সহিদুল আলম স্বপন

ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে হেঁটে বাংলাদেশে এলেন; বিমানে নয়, সড়কপথে। যেন প্রতীকী বার্তাটি আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশে পা রেখেই তিনি বললেন, “একই আকাশ, একই বাতাস, একই স্বপ্ন।” কথাগুলো শুনতে কাব্যিক, অনুভবে উষ্ণ এবং কূটনৈতিক বাগ্মিতার বিচারে নিঃসন্দেহে মনোহর। ভূপেন হাজারিকা বেঁচে থাকলে হয়তো এই কথায় আরও একটি গানও বাঁধতেন।
এর ঠিক দুই দিন পর বাংলাদেশ সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হলো না। বিমানবন্দরে তাকে থামিয়ে দেওয়া হলো। তিনি ফিরে গেলেন। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ নেই।
এই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে যে ছবিটি ফুটে ওঠে, তা কেবল বৈপরীত্যের নয়। এটি ভারতের দক্ষিণ এশিয়া নীতির সেই পুরনো দ্বৈত চরিত্রের নগ্ন প্রকাশ, যা বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মনে অবিশ্বাসের শিকড় গেড়ে বসেছে।
কূটনীতি কেবল শব্দের খেলা নয়। শব্দ ও কর্মের মধ্যে যখন সামঞ্জস্য থাকে না, তখন বিশ্বাসযোগ্যতা ভেঙে পড়ে এবং সেই ভাঙন একবার শুরু হলে জোড়া লাগানো কঠিন হয়ে যায়।
নতুন সরকার ভারতের সেই পুরনো ছাঁচে ঢালাই হতে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর ভারতে নয়, মালয়েশিয়ায় করবেন, এরপর যাবেন চীনে। এটি একটি সুচিন্তিত কূটনৈতিক বার্তা, যা সরাসরি না বললেও দিল্লি তা পড়তে পারছে।
ভারত বহু বছর ধরে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা বলে আসছে। মোদি সরকার ক্ষমতায় এসে এই নীতিকে তাদের পররাষ্ট্র কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ‘প্রতিবেশী প্রথম’ মানে প্রতিবেশীকে নিজের কক্ষপথে আটকে রাখা, তার রাজনৈতিক পছন্দ নির্ধারণ করে দেওয়া, তার কূটনৈতিক অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করা, এমনকি তার সরকারের কোনো প্রতিনিধি দিল্লিতে পা রাখতে পারবেন কি পারবেন না, সেটাও দিল্লির অনুমোদন সাপেক্ষ। এটি অংশীদারত্বের কূটনীতি নয়, এটি অভিভাবকত্বের রাজনীতি। আর এই অভিভাবকত্বের রাজনীতিই বারবার দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে, তা দিল্লির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ভারত শেখ হাসিনার সরকারকে নিজের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, ট্রানজিট সুবিধা, বিদ্রোহী দমন, প্রতিটি ক্ষেত্রে হাসিনা সরকার ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে, কখনো কখনো নিজের দেশের জনগণের প্রত্যাশার বিনিময়েও। সেই সরকারের পতনের পর দিল্লি এখন এক অস্বস্তিকর শূন্যতায় পড়েছে। নতুন সরকার ভারতের সেই পুরনো ছাঁচে ঢালাই হতে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর ভারতে নয়, মালয়েশিয়ায় করবেন, এরপর যাবেন চীনে। এটি একটি সুচিন্তিত কূটনৈতিক বার্তা, যা সরাসরি না বললেও দিল্লি তা পড়তে পারছে। কিন্তু সেই বার্তার জবাব দিচ্ছে কীভাবে? পরিপক্ব কূটনীতিতে নয়। বরং বাংলাদেশের একজন সরকারি উপদেষ্টাকে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দিয়ে, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার সবচেয়ে শিশুসুলভ প্রকাশ।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বিচারে এটি একটি গুরুতর ও অগ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ। ভিয়েনা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলে পরস্পরের সরকারি প্রতিনিধিদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান ও সৌজন্য বজায় রাখা অপরিহার্য। ডা. জাহেদ উর রহমান কোনো অপরাধী নন, কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যক্তি নন। তিনি একটি সার্বভৌম দেশের সরকারের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তাকে প্রবেশে বাধা দিয়ে ভারত কার্যত এই বার্তাই দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে সে সমকক্ষ মনে করে না; বরং তাকে একটি অবাধ্য প্রতিবেশী হিসেবে দেখছে, যাকে শাসন করা দরকার। এই মানসিকতা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি করে না, এটি আঞ্চলিক সহযোগিতার পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।
এই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে তাকালে দেখা যায়, ভারতের প্রতিটি প্রতিবেশী কোনো না কোনো সময়ে এই একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে। নেপালে ভারতীয় অবরোধ, শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মালদ্বীপে ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলনের জন্ম প্রতিটি ঘটনার পেছনে ভারতের একই অহংকারী মনোভাব কাজ করেছে। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত যে শূন্যস্থান তৈরি করেছে, সেখানে চীন নিঃশব্দে প্রবেশ করেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় চীন এই অঞ্চলে যে অবকাঠামো বিনিয়োগ করছে, যে কৌশলগত বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে, তার মূল কারণ ভারতের নিজের ব্যর্থতা। ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকেরা এটি জানেন, থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছে, কিন্তু নীতিনির্ধারণে সেই উপলব্ধির ছায়াও পড়েনি।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় একটি কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে, একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতিতে ছোট দেশগুলো আর বড় প্রতিবেশীর ছায়ায় নিষ্ক্রিয় বসে থাকে না। আমেরিকা-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতার এই যুগে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ বহুমুখী কূটনীতির পথে হাঁটছে, নিজের স্বার্থ নিজে নির্ধারণ করছে, নিজের অবস্থান নিজে ঠিক করছে। বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটছে। এই নতুন বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে সম্পর্ক গড়ার সাহস ভারতের থাকা উচিত ছিল। কিন্তু পুরনো মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কৌশলগত অংশীদারত্ব কখনো টেকসই হয় না; হয় কেবল নির্ভরতার সম্পর্ক, যা প্রথম সুযোগেই ভেঙে পড়ে।
প্রতিবেশীকে ধরে রাখতে হলে চাপ নয়, আস্থা দরকার। বাধা নয়, সুযোগ দরকার। নিয়ন্ত্রণ নয়, পারস্পরিক মর্যাদা দরকার। দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, “একই আকাশ, একই বাতাস, একই স্বপ্ন।” কথাটি ভৌগোলিকভাবে সত্য। কিন্তু কূটনীতিতে আকাশ ও বাতাস ভাগ করাই যথেষ্ট নয়; বিশ্বাস, সম্মান এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে হয়। সেই ভিত্তি যতদিন কেবল বক্তৃতায় থাকবে, আর বিমানবন্দরে প্রবেশ-নিষেধের নির্দেশে ভেঙে পড়বে, ততদিন ‘একই স্বপ্ন’ একটি ফাঁকা বুলিই থাকবে। আর ফাঁকা বুলি দিয়ে কখনো ইতিহাস লেখা যায় না; বরং অবিশ্বাসের নতুন অধ্যায় যোগ হয় কেবল।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ

ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে হেঁটে বাংলাদেশে এলেন; বিমানে নয়, সড়কপথে। যেন প্রতীকী বার্তাটি আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশে পা রেখেই তিনি বললেন, “একই আকাশ, একই বাতাস, একই স্বপ্ন।” কথাগুলো শুনতে কাব্যিক, অনুভবে উষ্ণ এবং কূটনৈতিক বাগ্মিতার বিচারে নিঃসন্দেহে মনোহর। ভূপেন হাজারিকা বেঁচে থাকলে হয়তো এই কথায় আরও একটি গানও বাঁধতেন।
এর ঠিক দুই দিন পর বাংলাদেশ সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হলো না। বিমানবন্দরে তাকে থামিয়ে দেওয়া হলো। তিনি ফিরে গেলেন। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ নেই।
এই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে যে ছবিটি ফুটে ওঠে, তা কেবল বৈপরীত্যের নয়। এটি ভারতের দক্ষিণ এশিয়া নীতির সেই পুরনো দ্বৈত চরিত্রের নগ্ন প্রকাশ, যা বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মনে অবিশ্বাসের শিকড় গেড়ে বসেছে।
কূটনীতি কেবল শব্দের খেলা নয়। শব্দ ও কর্মের মধ্যে যখন সামঞ্জস্য থাকে না, তখন বিশ্বাসযোগ্যতা ভেঙে পড়ে এবং সেই ভাঙন একবার শুরু হলে জোড়া লাগানো কঠিন হয়ে যায়।
নতুন সরকার ভারতের সেই পুরনো ছাঁচে ঢালাই হতে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর ভারতে নয়, মালয়েশিয়ায় করবেন, এরপর যাবেন চীনে। এটি একটি সুচিন্তিত কূটনৈতিক বার্তা, যা সরাসরি না বললেও দিল্লি তা পড়তে পারছে।
ভারত বহু বছর ধরে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা বলে আসছে। মোদি সরকার ক্ষমতায় এসে এই নীতিকে তাদের পররাষ্ট্র কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ‘প্রতিবেশী প্রথম’ মানে প্রতিবেশীকে নিজের কক্ষপথে আটকে রাখা, তার রাজনৈতিক পছন্দ নির্ধারণ করে দেওয়া, তার কূটনৈতিক অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করা, এমনকি তার সরকারের কোনো প্রতিনিধি দিল্লিতে পা রাখতে পারবেন কি পারবেন না, সেটাও দিল্লির অনুমোদন সাপেক্ষ। এটি অংশীদারত্বের কূটনীতি নয়, এটি অভিভাবকত্বের রাজনীতি। আর এই অভিভাবকত্বের রাজনীতিই বারবার দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে, তা দিল্লির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ভারত শেখ হাসিনার সরকারকে নিজের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, ট্রানজিট সুবিধা, বিদ্রোহী দমন, প্রতিটি ক্ষেত্রে হাসিনা সরকার ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে, কখনো কখনো নিজের দেশের জনগণের প্রত্যাশার বিনিময়েও। সেই সরকারের পতনের পর দিল্লি এখন এক অস্বস্তিকর শূন্যতায় পড়েছে। নতুন সরকার ভারতের সেই পুরনো ছাঁচে ঢালাই হতে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর ভারতে নয়, মালয়েশিয়ায় করবেন, এরপর যাবেন চীনে। এটি একটি সুচিন্তিত কূটনৈতিক বার্তা, যা সরাসরি না বললেও দিল্লি তা পড়তে পারছে। কিন্তু সেই বার্তার জবাব দিচ্ছে কীভাবে? পরিপক্ব কূটনীতিতে নয়। বরং বাংলাদেশের একজন সরকারি উপদেষ্টাকে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দিয়ে, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার সবচেয়ে শিশুসুলভ প্রকাশ।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বিচারে এটি একটি গুরুতর ও অগ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ। ভিয়েনা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলে পরস্পরের সরকারি প্রতিনিধিদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান ও সৌজন্য বজায় রাখা অপরিহার্য। ডা. জাহেদ উর রহমান কোনো অপরাধী নন, কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যক্তি নন। তিনি একটি সার্বভৌম দেশের সরকারের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তাকে প্রবেশে বাধা দিয়ে ভারত কার্যত এই বার্তাই দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে সে সমকক্ষ মনে করে না; বরং তাকে একটি অবাধ্য প্রতিবেশী হিসেবে দেখছে, যাকে শাসন করা দরকার। এই মানসিকতা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি করে না, এটি আঞ্চলিক সহযোগিতার পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।
এই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে তাকালে দেখা যায়, ভারতের প্রতিটি প্রতিবেশী কোনো না কোনো সময়ে এই একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে। নেপালে ভারতীয় অবরোধ, শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মালদ্বীপে ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলনের জন্ম প্রতিটি ঘটনার পেছনে ভারতের একই অহংকারী মনোভাব কাজ করেছে। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত যে শূন্যস্থান তৈরি করেছে, সেখানে চীন নিঃশব্দে প্রবেশ করেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় চীন এই অঞ্চলে যে অবকাঠামো বিনিয়োগ করছে, যে কৌশলগত বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে, তার মূল কারণ ভারতের নিজের ব্যর্থতা। ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকেরা এটি জানেন, থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছে, কিন্তু নীতিনির্ধারণে সেই উপলব্ধির ছায়াও পড়েনি।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় একটি কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে, একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতিতে ছোট দেশগুলো আর বড় প্রতিবেশীর ছায়ায় নিষ্ক্রিয় বসে থাকে না। আমেরিকা-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতার এই যুগে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ বহুমুখী কূটনীতির পথে হাঁটছে, নিজের স্বার্থ নিজে নির্ধারণ করছে, নিজের অবস্থান নিজে ঠিক করছে। বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটছে। এই নতুন বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে সম্পর্ক গড়ার সাহস ভারতের থাকা উচিত ছিল। কিন্তু পুরনো মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কৌশলগত অংশীদারত্ব কখনো টেকসই হয় না; হয় কেবল নির্ভরতার সম্পর্ক, যা প্রথম সুযোগেই ভেঙে পড়ে।
প্রতিবেশীকে ধরে রাখতে হলে চাপ নয়, আস্থা দরকার। বাধা নয়, সুযোগ দরকার। নিয়ন্ত্রণ নয়, পারস্পরিক মর্যাদা দরকার। দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, “একই আকাশ, একই বাতাস, একই স্বপ্ন।” কথাটি ভৌগোলিকভাবে সত্য। কিন্তু কূটনীতিতে আকাশ ও বাতাস ভাগ করাই যথেষ্ট নয়; বিশ্বাস, সম্মান এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে হয়। সেই ভিত্তি যতদিন কেবল বক্তৃতায় থাকবে, আর বিমানবন্দরে প্রবেশ-নিষেধের নির্দেশে ভেঙে পড়বে, ততদিন ‘একই স্বপ্ন’ একটি ফাঁকা বুলিই থাকবে। আর ফাঁকা বুলি দিয়ে কখনো ইতিহাস লেখা যায় না; বরং অবিশ্বাসের নতুন অধ্যায় যোগ হয় কেবল।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ