চার্লস লাইয়ন্স জোনস

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান-যা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় সরকারি ব্যক্তিত্বদের হত্যার লক্ষ্যে পরিচালিত এক ‘ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক’ (শীর্ষ নেতৃত্ব উৎখাত অভিযান) এর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল-তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়বে। চীনের জন্য এই মার্কিন অভিযানটি তাইওয়ান আক্রমণের সময় কীভাবে সরকারের ধারাবাহিকতা এবং সামরিক কমান্ড-চেইন বিচ্ছিন্ন করা যায়, তার একটি মূল্যবান পাঠ হতে পারে। তবে এটি একটি সফল ডেকাপিটেশন স্ট্রাইকের পরবর্তীতে কী কী বিপর্যয় ঘটতে পারে, তার একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও কাজ করতে পারে।
চীনের সামরিক বাহিনীর জন্য এখান থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো বেশ স্পষ্ট। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী অত্যন্ত নিখুঁত, সময়োপযোগী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। এর জন্য সম্ভবত সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স, জিওস্পেশিয়াল সক্ষমতা এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের খুব কাছাকাছি থাকা অত্যন্ত দক্ষ মানুষের একটি নিপুণ সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল।
গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং মূল্যায়নের দ্রুত ও সুবিন্যস্ত পদ্ধতি এবং মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যৌথ অপারেশন সম্ভবত ইরানে সাম্প্রতিক এই হামলাগুলোর সাফল্যের পেছনে মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে।
তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে এ ধরনের সক্ষমতাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে।
তাইওয়ানের বিরুদ্ধে একটি সফল শীর্ষ নেতৃত্ব উৎখাত অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় গভীর ও বিস্তৃত গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের সক্ষমতা চীন তৈরি করছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
২০২১ সালে চীনে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত তাইওয়ানিজদের সংখ্যা ছিল ১৬। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪-তে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাইওয়ানের চারজন সাবেক কর্মকর্তা চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাইয়ের সাবেক সহকারী এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ উ’র সাবেক সহযোগীরাও ছিলেন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সম্ভবত আরও উন্নত হয়েছে, তবে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ক্রমবর্ধমান মামলা ও সাজা প্রদান (বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে) সাধারণত প্রতিপক্ষের আরও আগ্রাসী গোয়েন্দা তৎপরতারই প্রতিফলন ঘটায়।
এর পাশাপাশি, তাইওয়ানে একটি সফল অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যন্ত পরিশীলিত ‘সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স’ এবং আক্রমণাত্মক সাইবার সক্ষমতা চীন তৈরি করে ফেলেছে; যার মধ্যে তাইওয়ানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক কমান্ড-চেইনকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সাথে সংঘর্ষের সময় চীন তাদের ‘বেইদু’ স্যাটেলাইট সিস্টেমসহ সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ও সাইবার ডোমেইনে পাকিস্তানকে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছিল। রয়টার্স পরবর্তীতে নথিভুক্ত করেছে যে, পাকিস্তানের একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার সাফল্যের পেছনে এই বহুমুখী সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানকে দেওয়া বেইজিংয়ের এই সমর্থনের একটি পরোক্ষ ফল ছিল জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা চক্রকে আরও সুবিন্যস্ত ও কার্যকর করার শিক্ষা-যা তাইওয়ানে একটি সফল আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত মূল্যবান প্রমাণিত হতে পারে।
তাইওয়ান আক্রমণের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে চীন শীর্ষ নেতৃত্ব উৎখাতের অভিযানকে অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
২০১৭ সালে ‘গ্লোবাল তাইওয়ান ইনস্টিটিউট’ কর্তৃক পিপল’স লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) স্পেশাল ফোর্সের বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের সময় তাইওয়ানিজদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে এই ধরনের নির্মূল অভিযানকে বিবেচনা করা হয়। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে জোসেফ ওয়েন নামক একজন তাইওয়ানিজ প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক চীনের একটি সামরিক ঘাঁটির উন্মুক্ত সোর্সের ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে তাইপেই-এর প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলাকার একটি হুবহু প্রতিরূপ দেখা গিয়েছিল।
২০২৫ সালের নভেম্বরে পিএলএ নেভির সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে আলোচনা করা হয় যে-তাইওয়ানের ধীরে উন্নত হতে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক কীভাবে একটি কার্যকর পাল্টা ব্যবস্থা হতে পারে। যদিও উন্মুক্ত সোর্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো সস্পূর্ণ নয়, তবুও এটি যুক্তিসঙ্গতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট যে, পিএলএ তাইওয়ানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক কমান্ড-চেইনকে লক্ষ্য করে ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক পরিচালনার পরিকল্পনা করছে।
এই কারণেই তাইওয়ানকে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির মতো সম্ভাব্য প্রেক্ষাপটের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে-এবং তা নিতে হবে দ্রুত। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানে সফলভাবে আক্রমণ চালানোর জন্য পিএলএ-কে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাইওয়ানের নেতৃত্বের জন্য এখন পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা, সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রক্রিয়া এবং শীর্ষ নেতাদের অবস্থানস্থলগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এক্ষেত্রে বিদেশের দিকে নজর দেওয়া সহায়ক হতে পারে। একটি সক্ষম প্রতিপক্ষের ক্রমাগত সামরিক আক্রমণের মুখেও কীভাবে সরকার এবং কমান্ড-চেইনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়, তার একটি আদর্শ উদাহরণ হলো ইউক্রেন। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কার্যকর কূটনীতি এবং গোয়েন্দা যোগাযোগ বজায় রাখা তাইওয়ানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হবে। কারণ ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের পূর্ববর্তী মাস এবং বছরগুলোতে ইউক্রেনকে এই প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত আয়ত্ত করতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল (তবে বর্তমানে ইউক্রেনের পক্ষে তাইওয়ানকে সাহায্য করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ বা সক্ষমতা না থাকাটাই স্বাভাবিক)।
ইরানের নেতৃত্বের সফল হত্যাকাণ্ডের বাইরেও, চীন বর্তমানে গভীর আগ্রহে পর্যবেক্ষণ করবে যে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী এরপর যুদ্ধটি কীভাবে পরিচালনা করে। শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ এবং ইরানে তা এখনো সম্পন্ন হয়নি। যদিও ইরানি শাসনের কিছু অনুগত ব্যক্তি আয়াতুল্লাহর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করবেন, তবে অনেক ইরানি তা করবেন না। বিশেষ করে তারা, যাদের পরিবারের সদস্যরা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তার শাসনের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন।

তাইওয়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমাজ, যেখানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতি জনগণের গ্রহণযোগ্যতা অনেক কম। তাইওয়ানের মানুষ তাদের সরকারের জন্য গর্বিত এবং তারা নিজেরাই এটি নির্বাচন করেছে। একজন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাকে হত্যা করা এবং বেইজিংয়ের কোনো প্রতিনিধিকে ক্ষমতায় বসানো হয়তো তাইওয়ানিজদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করবে না, বরং নতুন দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে।
এ কারণেই সি চিনপিং আগামী কয়েক মাস বাজপাখির মতো সতর্ক দৃষ্টিতে ইরানকে পর্যবেক্ষণ করবেন। যদি আমেরিকা এবং ইসরায়েল ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে এবং সেদেশের জনগণের সমর্থন লাভে সফল হতে না পারে, তবে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে তার (সি চিনপিংয়ের) সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব সামান্যই থাকবে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দল নিরপেক্ষ, স্বাধীন থিংক ট্যাংক লোয়ি ইনস্টিটিউট পরিচালিত দ্য ইন্টারপ্রেটর-এর লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত।
লেখক: লোয়ি ইন্সটিটিউটের ফরেন পলিসি ও পাবলিক ওপেনিয়ন প্রোগ্রামের রিসার্চ ফেলো

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান-যা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় সরকারি ব্যক্তিত্বদের হত্যার লক্ষ্যে পরিচালিত এক ‘ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক’ (শীর্ষ নেতৃত্ব উৎখাত অভিযান) এর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল-তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়বে। চীনের জন্য এই মার্কিন অভিযানটি তাইওয়ান আক্রমণের সময় কীভাবে সরকারের ধারাবাহিকতা এবং সামরিক কমান্ড-চেইন বিচ্ছিন্ন করা যায়, তার একটি মূল্যবান পাঠ হতে পারে। তবে এটি একটি সফল ডেকাপিটেশন স্ট্রাইকের পরবর্তীতে কী কী বিপর্যয় ঘটতে পারে, তার একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও কাজ করতে পারে।
চীনের সামরিক বাহিনীর জন্য এখান থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো বেশ স্পষ্ট। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী অত্যন্ত নিখুঁত, সময়োপযোগী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। এর জন্য সম্ভবত সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স, জিওস্পেশিয়াল সক্ষমতা এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের খুব কাছাকাছি থাকা অত্যন্ত দক্ষ মানুষের একটি নিপুণ সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল।
গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং মূল্যায়নের দ্রুত ও সুবিন্যস্ত পদ্ধতি এবং মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যৌথ অপারেশন সম্ভবত ইরানে সাম্প্রতিক এই হামলাগুলোর সাফল্যের পেছনে মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে।
তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে এ ধরনের সক্ষমতাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে।
তাইওয়ানের বিরুদ্ধে একটি সফল শীর্ষ নেতৃত্ব উৎখাত অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় গভীর ও বিস্তৃত গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের সক্ষমতা চীন তৈরি করছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
২০২১ সালে চীনে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত তাইওয়ানিজদের সংখ্যা ছিল ১৬। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪-তে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাইওয়ানের চারজন সাবেক কর্মকর্তা চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাইয়ের সাবেক সহকারী এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ উ’র সাবেক সহযোগীরাও ছিলেন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সম্ভবত আরও উন্নত হয়েছে, তবে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ক্রমবর্ধমান মামলা ও সাজা প্রদান (বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে) সাধারণত প্রতিপক্ষের আরও আগ্রাসী গোয়েন্দা তৎপরতারই প্রতিফলন ঘটায়।
এর পাশাপাশি, তাইওয়ানে একটি সফল অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যন্ত পরিশীলিত ‘সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স’ এবং আক্রমণাত্মক সাইবার সক্ষমতা চীন তৈরি করে ফেলেছে; যার মধ্যে তাইওয়ানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক কমান্ড-চেইনকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সাথে সংঘর্ষের সময় চীন তাদের ‘বেইদু’ স্যাটেলাইট সিস্টেমসহ সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ও সাইবার ডোমেইনে পাকিস্তানকে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছিল। রয়টার্স পরবর্তীতে নথিভুক্ত করেছে যে, পাকিস্তানের একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার সাফল্যের পেছনে এই বহুমুখী সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানকে দেওয়া বেইজিংয়ের এই সমর্থনের একটি পরোক্ষ ফল ছিল জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা চক্রকে আরও সুবিন্যস্ত ও কার্যকর করার শিক্ষা-যা তাইওয়ানে একটি সফল আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত মূল্যবান প্রমাণিত হতে পারে।
তাইওয়ান আক্রমণের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে চীন শীর্ষ নেতৃত্ব উৎখাতের অভিযানকে অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
২০১৭ সালে ‘গ্লোবাল তাইওয়ান ইনস্টিটিউট’ কর্তৃক পিপল’স লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) স্পেশাল ফোর্সের বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের সময় তাইওয়ানিজদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে এই ধরনের নির্মূল অভিযানকে বিবেচনা করা হয়। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে জোসেফ ওয়েন নামক একজন তাইওয়ানিজ প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক চীনের একটি সামরিক ঘাঁটির উন্মুক্ত সোর্সের ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে তাইপেই-এর প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলাকার একটি হুবহু প্রতিরূপ দেখা গিয়েছিল।
২০২৫ সালের নভেম্বরে পিএলএ নেভির সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে আলোচনা করা হয় যে-তাইওয়ানের ধীরে উন্নত হতে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক কীভাবে একটি কার্যকর পাল্টা ব্যবস্থা হতে পারে। যদিও উন্মুক্ত সোর্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো সস্পূর্ণ নয়, তবুও এটি যুক্তিসঙ্গতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট যে, পিএলএ তাইওয়ানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক কমান্ড-চেইনকে লক্ষ্য করে ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক পরিচালনার পরিকল্পনা করছে।
এই কারণেই তাইওয়ানকে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির মতো সম্ভাব্য প্রেক্ষাপটের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে-এবং তা নিতে হবে দ্রুত। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানে সফলভাবে আক্রমণ চালানোর জন্য পিএলএ-কে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাইওয়ানের নেতৃত্বের জন্য এখন পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা, সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রক্রিয়া এবং শীর্ষ নেতাদের অবস্থানস্থলগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এক্ষেত্রে বিদেশের দিকে নজর দেওয়া সহায়ক হতে পারে। একটি সক্ষম প্রতিপক্ষের ক্রমাগত সামরিক আক্রমণের মুখেও কীভাবে সরকার এবং কমান্ড-চেইনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়, তার একটি আদর্শ উদাহরণ হলো ইউক্রেন। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কার্যকর কূটনীতি এবং গোয়েন্দা যোগাযোগ বজায় রাখা তাইওয়ানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হবে। কারণ ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের পূর্ববর্তী মাস এবং বছরগুলোতে ইউক্রেনকে এই প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত আয়ত্ত করতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল (তবে বর্তমানে ইউক্রেনের পক্ষে তাইওয়ানকে সাহায্য করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ বা সক্ষমতা না থাকাটাই স্বাভাবিক)।
ইরানের নেতৃত্বের সফল হত্যাকাণ্ডের বাইরেও, চীন বর্তমানে গভীর আগ্রহে পর্যবেক্ষণ করবে যে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী এরপর যুদ্ধটি কীভাবে পরিচালনা করে। শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ এবং ইরানে তা এখনো সম্পন্ন হয়নি। যদিও ইরানি শাসনের কিছু অনুগত ব্যক্তি আয়াতুল্লাহর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করবেন, তবে অনেক ইরানি তা করবেন না। বিশেষ করে তারা, যাদের পরিবারের সদস্যরা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তার শাসনের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন।

তাইওয়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমাজ, যেখানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতি জনগণের গ্রহণযোগ্যতা অনেক কম। তাইওয়ানের মানুষ তাদের সরকারের জন্য গর্বিত এবং তারা নিজেরাই এটি নির্বাচন করেছে। একজন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাকে হত্যা করা এবং বেইজিংয়ের কোনো প্রতিনিধিকে ক্ষমতায় বসানো হয়তো তাইওয়ানিজদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করবে না, বরং নতুন দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে।
এ কারণেই সি চিনপিং আগামী কয়েক মাস বাজপাখির মতো সতর্ক দৃষ্টিতে ইরানকে পর্যবেক্ষণ করবেন। যদি আমেরিকা এবং ইসরায়েল ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে এবং সেদেশের জনগণের সমর্থন লাভে সফল হতে না পারে, তবে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে তার (সি চিনপিংয়ের) সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব সামান্যই থাকবে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দল নিরপেক্ষ, স্বাধীন থিংক ট্যাংক লোয়ি ইনস্টিটিউট পরিচালিত দ্য ইন্টারপ্রেটর-এর লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত।
লেখক: লোয়ি ইন্সটিটিউটের ফরেন পলিসি ও পাবলিক ওপেনিয়ন প্রোগ্রামের রিসার্চ ফেলো