কিংবদন্তি ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা আলফ্রেড হিচকককে বলা হয় ‘সাসপেন্সের গুরু’। তার এই পরিচিতির পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল তার অল-টাইম-ক্ল্যাসিক—‘সাইকো’ সিনেমা। যদিও হিচকক নিজে কখনো এই সিনেমাকে সিরিয়াসলি নেননি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বসিনেমার ইতিহাসে ‘সাইকো’ একটি বৈপ্লবিক ঘটনা।
এই সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের একটি-৪৫ সেকেন্ডের গোসল-দৃশ্য। দৃশ্যটি ‘শাওয়ার সিন’ নামে পরিচিত। শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যটি শুধু সিনেমা-চিন্তাতেই নয়—দৃশ্যশিল্প নিয়ে ভাবনাতেও আমূল পরিবর্তন আনে। আর এ জন্যই সুইস-মার্কিন চলচ্চিত্রকার আলেক্সান্দ্রে ও ফিলিপ বলেছেন, ‘শাওয়ার দৃশ্যের আগে ছিল এক ধরনের সিনেমা, এই দৃশ্যের পরে তৈরি হতে থাকে আরেক ধরনের সিনেমা।’ এখানেই থেমে থাকেননি ফিলিপ, এই দৃশ্য নিয়ে তিনি ২০১৭ সালে একটি আস্ত তথ্যচিত্র নির্মাণ করে ফেলেন।
তথ্যচিত্রটির নাম ‘সেভেন্টি এইট/ফিফটি টু: হিচকক’স শাওয়ার সিন’। চলচ্চিত্র সমালোচকরা বলেন, ১৯৬০ সালের ১৬ জুন মুক্তি পাওয়া ‘সাইকো’ আসলে আগের সামাজিক ট্যাবু ও প্রচলিত নিয়মকানুন ভেঙে ফেলে। মার্কিন ঔপন্যাসিক রবার্ট আলবার্ট ব্লকের লেখা উপন্যাস (সাইকো) অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমায় জ্যানেট লি মেরিয়ন ক্রেন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মেরিয়ন ক্রেন একটি মোটেলে ওঠেন। সেই মোটেলে তিনি যখন গোসল করছিলেন, তখন তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। খুনি হলো, মোটেলটির মালিক নরম্যান বেটস। এই ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অ্যান্থনি পারকিন্স। নরম্যান বেটস সাধারণ খুনি নয়—উন্মাদ সিরিয়াল কিলার! এই চরিত্রের প্রভাব পরবর্তী সময়ে কত সিনেমার ওপর যে পড়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
অভিনেত্রী জ্যানেট লিকে শাওয়ার সিন বুঝিয়ে দিচ্ছেন আলফ্রেড হিচকক। ছবি : আইএফসি ফিল্মস
টয়লেটে খুনের দৃশ্য ধারণ করতে হিচকক ৭৮টি ক্যামেরা সেটআপ এবং ৫২টি কাট ব্যবহার করেছেন। দৃশ্যটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নির্মাতা আলেক্সান্দ্রে ও ফিলিপ বলছেন, সেসময় এই দৃশ্যটি ছিল ‘গেম চেঞ্জার’। নানা কারণে দৃশ্যটি একটি মাইলফলক। হলিউডের কোনো সিনেমায় সেই প্রথম টয়লেটের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। বক্স অফিসে ‘সাইকো’ ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় করে। মার্কিন চলচ্চিত্র সমালোচক ওয়েন গ্লিবারম্যান মন্তব্য করেছিলেন, ‘সাইকো’ বুঝতে শেখায়, দানব ভিনগ্রহী নয়-তার বসবাস আসলে মানুষের মস্তিষ্কে। ‘আমেরিকান সাইকো’ উপন্যাসের লেখক ব্রেট ইস্টন এলিসের মতে, হিচককের ‘সাইকো’ জানিয়ে দিয়েছিল-খুন এখন থেকে বিনোদনের খোরাকও হবে। তার মতে, “হলিউড সিনেমায় সহিংসতা আগেও ছিল, কিন্তু ‘সাইকো’তে যতটা ঘনিষ্ঠ ও পরিকল্পিতভাবে আছে—সেভাবে ছিল না।”
ছবির আইডিয়া নিয়ে হিচকক প্রথমে প্যারামাউন্ট স্টুডিওর কাছে গিয়েছিলেন। তারা সাফ জানিয়ে দেয়, তারা বিনিয়োগ করছে না। উপায় না দেখে নিজের টাকায় সিনেমাটি তৈরি করেছিলেন তিনি। সিনেমা নির্মাণ শেষ হলেও বিপত্তি শেষ হয়নি। সেন্সর বোর্ড বেঁকে বসে। তারা সিনেমার গোড়াতেই আপত্তি তোলে। শুরুর দিকে দেখা যায়, ব্রা ও স্লিপ পরা মেরিয়ন ক্রেন (জ্যানেট লি) তার তালাকপ্রাপ্ত প্রেমিকের সঙ্গে হোটেল রুমে দেখা করে। বোর্ডের মতে, দৃশ্যটি অশ্লীল-এটি বদলাতে হবে। তারপর আসে সেই বিখ্যাত ‘শাওয়ার সিন’। এই দৃশ্যে এসে বোর্ড থমকে যায়। তাদের মতে, এই দৃশ্যটিও অশালীন। কিন্তু হিচকক ছলচাতুরি করে আপত্তিগুলো এড়িয়ে যান। তিনি বোর্ড সদস্যদের সেটে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন; বলেছিলেন, তাদের সামনেই আপত্তিকর দৃশ্যগুলো আবার শ্যুট করা হবে। কিন্তু একজনও আসেননি।
‘সাইকো’র বিখ্যাত ‘শাওয়ার সিন’। ছবি: সিনেমা থেকে নেওয়াশাওয়ারের সেটটি এমনভাবে বানানো হয়েছিল, যাতে এর যেকোনো দেয়াল খুলে ফেলা যায় এবং যেভাবে ইচ্ছে ক্যামেরা মুভ করা যায়। সুরকার বার্নার্ড হারম্যানের তীব্র ও তীক্ষ্ণ ভায়োলিনের সুর দৃশ্যটিকে আরও বেশি ভয় ও আতঙ্কের করে তুলেছে। যদিও হিচকক দৃশ্যটি নির্বাক রাখতে চেয়েছিলেন। হারম্যান তাকে রাজি করিয়েছিলেন—ভায়োলিনের সুরটুকু রাখা হোক।
পপকালচারে সাইকো গভীর ও ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং অস্থির ষাটের দশকে এক সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচনা করে। ইতালির জালো ধারা (সহিংসতা ও ইরোটিক ঘরানা) এবং আমেরিকার স্ল্যাশার ঘরানার ছবিগুলোর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে হিচককের সাইকো। সাইকোর সিক্যুয়েল ও রিমেক হয়েছে, তার অনুপ্রেরণায় টিভি সিরিজ, গান, অ্যানিমেশন—কী হয়নি সাইকোকে ভিত্তি করে! ফিলিপ যথার্থই বলেছেন, ‘সাইকো’ আসলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছিল।
তথ্যসূত্র: হিস্ট্রি ডটকম