Advertisement Banner

ট্রাম্পের জন্য ফাঁদ পাতছে তেহরান

রবি আগরওয়াল
রবি আগরওয়াল
ট্রাম্পের জন্য ফাঁদ পাতছে তেহরান
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো– গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়া ইরানি সামরিক বাহিনী এখনো কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে কার্যত জিম্মি করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে তেহরানের নতুন নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে– যাতে তারা হয় যুদ্ধ আরও বাড়ায়, নয়তো তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। কিন্তু ইরানের জন্য খরচ ও ক্ষতি বাড়তে থাকলে, তারা আর কতদিন এই পথে এগিয়ে যেতে পারবে? বর্তমানে ইরানের নেতৃত্বে কারা আছেন, এবং তারা এই সংঘাতের সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়ে কী ভাবছেন?

ফরেন পলিসি লাইভ-এর সর্বশেষ পর্বে আমি এই প্রশ্নগুলো রেখেছিলাম আলি ভায়েজের কাছে। আলি ভায়েজ হলেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক এবং ইরানের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে তার।

রবি আগরওয়াল: বর্তমানে ইরানকে আসলে কে পরিচালনা করছে?

আলি ভায়েজ: ইরান এখনো ইসলামিক রিপাবলিক–তবে নতুন মুখ নিয়ে। ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পরিবর্তে এখন ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি এবং অন্যান্য ক্ষমতাকেন্দ্র সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট স্পিকার আগের মতোই আছেন, তবে যারা নিহত হয়েছেন তাদের জায়গায় নতুন কর্মকর্তারা এসেছেন। একটি বড় ভুল ধারণা হলো– শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়বে। বাস্তবে ইরান একটি বহুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে একজন ব্যক্তি না থাকলেও অন্যরা সেই জায়গা পূরণ করতে পারে।

রবি আগরওয়াল: এখন সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি কে?

আলি ভায়েজ: বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ, যিনি আগে রেভল্যুশনারি গার্ডের বিমানবাহিনী শাখার কমান্ডার ছিলেন। তবে তিনি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ইরানে একাধিক ক্ষমতাকেন্দ্র রয়েছে, যা একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা অনুযায়ী কোনো একক ‘ডিলমেকার’ এখানে তৈরি করা কঠিন।

রবি আগরওয়াল: নতুন নেতৃত্ব কি আগের চেয়ে বেশি কঠোর?

আলি ভায়েজ: শুধু কঠোরই নয়, তারা আগের তুলনায় কম ঝুঁকিবিমুখ। আগের নেতৃত্ব, বিশেষ করে আলী খামেনির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল–তিনি অতিরিক্ত সতর্ক ছিলেন। নতুন নেতৃত্ব সেই অভিজ্ঞতা থেকে উল্টো শিক্ষা নিয়েছে। তারা বেশি আক্রমণাত্মক এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। এজন্য তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতেও হামলা চালিয়েছে এবং শুরু থেকেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে।

রবি আগরওয়াল: যুদ্ধের মধ্যে ইরানের কমান্ড ও যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

আলি ভায়েজ: কোনো বড় ধরনের ভাঙনের লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং ইরান আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। তারা ‘মোজাইক’ পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যেখানে ৩১টি প্রদেশে কমান্ড বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও প্রতিটি অঞ্চল নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের পাল্টা হামলার ধরন দেখলেই বোঝা যায়– একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় এখনো বজায় আছে।

রবি আগরওয়াল: তারা কীভাবে যোগাযোগ রাখছে?

আলি ভায়েজ: শীর্ষ পর্যায়ে ডিজিটাল যোগাযোগ এড়িয়ে চলা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, বার্তা আদান-প্রদানে দূত বা কুরিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ তারা জানে, ইসরায়েলি নজরদারির কারণে ডিজিটাল যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ।

রবি আগরওয়াল: কূটনৈতিকভাবে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ কী?

আলি ভায়েজ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এখনো প্রধান আলোচক হিসেবে কাজ করছেন। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও ইউরোপ ও আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে সামরিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের একটি ছোট গোষ্ঠী থেকে।

রবি আগরওয়াল: মোজতবা খামেনির অবস্থান কী?

আলি ভায়েজ: তার সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। তিনি প্রকাশ্যে আসছেন না। তিনি অসুস্থ, নাকি নিহত–তা স্পষ্ট নয়। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেমে নেই; রেভল্যুশনারি গার্ড, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পার্লামেন্ট স্পিকারের মতো নেতারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

রবি আগরওয়াল: ইরান কবে সমঝোতায় যেতে চাইবে?

আলি ভায়েজ: যখন তারা মনে করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যথেষ্ট মূল্য দিয়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধের খরচ–সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক–যখন প্রতিপক্ষের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে, তখনই তারা আলোচনায় আগ্রহী হতে পারে।

রবি আগরওয়াল: ‘যথেষ্ট মূল্য’ বলতে কী বোঝাচ্ছে ইরান?

আলি ভায়েজ: ইরানের কৌশল হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে চাপের মধ্যে ফেলা। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের রাডার নেটওয়ার্কে আঘাত করা– এসবই সেই পরিকল্পনার অংশ। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। আসলে ট্রাম্পের জন্য ফাঁদ পাতছে তেহরান।

রবি আগরওয়াল: যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য কী?

আলি ভায়েজ: ইরান জানে তারা সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। তাই তারা ‘আউটলাস্ট’ করার কৌশল নিয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করা। তারা মনে করে, সময় যত যাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অস্ত্র ও সম্পদ ফুরিয়ে আসবে, আর তখন তারা ভালো শর্তে সমঝোতা করতে পারবে।

ইরান-আমেরিকার পতাকা।
ইরান-আমেরিকার পতাকা।

রবি আগরওয়াল: ভবিষ্যতে সংঘাত আরও বাড়তে পারে কি?

আলি ভায়েজ: হ্যাঁ, বিশেষ করে যদি হুথি গোষ্ঠী বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে তেলের দাম আরও বেড়ে যাবে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে– যা ইরানের কৌশলেরই অংশ। এই পুরো পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট– ইরান সরাসরি শক্তি দিয়ে নয়, বরং সময়, চাপ ও কৌশলের মাধ্যমে যুদ্ধকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নিতে চাইছে।

রবি আগরওয়াল: ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফরেন পলিসির প্রধান সম্পাদক

সম্পর্কিত