দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন
চরচা ডেস্ক

প্রতিদিন সকালে নতুন নতুন হুমকির কথা শুনে ঘুম থেকে উঠলে সমাধান নিয়ে ভাবা সহজ নয়। আর সেই হুমকি যদি আসে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্টের থেকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর।
গত ১৪ জানুয়ারি ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এভাবেই একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। সেদিনই তিনি ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে এক উত্তপ্ত বৈঠক করেছিলেন।
৩ জানুয়ারি আমেরিকান বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, গ্রিনল্যান্ড যদি আমেরিকার হাতে না আসে, তা হলে সেটি রাশিয়া বা চীনের কবলে পড়বে। আর এটি আমেরিকার কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই পক্ষই ‘একমত না হতে রাজি’ হয়েছে। তা ছাড়া গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাদের সরকারের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবেনা বলেও জানান তিনি। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হলেও এটি একটি স্বশাসিত অঞ্চল।
তাৎক্ষণিক কোনো সংকট দেখা না দিলেও ন্যাটোর এক মিত্র দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের এমন হস্তক্ষেপ ইউরোপীয় দেশগুলোতে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য বোঝা খুব কঠিন। তিনি কি গ্রিনল্যান্ডবাসীকে ডেনমার্ক থেকে আলাদা করতে চান? দ্বীপটি কিনে নিতে চান? নাকি সামরিক দখলের কথাও ভাবছেন? এই প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে ইউরোপীয় রাজনীতিকরা হিমশিম খাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা মূলত তিনটি কৌশল অবলম্বন করতে পারে। এগুলো হলো- চাপ কমানো, প্রতিরোধ গড়া ও মনোযোগ ঘোরানো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ট্রাম্পের তথাকথিত নিরাপত্তা উদ্বেগ কমানোর বিষয়ে। বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই এসব উদ্বেগের সমাধান সম্ভব বলে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাসমুসেন জানান, আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে একটি ‘উচ্চপর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করা হবে। ন্যাটোর ভেতরে ব্রিটেন ও জার্মানি ‘আর্কটিক সেন্ট্রি’ নামে একটি নৌ নজরদারি মিশনের প্রস্তাব দিয়েছে।
এসব প্রস্তাবের সঙ্গে আবার ট্রাম্পের মনের কথাও কিছুটা বলেছেন তিনি। রাসমুসেন বলেন, “ট্রাম্প যা বলেন, তাতে সব সময় সামান্য হলেও সত্য থাকে।”
কারণ ট্রাম্প বরাবরই ন্যাটো মিত্রদের থেকে শুনতে চান যে উত্তর মেরু অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে তার উদ্বেগ ‘পুরোপুরি ভিত্তিহীন’ নয়।
তবে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিষয়টি তা নয়। ১৯৫১ সালে ডেনমার্কের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির আওতায় আমেরিকা চাইলে গ্রিনল্যান্ডে কার্যত যত খুশি সেনা মোতায়েন করতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের পর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমে যায়। বর্তমানে দ্বীপটির উত্তর-পশ্চিমে একটি ঘাঁটিতে ২০০ জনেরও কম আমেরিকান সেনা রয়েছে, যা মূলত মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কবার্তার রাডারের কাজে ব্যবহৃত হয়। গ্রিনল্যান্ড আবার ন্যাটোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই রয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে আমেরিকার বক্তব্য অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অসলোভিত্তিক ফ্রিডটজফ ন্যানসেন ইনস্টিটিউটের আর্কটিক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ওস্থাগেন বলেন, “গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় ন্যাটো মিশনের বাস্তব কোনো নিরাপত্তাগত প্রয়োজন নেই।”
ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ডের আশপাশের সমুদ্র রুশ ও চীনা জাহাজে ভরে গেছে। অথচ এর পক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। ডেনমার্ক ইতোমধ্যে গ্রিনল্যান্ডে চীনের বিনিয়োগ আগ্রহও অনেকটাই ঠেকাতে পেরেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্কটিক অঞ্চলের প্রকৃত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আসলে অন্য জায়গায়, যেমন আলাস্কায়। আর যে বিরল খনিজ ও খনিজসম্পদের প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ, সেগুলো উত্তোলনের খরচ এত বেশি যে তা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। আমেরিকার কোম্পানিগুলো চাইলে সার্বভৌমত্ব বদল ছাড়াই খনির লাইসেন্স পেতে পারে, কিন্তু বাস্তবে খুব কম প্রতিষ্ঠানই আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে এসব যুক্তি ট্রাম্পকে নড়াতে পারেনি। তিনি যখন বললেন ‘মালিকানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ’, তখন তার কথা মূল্য দিয়েই ভাবতে হচ্ছে ইউরোপকে। এক সাবেক আমেরিকান কূটনীতিকের মতে, গ্রিনল্যান্ড দখল ট্রাম্পের ‘লিগ্যাসি বা ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নিয়ে মোহের’ অংশ।

তাই ইউরোপকে দ্বিতীয় পথটি ভাবতে হচ্ছে। ট্রাম্পের সম্ভাব্য দখলচেষ্টা কীভাবে ঠেকানো যায়।
আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির কিছু অংশ স্থগিত করা বা মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে চাপে রাখার কথা উঠেছে। এছাড়া ইউরোপে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা বা আমেরিকান ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে দেওয়ার মতো কঠোর প্রস্তাবও সামনে এসেছে।
তবে ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের গবেষণা পরিচালক জেরেমি শাপিরো বলছেন, এসব প্রস্তাবে ঐকমত্য পাওয়া কঠিন, আর এগুলো মূলত প্রতিশোধমূলক, প্রতিরোধমূলক নয়। পরিবর্তে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
যেমন- গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সেনাদের চক্রাকার উপস্থিতি গড়ে তোলা, স্থানীয়দের সম্মতি ছাড়া কোনো আমেরিকান কোম্পানি যদি খনিজ আহরণ করে, তার বিরুদ্ধে আগাম নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা এবং ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকানদের লবিং করা।
ওয়াশিংটনের বৈঠক শুরুর দিনই ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডে নৌ, বিমান ও স্থল বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইডেনসহ মিত্র দেশগুলো সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ইউরোপ কি আরও দূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত?
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো এই বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছেন। ১৪ জানুয়ারি তিনি তার মন্ত্রিসভাকে বলেন, ট্রাম্প ‘চরম পরিণতি’ ডেকে এনেছেন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন আগে সতর্ক থাকার পক্ষে থাকলেও এখন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডে হামলা হলে ন্যাটো ভেঙে পড়বে।
জার্মানির সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর রবার্ট হাবেক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে পদক্ষেপ নিলে রাশিয়া নর্ডিক দেশগুলোতে আরও আগ্রাসী হতে পারে। তার ভাষ্য, “সব বিকল্পই টেবিলে রাখতে হবে।”

অন্যদিকে, অনেকে মনে করেন অতিরিক্ত চাপ ট্রাম্পকে আরও আগ্রাসী করে তুলতে পারে। ইউক্রেনও বড় উদ্বেগের জায়গা। হোয়াইট হাউসকে ক্ষেপালে ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই আপাতত বেশির ভাগ ইউরোপীয় রাজনীতিক চাপ বাড়াতে অনিচ্ছুক।
জার্মানির ক্ষমতাসীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটদের পররাষ্ট্রনীতি মুখপাত্র ইয়ুর্গেন হার্ড বলেন, “ডেনমার্কের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ড রেখেই বিদ্যমান চুক্তির মধ্যে সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমি নিশ্চিত, এই যুক্তিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝানো সম্ভব।”
যদি তা না হয়, শেষ ভরসা হলো, ট্রাম্প হয়তো অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ হারাবেন। গ্রিনল্যান্ডকে ধীরে ধীরে দখলের কৌশল, যেমন স্বাধীনতার দাবিকে উসকে দিয়ে পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বা সংযুক্তির জন্য দীর্ঘ পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা দরকার, যা ট্রাম্পের শক্তির জায়গা নয়। সামরিক দখল তুলনামূলক সহজ হলেও তা সেনাবাহিনী, সরকার ও কংগ্রেসের ভেতরে আনুগত্যের বড় পরীক্ষা নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৪ শতাংশ ভোটার গ্রিনল্যান্ড দখলে বলপ্রয়োগ সমর্থন করেন।
চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন, ইরানসহ নানা সংকটের কারণে ট্রাম্পের সামনে কাজের অভাব নেই। ভেনেজুয়েলার ‘সাফল্যের’ উচ্ছ্বাস কাটলে তিনি হয়তো অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। ইউরোপের আশা, গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা হয়তো কেবল ডেনমার্ককে নিরাপত্তা বা খনিজ নিয়ে কোনো সমঝোতায় চাপ দেওয়ার কৌশল। আপাতত, এই আশাতেই তারা ভরসা রাখছে।

প্রতিদিন সকালে নতুন নতুন হুমকির কথা শুনে ঘুম থেকে উঠলে সমাধান নিয়ে ভাবা সহজ নয়। আর সেই হুমকি যদি আসে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্টের থেকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর।
গত ১৪ জানুয়ারি ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এভাবেই একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। সেদিনই তিনি ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে এক উত্তপ্ত বৈঠক করেছিলেন।
৩ জানুয়ারি আমেরিকান বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, গ্রিনল্যান্ড যদি আমেরিকার হাতে না আসে, তা হলে সেটি রাশিয়া বা চীনের কবলে পড়বে। আর এটি আমেরিকার কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই পক্ষই ‘একমত না হতে রাজি’ হয়েছে। তা ছাড়া গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাদের সরকারের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবেনা বলেও জানান তিনি। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হলেও এটি একটি স্বশাসিত অঞ্চল।
তাৎক্ষণিক কোনো সংকট দেখা না দিলেও ন্যাটোর এক মিত্র দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের এমন হস্তক্ষেপ ইউরোপীয় দেশগুলোতে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য বোঝা খুব কঠিন। তিনি কি গ্রিনল্যান্ডবাসীকে ডেনমার্ক থেকে আলাদা করতে চান? দ্বীপটি কিনে নিতে চান? নাকি সামরিক দখলের কথাও ভাবছেন? এই প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে ইউরোপীয় রাজনীতিকরা হিমশিম খাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা মূলত তিনটি কৌশল অবলম্বন করতে পারে। এগুলো হলো- চাপ কমানো, প্রতিরোধ গড়া ও মনোযোগ ঘোরানো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ট্রাম্পের তথাকথিত নিরাপত্তা উদ্বেগ কমানোর বিষয়ে। বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই এসব উদ্বেগের সমাধান সম্ভব বলে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাসমুসেন জানান, আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে একটি ‘উচ্চপর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করা হবে। ন্যাটোর ভেতরে ব্রিটেন ও জার্মানি ‘আর্কটিক সেন্ট্রি’ নামে একটি নৌ নজরদারি মিশনের প্রস্তাব দিয়েছে।
এসব প্রস্তাবের সঙ্গে আবার ট্রাম্পের মনের কথাও কিছুটা বলেছেন তিনি। রাসমুসেন বলেন, “ট্রাম্প যা বলেন, তাতে সব সময় সামান্য হলেও সত্য থাকে।”
কারণ ট্রাম্প বরাবরই ন্যাটো মিত্রদের থেকে শুনতে চান যে উত্তর মেরু অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে তার উদ্বেগ ‘পুরোপুরি ভিত্তিহীন’ নয়।
তবে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিষয়টি তা নয়। ১৯৫১ সালে ডেনমার্কের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির আওতায় আমেরিকা চাইলে গ্রিনল্যান্ডে কার্যত যত খুশি সেনা মোতায়েন করতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের পর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমে যায়। বর্তমানে দ্বীপটির উত্তর-পশ্চিমে একটি ঘাঁটিতে ২০০ জনেরও কম আমেরিকান সেনা রয়েছে, যা মূলত মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কবার্তার রাডারের কাজে ব্যবহৃত হয়। গ্রিনল্যান্ড আবার ন্যাটোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই রয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে আমেরিকার বক্তব্য অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অসলোভিত্তিক ফ্রিডটজফ ন্যানসেন ইনস্টিটিউটের আর্কটিক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ওস্থাগেন বলেন, “গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় ন্যাটো মিশনের বাস্তব কোনো নিরাপত্তাগত প্রয়োজন নেই।”
ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ডের আশপাশের সমুদ্র রুশ ও চীনা জাহাজে ভরে গেছে। অথচ এর পক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। ডেনমার্ক ইতোমধ্যে গ্রিনল্যান্ডে চীনের বিনিয়োগ আগ্রহও অনেকটাই ঠেকাতে পেরেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্কটিক অঞ্চলের প্রকৃত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আসলে অন্য জায়গায়, যেমন আলাস্কায়। আর যে বিরল খনিজ ও খনিজসম্পদের প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ, সেগুলো উত্তোলনের খরচ এত বেশি যে তা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। আমেরিকার কোম্পানিগুলো চাইলে সার্বভৌমত্ব বদল ছাড়াই খনির লাইসেন্স পেতে পারে, কিন্তু বাস্তবে খুব কম প্রতিষ্ঠানই আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে এসব যুক্তি ট্রাম্পকে নড়াতে পারেনি। তিনি যখন বললেন ‘মালিকানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ’, তখন তার কথা মূল্য দিয়েই ভাবতে হচ্ছে ইউরোপকে। এক সাবেক আমেরিকান কূটনীতিকের মতে, গ্রিনল্যান্ড দখল ট্রাম্পের ‘লিগ্যাসি বা ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নিয়ে মোহের’ অংশ।

তাই ইউরোপকে দ্বিতীয় পথটি ভাবতে হচ্ছে। ট্রাম্পের সম্ভাব্য দখলচেষ্টা কীভাবে ঠেকানো যায়।
আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির কিছু অংশ স্থগিত করা বা মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে চাপে রাখার কথা উঠেছে। এছাড়া ইউরোপে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা বা আমেরিকান ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে দেওয়ার মতো কঠোর প্রস্তাবও সামনে এসেছে।
তবে ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের গবেষণা পরিচালক জেরেমি শাপিরো বলছেন, এসব প্রস্তাবে ঐকমত্য পাওয়া কঠিন, আর এগুলো মূলত প্রতিশোধমূলক, প্রতিরোধমূলক নয়। পরিবর্তে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
যেমন- গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সেনাদের চক্রাকার উপস্থিতি গড়ে তোলা, স্থানীয়দের সম্মতি ছাড়া কোনো আমেরিকান কোম্পানি যদি খনিজ আহরণ করে, তার বিরুদ্ধে আগাম নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা এবং ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকানদের লবিং করা।
ওয়াশিংটনের বৈঠক শুরুর দিনই ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডে নৌ, বিমান ও স্থল বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইডেনসহ মিত্র দেশগুলো সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ইউরোপ কি আরও দূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত?
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো এই বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছেন। ১৪ জানুয়ারি তিনি তার মন্ত্রিসভাকে বলেন, ট্রাম্প ‘চরম পরিণতি’ ডেকে এনেছেন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন আগে সতর্ক থাকার পক্ষে থাকলেও এখন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডে হামলা হলে ন্যাটো ভেঙে পড়বে।
জার্মানির সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর রবার্ট হাবেক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে পদক্ষেপ নিলে রাশিয়া নর্ডিক দেশগুলোতে আরও আগ্রাসী হতে পারে। তার ভাষ্য, “সব বিকল্পই টেবিলে রাখতে হবে।”

অন্যদিকে, অনেকে মনে করেন অতিরিক্ত চাপ ট্রাম্পকে আরও আগ্রাসী করে তুলতে পারে। ইউক্রেনও বড় উদ্বেগের জায়গা। হোয়াইট হাউসকে ক্ষেপালে ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই আপাতত বেশির ভাগ ইউরোপীয় রাজনীতিক চাপ বাড়াতে অনিচ্ছুক।
জার্মানির ক্ষমতাসীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটদের পররাষ্ট্রনীতি মুখপাত্র ইয়ুর্গেন হার্ড বলেন, “ডেনমার্কের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ড রেখেই বিদ্যমান চুক্তির মধ্যে সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমি নিশ্চিত, এই যুক্তিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝানো সম্ভব।”
যদি তা না হয়, শেষ ভরসা হলো, ট্রাম্প হয়তো অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ হারাবেন। গ্রিনল্যান্ডকে ধীরে ধীরে দখলের কৌশল, যেমন স্বাধীনতার দাবিকে উসকে দিয়ে পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বা সংযুক্তির জন্য দীর্ঘ পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা দরকার, যা ট্রাম্পের শক্তির জায়গা নয়। সামরিক দখল তুলনামূলক সহজ হলেও তা সেনাবাহিনী, সরকার ও কংগ্রেসের ভেতরে আনুগত্যের বড় পরীক্ষা নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৪ শতাংশ ভোটার গ্রিনল্যান্ড দখলে বলপ্রয়োগ সমর্থন করেন।
চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন, ইরানসহ নানা সংকটের কারণে ট্রাম্পের সামনে কাজের অভাব নেই। ভেনেজুয়েলার ‘সাফল্যের’ উচ্ছ্বাস কাটলে তিনি হয়তো অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। ইউরোপের আশা, গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা হয়তো কেবল ডেনমার্ককে নিরাপত্তা বা খনিজ নিয়ে কোনো সমঝোতায় চাপ দেওয়ার কৌশল। আপাতত, এই আশাতেই তারা ভরসা রাখছে।