। মার্কিন জনগণের অধিকাংশ একে ঘৃণা করলেও আমেরিকায় ফ্যাসিবাদের ভিত্তি ক্রমে শক্তিশালী হয়েই চলেছে।
ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার ইতিহাসের অধ্যাপক জ্যানেট ওয়ার্ড মনে করেন, আমেরিকায় ফ্যাসিবাদের চর্চার ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রায় ১০০ বছর ধরে এই চর্চা ধীরে ধীরে জনতুষ্টিবাদ ও উগ্র ডানপন্থায় রূপায়িত হচ্ছে। এই বিষয়টি ক্রমশ অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই জনতুষ্টিবাদ ও উগ্রপন্থার প্রসঙ্গেই অবধারিতভাবে চলে আসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম। তিনিই এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার নির্বাচনী রাজনীতিতে তার আবির্ভাবের পর থেকেই মার্কিন রাজনীতির অনেক প্রচলিত আচরণগত নিয়মকানুন ভেঙে পড়েছে। ট্রাম্প এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ধার ধারেন না। ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে ভালোবাসেন। অন্য দেশ দখলে নেওয়ার বাসনা প্রকাশ্যে জানান। নিজের দেশের সরকার ব্যবস্থাকে মোটা দাগে একটি ‘ব্যবসা প্রতিষ্ঠান’ মনে করে থাকেন। ফলে আধিপত্য ও আগ্রাসনকে যদি ফ্যাসিবাদের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ধরা হয়, তবে এখনকার আমেরিকা বা ট্রাম্প সেই নিন্দিত ঘরানায় পড়েও যায়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, ট্রাম্প কি তাহলে ফ্যাসিস্ট? কিছুদিন আগেই নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ট্রাম্পকে প্রকাশ্যেই ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি ট্রাম্পের সামনেও বলেছেন। যদিও তাতে হাস্যরসের মোড়ক ছিল। আসল কথা হলো, ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট বলে অভিহিত করার চল খোদ মার্কিন মুলুকেই আছে। দেশকে বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প এবার এবং আগেও দিয়েছেন, সেটি ফ্যাসিস্ট নেতারই লক্ষণ বটে। ফ্যাসিবাদে সব সময়ই মহিমান্বিত অতীতকে ফিরিয়ে আনার বা তা নির্মাণের স্বপ্ন দেখানো হয়। ট্রাম্প এটি আগেও করেছেন এবং এখনো করছেন। ফলে এদিক থেকেও ফ্যাসিবাদী লক্ষণের তীব্রতা ট্রাম্পের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক জেসন স্ট্যানলি। তিনি ‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন, যা ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদ নিয়ে তার বিস্তারিত গবেষণা আছে। জেসন স্ট্যানলি ২০১৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাই এক কথাতেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, “ট্রাম্প ফ্যাসিবাদী রাজনীতিরই চর্চা করেন। তবে এর মানে এই নয় যে, তার সরকার ফ্যাসিবাদী। তবে হ্যাঁ, তিনি ফ্যাসিবাদী নানা কৌশল ব্যবহার করে থাকেন।”
অর্থাৎ, পুরো সরকার ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী না বানিয়েও নেতা ফ্যাসিবাদী হতে পারেন। এমন নেতারা বিভিন্ন কৌশলে নিজেকে ‘অনিবার্য ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং পুরো সরকার ব্যবস্থা যেন তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়, সেটি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালান। এমন বৈশিষ্ট্য যে ট্রাম্পের মধ্যে আছে, সেটি মুখ মুছে অস্বীকার করাটা কঠিনই বটে।
আর তাই খোদ আমেরিকাতেই ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ মনে করা জনতার সংখ্যা অনেক। তবে এর বিরোধী পক্ষও আছে বেশ। সমস্যা হচ্ছে, ট্রাম্পের কাছের লোকেরাই তাকে ফ্যাসিবাদী মনে করে থাকেন। আগের মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ ছিলেন জন কেলি। কেলি বছরখানেক আগে এক নির্বাচনী অনুষ্ঠানেই বলেছেন, ফ্যাসিবাদের সাধারণ সংজ্ঞা অনুযায়ী ট্রাম্প অবশ্যই ফ্যাসিস্ট। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প যেভাবে বিরোধী মত দমনে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের কথা বলেছেন, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অপমানজনক মন্তব্য করছেন, যেকোনো মতভিন্নতাকে কোণঠাসা করার কথা বলেছেন, নির্বাচনী কর্মকর্তার বিচার করার বা বিচার বিভাগকে ছিন্নভিন্ন করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তাতে ফ্যাসিবাদী অনেক লক্ষণই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞ ট্রাম্পকে শুধুই একজন উচ্চস্তরের পুঁজিবাদী বলেই মনে করেন। তাদের মতে, ট্রাম্প কেবল ব্যবসায়ী পুঁজিপতিদের নির্বিঘ্নে কাজ করতে দিতে চান, বেপরোয়া হতে দিতে চান। এবং এটি সম্ভব করার জন্যই তিনি যাবতীয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট মনে না করা মানুষের সংখ্যা একেবারে কম নয়। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক ইয়ান-ভারনার মুলার দ্য গার্ডিয়ানে লেখা এক নিবন্ধে সরাসরি বলে দিয়েছেন, ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট নন। তার ভাষায়, উগ্র ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী একজন নেতা হলেন ট্রাম্প। তবে তাকে ফ্যাসিবাদী বলা যাবে না। ফ্যাসিবাদ এক ধরনের একনায়কতন্ত্র। তবে সব একনায়ক ফ্যাসিস্ট নন। ট্রাম্প ভোগসর্বস্ব পুঁজিবাদের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। তবে যুদ্ধে মরে যাওয়াকে তিনি মহিমান্বিত করতে চান না, যদিও যেকোনো ফ্যাসিবাদী নেতা সর্বতোভাবে এটিই করে থাকেন। তাই ট্রাম্প কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী নন। অবশ্য তাই বলে, ট্রাম্প যে বিপজ্জনক নন, সেটিও বলা যাবে না।
অর্থাৎ, ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কিনা–সেই বিতর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে চলে আসাটা একটু কঠিনই। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত আছে। তবে এটি মানতেই হবে যে, ফ্যাসিবাদের বেশ কিছু লক্ষণ ট্রাম্পের মধ্যে, অন্তত বাহ্যিকভাবে বিরাজমান অবশ্যই। এখন তার মনের গহীনে কী ইচ্ছা আছে, তা তো আর কেউ জানে না!
তবে প্রেসিডেন্টের মধ্যে ফ্যাসিস্ট লক্ষণ থাকলেও যেমন তাকে পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট বলা যায় না, তেমনি পুরো দেশও ফ্যাসিবাদের কবলে পুরোপুরি পড়ে না। অনেক বিশ্লেষকই মনে করে থাকেন যে, আমেরিকা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র নয়। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হলো, দেশটিতে থাকা সরকার ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী নয়। এমনকি মার্কিন সমাজকেও ফ্যাসিবাদী বলা যাবে না। তবে হ্যাঁ, বিচ্ছিন্নভাবে দেশটিতে ফ্যাসিবাদের অস্তিত্ব রয়েছে। ফ্যাসিবাদী ঘরানার রাজনৈতিক নেতাও আছে। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি ফ্যাসিবাদী হলেই তো আর পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় তোলা যায় না।
আমেরিকার কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, দেশটি কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী নয়। এর মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, যেহেতু আমেরিকার সমাজ ব্যবস্থা ও পুরো সরকার ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী নয় এবং ফ্যাসিবাদের সব লক্ষণ স্পষ্ট নয়, সুতরাং আমেরিকাকে ফ্যাসিবাদী দেশ বলা যায় না। তাছাড়া আমেরিকার অর্থনীতি ও সমাজ এখনো ভোগবাদী রূপেই আছে। ফ্যাসিবাদের মতো চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ এখনো তৃণমূল পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। ফলে আমেরিকাকে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বলাটা কঠিনই।
‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামের বইয়ের লেখক জেসন স্ট্যানলি। তিনি গত বছরের নভেম্বরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ট্রাম্পের এখন যে অবস্থা, তাতে তাকে ফ্যাসিস্ট বলা যেতেই পারে। একই সঙ্গে স্ট্যানলি এও বলেছেন যে, আমেরিকা বর্তমানে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের কবলে পড়েছে। এখন সেটি ফ্যাসিবাদে রূপ নেবে কিনা, তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। তবে আমেরিকায় ফ্যাসিবাদী শাসনের নানা উপাদান সক্রিয় আছে।

একই ধরনের মন্তব্য রবার্ট হিগসেরও। ‘ক্রাইসিস অ্যান্ড লেভিয়াথান’ নামের বইয়ের এই লেখক অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের বিস্তৃত ধারণা দিয়েছেন। এই গবেষক বলেন, “আমেরিকায় অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের অস্তিত্ব বেশ ভালোভাবেই গেঁড়ে বসেছে। কিন্তু মার্কিন জনগণ এটি স্বীকার করে নিতে চায় না। তারা এটি মেনে নিতে পারে না যে, তারা এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাস করছে, যা নিখুঁতভাবে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের মধ্যে পড়ে। তারা তাই বারবার বলে যে, ফ্যাসিবাদী হতে হলে ডেথ ক্যাম্প থাকতে হয়, ইউনিফর্ম পরা সিভিল ফোর্স থাকতে হবে, হিটলার বা মুসোলিনির মতো খুনি নেতা লাগবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, এসব হলো দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের ইতালি ও জার্মানির ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ফ্যাসিবাদও বদলেছে এবং নানা সুনির্দিষ্ট কাঠামো লাভ করেছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তা ঘাঁটি গেড়েছে। চারদিকে একটু মনযোগ দিয়ে নজর দিলেই তা বোঝা যাবে।”
অর্থাৎ, বোঝাই যাচ্ছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা আমেরিকার ফ্যাসিবাদকে আলিঙ্গন করার আশঙ্কা ঠিক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয় নয়। শঙ্কার কারণ আছে ঢের। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই শঙ্কার আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটাই দেখা যায়। আশার কথা হচ্ছে, মার্কিন সমাজে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির একাট্টা হওয়ার ইঙ্গিতও মিলছে। তবে ট্রাম্প যেভাবে চলছেন, তাতে রাশ টানা সম্ভব না হলে, ভবিষ্যৎ হয়তো অন্ধকারেই ডুবে যাবে। আর তাতে কেবল বাদবাকি দুনিয়া ডুববে না, আমেরিকা নিজেও ডুববে। ওই যেভাবে হিটলার বা মুসোলিনির কারণে জার্মানি বা ইতালি ডুবেছিল একদা!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা