অ্যালেক্স ভাটানকা

প্রায় চার দশক ধরে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থিরতার মূর্ত প্রতীক ছিলেন। যুদ্ধ-শান্তি, দমন-পীড়ন, সংস্কার, অর্থনীতি এবং আদর্শের সব বড় সিদ্ধান্ত তিনি একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে নিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার কমান্ড কম্পাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় তার মৃত্যু সেই স্থিরতাকে সবচেয়ে সহিংস উপায়ে তুমুল অস্থিরতায় পরিণত করেছে।
এখানে বিশেষভাবে যা দৃষ্টিগোচর হয় তা হলো, দম্ভ বা অতি-অহমিকা। দেশটির শাসকগোষ্ঠী জানত যে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের যোগাযোগ মাধ্যম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ৪৭ বছরের ইতিহাসে যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গভীরে অনুপ্রবেশ করেছে। খামেনি নিজে প্রকাশ্যে নিরাপত্তা ও সশস্ত্র বাহিনী-যার মধ্যে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অন্তর্ভুক্ত-সেখানে গভীর অনুপ্রবেশ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
তা সত্ত্বেও আলি খামেনি তার যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা অর্থাৎ ডিফেন্স কাউন্সিলের বৈঠকটি ডাকলেন যে জায়গায়, তা সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়। সেই কম্পাউন্ডে থাকা ব্যক্তিদের তালিকার দিকে তাকালে মনে হয়, যেন এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দমনমূলক ব্যবস্থার কর্তাব্যক্তিদের একটি তালিকা, যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ, আইআরজিসি’র প্রধান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিবসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চরম উত্তেজনার সময়ে খামেনি নিজেকে এবং দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আড়াল সরিয়ে ফেলেছিলেন, যখন পেন্টাগন গত কয়েক দশকের মধ্যে ওই অঞ্চলে তাদের বৃহত্তম সামরিক শক্তি সমাবেশ করেছিল। এটি ইরানি শাসনের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করার মতো একটি হামলার শিকারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
বিপরীতে, এমনও হতে পারে যে, খামেনি নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে অসতর্ক ছিলেন, কারণ হয়তো তিনি তার আদর্শের জন্য শহীদ হতে প্রস্তুত ছিলেন। সম্ভবত তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে, এর বিকল্প হলো একটি অপমানজনক পশ্চাদপসরণ মেনে নেওয়া। ১৯৮৮ সালের পর তিনি দেশটিকে সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাতের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন-যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে একটি সরাসরি লড়াইয়ের সূচনা করেছে। তিনি অসহায়ভাবে দেখছিলেন কীভাবে ইরানের প্রতিরোধের প্রধান শক্তিগুলো ধারাবাহিকভাবে ক্ষয় হচ্ছে। বিপর্যয় ডেকে আনা নেতা হিসেবে আলোচনায় বসার চেয়ে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে মৃত্যুবরণ করা তার আদর্শিক অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণও বটে। শাহাদাত বরণ তাকে জবাবদিহিতা থেকে বাঁচার পথ করে দিয়েছে এবং ব্যর্থতা স্বীকার না করেই উত্তরাধিকার হস্তান্তরের সুযোগও তৈরি করেছে। তার সহকারীরা দীর্ঘকাল ধরে ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগের প্রতি তার গভীর অনুরাগের কথা এবং তার সেই বারবার বলা জেদের কথা স্মরণ করেন যে, প্রকৃত নেতৃত্ব আপস নয়, বরং মৃত্যুর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়।
গুলির মুখে উত্তরণ
সচেতন বা অবচেতনভাবে আলি খামেনির চিন্তা-চেতনায় যাই থাকুক না কেন, তার মৃত্যু এই ব্যবস্থাকে যুদ্ধের পরিস্থিতির মধ্যে একটি জরুরি উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমন এক পরিস্থিতি যার নজির ইরানের ইতিহাসে নেই। ইরান এখন আর কোনো সর্বোচ্চ নেতা দ্বারা শাসিত হচ্ছে না, বরং তিন সদস্যের একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ’ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এটি এমন একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ, যা দীর্ঘমেয়াদী নির্দেশনার চেয়ে বরং সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পরিষদ আত্মপ্রকাশ করে, যার গঠন ইরানের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ মতে বাধ্যতামূলক। এতে আছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি এজেই এবং আলেম ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফকিহ আলিরেজা আরাফি। কাগজে-কলমে, তারা সম্মিলিতভাবে সেই সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী, যা একসময় খামেনির একচেটিয়া কর্তৃত্বে ছিল। এর মধ্যে আছে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রীয় নীতির তদারকি, রেডিও ও টেলিভিশনের নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ, শান্তি ও সংহতি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
এই পরিষদের প্রত্যেক সদস্যই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের খণ্ডিত রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিন্ন ভিন্ন ধারার প্রতিনিধি। ২০২৪ সালে বাস্তববাদিতা এবং পশ্চিমের প্রতি সীমিত উন্মুক্ততার হিসাবে নির্বাচিত পেজেশকিয়ান এখন এমন এক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ভূমিকায় আসতে বাধ্য হয়েছেন, যেখানে কূটনৈতিক কৌশলের সুযোগ খুবই কম। এজেই প্রতিনিধিত্ব করছেন কট্টরপন্থী বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার, যা দীর্ঘকাল ধরে আইআরজিসির সাথে জোটবদ্ধ এবং খামেনির আদর্শিক প্রকল্প অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আরাফি, যিনি একাধারে একজন আলেম এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তিনি সেই নেটওয়ার্কগুলোর সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত যা গত কয়েক দশক ধরে এই শাসনের তাত্ত্বিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। তিনি খামেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন অনুসারীও বটে, যিনি বছরের পর বছর ধরে তার ক্যারিয়ারের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং বারবার পদোন্নতি দিয়েছেন। এই তিন ব্যক্তি একে অপরকে বেছে নেননি, এবং তাদের কাউকেই সুনির্দিষ্টভাবে সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকারী হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তাদের ঐক্য রাজনৈতিক সমন্বয়ের ফল নয়, বরং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ফল।
এই পরিষদকে অবিলম্বে তাদের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বাবলী নিতে হচ্ছে। এগুলো হলো- অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখা এবং একই সাথে ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ কর্তৃক নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া, যাদের কাজ হলো ইরানের পরবর্তী শীর্ষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নির্বাচন করা। এই প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়া উচিত। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো প্রশ্ন উঠছে যে, আলেমদের এই বয়োজ্যেষ্ঠ পরিষদ যুদ্ধের সময় সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সশরীরে সমবেত হতে পারবে কি না। কারণ, যাতায়াতের পথ রুদ্ধ, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা অনিশ্চিত এবং বিদেশি গোয়েন্দাদের নাশকতা ইরানের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কগুলোতে বারবার আঘাত করেছে ও করছে।
যদি ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বৈঠক করতে না পারে, তবে সংবিধান যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে তার চেয়ে বেশি সময় অন্তর্বর্তী পরিষদ ক্ষমতায় থাকতে পারে। এই সম্ভাবনা উদ্বেগের। রূপান্তরের জন্য কোনো স্পষ্ট সময়সীমা ছাড়াই একটি অস্থায়ী পরিষদ সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। তবুও নেতৃত্বের শূন্যতা খামেনির দপ্তরের গণ্ডির অনেক বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত। তাকে যে মার্কিন–ইসরায়েলি অভিযান হত্যা করেছে, তা ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের বড় অংশকেও নির্মূল করেছে। সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদোলরহিম মুসাভি নিহত হয়েছেন। আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ ও ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানিও নিহত হয়েছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ চেইন অব কমান্ড ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

স্বাভাবিক সময়ে, এই ব্যক্তিরাই উত্তরাধিকার প্রশ্নে বিভিন্ন উপদলের দরকষাকষিতে মূল ভূমিকা রাখতেন। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কোন প্রার্থীদের গ্রহণ করবে বা বাদ দেবে-সেই সংকেত দেওয়ার মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক অচলাবস্থা রোধ করে একটি ঐক্যমতে পৌঁছাতেন। তাদের এই আকস্মিক বিদায় ইরানকে এমন এক অবস্থায় ফেলে রেখে গেছে, যখন তাদের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি ছিল।
এই ধাক্কা রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ব্যাংক ও সরবরাহ ব্যবস্থা জরুরি প্রটোকলের অধীনে খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরগুলো বন্ধ বা সীমিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশে ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এই সংঘাতের ফলে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছিল, যা মিনাবে একটি মেয়েদের স্কুলে বোমা হামলার ফলে আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করে হত্যার গুজব প্রতি ঘণ্টায় ছড়িয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে, অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদের প্রধান কাজ কেবল শাসন নয়, বরং শাসনব্যবস্থা যে এখনো বিদ্যমান রয়েছে তা প্রতিষ্ঠা করা। সাবেক প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে আইআরজিসি কমান্ডার পর্যন্ত প্রতিটি সরকারি বিবৃতিতে একই বার্তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তা হলো- ক্ষমতায় শূন্যতা নেই, সরকার ব্যবস্থা কার্যকর ও চেইন অব কমান্ড অক্ষুণ্ন আছে। একটি পরিকল্পনার অস্তিত্ব যে আছে, সেটিও বারবার বলে আশ্বস্ত করতে হচ্ছে।
বাড়তে থাকা ভয়
কিন্তু সরকারি বাগাড়ম্বরের আড়ালে একটি গভীর ভয় লুকিয়ে আছে যে, সাধারণ মানুষ হয়ত এসব কথা বিশ্বাস করবে না এবং বিক্ষোভ দানা বেঁধে এক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এরই মধ্যে কিছু শহরে আনন্দমিছিল করা জনতার সাথে মিলিশিয়ার সংঘর্ষ হয়েছে, অন্যদিকে অনুগত গোষ্ঠীগুলো খামেনির মৃত্যুতে যারা আনন্দ প্রকাশ করেছে, তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এই শাসকগোষ্ঠী রাজপথকে কেবল একটি রাজনৈতিক স্থান হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধের ময়দান হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই আতঙ্কই পরিষদের পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। আপাতত, ইরান পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাবে। অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত এবং ড্রোন ও মিসাইল হামলার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্য হলো টিকে থাকার সক্ষমতা দেখানো।
ইরান বিশ্বাস করে যে, শত্রুপক্ষকে ক্রমাগত ক্ষতির মুখে ফেলতে পারলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের অভিযানের গতি বা পরিধি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। তবে এতে সমস্যাও আছে।
এদিকে তুলনামূলক কম দৃশ্যমান হলেও রাজনৈতিক পথটি সমানভাবে সক্রিয় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তেহরান ইতিমধ্যেই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহ প্রকাশ করতে বা অন্তত উত্তেজনা হ্রাসের একটি পথ তৈরিতে যোগাযোগ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, ইরানি দূতরা একটি ‘চুক্তির’ সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন, যদিও এর রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট। অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব একসাথে তিনটি লড়াই করছে। সেগুলো হলো-যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এবং অভ্যন্তরীণ গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে। যে কোনো শাসনব্যবস্থার নেতৃত্ব, তারা যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন, অনির্দিষ্টকাল ধরে এই তিনটি ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না।
তবুও, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনশীল বিষয়টি তেহরানের নিয়ন্ত্রণের অনেক বাইরে। তা হলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা। ট্রাম্প যদি সিদ্ধান্ত নেন যে, এই যুদ্ধটি শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে, তবে ইরানের সংহতি বজায় রাখার সক্ষমতা গভীরভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে প্রতিদিনের সুনির্দিষ্ট হামলাগুলো ইতিমধ্যেই কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেমকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। অভিজ্ঞ কমান্ডারদের ক্রমাগত হারানোর ফলে কৌশলগত ভুলের আশঙ্কা বাড়ছেই কেবল। ফলে, কোনো এক পর্যায়ে প্রশ্নটি আর শাসনব্যবস্থা আদৌ শাসন করতে পারে কি না তা নিয়ে হবে না। বরং হয়ে দাঁড়াবে—অব্যাহত ক্ষয়ক্ষতির মুখে এটি সুসংহত প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকতে পারবে কি না?
যদি এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে একইভাবে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হলো—এর পরে কী হবে? ইরান কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তরসূরি থাকা কেন্দ্রীয় একনায়কতন্ত্র নয়, আবার এটি এমন কোনো ভঙ্গুর রাষ্ট্রও নয় যা খুব সহজে ভেঙে পড়বে। এর রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি বহুস্তরীয়। এসব স্তরের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আইআরজিসি, আমলাতন্ত্র, প্রাদেশিক নেটওয়ার্ক, আদর্শিক মিলিশিয়া এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিদ্বন্দ্বী অভিজাত গোষ্ঠী। হঠাৎ কোনো অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণ এমন সব কেন্দ্রবিমুখ শক্তিকে মুক্ত করে দিতে পারে যেগুলোকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র দীর্ঘকাল ধরে ঠেকিয়ে রাখার দাবি করে আসছে। যেমন- জাতিগত উত্তেজনা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অভিজাতদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইত্যাদি।
আপাতত, রাষ্ট্র জোর দিয়ে বলছে যে, এই ধরনের কিছুই ঘটবে না। কিন্তু তাদের আচরণ ভিন্ন এক বাস্তবতা প্রকাশ করে দিচ্ছে—গ্রেপ্তার, ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ এবং শাসকগোষ্ঠীর ভাষায় সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সতর্কতা, বিচ্ছিন্নতাবাদের নিন্দা এবং সরকারি বক্তৃতায় আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর নিরন্তর গুরুত্বারোপ। এসব সংশ্লিষ্ট বক্তব্যই অনেক কিছু প্রকাশ করছে। ইরানের পদস্থ ব্যক্তিরা কেবল বিদেশি শত্রুদেরই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ভাঙনকেও ভয় পাচ্ছে।
যদি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস শিগগিরই অধিবেশনে বসতে পারে এবং একজন উত্তরসূরির ঘোষণা দিতে পারে, তবে নতুন নেতা দুর্বল, বিতর্কিত বা প্রতীকী হলেও প্রয়োজনীয় শাসনতন্ত্রের হয়তো একটি কাঠামোগত অবয়ব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। যদি পরিষদ বৈঠক করতে না পারে, তবে অন্তর্বর্তী পরিষদ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যত নেতৃত্বে পরিণত হবে। আর যদি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ে, তবে পরিষদটি পুরো রাষ্ট্রকেই অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিতে পারে।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্র সবসময় তার সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকারকে একটি সূক্ষ্ম আচার হিসেবে বিবেচনা করেছে। এটি এর আগে মাত্র একবার ঘটেছিল, ১৯৮৯ সালে। তখন রুহুল্লাহ খোমেনি মারা যান এবং আলি খামেনির নিয়োগ নিশ্চিত হয়। আজ এটি একটি জরুরি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। খামেনির মৃত্যু কেবল একটি যুগের অবসান ঘটায়নি, বরং এটি এই শাসনব্যবস্থাকে এমন কিছু চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে যেগুলোর মুখোমুখি তাদের আগে কখনো একসাথে হতে হয়নি। কারণ খামেনির রেখে যাওয়া শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে প্রকাশ্য যুদ্ধের পাশাপাশি ব্যাপক জনঅসন্তোষ নিয়েও চিন্তায় আছে। আবার তার সাথে আছে যোগ্য নেতৃত্বের শূন্যস্থানও।
ইরানের এই শাসনব্যবস্থা অক্ষত অবস্থায় টিকে থাকবে, নিজেকে রূপান্তরিত করবে, নাকি ভাঙতে শুরু করবে—তা যেমন আগামী দিনে দেশটির বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে, তেমনি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপরও। বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো, তেহরানের নেতাদের এমন একটি সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হচ্ছে, যা তারা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষা করে এসেছে বা এড়িয়ে গেছে। তা হলো একটি সর্বাত্মক অনিশ্চয়তার শঙ্কা। এই অনিশ্চয়তা খামেনির পর কে ক্ষমতায় আসবে, শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর বিষয়ক নয়। বরং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র আদৌ টিকে থাকবে কি না, সেই শঙ্কার আগুনেও ঘি ঢালে দেদারসে।
(১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। যা রাজনৈতিক নেতা এবং নীতিনির্ধারকদের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ দেয়।)
লেখক : মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো।

প্রায় চার দশক ধরে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থিরতার মূর্ত প্রতীক ছিলেন। যুদ্ধ-শান্তি, দমন-পীড়ন, সংস্কার, অর্থনীতি এবং আদর্শের সব বড় সিদ্ধান্ত তিনি একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে নিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার কমান্ড কম্পাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় তার মৃত্যু সেই স্থিরতাকে সবচেয়ে সহিংস উপায়ে তুমুল অস্থিরতায় পরিণত করেছে।
এখানে বিশেষভাবে যা দৃষ্টিগোচর হয় তা হলো, দম্ভ বা অতি-অহমিকা। দেশটির শাসকগোষ্ঠী জানত যে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের যোগাযোগ মাধ্যম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ৪৭ বছরের ইতিহাসে যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গভীরে অনুপ্রবেশ করেছে। খামেনি নিজে প্রকাশ্যে নিরাপত্তা ও সশস্ত্র বাহিনী-যার মধ্যে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অন্তর্ভুক্ত-সেখানে গভীর অনুপ্রবেশ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
তা সত্ত্বেও আলি খামেনি তার যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা অর্থাৎ ডিফেন্স কাউন্সিলের বৈঠকটি ডাকলেন যে জায়গায়, তা সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়। সেই কম্পাউন্ডে থাকা ব্যক্তিদের তালিকার দিকে তাকালে মনে হয়, যেন এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দমনমূলক ব্যবস্থার কর্তাব্যক্তিদের একটি তালিকা, যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ, আইআরজিসি’র প্রধান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিবসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চরম উত্তেজনার সময়ে খামেনি নিজেকে এবং দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আড়াল সরিয়ে ফেলেছিলেন, যখন পেন্টাগন গত কয়েক দশকের মধ্যে ওই অঞ্চলে তাদের বৃহত্তম সামরিক শক্তি সমাবেশ করেছিল। এটি ইরানি শাসনের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করার মতো একটি হামলার শিকারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
বিপরীতে, এমনও হতে পারে যে, খামেনি নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে অসতর্ক ছিলেন, কারণ হয়তো তিনি তার আদর্শের জন্য শহীদ হতে প্রস্তুত ছিলেন। সম্ভবত তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে, এর বিকল্প হলো একটি অপমানজনক পশ্চাদপসরণ মেনে নেওয়া। ১৯৮৮ সালের পর তিনি দেশটিকে সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাতের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন-যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে একটি সরাসরি লড়াইয়ের সূচনা করেছে। তিনি অসহায়ভাবে দেখছিলেন কীভাবে ইরানের প্রতিরোধের প্রধান শক্তিগুলো ধারাবাহিকভাবে ক্ষয় হচ্ছে। বিপর্যয় ডেকে আনা নেতা হিসেবে আলোচনায় বসার চেয়ে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে মৃত্যুবরণ করা তার আদর্শিক অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণও বটে। শাহাদাত বরণ তাকে জবাবদিহিতা থেকে বাঁচার পথ করে দিয়েছে এবং ব্যর্থতা স্বীকার না করেই উত্তরাধিকার হস্তান্তরের সুযোগও তৈরি করেছে। তার সহকারীরা দীর্ঘকাল ধরে ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগের প্রতি তার গভীর অনুরাগের কথা এবং তার সেই বারবার বলা জেদের কথা স্মরণ করেন যে, প্রকৃত নেতৃত্ব আপস নয়, বরং মৃত্যুর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়।
গুলির মুখে উত্তরণ
সচেতন বা অবচেতনভাবে আলি খামেনির চিন্তা-চেতনায় যাই থাকুক না কেন, তার মৃত্যু এই ব্যবস্থাকে যুদ্ধের পরিস্থিতির মধ্যে একটি জরুরি উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমন এক পরিস্থিতি যার নজির ইরানের ইতিহাসে নেই। ইরান এখন আর কোনো সর্বোচ্চ নেতা দ্বারা শাসিত হচ্ছে না, বরং তিন সদস্যের একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ’ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এটি এমন একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ, যা দীর্ঘমেয়াদী নির্দেশনার চেয়ে বরং সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পরিষদ আত্মপ্রকাশ করে, যার গঠন ইরানের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ মতে বাধ্যতামূলক। এতে আছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি এজেই এবং আলেম ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ফকিহ আলিরেজা আরাফি। কাগজে-কলমে, তারা সম্মিলিতভাবে সেই সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী, যা একসময় খামেনির একচেটিয়া কর্তৃত্বে ছিল। এর মধ্যে আছে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রীয় নীতির তদারকি, রেডিও ও টেলিভিশনের নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ, শান্তি ও সংহতি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
এই পরিষদের প্রত্যেক সদস্যই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের খণ্ডিত রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিন্ন ভিন্ন ধারার প্রতিনিধি। ২০২৪ সালে বাস্তববাদিতা এবং পশ্চিমের প্রতি সীমিত উন্মুক্ততার হিসাবে নির্বাচিত পেজেশকিয়ান এখন এমন এক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ভূমিকায় আসতে বাধ্য হয়েছেন, যেখানে কূটনৈতিক কৌশলের সুযোগ খুবই কম। এজেই প্রতিনিধিত্ব করছেন কট্টরপন্থী বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার, যা দীর্ঘকাল ধরে আইআরজিসির সাথে জোটবদ্ধ এবং খামেনির আদর্শিক প্রকল্প অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আরাফি, যিনি একাধারে একজন আলেম এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তিনি সেই নেটওয়ার্কগুলোর সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত যা গত কয়েক দশক ধরে এই শাসনের তাত্ত্বিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। তিনি খামেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন অনুসারীও বটে, যিনি বছরের পর বছর ধরে তার ক্যারিয়ারের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং বারবার পদোন্নতি দিয়েছেন। এই তিন ব্যক্তি একে অপরকে বেছে নেননি, এবং তাদের কাউকেই সুনির্দিষ্টভাবে সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকারী হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তাদের ঐক্য রাজনৈতিক সমন্বয়ের ফল নয়, বরং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ফল।
এই পরিষদকে অবিলম্বে তাদের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বাবলী নিতে হচ্ছে। এগুলো হলো- অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখা এবং একই সাথে ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ কর্তৃক নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া, যাদের কাজ হলো ইরানের পরবর্তী শীর্ষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নির্বাচন করা। এই প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়া উচিত। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো প্রশ্ন উঠছে যে, আলেমদের এই বয়োজ্যেষ্ঠ পরিষদ যুদ্ধের সময় সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সশরীরে সমবেত হতে পারবে কি না। কারণ, যাতায়াতের পথ রুদ্ধ, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা অনিশ্চিত এবং বিদেশি গোয়েন্দাদের নাশকতা ইরানের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কগুলোতে বারবার আঘাত করেছে ও করছে।
যদি ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বৈঠক করতে না পারে, তবে সংবিধান যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে তার চেয়ে বেশি সময় অন্তর্বর্তী পরিষদ ক্ষমতায় থাকতে পারে। এই সম্ভাবনা উদ্বেগের। রূপান্তরের জন্য কোনো স্পষ্ট সময়সীমা ছাড়াই একটি অস্থায়ী পরিষদ সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। তবুও নেতৃত্বের শূন্যতা খামেনির দপ্তরের গণ্ডির অনেক বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত। তাকে যে মার্কিন–ইসরায়েলি অভিযান হত্যা করেছে, তা ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের বড় অংশকেও নির্মূল করেছে। সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদোলরহিম মুসাভি নিহত হয়েছেন। আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ ও ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানিও নিহত হয়েছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ চেইন অব কমান্ড ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

স্বাভাবিক সময়ে, এই ব্যক্তিরাই উত্তরাধিকার প্রশ্নে বিভিন্ন উপদলের দরকষাকষিতে মূল ভূমিকা রাখতেন। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কোন প্রার্থীদের গ্রহণ করবে বা বাদ দেবে-সেই সংকেত দেওয়ার মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক অচলাবস্থা রোধ করে একটি ঐক্যমতে পৌঁছাতেন। তাদের এই আকস্মিক বিদায় ইরানকে এমন এক অবস্থায় ফেলে রেখে গেছে, যখন তাদের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি ছিল।
এই ধাক্কা রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ব্যাংক ও সরবরাহ ব্যবস্থা জরুরি প্রটোকলের অধীনে খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরগুলো বন্ধ বা সীমিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশে ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এই সংঘাতের ফলে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছিল, যা মিনাবে একটি মেয়েদের স্কুলে বোমা হামলার ফলে আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করে হত্যার গুজব প্রতি ঘণ্টায় ছড়িয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে, অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদের প্রধান কাজ কেবল শাসন নয়, বরং শাসনব্যবস্থা যে এখনো বিদ্যমান রয়েছে তা প্রতিষ্ঠা করা। সাবেক প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে আইআরজিসি কমান্ডার পর্যন্ত প্রতিটি সরকারি বিবৃতিতে একই বার্তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তা হলো- ক্ষমতায় শূন্যতা নেই, সরকার ব্যবস্থা কার্যকর ও চেইন অব কমান্ড অক্ষুণ্ন আছে। একটি পরিকল্পনার অস্তিত্ব যে আছে, সেটিও বারবার বলে আশ্বস্ত করতে হচ্ছে।
বাড়তে থাকা ভয়
কিন্তু সরকারি বাগাড়ম্বরের আড়ালে একটি গভীর ভয় লুকিয়ে আছে যে, সাধারণ মানুষ হয়ত এসব কথা বিশ্বাস করবে না এবং বিক্ষোভ দানা বেঁধে এক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এরই মধ্যে কিছু শহরে আনন্দমিছিল করা জনতার সাথে মিলিশিয়ার সংঘর্ষ হয়েছে, অন্যদিকে অনুগত গোষ্ঠীগুলো খামেনির মৃত্যুতে যারা আনন্দ প্রকাশ করেছে, তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এই শাসকগোষ্ঠী রাজপথকে কেবল একটি রাজনৈতিক স্থান হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধের ময়দান হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই আতঙ্কই পরিষদের পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। আপাতত, ইরান পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাবে। অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত এবং ড্রোন ও মিসাইল হামলার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্য হলো টিকে থাকার সক্ষমতা দেখানো।
ইরান বিশ্বাস করে যে, শত্রুপক্ষকে ক্রমাগত ক্ষতির মুখে ফেলতে পারলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের অভিযানের গতি বা পরিধি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। তবে এতে সমস্যাও আছে।
এদিকে তুলনামূলক কম দৃশ্যমান হলেও রাজনৈতিক পথটি সমানভাবে সক্রিয় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তেহরান ইতিমধ্যেই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহ প্রকাশ করতে বা অন্তত উত্তেজনা হ্রাসের একটি পথ তৈরিতে যোগাযোগ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, ইরানি দূতরা একটি ‘চুক্তির’ সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন, যদিও এর রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট। অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব একসাথে তিনটি লড়াই করছে। সেগুলো হলো-যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এবং অভ্যন্তরীণ গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে। যে কোনো শাসনব্যবস্থার নেতৃত্ব, তারা যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন, অনির্দিষ্টকাল ধরে এই তিনটি ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না।
তবুও, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনশীল বিষয়টি তেহরানের নিয়ন্ত্রণের অনেক বাইরে। তা হলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা। ট্রাম্প যদি সিদ্ধান্ত নেন যে, এই যুদ্ধটি শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে, তবে ইরানের সংহতি বজায় রাখার সক্ষমতা গভীরভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে প্রতিদিনের সুনির্দিষ্ট হামলাগুলো ইতিমধ্যেই কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেমকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। অভিজ্ঞ কমান্ডারদের ক্রমাগত হারানোর ফলে কৌশলগত ভুলের আশঙ্কা বাড়ছেই কেবল। ফলে, কোনো এক পর্যায়ে প্রশ্নটি আর শাসনব্যবস্থা আদৌ শাসন করতে পারে কি না তা নিয়ে হবে না। বরং হয়ে দাঁড়াবে—অব্যাহত ক্ষয়ক্ষতির মুখে এটি সুসংহত প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকতে পারবে কি না?
যদি এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে একইভাবে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হলো—এর পরে কী হবে? ইরান কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তরসূরি থাকা কেন্দ্রীয় একনায়কতন্ত্র নয়, আবার এটি এমন কোনো ভঙ্গুর রাষ্ট্রও নয় যা খুব সহজে ভেঙে পড়বে। এর রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি বহুস্তরীয়। এসব স্তরের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আইআরজিসি, আমলাতন্ত্র, প্রাদেশিক নেটওয়ার্ক, আদর্শিক মিলিশিয়া এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিদ্বন্দ্বী অভিজাত গোষ্ঠী। হঠাৎ কোনো অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণ এমন সব কেন্দ্রবিমুখ শক্তিকে মুক্ত করে দিতে পারে যেগুলোকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র দীর্ঘকাল ধরে ঠেকিয়ে রাখার দাবি করে আসছে। যেমন- জাতিগত উত্তেজনা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অভিজাতদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইত্যাদি।
আপাতত, রাষ্ট্র জোর দিয়ে বলছে যে, এই ধরনের কিছুই ঘটবে না। কিন্তু তাদের আচরণ ভিন্ন এক বাস্তবতা প্রকাশ করে দিচ্ছে—গ্রেপ্তার, ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ এবং শাসকগোষ্ঠীর ভাষায় সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সতর্কতা, বিচ্ছিন্নতাবাদের নিন্দা এবং সরকারি বক্তৃতায় আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর নিরন্তর গুরুত্বারোপ। এসব সংশ্লিষ্ট বক্তব্যই অনেক কিছু প্রকাশ করছে। ইরানের পদস্থ ব্যক্তিরা কেবল বিদেশি শত্রুদেরই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ভাঙনকেও ভয় পাচ্ছে।
যদি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস শিগগিরই অধিবেশনে বসতে পারে এবং একজন উত্তরসূরির ঘোষণা দিতে পারে, তবে নতুন নেতা দুর্বল, বিতর্কিত বা প্রতীকী হলেও প্রয়োজনীয় শাসনতন্ত্রের হয়তো একটি কাঠামোগত অবয়ব পুনরুদ্ধার করতে পারবে। যদি পরিষদ বৈঠক করতে না পারে, তবে অন্তর্বর্তী পরিষদ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যত নেতৃত্বে পরিণত হবে। আর যদি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ে, তবে পরিষদটি পুরো রাষ্ট্রকেই অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিতে পারে।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্র সবসময় তার সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকারকে একটি সূক্ষ্ম আচার হিসেবে বিবেচনা করেছে। এটি এর আগে মাত্র একবার ঘটেছিল, ১৯৮৯ সালে। তখন রুহুল্লাহ খোমেনি মারা যান এবং আলি খামেনির নিয়োগ নিশ্চিত হয়। আজ এটি একটি জরুরি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। খামেনির মৃত্যু কেবল একটি যুগের অবসান ঘটায়নি, বরং এটি এই শাসনব্যবস্থাকে এমন কিছু চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে যেগুলোর মুখোমুখি তাদের আগে কখনো একসাথে হতে হয়নি। কারণ খামেনির রেখে যাওয়া শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে প্রকাশ্য যুদ্ধের পাশাপাশি ব্যাপক জনঅসন্তোষ নিয়েও চিন্তায় আছে। আবার তার সাথে আছে যোগ্য নেতৃত্বের শূন্যস্থানও।
ইরানের এই শাসনব্যবস্থা অক্ষত অবস্থায় টিকে থাকবে, নিজেকে রূপান্তরিত করবে, নাকি ভাঙতে শুরু করবে—তা যেমন আগামী দিনে দেশটির বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে, তেমনি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপরও। বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো, তেহরানের নেতাদের এমন একটি সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হচ্ছে, যা তারা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষা করে এসেছে বা এড়িয়ে গেছে। তা হলো একটি সর্বাত্মক অনিশ্চয়তার শঙ্কা। এই অনিশ্চয়তা খামেনির পর কে ক্ষমতায় আসবে, শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর বিষয়ক নয়। বরং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র আদৌ টিকে থাকবে কি না, সেই শঙ্কার আগুনেও ঘি ঢালে দেদারসে।
(১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। যা রাজনৈতিক নেতা এবং নীতিনির্ধারকদের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ দেয়।)
লেখক : মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো।