Advertisement Banner

বাংলাদেশে দেখা যাবে না বিশ্বকাপ ফুটবল?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
বাংলাদেশে দেখা যাবে না বিশ্বকাপ ফুটবল?
ছবি: রয়টার্স

বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চ থেকে কি এবার বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষেরা? বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ৩৩ দিন। কিন্তু জানা গেছে, এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সরাসরি সম্প্রচারের ব্যাপারে চুক্তি করেনি কোনো প্রতিষ্ঠান। এমনকি বাংলাদেশ টেলিভিশনও নাকি উচ্চমূল্যের কারণে এবারের বিশ্বকাপ বাংলাদেশে সম্প্রচারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অথচ, দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশনই ছিল বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বকাপ উপভোগের একমাত্র মাধ্যম।

মূলত বিপুল স্বত্বমূল্য, বিজ্ঞাপন বাজারের সীমাবদ্ধতা ও ম্যাচের প্রতিকূল সময়ের জন্য বিশ্বকাপ সরাসরি সম্প্রচারের আগ্রহ পাচ্ছে না দেশের সরকারি চ্যানেল বিটিভি ও অন্য বেসরকারি চ্যানেলগুলো।

দীর্ঘ দিন ধরে বিটিভিই বাংলাদেশে ছিল বিশ্বকাপ সম্প্রচারের একমাত্র মাধ্যম। এমনকি দেশি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার স্বত্ব কিনে সম্প্রচার করলেও বিটিভি বিশ্বকাপ সম্প্রচার করে গেছে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে বিটিভি টেরিস্ট্রিয়াল স্বত্ব কিনেছিল। বেসরকারি টিভি চ্যানেল টি স্পোর্টস ও জিটিভি কিনেছিল স্যাটেলাইট স্বত্ব। বিটিভি, টি-স্পোর্টস ও জিটিভি গতবার ৬৪টি ম্যাচই সরাসরি সম্প্রচার করেছিল। ডিজিটাল স্ট্রিমিং স্বত্ব কিনেছিল টফি।

বাংলাদেশে এবার বিশ্বকাপের মিডিয়া স্বত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড’। তারা বিশাল অংকের অর্থ দাবি করায় বিশ্বকাপ সম্প্রচারই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বাংলাদেশে। বিশ্বকাপের ৩৩ দিন বাকি থাকতেও এ নিয়ে অনিশ্চয়তার কোনো সমাধান হয়নি।

বাংলাদেশ সরকারও এবার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে আগ্রহী নয়। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহিরউদ্দিন স্বপন এমন কথাই বলেছেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও আগের চুক্তিতে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় এবার সরকার সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে আগ্রহী নয়।

তিনি ডেইলি স্টারের কাছে একটি অভিযোগ করেছেন, গতবার সম্প্রচার কেনা বাবদ যে অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে খরচ করা হয়েছে, তার ১০ ভাগও নাকি উঠিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

তিনি সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। তবে তিনি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, কেউ যদি আগ্রহী থাকেন, তাহলে সরকার পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সহযোগিতার কথা ভাবতে পারে।

স্প্রিংবক ফিফার কাছ থেকে মিডিয়া স্বত্ব কিনেছে। সেই মিডিয়া স্বত্বে আছে টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল ও ইন্টারনেট স্বত্বের প্যাকেজ।

ইংরেজি সংবাদ মাধ্যম ডেইলি স্টার জানিয়েছে, বিটিভির কাছে স্প্রিংবক দাবি করেছে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা। এই অংকটা ট্যাক্স বাদ দিয়ে। ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত করলে অংকটা আরও বাড়ে। শর্তানুযায়ী এই টাকার অর্ধেক ১০ মে ও বাকি অর্ধেক ১০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এই প্যাকেজের আওতায় আছে বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচ আর উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান। ভ্যাট-ট্যাক্স মিলিয়ে এই অংক ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচ শুরুর সময়ও দর্শক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ অসুবিধাজনক। ১০৪ ম্যাচের ৫২টি বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টার আগে শেষ হবে। বাকি ৫২টি শুরু হবে ভোর ৪টার পর।

বিটিভি কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে?

২০২২-এর বিশ্বকাপে টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার স্বত্ব বিটিভি কিনেছিল ৯৮ কোটি টাকা দিয়ে। সেবারও সরকারি সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তে এসে সম্প্রচার স্বত্ব কেনা হয়েছিল। টি-স্পোর্টস ও জিটিভি আলাদাভাবে কেনে স্যাটেলাইট স্বত্ব, টফি স্ট্রিমিং স্বত্ব।

স্প্রিংবক প্রথমে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখান থেকে বিষয়টি বিটিভির কাছে পাঠানো হয়। বিটিভি ফিফার কাছে বিনামূল্যে ফিড পাওয়া যায় কি না, সেটি জানতে চেয়েছে। ফিফা এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কিছু জানায়নি। অথচ, এর আগে বেশ কয়েকটি বিশ্বকাপে ফিফার কাছ থেকে বিনামূল্যেই ফিড পেয়েছিল বিটিভি।

জানা গেছে ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে ফিফা বিশ্বকাপ সম্প্রচারের একটি টেন্ডার আহ্বান করেছিল। তখন বাংলাদেশ বা বিটিভি সেই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। সেই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কেন বিটিভি অংশ নেয়নি, সেটি জানা না গেলেও ওই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে কিছুটা কম মূল্যে সম্প্রচার স্বত্ব কেনার সুযোগ থাকত।

একটি জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা চরচাকে জানান, ‘স্ট্রিমিং রাইট কেনার একটা প্রস্তাব আমরাও পেয়েছি। আমরা ভাবছিলামও বিশ্বকাপের ব্যাপারে। কিন্তু প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখলাম এটা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বাজার অনুযায়ী টাকার অংকটা অনেক বেশি। খেলা দেখিয়ে, বিজ্ঞাপন দিয়ে আয় করেও এই টাকা তুলে আনা সম্ভব নয়। তা ছাড়া, এবারের খেলাগুলোর সময়সূচি দেখুন। হয়, শেষ রাতে নয় তো খুব সকালে।’

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো স্প্রিংবকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দামের ব্যাপারে স্প্রিংবকের অনমনীয় মনোভাব সেই আলোচনাকে এগোতে দিচ্ছে না।

বেসরকারি চ্যানেলগুলোও বিশ্বকাপ সম্প্রচারে বিটিভির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছেন। গত বিশ্বকাপে বিটিভি যেহেতু ৯৮ কোটি টাকা দিয়ে সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল, তাই ফিফা এবার বাংলাদেশের বাজারের জন্য বেশি টাকাই দাবি করছে।

সম্প্রচার নিয়ে একই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে ভারত ও চীনেও। ভারতের সম্প্রচারকারীরাও উচ্চমূল্যে বিশ্বকাপ দেখাতে আগ্রহী নয়। রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, ভারতে রিলায়েন্স-ডিজনি যৌথভাবে ভারতে সম্প্রচার স্বত্বের ব্যাপারে ২০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু ফিফা তাতে রাজি হয়নি। সনি এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহই দেখায়নি।

চীনেও চলছে একই সংকট। উচ্চমূল্যে সম্প্রচারে আগ্রহী নয় কেউই। অথচ ২০২২ বিশ্বকাপে ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়া ভিউয়ের অর্ধেকই এসেছে ভারত, চীন ও আশপাশের দেশ থেকে।

বিশ্বকাপ একটি উৎসব। একটি উদযাপনের নাম। কিন্তু অর্থমূল্যের মারপ্যাঁচের মধ্যে পড়ে বাংলাদেশে এই বিশ্বকাপ দেখা নিয়েই চলছে অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা যদি না কাটে, তাহলে সেই উৎসব থেকে বাংলাদেশের মানুষ বঞ্চিত হবে। বহু বহু বছর পর বিশ্বকাপ ফুটবল হয়ে যাবে বাংলাদেশের মানুষের নাগালের বাইরের একটা উৎসব।

সম্পর্কিত