মেরিনা মিতু

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এবং দল থেকে বহিষ্কার রাজনীতির অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি শুধু একজন নেতার ছেলের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা, নাকি বিএনপি সরকার এর মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে? ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল কি না, তা নিয়েও কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
সজীবকে আটকের পর যুবদল কেন্দ্রীয়ভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করে। দল স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তার কোনো কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠন নেবে না।
বিএনপি নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এ ঘটনায় সরকারের বার্তা হতে পারে-ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার আত্মীয় বা পরিবারের সদস্য হলেও অভিযোগ উঠলে ছাড় দেওয়া হবে না। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ‘দলীয় পরিচয়ে প্রভাব খাটানোর’ অভিযোগ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সজীবের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের জন্য একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সরকারের একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেন, “এই ঘটনায় সরকার কয়েকটি বার্তা দিতে চেয়েছে। তা হলো- চাঁদাবাজি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো সুরক্ষা নয়। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন অভিযোগে দল দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। তার জন্য সরকার ‘জির টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।”
দলের ভেতরে প্রশ্ন উঠছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বা দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী কোনো নেতার ছেলে একই অভিযোগে অভিযুক্ত হলে দল কি একই গতিতে ব্যবস্থা নিত?
ফেসবুকে ইসমাইল মোল্লা নামে একজন লিখেছেন, “মাননীয় তারেক রহমানের এমন সব সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। তবে, সালাহউদ্দীন সাহেবের ছেলের বেলাতেও কি এমন কঠোর হতেন? নাকি মান্নান সাহেবের বেলাতেই এক্সাম্পল ক্রিয়েট করার সুযোগটা নিলেন?”
সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “সজীবের ঘটনায় যা দেখা গেছে, তা হলো, আটকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এসেছে। ফলে বিএনপি অন্তত প্রকাশ্যে দেখাতে চেয়েছে যে পরিচয় নয়, অভিযোগই বিবেচ্য। তাই কার ছেলে, কার কী সেটা কাউন্ট করা হচ্ছে না, হবেও না।”

মান্নানের ওপর বিরক্ত বিএনপি?
দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আজহারুল ইসলাম মান্নানকে ঘিরে দলের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক রয়েছে। মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের সময় তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভও হয়েছিল।
দলের একাংশের মতে, সজীবের ঘটনায় শুধু আইন প্রয়োগ নয়, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও একটি বার্তা থাকতে পারে। যদিও সরকার বা বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো অবস্থান জানায়নি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির অভ্যন্তরে বিভক্তি ও গ্রুপিং একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক বলয় বা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গ্রুপের মধ্যে প্রভাব বিস্তার, পদ-পদবি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্বও সময়ের সঙ্গে প্রকাশ্যে এসেছে।
স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একাধিকবার এসব দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্থানীয় নেতৃত্বকে নির্দেশ দিলেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং বিরোধ আরও প্রকট হয়েছে। ফলে স্থানীয় সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি হয়।
এই অস্বস্তির মধ্যে গত বছরের ৪ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের সনমান্দি ইউনিয়নের অলিপুরা বাজারে আয়োজিত এক সভায় নতুন বিতর্কের জন্ম দেন মান্নানের জামাতা মাসুম বিল্লাহ।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “সাবধান, হুঁশিয়ার, লাস্ট ওয়ার্নিং। এরপর কোনো ওয়ার্নিং হবে না। আজহারুল ইসলাম মান্নানের পক্ষে কাজ করতে হবে। ব্যত্যয় হলে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।”
বক্তব্যের ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নয়, বরং নিজ দলের কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া এক ধরনের হুমকি হিসেবে দেখেন। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ভেতরে এমন ভাষা কীভাবে ব্যবহার করা হলো।
জামাতার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক যখন চলছিল, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আজহারুল ইসলাম মান্নান এবং এক সাংবাদিকের কথোপকথনের একটি অডিও।
অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং স্থানীয় রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা যায়, ওই সাংবাদিক মান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং তার ছেলে মেঘনার টোল প্লাজা দখলের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
জবাবে মান্নানকে বলতে শোনা যায়, “সারা বাংলাদেশেই বিএনপির পোলাপান এসব করে। ঢাকাতে মির্জা আব্বাসের পোলাপান হগল করে। দেখতে চান আপনে?”
একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিককে বলেন, “আগে গিয়া নিজেরা তদন্ত কইরা বাহির করেন, তারপর লিখেন। আপনের লগে তর্ক করতে রাজি না।”
অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই মনে করেন, কথোপকথনে ব্যবহৃত ভাষা এবং বক্তব্য তৃণমূল কর্মীদের প্রতি অবমাননাকর।
অডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানান সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শহিদুর রহমান স্বপন। তিনি বলেন, “তিনি কীসের ভিত্তিতে এমন মন্তব্য করলেন, বুঝতে পারছি না। নেতাকর্মীদের নিয়ে এ ধরনের কথা বলা বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করেছে। আমরা ব্যাপকভাবে অপমানিত হয়েছি।”
তার এই বক্তব্য দ্রুত স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অনেক নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তবে পুরো ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন আজহারুল ইসলাম মান্নান। সেসময় তিনি দাবি করেন, যে সাংবাদিকের সঙ্গে তার কথোপকথন ভাইরাল হয়েছে, তিনি ‘প্রকৃত সাংবাদিক’ নন। তার ভাষায়, এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তৈরি বা পরিচালিত একটি ষড়যন্ত্রের অংশ।
নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় এক বিএনপি নেতা চরচাকে বলেন, “খবরে পড়েছি চাঁদাবাজির জন্য আটক, বহিষ্কার...আমাদের তা মনে হয় না। মান্নান সাহেবের যে টাকা, তা এমনি মানুষকে বিলায় বেড়ায়। এখানে অন্য কোনো খেলা আছে। অন্য কোনো হিসাব আছে। বিএনপি নেতাদের মধ্যেকার বিভাজন সিন্ডিকেট ঠেকাতে ব্যর্থ ছিলেন মান্নান সাহেব, তারপরেও আরও অন্য কোনো হিসাব থাকতে পারে এখানে।”
অন্য হিসাব কী?
বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক, সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন ধরনের একটি ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে।
তাদের দাবি, ঘটনাটিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। বরং এর সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক বার্তা এবং সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া কিছু বিতর্ক মোকাবিলার কৌশলও জড়িত থাকতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা কয়েকজন নীতিনির্ধারক মনে করেন, সজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাকে আটক এবং দলীয়ভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পেছনে আরেকটি রাজনৈতিক হিসাব কাজ করেছে।

তাদের ভাষায়, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটি সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব বা ‘নিজেদের লোকদের রক্ষা করার’ অভিযোগও ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের ছেলের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তারা।
একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেন, “সরকারকে দেখাতে হয়েছে যে অভিযোগ উঠলে পরিচয় নয়, অভিযোগটাই মুখ্য। একজন এমপির ছেলে হলেও ছাড় দেওয়া হবে না-এমন বার্তা জনসাধারণের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল।”
আরেকজন নীতিনির্ধারকের ভাষ্য, “এটি শুধু একটি ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, বরং সরকারের ভাবমূর্তি ভারসাম্যে আনার একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও হতে পারে। সাম্প্রতিক বিতর্কের পর সরকারকে দৃশ্যমানভাবে কঠোর অবস্থান দেখাতে হয়েছে।”
তবে তারা এটাও বলছেন, সিদ্ধান্তটির পেছনে রাজনৈতিক হিসাব থাকলেও সেটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না।
বরং তাদের মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে দলটি নিজের লোকদের বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা নিতে পারে তার ওপর।
একজন প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যদি অভিযোগের মুখে শুধু বিরোধী পক্ষের লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় আর নিজেদের লোকদের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে জায়গা থেকে এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।”
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপি ও সরকার-উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। এসব অভিযোগ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
সে কারণে অনেকেই মনে করছেন, সজীবের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপটি একটি ‘সিগন্যাল কেস’ বা দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই বার্তার প্রকৃত বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের ঘটনাগুলোর ওপর। একই ধরনের অভিযোগে অন্য প্রভাবশালী নেতার স্বজনদের বিরুদ্ধেও যদি সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবেই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির দাবি শক্তিশালী হবে। অন্যথায় এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই দেখা হবে।
রাজনীতিতে প্রতীকী সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। সজীবের ঘটনা সেই ধরনের একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে-এটি কি কেবল একজন সংসদ সদস্যের ছেলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে অন্য প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে?

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এবং দল থেকে বহিষ্কার রাজনীতির অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি শুধু একজন নেতার ছেলের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা, নাকি বিএনপি সরকার এর মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে? ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল কি না, তা নিয়েও কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
সজীবকে আটকের পর যুবদল কেন্দ্রীয়ভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করে। দল স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তার কোনো কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠন নেবে না।
বিএনপি নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এ ঘটনায় সরকারের বার্তা হতে পারে-ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার আত্মীয় বা পরিবারের সদস্য হলেও অভিযোগ উঠলে ছাড় দেওয়া হবে না। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ‘দলীয় পরিচয়ে প্রভাব খাটানোর’ অভিযোগ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সজীবের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের জন্য একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সরকারের একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেন, “এই ঘটনায় সরকার কয়েকটি বার্তা দিতে চেয়েছে। তা হলো- চাঁদাবাজি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো সুরক্ষা নয়। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন অভিযোগে দল দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। তার জন্য সরকার ‘জির টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।”
দলের ভেতরে প্রশ্ন উঠছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বা দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী কোনো নেতার ছেলে একই অভিযোগে অভিযুক্ত হলে দল কি একই গতিতে ব্যবস্থা নিত?
ফেসবুকে ইসমাইল মোল্লা নামে একজন লিখেছেন, “মাননীয় তারেক রহমানের এমন সব সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। তবে, সালাহউদ্দীন সাহেবের ছেলের বেলাতেও কি এমন কঠোর হতেন? নাকি মান্নান সাহেবের বেলাতেই এক্সাম্পল ক্রিয়েট করার সুযোগটা নিলেন?”
সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “সজীবের ঘটনায় যা দেখা গেছে, তা হলো, আটকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এসেছে। ফলে বিএনপি অন্তত প্রকাশ্যে দেখাতে চেয়েছে যে পরিচয় নয়, অভিযোগই বিবেচ্য। তাই কার ছেলে, কার কী সেটা কাউন্ট করা হচ্ছে না, হবেও না।”

মান্নানের ওপর বিরক্ত বিএনপি?
দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আজহারুল ইসলাম মান্নানকে ঘিরে দলের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক রয়েছে। মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের সময় তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভও হয়েছিল।
দলের একাংশের মতে, সজীবের ঘটনায় শুধু আইন প্রয়োগ নয়, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও একটি বার্তা থাকতে পারে। যদিও সরকার বা বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো অবস্থান জানায়নি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির অভ্যন্তরে বিভক্তি ও গ্রুপিং একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক বলয় বা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গ্রুপের মধ্যে প্রভাব বিস্তার, পদ-পদবি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্বও সময়ের সঙ্গে প্রকাশ্যে এসেছে।
স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একাধিকবার এসব দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্থানীয় নেতৃত্বকে নির্দেশ দিলেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং বিরোধ আরও প্রকট হয়েছে। ফলে স্থানীয় সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি হয়।
এই অস্বস্তির মধ্যে গত বছরের ৪ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের সনমান্দি ইউনিয়নের অলিপুরা বাজারে আয়োজিত এক সভায় নতুন বিতর্কের জন্ম দেন মান্নানের জামাতা মাসুম বিল্লাহ।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “সাবধান, হুঁশিয়ার, লাস্ট ওয়ার্নিং। এরপর কোনো ওয়ার্নিং হবে না। আজহারুল ইসলাম মান্নানের পক্ষে কাজ করতে হবে। ব্যত্যয় হলে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।”
বক্তব্যের ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নয়, বরং নিজ দলের কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া এক ধরনের হুমকি হিসেবে দেখেন। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ভেতরে এমন ভাষা কীভাবে ব্যবহার করা হলো।
জামাতার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক যখন চলছিল, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আজহারুল ইসলাম মান্নান এবং এক সাংবাদিকের কথোপকথনের একটি অডিও।
অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং স্থানীয় রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা যায়, ওই সাংবাদিক মান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং তার ছেলে মেঘনার টোল প্লাজা দখলের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
জবাবে মান্নানকে বলতে শোনা যায়, “সারা বাংলাদেশেই বিএনপির পোলাপান এসব করে। ঢাকাতে মির্জা আব্বাসের পোলাপান হগল করে। দেখতে চান আপনে?”
একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিককে বলেন, “আগে গিয়া নিজেরা তদন্ত কইরা বাহির করেন, তারপর লিখেন। আপনের লগে তর্ক করতে রাজি না।”
অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই মনে করেন, কথোপকথনে ব্যবহৃত ভাষা এবং বক্তব্য তৃণমূল কর্মীদের প্রতি অবমাননাকর।
অডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানান সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শহিদুর রহমান স্বপন। তিনি বলেন, “তিনি কীসের ভিত্তিতে এমন মন্তব্য করলেন, বুঝতে পারছি না। নেতাকর্মীদের নিয়ে এ ধরনের কথা বলা বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করেছে। আমরা ব্যাপকভাবে অপমানিত হয়েছি।”
তার এই বক্তব্য দ্রুত স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অনেক নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তবে পুরো ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন আজহারুল ইসলাম মান্নান। সেসময় তিনি দাবি করেন, যে সাংবাদিকের সঙ্গে তার কথোপকথন ভাইরাল হয়েছে, তিনি ‘প্রকৃত সাংবাদিক’ নন। তার ভাষায়, এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তৈরি বা পরিচালিত একটি ষড়যন্ত্রের অংশ।
নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় এক বিএনপি নেতা চরচাকে বলেন, “খবরে পড়েছি চাঁদাবাজির জন্য আটক, বহিষ্কার...আমাদের তা মনে হয় না। মান্নান সাহেবের যে টাকা, তা এমনি মানুষকে বিলায় বেড়ায়। এখানে অন্য কোনো খেলা আছে। অন্য কোনো হিসাব আছে। বিএনপি নেতাদের মধ্যেকার বিভাজন সিন্ডিকেট ঠেকাতে ব্যর্থ ছিলেন মান্নান সাহেব, তারপরেও আরও অন্য কোনো হিসাব থাকতে পারে এখানে।”
অন্য হিসাব কী?
বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক, সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন ধরনের একটি ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে।
তাদের দাবি, ঘটনাটিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। বরং এর সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক বার্তা এবং সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া কিছু বিতর্ক মোকাবিলার কৌশলও জড়িত থাকতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা কয়েকজন নীতিনির্ধারক মনে করেন, সজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাকে আটক এবং দলীয়ভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পেছনে আরেকটি রাজনৈতিক হিসাব কাজ করেছে।

তাদের ভাষায়, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটি সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব বা ‘নিজেদের লোকদের রক্ষা করার’ অভিযোগও ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের ছেলের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তারা।
একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেন, “সরকারকে দেখাতে হয়েছে যে অভিযোগ উঠলে পরিচয় নয়, অভিযোগটাই মুখ্য। একজন এমপির ছেলে হলেও ছাড় দেওয়া হবে না-এমন বার্তা জনসাধারণের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল।”
আরেকজন নীতিনির্ধারকের ভাষ্য, “এটি শুধু একটি ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, বরং সরকারের ভাবমূর্তি ভারসাম্যে আনার একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও হতে পারে। সাম্প্রতিক বিতর্কের পর সরকারকে দৃশ্যমানভাবে কঠোর অবস্থান দেখাতে হয়েছে।”
তবে তারা এটাও বলছেন, সিদ্ধান্তটির পেছনে রাজনৈতিক হিসাব থাকলেও সেটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না।
বরং তাদের মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে দলটি নিজের লোকদের বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা নিতে পারে তার ওপর।
একজন প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যদি অভিযোগের মুখে শুধু বিরোধী পক্ষের লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় আর নিজেদের লোকদের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে জায়গা থেকে এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।”
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপি ও সরকার-উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। এসব অভিযোগ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
সে কারণে অনেকেই মনে করছেন, সজীবের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপটি একটি ‘সিগন্যাল কেস’ বা দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই বার্তার প্রকৃত বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের ঘটনাগুলোর ওপর। একই ধরনের অভিযোগে অন্য প্রভাবশালী নেতার স্বজনদের বিরুদ্ধেও যদি সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবেই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির দাবি শক্তিশালী হবে। অন্যথায় এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই দেখা হবে।
রাজনীতিতে প্রতীকী সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। সজীবের ঘটনা সেই ধরনের একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে-এটি কি কেবল একজন সংসদ সদস্যের ছেলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে অন্য প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে?