Advertisement Banner

ব্রাজিলের হেক্সা মিশন কতটা কঠিন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ব্রাজিলের হেক্সা মিশন কতটা কঠিন?
ব্রাজিলের জার্সিতে ষষ্ঠ তারকা যোগ করার মিশন ষষ্ঠ বিশ্বকাপে গড়াচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

ব্রাজিলে নাকি বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়াও ব্যর্থতা!

সে হিসাবে গত ২৪ বছরে ব্যর্থতার ভারটা তো জগদ্দল পাথরের চেয়েও ভারি হয়ে যাওয়ার কথা! ২০০২-এ শেষবার – রেকর্ড পঞ্চমবার – বিশ্বকাপ জেতার পর থেকে প্রতিবারই বিশ্বকাপ শুরু হয় ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের আওয়াজ নিয়ে, কোয়ার্টার ফাইনাল কিংবা সেমিফাইনাল যেতে যেতে আওয়াজ মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। জার্সিতে ষষ্ঠ তারকাটির খোঁজে এবার ষষ্ঠ বিশ্বকাপে নামছে ব্রাজিল।

এই দুই যুগে একের পর এক বিশ্বকাপে ব্রাজিলের তারকার অভাব কখনো হয়নি। ব্রাজিল কখনো বিশ্বকাপে গেছে ফর্মের তুঙ্গে থাকা রোনালদিনিওকে নিয়ে, কখনো ইউরোপ মাতিয়ে বেড়ানো কাকাকে নিয়ে, টানা তিন বিশ্বকাপে গেছে নেইমারকে স্বপ্নসারথি বানিয়ে... ভিনিসিয়ুসও একটা বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ রানার্সআপ হওয়াই দূর, সর্বশেষ পাঁচ বিশ্বকাপে চারবারই কোয়ার্টার ফাইনালে বাদ পড়েছে ব্রাজিল। যে একবার সেমিফাইনালে গেছে, নিজ মাটিতে আয়োজিত সে বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগেই বরং বাদ পড়ে গেলে বুঝি বেশি স্বস্তি পেতেন ব্রাজিল সমর্থকেরা!

মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘোচানো বিশ্বকাপ।

২০২৬-এ এসে ব্রাজিলের গল্পটা তাই শুধু আরেকটা বিশ্বকাপের নয়। একটা প্রশ্নের।

কাতার বিশ্বকাপের চমক মরক্কোর বিপক্ষে কঠিন ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশ সময় রাত ৪টায় যখন ব্রাজিলের এবারের বিশ্বকাপ মিশন শুরু হতে যাচ্ছে, তার আগে প্রশ্নটা এই - ব্রাজিল কি নিজ ঐতিহ্য আর আধুনিক ফুটবলের বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নিতে পারবে?

২.

১৯৫৮-তে ব্রাজিল অনেকটা কাছাকাছি এক প্রশ্ন নিয়েই বিশ্বকাপে গিয়েছিল পেলের ব্রাজিল। আট বছর আগে – ১৯৫০ বিশ্বকাপে – দুঃস্বপ্নকে বাস্তবে দেখা ব্রাজিল ’৫৮-তে বিভ্রান্ত ছিল। দ্বিধা ছিল, ব্রাজিলিয়ান ঢংয়েই খেলবে, নাকি ইউরোপের নকল করবে? শুরুতে অতিসতর্ক, অতিনিরাপদ থেকে ইউরোপিয়ান ঢংয়ের অনুকরণের চেষ্টা করলেও রক্ত বিদ্রোহ করে বসেছিল। পেলে-গারিঞ্চারা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, নিজ শেকড়েই সমাধান। ব্যস, অতটুকুই দরকার ছিল! সেমিফাইনাল, ফাইনালে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ব্রাজিলকে।

সেই যে শুরু হলো, আর থামায় কে! ’৫৮, ’৬২…মাঝে ’৬৬-তে হিসাবে উল্টোপাল্টা হয়ে গেল, কিন্তু ১৯৭০-এ বিশ্বজয়ের হ্যাটট্রিক করে জুলে রিমে ট্রফিটাই রেখে দিল ব্রাজিল।

তখন যুগ ভিন্ন ছিল, আত্মপরিচয়ে অহম ছিল।

দূরত্ব মুছে দিতে এসে বিশ্বায়ন এই পার্থক্যটাও মুছে দিল।

ব্রাজিল আবার বিভ্রান্ত হলো। কেটে গেল ২৪ বছর। এই যুক্তরাষ্ট্রেই অবশেষে ১৯৯৪ সালে গিয়ে দুই যুগের আক্ষেপ ঘুচল, ব্রাজিল স্বস্তি পেল। শিরোপার সংখ্যায় গায়ের সঙ্গে লেগে থাকা ইতালিকে আবার টপকে যাওয়ার গর্বও সঙ্গী হলো। কিন্তু তৃপ্তি পেল কি? সম্ভবত না।

আট বছর পর রিভালদো-রোনালদোরা ব্রাজিলকে বানিয়ে দিলেন পাঁচ তারকা। ফুটবলটাও হলো ব্রাজিল আর ইউরোপের মিশেলে বিশ্বায়নের প্যাকেজ মিলিয়ে দেওয়া।

এরপর…। আবার ২৪ বছর। আবার ব্রাজিলের নিজেকে খুঁজে ফেরা। আবার প্রশ্নটার মুখোমুখি হওয়া। ব্রাজিলিয়ান ঢং এখন আর অল্পই বাকি আছে। এখন প্রশ্ন অতটুকুই – ক্রমেই হারিয়ে যেতে থাকা ব্রাজিলিয়ান জিঙ্গার অবশিষ্টাংশ আর ইউরোপিয়ান প্রজ্ঞার মধ্যে ‘অপটিমাম পয়েন্ট’টা কি খুঁজে নিতে পারবে ব্রাজিল?

উত্তরের খোঁজ মরিয়া ব্রাজিলকে লক্ষণরেখা পার করার ঝুঁকি নিতেও বাধ্য করে ফেলল। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ডাগআউটে নন-ব্রাজিলিয়ান কোচ!

ব্রাজিলের কোচ এবার আনচেলত্তি। ছবি: রয়টার্স
ব্রাজিলের কোচ এবার আনচেলত্তি। ছবি: রয়টার্স

ব্রাজিলিয়ান নন, এমন কোচ ব্রাজিলের ডাগআউটে দেখা যাওয়ার কথা ইতিহাসে আছে। তবে তার প্রতিটিরই মেয়াদ ছিল অল্প। বিশ্বকাপকে অন্তত এই জায়গায় লক্ষণরেখা বানিয়ে রেখেছিল ব্রাজিল। বিশ্বকাপ কখনো ব্রাজিলের ডাগআউটে নন-ব্রাজিলিয়ান কোচ দেখেনি।

২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোতে চলতে থাকা বিশ্বকাপে এই ধারাটা ভাঙছে ব্রাজিল, তা-ও কাকে দিয়ে! কার্লো আনচেলত্তি! ইতালিয়ান ডন, ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের মুকূট চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতায় যাঁর আশপাশে কেউ নেই!

আনচেলত্তির হাত ধরেই কি তবে ব্রাজিলের বন্ধ তালা খুলবে?

৩.

ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতবে কি না, সে উত্তরের খোঁজে যাওয়ার আগে দেখতে হবে, আনচেলত্তির হাতে অস্ত্র কী কী আছে? সময়ের সেরা উইঙ্গারদের দুজন ভিনিসিয়ুস আর রাফিনিয়া আছেন। সময়ের সেরা গোলকিপারদের একজন আলিসন আছেন। ঠিক বিশ্বসেরা তারকা না হলেও ব্রুনো গিমারায়েস, মারকিনিওস, গাব্রিয়েল, পাকেতা, কুনিয়া… ডিফেন্স, মিডফিল্ড, অ্যাটাকে বিকল্প অনেকই আছে আনচেলত্তির হাতে। এনদ্রিকের মতো তরুণ প্রতিভা কিংবা কাসেমিরোর মতো পোড়খাওয়া খেলোয়াড়ও আছেন।

আর আছেন নেইমার!

প্রায় তিন বছর আগে ব্রাজিলের জার্সিটা সর্বশেষবার গায়ে উঠেছে তার। চোটের চোটপাটই তার সর্বশেষ তিন-চার বছরের ক্যারিয়ারের সারসংক্ষেপ। মাঝে সৌদি আরবে দেড় বছরে ৭ ম্যাচের ‘প্রমোদভ্রমণ’ কাটানো নেইমার বিশ্বকাপে জায়গা পেতে শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরেছেন, আনচেলত্তির দেওয়া শর্ত পূরণ করেছেন ম্যাচের পর ম্যাচ খেলে। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে ঠিক আবার চোটে পড়েছেন।

বিশ্বকাপে ছন্দ খুঁজে পাবেন নেইমার? ছবি: রয়টার্স
বিশ্বকাপে ছন্দ খুঁজে পাবেন নেইমার? ছবি: রয়টার্স

ফিটনেস নিয়ে তাই প্রশ্ন আছে। ফর্ম নিয়েও। পায়ের গতি আর শরীরের নড়াচড়াও ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা নেইমারের কথা মনে করিয়ে দেয় দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে।

তা সত্ত্বেও নেইমারকে বিশ্বকাপ দলে রেখেছেন আনচেলত্তি। কিন্তু এই নেইমার ব্রাজিলের জন্য সমাধান হয়ে দেখা দেবেন, নাকি উল্টো সমস্যা হয়ে – দলটার বিশ্বকাপ সম্ভাবনার প্রশ্নের অনেকটাই লুকিয়ে সে প্রশ্নে।

৪.

ব্রাজিল কেন বিশ্বকাপ জিতবে?

উত্তরটা এর মধ্যেই আপনার পেয়ে যাওয়ার কথা। ব্রাজিলের হেক্সার স্বপ্নে সাফল্যের সম্ভাবনাকে একেবারে সংক্ষেপে শুধু একটি নামের সঙ্গেই জড়িয়ে ফেলা যায় - আনচেলত্তি। ব্রাজিল যদি বিশ্বকাপ জেতে, আনচেলত্তির কারণেই জিতবে।

আনচেলত্তি কী পারেন, সেটা ফুটবলে নতুন করে ব্যাখ্যা করার দরকার পড়ে না। পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগেই শিরোপা – সবই তাকে মাস্টার ট্যাকটিশিয়ান বলার কারণ ব্যাখ্যা করে। ব্রাজিলের জন্য আনচেলত্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তার ট্যাকটিকস সাজানোর নীতির কারণে। জটিল ট্যাকটিকসের পথে তিনি হাঁটেন না। সেরা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা আদায় করে নেওয়াই আনচেলত্তির ট্যাকটিকস! বাঁধাধরা কোনো সিস্টেম মেনে খেলোয়াড় দলে ডাকেন না, দলে থাকা খেলোয়াড়দের ভিত্তিতে সিস্টেম সাজিয়ে নেন।

তাতে আনচেলত্তি কতটা সফল, সেটা রেয়াল মাদ্রিদ দেখেছে। একই অভিজ্ঞতা হয়েছে এসি মিলানেরও। ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা তো এতদিন এটাই ছিল— তারকা কিংবা প্রতিভার অভাব দলটার কখনো হয়নি, কিন্তু এই তারকাদের একসঙ্গে কাজ করানোর কৌশল গত ২৪ বছরে কোনো কোচ খুঁজে পাননি।

আনচেলত্তির একটা প্রভাব বিশ্বকাপের আগেই টের পেয়েছে ব্রাজিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর মূলত দুই মিডফিল্ডার আর চার ফরোয়ার্ড নিয়ে ৪-২-৪ ছকে ব্রাজিলকে খেলিয়েছেন আনচেলত্তি। কিন্তু বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসতে আসতে সেই ছক থেকে সরে আসার ইঙ্গিত আনচেলত্তির কৌশলে। সেটা হতে পারে নেইমারকে কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেই ভবিষ্যৎ ভাবনা থেকে; অথবা হতে পারে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ফ্রান্স-আর্জেন্টিনা-স্পেনের মতো দল সামনে পড়লে কী করবেন সেটা চিন্তা করে।

কী পরিবর্তন করেছেন আনচেলত্তি? কাসেমিরো আর ব্রুনো গিমারায়েসের মিডফিল্ড এতদিন জায়গা ‘কাভার’ করতে সমস্যায় পড়েছে, কাসেমিরোর বুড়িয়ে যাওয়া পা জোড়া সমস্যা আরও বাড়িয়েছে। তবু হাতে থাকা ফরোয়ার্ডদের সেরাটা বের করে আনার প্রয়োজনে সে কৌশল থেকে সরেননি আনচেলত্তি। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে তিনি ব্রাজিলকে খেলিয়েছেন তিন মিডফিল্ডার। কাসেমিরো-ব্রুনোর সঙ্গে পাকেতা নয়তো মিডফিল্ডার দানিলোকে (রাইটব্যাকেও একজন দানিলো আছেন) বিশ্বকাপে দেখার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারেন।

তিন মিডফিল্ডারের সুবিধা? ব্রাজিলের গোল করার লোক পাওয়া যাবে, কিন্তু টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে মাঝমাঠ গড়ের মাঠ হয়ে গেলে এক-দুটি মুহূর্তই সব শেষ করে দিতে পারে। ৪-৩-৩ ছক ব্রাজিলকে ঘিরে সে শঙ্কা কিছুটা কমাবে।

আনচেলত্তি ডাগআউটে আছেন বলেই ভিনিসিয়ুসকে নিয়েও নতুন করে স্বপ্ন সাজানোর সাহস পাচ্ছেন ব্রাজিলিয়ানরা। রেয়াল মাদ্রিদে তারকা হয়ে গেলেও ব্রাজিলের জার্সিতে বরাবরই ম্লান ভিনিসিয়ুস। কিন্তু রেয়াল মাদ্রিদেও শুরুতে ধুঁকতে থাকা ভিনিসিয়ুসকে তারকা হওয়ার পথটা চিনিয়ে দিয়েছেন তো আনচেলত্তিই। সেই আনচেলত্তিই যখন ব্রাজিলের ডাগআউটে, হলুদ জার্সিতে লেফট উইংয়ে ‘রেয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস’কে দেখার আশা তো ব্রাজিল করতেই পারে!

ব্রাজিলে ‘রেয়াল মাদ্রিদে’র ভিনিসিয়ুসকে ফেরাতে পারবেন আনচেলত্তি? ছবি: রয়টার্স
ব্রাজিলে ‘রেয়াল মাদ্রিদে’র ভিনিসিয়ুসকে ফেরাতে পারবেন আনচেলত্তি? ছবি: রয়টার্স

আনচেলত্তির সঙ্গে এই তালিকায় নেইমারকেও রাখার লোভ যে কারও হবে। ছন্দে থাকলে নেইমার তো যেকোনো সময়ই ভয়ংকর! কিন্তু চোটের কারণে এরই মধ্যে মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়া নেইমার এখনো দলের সঙ্গেই অনুশীলন করেননি, চোটের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় এখনো শুধু জিমেই সময় কাটছে তার। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয়, এমনকি তৃতীয় ম্যাচের আগে তাকে বদলি হিসেবেও দেখার আশা করা ঠিক হবে না। সেই নেইমার কবে ফিরবেন, ফিরলেও কতটা ফিট থাকবেন সেটাই বড় প্রশ্ন। ছন্দে থাকবেন কি না, সেই প্রশ্ন তো আরও পরের ব্যাপার।

৫.

তাহলে ব্রাজিল কেন বিশ্বকাপ জিততে না-ও পারে?

এক, স্ট্রাইকারের অভাব। কেন এটা বলা হচ্ছে, তা ২০০২-এর সঙ্গে গত কয়েক বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলকে মিলিয়ে নিলেই পেয়ে যাবেন। ২০০২-এ ব্রাজিলের একজন রোনালদো নাজারিও ছিল। এর আগের প্রতিটি বিশ্বকাপে শিরোপার পথে ব্রাজিলের ইতিহাস রাঙিয়েছেন কোনো না কোনো স্ট্রাইকার। কিন্তু এরপর?

২০০৬-এ রোনালদোর ওজন ছাড়া বাকি সব দিকেই চার বছর আগের চেয়ে কমতি ছিল। ২০১০ কিংবা এরপর থেকে ব্রাজিলের ‘নাম্বার নাইন’ জার্সিটা কখনো তার ওজনের সঙ্গে মানানসই নাম পায়নি। স্ট্রাইকারের জন্য বিখ্যাত ব্রাজিল একের পর এক বিশ্বকাপে গেছে ফ্রেড, রিচার্লিসন, লুইস ফাবিয়ানোদের নিয়ে। মাঝে গাব্রিয়েল জেসুস আশা জাগিয়েও দ্রুত হারিয়ে গিয়েছিলেন।

এবারও ব্রাজিলের নাম্বার নাইন এমন একজন, যিনি প্রথাগত ‘নাম্বার নাইন’ই নন। মাতেউস কুনিয়া প্রতিভাবান, কিন্তু নিয়মিত গোলের প্রয়োজন কি মেটাতে পারবেন? ফ্রান্সের গোল করার মতো লোকের অভাব নেই, আর্জেন্টিনার মেসির পাশে আলভারেস-মার্তিনেস আছেন, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন আছেন। কিন্তু ব্রাজিলের? কুনিয়া নামটা বাকি দলগুলোর মতো ভরসা জোগায়?

বক্সে প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরানোর মতো, ডিফেন্ডারদের অন্যদিকে ব্যস্ত করে ভিনিসিয়ুস-নেইমারদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার মতো স্ট্রাইকার কুনিয়া নন। ইগর থিয়াগো মূল একাদশেরই খেলোয়াড় নন। বক্সে ত্রাস ছড়ানোর মতো একজন স্ট্রাইকারের অভাব ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জেতা-না জেতার পথে বড় ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।

কাসেমিরোর বুড়িয়ে যাওয়া পা জোড়া ব্রাজিলের দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। ছবি: রয়টার্স
কাসেমিরোর বুড়িয়ে যাওয়া পা জোড়া ব্রাজিলের দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। ছবি: রয়টার্স

দ্বিতীয় কারণ, কাসেমিরো। মিডফিল্ডে তিনজন রাখার পেছনে আনচেলত্তিকে বাধ্য করার একটা বড় কারণ তিনিও। কল্পনা করুন, নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচে ফ্রান্সের সঙ্গে ব্রাজিলের দেখা। বল পেলেই অল্প পাসে, স্বল্প সময়ে উঠে যাওয়া (কুইক ট্রানজিশন) ফ্রান্সের হয়ে উঠছেন এমবাপ্পে, কিংবা দেম্বেলে বা ওলিসে। তাদের সঙ্গে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছেন কাসেমিরো। এর ফল দুটির একটি হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি – ফাউল করতে গিয়ে কার্ড দেখে বসতে পারেন কাসেমিরো, নয়তো ব্রাজিলের বক্সে বল!

৬.

২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে এ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্তই ব্রাজিলের সময়টা কেটেছে খুব বাজে। আনচেলত্তিকে নিয়ে এ সময়ে চারজন কোচ দেখেছে ব্রাজিল। ম্যাচ খেলেছে ৩৭টি, তার মধ্যে জয় মাত্র ১৭টিতে। বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, উরুগুয়ের মতো দলের বিপক্ষে ভুগেছে। আর্জেন্টিনার কাছে তো ঘরের মাঠেই হেরেছে ৪-১ গোলে, তা-ও আবার মেসিহীন আর্জেন্টিনা! আনচেলত্তি দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা বদলানোর আগে এমনও বলা হয়েছে একটা পর্যায়ে যে, এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপে লাতিন অঞ্চলের ১০ দলের ৬টিই বিশ্বকাপে গেছে বলে, না হলে ব্রাজিলের সবগুলো বিশ্বকাপে খেলার গর্বই ২২-এ থেমে যেত!

১৯৯৪ আর ২০০২-এও ব্রাজিল ধুঁকতে ধুঁকতে বিশ্বকাপে গিয়েছিল। সে স্মৃতি মনে করিয়ে এবারও শিরোপার স্বপ্ন তাই দেখছেন অনেকে। কিন্তু ডেটার যুগে এই বিশ্বাসের দাম কতটা?

ফ্রান্সের বিশ্বকাপের সম্ভাবনা যেখানে তাদের স্কোয়াডে বিকল্পের প্রাচুর্যের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে। স্পেন স্বপ্ন দেখছে তাদের ফুটবলে পাসিং আর ট্রানজিশনের অসাধারণ সমন্বয়ের কারণে। ব্রাজিল যেখানে ভর করেছে শুধুই বিশ্বাসে।

বিশ্বাসে হেক্সা মিললে তো হয়েই গেল!

সম্পর্কিত