মোসাব্বির হত্যা: চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, নাকি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

আরমান ভূঁইয়া
মোসাব্বির হত্যা: চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, নাকি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
মোসাব্বির হত্যাকান্ডের পর ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। ছবি: চরচা

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বির (৪৪)। তদন্তকারী কর্মকর্তারা এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে মোটিভগুলো খুঁজে পেয়েছেন–তার একটি কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও এলাকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যটি হচ্ছে দলীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব। এ ক্ষেত্রে বড় বড় নামও উঠে আসছে সন্দেহের তালিকায়।

গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কারওয়ান বাজারে স্টার হোটেলের পাশের গলিতে মোসাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা তেজগাঁও থানা ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে একটি রাজনৈতিক বৈঠক শেষে মোসাব্বির ও মাসুদ বাসার উদ্দেশে হোটেলের পাশের গলির ভেতরে প্রবেশ করেন। আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট ভবনের সামনে পৌঁছামাত্র আগে থেকেই ওঁৎ পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জন দুর্বৃত্ত তাদের গতিরোধ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে মোসাব্বিরের ডান হাতের কনুই ও পেটের ডান পাশে দুটি গুলি লাগে। মাসুদের পেটের বাম পাশে একটি গুলি লাগে।

আজিজুর রহমান মোসাব্বির। ফাইল ছবি
আজিজুর রহমান মোসাব্বির। ফাইল ছবি

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুজনই দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে গলির একটু সামনে গিয়ে আহমেদ জেনারেল স্টোরের সামনে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন মোসাব্বির। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় একটি ভ্যানে করে তাদের বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ঘটনার পরপরই পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। সেখান থেকে ৭.৬৫ এমএম পিস্তলের তিনটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

হত্যাকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার সকালে নিহত মোসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৪-৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান চরচাকে বলেন, “নিহতের স্ত্রী জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন ধরেই মোসাব্বির জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন। তবে সে বিষয়ে কোনো জিডি বা মামলা করা হয়নি। আমরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা কয়েকজনকে শনাক্ত করে তদন্ত করছি। কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি, ফার্মগেট এলাকার গ্যারেজ দখল ও স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব–এই তিনটি বিষয় সামনে রেখেই তদন্ত চলছে।”

আজিজুর রহমান মোসাব্বির জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে বিএনপিতে যুক্ত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে তার বিরুদ্ধে অন্তত ১২৫টি মামলা ছিল বলে জানা যায়। একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণও করেন তিনি। তবে ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজির ঘটনায় তাকে পদ থেকে বহিস্কার করা হয়।

২০২০ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছিলেন মোসাব্বির। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগে তার সাংগঠনিক পদ স্থগিত করা হয়।

ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত গুলির খোসা। ছবি: চরচা
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত গুলির খোসা। ছবি: চরচা

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলত দুটি মোটিভ কাজ করেছে–স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারওয়ান বাজারের দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ে বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়। এ সময় ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম নীরবের সঙ্গে মোসাব্বিরের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। যদিও একপর্যায়ে এর সমঝোতা হয় বলে জানা যায়।

সংকট শুরু হয় ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি থেকে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে সমর্থন দিলে। নীরব মোসাব্বিরের কাছে সমর্থন চাইলেও তিনি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না বলে জানান। এ থেকে আবার নীরবের সঙ্গে মোসাব্বিরের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।

আরেকটি নাম: সুইডেন আসলাম

গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ ধারণা করছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের সঙ্গেও এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে। জানা যায়, আসলাম তার স্ত্রীকে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর করতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে মোসাব্বিরকে সমর্থন দিতে বলা হলেও তিনি রাজি হননি। এই বিরোধ থেকেও হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিলিং মিশনে পাঁচজন

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিলিং মিশনে মোট পাঁচজন অংশ নেয়। গলির ভেতরে অস্ত্রধারী তিনজন সরাসরি গুলি চালায় এবং স্টার হোটেলের সামনে মূল সড়কে আরও দুজন মোসাব্বিরের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। এরা পেশাদার ভাড়াটে শুটার এবং কেউই স্থানীয় নন বলে দাবি গোয়েন্দাদের।

ঘটনার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল মজিদ মিলন ও যুবদলের সহসভাপতি মো. ফারুক হোসেনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মিলনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও ফারুককে এখনো আটক রাখা হয়েছে। অন্যদিকে র‍্যাব রনি ও মন্টু নামে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে এবং তেজগাঁও থানা পুলিশও জিজ্ঞাসাবদের জন্য তিনজনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে। যদিও এ আটকের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

এ ছাড়া তেজগাঁও থানা যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্যসচিব আবদুর রহমানকেও এ ঘটনায় খুঁজছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই আবদুর রহমান ও তার অনুসারীরা পলাতক বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কর্মসূচি

মোসাব্বির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বুধবার রাতেই কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা মোড় অবরোধ করে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। তারা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। আজ বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং পরে কারওয়ান বাজারে জানাজা ঘিরেও বিক্ষোভ মিছিল হয়। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দল শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

সম্পর্কিত