Advertisement Banner

রুজভেল্টের অসমাপ্ত কাজ কি ট্রাম্প শেষ করবেন?

রুজভেল্টের অসমাপ্ত কাজ কি ট্রাম্প শেষ করবেন?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

এ বছর যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে। ১৭৭৬ সালের ৩-৪ জুলাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা দিবস। অবশ্য তখনো স্বাধীনতার যুদ্ধ শেষ হয়নি। আনুষঙ্গিক অনেক কার্যক্রম ছিল। জর্জ ওয়াশিংটনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে ১৭৮৯ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের যাত্রা শুরু। জর্জ ওয়াশিংটন পরপর দু’বার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর আর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। অবশ্য সে সময় সংবিধানে কোনো বাধা ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের একটি বিষয়ে প্রশংসা করতে হয়। ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরার মানসিকতা তাদের ছিল না। মানুষ নশ্বর ক্ষমতা অবিনশ্বর–এই আদর্শে তারা বিশ্বাসী ছিলেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডেমোক্রেটিক পার্টি ফ্রেডারিক ডেলানো রুজভেন্টকে চারবার মনোনয়ন দিয়েছিল। তিনি চারবারই রিপাবলিকান দলের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। এরপর সংবিধানে সংশোধনী আনা হয় যে, দুবারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট পদে অসীন হতে পারবেন না।

রুজভেল্টের আগে এই দীর্ঘ সময় রীতি হিসেবে মেনে নিয়ে কেউ দু’বারের বেশি প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। যুক্তরাষ্ট্র বিপুল সম্পদশালী রাষ্ট্র। জর্জ ওয়াশিংটন দম্পতির ৬০ হাজার একর ভূমি ছিল, যার প্রতি তারা যথাযথ যত্নশীল ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রবাসী সম্পদ রক্ষার ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠলেন। তারা যেখান থেকে (ইউরোপ) এসেছেন, সেখান থেকে আবার যদি পশ্চিম গোলার্ধে আসার জোয়ার ওঠে, সেটাকে প্রতিরোধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জনরো ১৮২৩ সালে তার নামে মনরো ডকট্রিন চালু করলেন। এই ডকট্রিন অনুযায়ী বিশ্বের অন্য কোনো দেশ পশ্চিম গোলার্ধে অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশে কোনো বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ১৮২৩ সালের ২ ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো কংগ্রেসকে তার এই বার্তা জানিয়ে দেন।

এর এক শ বছর পর ১৯৩৮ সালে এর কিছুটা সংশোধনী আনা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, আমেরিকার সকল রাষ্ট্র যৌথভাবে এই দায়িত্ব পালন করবে। তবে বস্তুত এর পূর্ণ নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থেকে যায়। ১৯০১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যাস্ক কিনলি নিহত হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেন্ট প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নিজ মহাদেশে সীমাবদ্ধ রাখার নীতি সমর্থন করতেন। এর আগে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে ১৮৯৮ সালে স্পেনকে হটিয়ে দিয়ে কিউবা ও পুয়ের্তো রিকো দখল করেন। একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনী ফিলিপাইনও দখল করে। এই যুদ্ধে রুজভেন্ট নায়ক হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ফিলিপাইন হয় প্রথম মার্কিন কলোনি।

রুজভেন্ট ১৯০৪ সালে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। একদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাতে আগ্রহী। অপরদিকে, রুশ-জাপান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে অবদানের জন্য ১৯০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। ইতিমধ্যে ওয়াশিংটন ডিসির পটোম্যাক নদী দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে।

আমেরিকান গৃহযুদ্ধের পর মার্কিন শিল্প, বিদ্যুৎ, জ্বালানি উত্তোলন এবং রেল যোগাযোগ অতিদ্রুত উন্নতি করতে লাগল। ১৮৯০ সালের ভেতর বিশ্বের শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যকে ছড়িয়ে যায়।

ফিরে আসি টেডি রুজভেন্টের দর্শনের দিকে। তিনি চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে। ব্রিটেনের অবস্থান তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল কি না, জানি না। কেননা এক সময়ে নাকি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেত না। যা হোক, টেডি রুজভেন্টের পর অল্পদিনের ব্যবধানে দুটো বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট বিশ্বের একটি পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন করে দেশ দখল করাতো দুরের কথা, যারা পরাধীন কলোনী তাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম জোরদার হয়ে ওঠে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন একনিষ্ঠভাবে সমর্থন দিয়ে যায়। এর ফলে বামপন্থী রাজনীতির অবয়ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এতে যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করে অবাধ মুক্ত গণতন্ত্র। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তো সোভিয়েত ইউনিয়নকে আখ্যায়িত করলেন ‘লৌহ পর্দার দেশ’ হিসেবে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে জানান দিয়েছিল যে, সামরিক শক্তিতে তার অবস্থান এক নম্বরে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এরপর জানিয়ে দিয়েছিল যে, সে কম যায় না। এর ফলে বিশ্বে দ্রুত পরাধীন কলোনিগুলো স্বাধীনতা অর্জন করতে লাগল।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব তখন একক শক্তির অধীনে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরাককে আক্রমণ করে। অভিযোগ ছিল, সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে। পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কিন্তু বিশ্ব বিবেকের কোনো বিচার পেল না। তবে ট্রাম্পের মতো টেডি রুজভেন্টের আদর্শে শতভাগ অনুগত আর কোনো প্রেসিডেন্ট আসেননি। তিনি শক্তি প্রয়োগ করে একটি দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক হাতকড়া পরিয়ে প্রেসিডেন্টের ভবন থেকে উঠিয়ে আনলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অকৃত্রিম বন্ধু কানাডাকে অঙ্গরাজ্য বানাতে চাইলেন। গ্রিনল্যান্ডকে দখল করতে চাইলেন। আর ইরানের সভ্যতাকে তো বিশ্ব থেকে নিশ্চিহ্ন করতে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার অপকর্মের ঘনিষ্ঠ সাথী হলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একজন ব্রিটিশ আইনপ্রণেতাকে একজন সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, গুজব রটেছে, নেতানিয়াহু নাকি মারা গেছে। উত্তরে সেই ব্রিটিশ এমপি বলেছিলেন, মনে হয় না, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে চালাচ্ছে কে?

ইরানের সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এটিও কিন্তু ট্রাম্পের পূর্বসুরীদের প্রভাবে। ডিএনএ টেস্ট করলে মিলে যাবে। অতীতে অসহায় অনেক সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে শক্তিশালী সভ্যগোষ্ঠীর কাছে। লাতিন আমেরিকার মায়া সভ্যতার এতটুকু চিহ্নও নেই। ১৬২২ থেকে ১৮১০ সাল পর্যন্ত মার্কিন শ্বেত নাগরিকদের সঙ্গে রেড ইন্ডিয়ানদের সংঘর্ষে প্রায় ৩৮ লাখ রেড ইন্ডিয়ান নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পুর্বাঞ্চলে সোনা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার আদিবাসীদের ৮০০ মাইল দূরে যেতে বলা হলো। প্রচন্ড শীত। পথিমধ্যে ৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

Terra Nullius একটি ল্যাটিন শব্দ। ইউরোপে আইনের দোহাই দিয়ে এটি ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ, এটি কারও ভূমি নয়। ইউরোপীয়রা কলোনি স্থাপনের জন্য এই শব্দটি করেছে। আর যদিও আদিবাসী থাকতো, বলা হতো তারা বসবাসের অযোগ্য। অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে আদিবাসীরা বসতি স্থাপন করে। কিন্তু তাদের বাস করার যোগ্যতা ছিল না, অতএব Terra Nullius আইনের বলে তারা বাস্তচ্যুত হয়। অস্ট্রেলিয়া অতীব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে সমৃদ্ধ মহাদেশ। চারিদিকে সাগর। খনিজ সম্পদে ভরপুর। শতাধিক দৃষ্টিনন্দন সৈকত রয়েছে। মরুভূমিরও তো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য রয়েছে। তাই সেখানে অধিকাংশ আদিবাসীর ঠাঁই হয়েছে।

কানাডায় ১৮৭৬ সালে ইন্ডিয়ান (ফাস্ট লেশন) আবাসিক স্কুল আইন গৃহীত হয় এবং ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আবাসিক স্কুলে নেওয়া হতো। উদ্দেশ্য তাদের কানাডার বৃহত্তর সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূত করা। এই অবস্থায় প্রায় ৬ হাজার শিশু মারা যায়। নেওয়া হয়েছিল দেড় লাখ শিশু। বিজ্ঞজনরা একে আখ্যায়িত করেন ‘কালচারাল জেনোসাইড’। এভাবে বহু সম্প্রদায়, গোত্র নিশ্চিহ্ন হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ইরানের সভ্যতাকে বিশ্বের ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন। তা করতে হলে গোটা ইরান এবং এর অধিবাসীদের ধ্বংস করে দিতে হবে।

বিশ্বে যখন একক শক্তি ছিল না, তখন সকল মানুষকে পদানত করার মানসিকতা দেখা যায়নি। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র একক শক্তির অধিকারী হওয়ায় ট্রাম্প যেভাবে কথা বলেন, তাতে মনে হয় সবাই তার প্রজা।

লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

সম্পর্কিত