নির্বাচন বিতর্ক ও ভূরাজনৈতিক খেলার ফাঁদে বাংলাদেশ

বিদিত দেআফসানা কিশোয়ার লোচনআজম খানড. তাশফীন হোসেন
বিদিত দে, আফসানা কিশোয়ার লোচন, আজম খান ও ড. তাশফীন হোসেন
নির্বাচন বিতর্ক ও ভূরাজনৈতিক খেলার ফাঁদে বাংলাদেশ
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। ছবি: সুদীপ্ত সালাম

২০২৬ সালের বাংলাদেশের নির্বাচন উল্লেখযোগ্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বদলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতীকী জয়কে সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে এই নির্বাচন সাধারণ কোনো রাজনৈতিক ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল। এটি বাংলাদেশের ভেতরে তথাকথিত ‘নয়া বন্দোবস্ত’ হিসেবে পরিচিত বিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

এই নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়কে চিহ্নিত করেছে: এটি মূলত প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর একটি গণভোট হিসেবে কাজ করেছে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মৌলিক পরিচয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের শাসন পরিবর্তন কেবল গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না; বরং এটি ছিল বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প, বৈশ্বিক পুঁজি এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের লক্ষ্যপূরণে রাষ্ট্রের একটি কৌশলগত পুনর্গঠন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার এবং জুলাই সনদের আড়ালে মূলত রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের যেকোনো গভীর বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সামরিকীকরণ, রাজনৈতিক ইসলাম, নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদের কাঠামোতে ভূ-রাজনীতির প্রভাব এবং শ্রেণিগত প্রশ্নটিকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে–বিশেষ করে শোষণ থেকে মুক্তিপ্রত্যাশী শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক দাবি ও সংগ্রামের বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

ইলৈকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিতর্ক

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয় এবং তাদের কাজের স্বাধীনতা হারায়, তখনই নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং (কৌশলগত কারচুপি) করা সম্ভব হয়। ২০২৬ সালে ব্যাপক পরিসরে এই নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বাধীনতা ছিল বিতর্কিত।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সমগ্র পুলিশ বাহিনী ভেঙে পড়েছিল। ফাইল ছবি
২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সমগ্র পুলিশ বাহিনী ভেঙে পড়েছিল। ফাইল ছবি

২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সমগ্র পুলিশ বাহিনী ভেঙে পড়েছিল। সে সময় বিভিন্ন থানায় হামলা চালানো হয় এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়, যারা আদর্শিকভাবে ‘জুলাই সংস্কার’ কাঠামোর সঙ্গে একমত ছিলেন।

নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত হওয়া সত্ত্বেও এমন একটি কাঠামোর মধ্যে কাজ করেছে, যেখানে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব মূলত দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল–বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দলীয় বিবেচনায় নিয়ন্ত্রিত ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ-জাতীয়তাবাদী দল আওয়ামী লীগকে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

নির্বাচনী সংকট এবং রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি মূলত সেই সব উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে সূক্ষ্মভাবে সাজানো হয়েছিল, যার মধ্যে এনজিও এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্র (সিভিল ব্যুরোক্রেসি) অন্তর্ভুক্ত, যারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলেছে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনামলে বেসরকারি মালিকানাধীন শিল্প প্রসারের মাধ্যমেই এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। পরে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর অধীনে উন্নয়নের ‘এনজিও-করণ’  শাসন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রশক্তির পাশাপাশি সুশীল সমাজকেও গেঁথে ফেলেছে। 

‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে গণতন্ত্রের বিরাজনীতিকীকরণ

নির্বাচন-পূর্ব কারসাজির আরেকটি পদ্ধতি হলো ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা। এই ফর্মুলার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল–আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রধান দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বিরাজনীতিকীকরণে উসকে দেওয়া। এর পরিবর্তে ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা ও সুশাসনের কথা সামনে নিয়ে আসে। জরুরি অবস্থা চলাকালীন তারা ক্ষুদ্রঋণের প্রবর্তক এবং ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে একজন দক্ষ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছিল।

এই প্রকল্প বিভিন্ন এনজিও, দাতা-সংস্থা সমর্থিত সুশীল সমাজ এবং করপোরেট মিডিয়ার মাধ্যমে বেগবান করা হয়। তবে এখানে একটি স্ববিরোধিতা লক্ষ্যণীয়। বাংলাদেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় এনজিও–ফজলে হাসান আবেদ প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক (যা আফগানিস্তানে ব্যাপক কার্যক্রমের কারণে একটি আন্তর্জাতিক এনজিওতে পরিণত হয়েছে) এবং মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক–উভয়ের নেতৃত্বই ছিল পারিবারিক ক্ষমতার বলয়ে গভীরভাবে আবদ্ধ। উল্লেখ্য যে, ২০০৭ সালে ইউনূস নোবেল শান্তি পুরস্কার পান এবং ২০১০ সালে ব্রিটিশ রাজতন্ত্র কর্তৃক আবেদকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বাংলাদেশের ওপর মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হাসিনা সরকারের গণতান্ত্রিক ঘাটতির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা মূলত ক্ষমতার এই রূপান্তরকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেওয়ার একটি ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। এর সমান্তরালে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল ব্রিকস-এ বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করা। এই সদস্যপদ পেলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তাধীন ঋণের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা হ্রাস পেত, যে পথটি ছিল এই অঞ্চলে মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের সরাসরি পরিপন্থী।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা কেবল কোনো সংস্কার নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত কাঠামোগত হস্তক্ষেপ। এটি একদিকে যেমন দাতানির্ভর এনজিও নেটওয়ার্কের স্বরূপ উন্মোচন করে–যারা বাজার সংস্কার এবং বিশ্বায়নের সাথে একীভূত হওয়ার লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করে; অন্যদিকে প্রকৃত রাজনীতিকে বিরাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে ‘টেকনোক্র্যাটিক’ শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দান করে। 

রাজনৈতিক রূপান্তর ও মৌলবাদের বৈধতাকরণ

১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি নব্য-উদারবাদী পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর সাথে কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্র গঠনের কেন্দ্রে রাজনৈতিক ইসলাম এবং সামরিক প্রভাব মুখ্য হয়ে উঠেছে, যা সমসাময়িক উত্তেজনার পূর্বাভাস দেয়। ২০২৪-২৬ সময়কালে সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পটি আওয়ামী লীগ বিরোধিতাকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে, যাতে ধর্মীয় মৌলবাদী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে মূলধারায় স্বাভাবিক করে তোলা যায়।

সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি–যেমন শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, গ্রাম ও শহরের শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ এবং ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তির সাথে ঐতিহাসিকভাবে সম্পৃক্ত ইসলামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো–আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের প্রতি তাদের অসন্তোষ নিজ নিজ সামাজিক অবস্থান থেকে প্রকাশ করেছে। শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের এই ক্ষোভ উদারপন্থী রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে তুলে ধরেছে। দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, শিক্ষিত বেকারত্ব, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম এবং মেগা-প্রকল্পগুলোর অব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ তাদের হতাশা বাড়িয়ে দেয়। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতার অভাব এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কড়াকড়ি এই ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই আবার বাংলাদেশের এনজিওকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অর্থনীতির সুবিধাভোগী। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের সময় সুশীল সমাজ, এনজিও এবং বুদ্ধিজীবী সমাজের একটি অংশ মূলত এই শ্রেণিগত অবস্থান থেকেই সক্রিয় হয়েছিল।

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি প্রধানত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জনপদ সামাজিক ও আদর্শগতভাবে ইসলামের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, যারা বিশ্বাস বা ধর্মকে তাদের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু মনে করে। আর এই প্রবণতাটি ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এর প্রভাবে আরও শক্তিশালী হয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক ইসলাম এবং সুশীল সমাজের নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে একটি গভীর সংযোগ তৈরি হয়েছে, যার একটি বড় কারণ হলো ইউএসএআইডি এবং পশ্চিম এশীয় উৎস থেকে এনজিওগুলোতে আসা বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন। একইসাথে, যাকাত এবং বিভিন্ন দাতব্য অনুদানের একটি অংশ মাদ্রাসার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে সহায়তা করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে প্রায় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে এবং গত তিন দশকে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় আটগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনর্বাসন এই প্রক্রিয়ার কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল স্নায়ুযুদ্ধকালীন উপনিবেশবাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) গঠন ছিল মূলত ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের দিকে এক অভাবনীয় যাত্রা।

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ। ছবি: বাসস
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ। ছবি: বাসস

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতার একটি দালিলিক ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্টের এক রায়ে দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়। কারণ তাদের দলীয় গঠনতন্ত্র সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বেশ কয়েকজন নেতা দণ্ডিত হয়েছিলেন। 

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এই পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে: জামায়াত ইসলামীকে পুনরায় নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৯৭১-পরবর্তী রাষ্ট্রের যে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ছিল, বর্তমান সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় তা সংশোধন করা হয়েছে। এর পেছনে কৌশলগত যুক্তিটি রাজনৈতিক ইসলামের সাথে আদর্শিক মিল নয়, বরং একটি ‘কৌশলগত হিসাব-নিকাশ’। স্বাধীন উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং চীনের সাথে ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের অধিকারী একটি ধর্মনিরপেক্ষ-জাতীয়তাবাদী সরকারের চেয়ে জামায়াতের মতো বৈধ রাজনৈতিক অংশীদার সম্বলিত একটি মধ্যপন্থী ইসলামি রাষ্ট্র মার্কিন আঞ্চলিক স্বার্থের জন্য অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। 

দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে অবৈধ সাব্যস্ত করার ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, কওমি মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে পুষ্ট সুশীল সমাজে সুসংগঠিত ভিত্তি থাকার কারণে জামায়াতে ইসলামী সেই জায়গাটি দখলের জন্য সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ফলে ২০২৪ সালের শাসন পরিবর্তন তাদের একটি কার্যকর ও বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা বাংলাদেশকে একটি ‘মধ্যপন্থী ইসলামি রাষ্ট্র’ হিসেবে পুনর্গঠনের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন 

বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত থাকায় দেশটিকে প্রায় ১০ লাখ শরণার্থীর এক বিশাল মানবিক সংকটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর সাথে বর্তমান আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যকার চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেছে। বিআরআই-এর মাধ্যমে এবং হাসিনা সরকারের অধীনে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প’ সম্পন্ন করেছে, যা বিশ্বব্যাংক এবং পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।

সিপ্রি (এসআইপিআরআই)-এর তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় অস্ত্রের প্রায় ৭২ শতাংশ চীন থেকে সংগ্রহ করেছে, যা বাংলাদেশকে চীনা অস্ত্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈশ্বিক আমদানিকারকে পরিণত করেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ও চীন তাদের প্রথম যৌথ সামরিক মহড়া ‘গোল্ডেন ফ্রেন্ডশিপ ২০২৪’ পরিচালনা করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন এবং সন্ত্রাসবাদ দমন। পাশাপাশি একটি ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের বিষয়েও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

হাসিনা সরকার সুপরিকল্পিত সামরিক অংশীদারত্ব এবং আঞ্চলিক কূটনীতির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছিল। ব্রিকস থেকে বস্তুগত ও আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করত, যা দেশটিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে এবং আইএমএফ-এর সাথে আরও অনুকূল শর্তে আলোচনা করতে সাহায্য করত। তবে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের কারণে ব্রিকসে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি কার্যকরভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। 

শ্রমিক ও কৃষকদের প্রান্তে ঠেলা

২০২৪ সালের শাসন পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কৃষক ও শ্রমিকরা বহুলাংশে অনুপস্থিত ছিল। প্রথাগত ও অপ্রথাগত খাতের যাঁতাকলে পিষ্ট এই মানুষগুলো কেবল তখনই সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে, যখন তারা কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে রাস্তা অবরোধ করে পুলিশের সহিংসতার শিকার হয়; অথবা যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে তারা পাচারের শিকার হয় এবং লিবিয়া বা তিউনিসিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার মতো বিপজ্জনক অভিবাসনের পথ বেছে নেয়। এই অনুপস্থিতি মোটেও আকস্মিক ছিল না।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক রূপান্তরটি শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পরিবর্তে শহুরে মধ্যবিত্ত এবং সুসংগঠিত রাজনৈতিক ইসলামের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। বন্দর শ্রমিকদের ঘটনাটি একে আরও স্পষ্ট করে তোলে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের পাঁচজন শ্রমিককে আটক করা হয়। তাদের অপরাধ ছিল–অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক দুবাইভিত্তিক লজিস্টিক করপোরেশন ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর কাছে বন্দর টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করা। 

উল্লেখ্য যে, এই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে উপসাগরীয় পুঁজি এবং পশ্চিমা আর্থিক নেটওয়ার্কের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নির্বাচনের দশ দিন পরও তারা আটক রয়েছেন এবং যেসব দল গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল, তাদের পক্ষ থেকে কোনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাদের এই প্রতিবাদ কোনো বিমূর্ত গণতান্ত্রিক নীতির জন্য ছিল না; বরং তা ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং কার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে–সেই অধিকার আদায়ের লড়াই। আর এই প্রশ্নটিকেই পুরোপুরি চাপা দিতে এই ‘নিউ সেটেলমেন্ট’ নকশা করা হয়েছিল।  

সমাজ গবেষণা বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ট্রাইকনটিনেন্টাল-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখাটি চরচার পাঠকদের জন্য ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করা হয়েছে

বিদিত দে: যুক্তরাজ্যের নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটির নিউক্যাসেল বিজনেস স্কুলের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবং ‘মার্কেটস সাবজেক্ট গ্রুপ’-এর প্রধান

আফসানা কিশোয়ার লোচন: লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আজম খান: ভূ-রাজনীতির রাজনৈতিক অর্থনীতি সংক্রান্ত গবেষণা, অ্যাডভোকেসি এবং কন্টেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে ২০ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ড. তাশফীন হোসেন: মাউন্ট রয়্যাল ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস, কমিউনিকেশন স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যাভিয়েশন’-এর আওতাধীন বিসেট স্কুল অব বিজনেসের অ্যাকাউন্টিং এবং ফিন্যান্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

সম্পর্কিত