মেরিনা মিতু

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) হঠাৎ করেই মহাসচিব পদে পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়ে উঠেছে। সামনে দলীয় কাউন্সিল আর সেই কাউন্সিলকে ঘিরেই নেতৃত্বে সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা।
কেন এখন এই আলোচনা?
প্রথমত, সময়ের প্রেক্ষাপট। প্রায় এক দশক পর দলটি জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০১৬ সালের পর আর কোনো কাউন্সিল হয়নি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক চাপ এবং সাংগঠনিক ব্যস্ততায় আটকে থাকা এই প্রক্রিয়া এখন আবার সামনে এসেছে—তাও এমন সময়ে, যখন দলটি ক্ষমতায়।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিএনপির ভেতরে নতুন নেতৃত্ব, নতুন কৌশল এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। আর সেখানেই মহাসচিব পদটি হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ফখরুলের ‘অবসরের’ ইঙ্গিত
আলোচনার সবচেয়ে বড় আরেকটি কারণ, বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও সরকারি দলের মহাসচিব বলেন, “আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।”
প্রায় ১৫ বছর ধরে দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা এই নেতা দলের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাসনকালে কার্যত দেশে দলের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
রাজনৈতিক চাপ, বারবার গ্রেপ্তার এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দলকে ধরে রাখার কৃতিত্ব অনেকেই তার নেতৃত্বকে দেন। ফলে তার সম্ভাব্য বিদায় শুধু একটি পদ পরিবর্তন নয়-বরং একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
চলতি বছর ১২ জানুয়ারির ভোটে জিতে সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মির্জা ফখরুলকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। সাধারণত দলের মহাসচিব/সাধারণ সম্পাদককে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংসদেও সংসদ নেতার পাশে আসন পেয়েছেন মির্জা ফখরুল। সংসদ নেতা বা প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটি সংসদ উপনেতার হিসেবেই ধরা হয়। তবে বিএনপি এখনো সংসদ উপনেতা হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেয়নি।
নতুন প্রজন্মের ‘চাপ’
দলের ভেতরে প্রজন্ম পরিবর্তনের আলোচনা নতুন নয়, দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়ে আলোচনা ছিল। তবে সেটি এত দিন তেমন সামনে আসেনি। এখন দল ক্ষমতায় এবং সামনে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। তাই নতুন নেতৃত্ব আনার প্রশ্নটি আরও জোরাল হয়েছে।
এই প্রজন্মগত দূরত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দলটির অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে আন্দোলনের কৌশল, কর্মসূচি এবং নেতৃত্বের ধরন নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকে ছাত্রদলের এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মাঠের বাস্তবতা আর কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের মধ্যে অনেক সময় মিল থাকে না। এতে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।”
ওই অনুষ্ঠানে মহাসচিব ও ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা লক্ষ্য করা যায়।
অন্যদিকে, মির্জা ফখরুলও একাধিকবার শৃঙ্খলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন,
“দল চালাতে হলে শৃঙ্খলা মানতেই হবে। ব্যক্তিগত আবেগ দিয়ে সংগঠন চলে না।”
দলীয় একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখন সরকারে থাকার বাস্তবতায় প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠন-সবকিছু নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ায় নতুন প্রজন্মের নেতাদের অগ্রভাগে আনার প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে।
একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “ক্ষমতায় থাকলে দলের ওপর প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যায়। তখন শুধু আন্দোলনের রাজনীতি দিয়ে হয় না, সংগঠন চালানোর জন্য নতুন চিন্তা, নতুন নেতৃত্ব দরকার হয়।”
মাহাসচিব পদ থেকে মির্জ ফখরুলকে সরানোর গুঞ্জন অনেক আগে থেকেই ছিল। দলের একাংশের অভিযোগ ছিল, তিনি তুলনামূলকভাবে ‘সফট’ বা সমঝোতামুখী রাজনীতি করেন। যা আন্দোলনমুখী তরুণ নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার সঙ্গে সবসময় মেলে না। যদিও এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে খুব কমই এসেছে, তবে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বিষয়টি বারবার উঠেছে বলে জানা যায়।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি কারা?
ইতিমধ্যে মহাসচিব পদে সম্ভাব্য কয়েকটি নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খানের নামও আলোচনায় রয়েছেন। দলীয় নেতাদের মধ্যে মহাসচিব হিসেবে যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামও শোনা যায়। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ও ত্যাগী নেতৃত্ব হিসেবে তার প্রতি দলীয় কর্মীদের আস্থা ও সমর্থন লক্ষ্য করা গেছে।
তবে বিএনপির রাজনীতিতে শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো নাম সামনে আসার ঘটনাও নতুন নয়। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
জানতে চাইতে রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “বিএনপি-দল একটি বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন। এখানে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, এটাই আমাদের মূলনীতি। মহাসচিব কে হবেন, সেটি সম্পূর্ণভাবে দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত এবং কাউন্সিলের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে। আমার ব্যক্তিগত কোনো আকাঙ্ক্ষা বা আগ্রহ নেই। আমি সবসময় দলের একজন কর্মী হিসেবেই কাজ করে যেতে চাই। দল যেখানেই আমাকে দায়িত্ব দেবে, আমি সেটিই নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করব। এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা।”
রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গ ও ফখরুলের অবস্থান
রাজনীতি থেকে অবসর নিলে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখা যেতে পারে—এমন গুঞ্জনও রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। তবে এই সম্ভাবনাকে নিজেই নাকচ করেছেন মির্জা ফখরুল। তার ভাষায়, এ ধরনের কোনো আকাঙ্ক্ষা তার কখনোই ছিল না।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সে সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হন এবং সংগঠনের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে নেতৃত্বে উঠে আসেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং রাজনৈতিক কারণে জেলেও যেতে হয় তাকে। পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়ে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮৬ সালে তিনি পদত্যাগ করে পুরোপুরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপি-তে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।
২০০৯ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। পরে ২০১১ সালের মার্চে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালের কাউন্সিলের পর পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) হঠাৎ করেই মহাসচিব পদে পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়ে উঠেছে। সামনে দলীয় কাউন্সিল আর সেই কাউন্সিলকে ঘিরেই নেতৃত্বে সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা।
কেন এখন এই আলোচনা?
প্রথমত, সময়ের প্রেক্ষাপট। প্রায় এক দশক পর দলটি জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০১৬ সালের পর আর কোনো কাউন্সিল হয়নি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক চাপ এবং সাংগঠনিক ব্যস্ততায় আটকে থাকা এই প্রক্রিয়া এখন আবার সামনে এসেছে—তাও এমন সময়ে, যখন দলটি ক্ষমতায়।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিএনপির ভেতরে নতুন নেতৃত্ব, নতুন কৌশল এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। আর সেখানেই মহাসচিব পদটি হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ফখরুলের ‘অবসরের’ ইঙ্গিত
আলোচনার সবচেয়ে বড় আরেকটি কারণ, বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও সরকারি দলের মহাসচিব বলেন, “আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।”
প্রায় ১৫ বছর ধরে দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা এই নেতা দলের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাসনকালে কার্যত দেশে দলের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
রাজনৈতিক চাপ, বারবার গ্রেপ্তার এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দলকে ধরে রাখার কৃতিত্ব অনেকেই তার নেতৃত্বকে দেন। ফলে তার সম্ভাব্য বিদায় শুধু একটি পদ পরিবর্তন নয়-বরং একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
চলতি বছর ১২ জানুয়ারির ভোটে জিতে সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মির্জা ফখরুলকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। সাধারণত দলের মহাসচিব/সাধারণ সম্পাদককে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংসদেও সংসদ নেতার পাশে আসন পেয়েছেন মির্জা ফখরুল। সংসদ নেতা বা প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটি সংসদ উপনেতার হিসেবেই ধরা হয়। তবে বিএনপি এখনো সংসদ উপনেতা হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেয়নি।
নতুন প্রজন্মের ‘চাপ’
দলের ভেতরে প্রজন্ম পরিবর্তনের আলোচনা নতুন নয়, দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়ে আলোচনা ছিল। তবে সেটি এত দিন তেমন সামনে আসেনি। এখন দল ক্ষমতায় এবং সামনে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। তাই নতুন নেতৃত্ব আনার প্রশ্নটি আরও জোরাল হয়েছে।
এই প্রজন্মগত দূরত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দলটির অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে আন্দোলনের কৌশল, কর্মসূচি এবং নেতৃত্বের ধরন নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকে ছাত্রদলের এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মাঠের বাস্তবতা আর কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের মধ্যে অনেক সময় মিল থাকে না। এতে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।”
ওই অনুষ্ঠানে মহাসচিব ও ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা লক্ষ্য করা যায়।
অন্যদিকে, মির্জা ফখরুলও একাধিকবার শৃঙ্খলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন,
“দল চালাতে হলে শৃঙ্খলা মানতেই হবে। ব্যক্তিগত আবেগ দিয়ে সংগঠন চলে না।”
দলীয় একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখন সরকারে থাকার বাস্তবতায় প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠন-সবকিছু নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ায় নতুন প্রজন্মের নেতাদের অগ্রভাগে আনার প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে।
একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “ক্ষমতায় থাকলে দলের ওপর প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যায়। তখন শুধু আন্দোলনের রাজনীতি দিয়ে হয় না, সংগঠন চালানোর জন্য নতুন চিন্তা, নতুন নেতৃত্ব দরকার হয়।”
মাহাসচিব পদ থেকে মির্জ ফখরুলকে সরানোর গুঞ্জন অনেক আগে থেকেই ছিল। দলের একাংশের অভিযোগ ছিল, তিনি তুলনামূলকভাবে ‘সফট’ বা সমঝোতামুখী রাজনীতি করেন। যা আন্দোলনমুখী তরুণ নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার সঙ্গে সবসময় মেলে না। যদিও এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে খুব কমই এসেছে, তবে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বিষয়টি বারবার উঠেছে বলে জানা যায়।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি কারা?
ইতিমধ্যে মহাসচিব পদে সম্ভাব্য কয়েকটি নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খানের নামও আলোচনায় রয়েছেন। দলীয় নেতাদের মধ্যে মহাসচিব হিসেবে যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামও শোনা যায়। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ও ত্যাগী নেতৃত্ব হিসেবে তার প্রতি দলীয় কর্মীদের আস্থা ও সমর্থন লক্ষ্য করা গেছে।
তবে বিএনপির রাজনীতিতে শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো নাম সামনে আসার ঘটনাও নতুন নয়। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
জানতে চাইতে রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “বিএনপি-দল একটি বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন। এখানে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, এটাই আমাদের মূলনীতি। মহাসচিব কে হবেন, সেটি সম্পূর্ণভাবে দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত এবং কাউন্সিলের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে। আমার ব্যক্তিগত কোনো আকাঙ্ক্ষা বা আগ্রহ নেই। আমি সবসময় দলের একজন কর্মী হিসেবেই কাজ করে যেতে চাই। দল যেখানেই আমাকে দায়িত্ব দেবে, আমি সেটিই নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করব। এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা।”
রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গ ও ফখরুলের অবস্থান
রাজনীতি থেকে অবসর নিলে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখা যেতে পারে—এমন গুঞ্জনও রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। তবে এই সম্ভাবনাকে নিজেই নাকচ করেছেন মির্জা ফখরুল। তার ভাষায়, এ ধরনের কোনো আকাঙ্ক্ষা তার কখনোই ছিল না।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সে সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হন এবং সংগঠনের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে নেতৃত্বে উঠে আসেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং রাজনৈতিক কারণে জেলেও যেতে হয় তাকে। পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়ে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮৬ সালে তিনি পদত্যাগ করে পুরোপুরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপি-তে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।
২০০৯ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। পরে ২০১১ সালের মার্চে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালের কাউন্সিলের পর পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান।