তাসীন মল্লিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় পার্টির (জাপা) জন্য নতুন ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশির ভাগ সময় সরকার গঠনে ভূমিকা রাখা দলটি এবার শুধু সংসদে প্রতিনিধিত্বই হারায়নি, বরং নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে শোচনীয় পরাজয়ের মুখে পড়েছে। ভাঙন দলটির জন্য নতুন কোনো বিষয় না হলেও নির্বাচনের আগে এমন পরিস্থিতির কারণে সাংগঠনিক অবস্থা্ও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে নাজুক।
আওয়ামী লীগের আমলে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে জাপা ছিল প্রধান বিরোধী দল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সমঝোতা এবং সংসদে ভূমিকার জন্য হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত দলটি ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ তকমা পায়।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাপাকে তার খেসারতও দিতে হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ বা নির্বাচন কমিশনের সংলাপে ডাক পায়নি দলটি। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পড়তে হয়েছে বাধার মুখে। ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে জাপাকে নিষিদ্ধ করার দাবিও ওঠে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে জাপা লাঙ্গল প্রতীকে ১৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। কোনো আসনেই দলটির প্রার্থীরা নূন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নিজ এলাকা রংপুর জেলায় দলের ঘাঁটি বলে বিবেচিত তিনটি আসনে লাঙ্গলের প্রার্থীরা হয়েছেন তৃতীয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে থাকার কারণে শুধু আবেগ দিয়ে জনগণকে আকর্ষণ করতে পারেনি জাপা। সে কারণেই ভোটের ফলে এই বিপর্যয়।
দলের রাজনীতি ও নেতাকর্মীদের ওপর ভোটের ফলের প্রভাব পড়েছে স্বীকার করে জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী চরচাকে বলেন, ‘‘অবশ্যই আমাদের নেতাকর্মীরা মনক্ষুণ্ন হয়েছে। তবে আমরা মনোবল হারাইনি, সবাইকে একত্রিত করছি।’’
১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপার পথ চলাকে তিন পর্যায়ে ভাগ করা যায়। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬–দ্রুত উত্থান ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের সময়কাল। ২০০১ থেকে ২০১৮–জোটনির্ভর টিকে থাকার সময় এবং ২০২৪ থেকে ২০২৬–দ্রুত পতন ও প্রান্তিক হয়ে পড়ার সময়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান চরচাকে বলেন, “জাতীয় পার্টির পতন ১৯৯১ সালে ঘটে। কিন্তু সেই পতনটা আর্টিফিশিয়ালি। দুই দলই চেয়েছে জাতীয় পার্টিকে টানতে। জাতীয় পার্টি কিছুটা অস্তিত্ব রক্ষা করতে পেরেছিল। ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের সঙ্গে যাওয়ার কারণে তখন আর জাতীয় পার্টির প্রতি মানুষের কোনো আগ্রহ ছিল না।”
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, “চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা গেল, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের বি-টিম হিসেবে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদ রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করল। তখন আর মানুষের কোনো আগ্রহ জাতীয় পার্টির প্রতি নেই। নির্বাচনে যা দেখা গেছে, তাতে মনে হয় জাতীয় পার্টি আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।”
চার দশকে শীর্ষ থেকে শূন্যে
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। এর মাত্র দুই বছর পর ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে দলটি ২৫১টি আসন পেয়ে একপ্রকার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে এই সময়ের নির্বাচনগুলো ছিল বিতর্কিত এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল না, যা এই সাফল্যের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর পর এবারই প্রথম দলটি সংসদে নেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, মশিউর রহমান রাঙ্গাসহ প্রভাবশালী নেতারা নিজ নিজ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছেন তৃতীয়। মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ জাপার মোট ২৮ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাপার ভোটের হার প্রায় ১ শতাংশের নিচে নেমে যায়। এটা দলটির বড় ধরনের পতন নির্দেশ করে, যা তাদের প্রান্তিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে দলটি যথাক্রমে প্রায় ৪২% ও ৬৮% ভোট পেলেও এই সাফল্য ছিল ক্ষমতানির্ভর এবং বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনের ফল। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এলে ভোটের হার হঠাৎ কমে প্রায় ১২ শতাংশে নেমে আসে। দলটি মাত্র ৩৫টি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়।

এরপর ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টি ৭ থেকে ১৬ শতাংশ ভোটের মধ্যে সীমিত একটি ভিত্তি ধরে রাখে এবং তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিকে থাকে। ১৯৯৬ সালে ৩২টি, ২০০১ সালে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে ২৭টি আসন নিয়ে দলটি মাঝারি শক্তি হিসেবে টিকে থাকলেও এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার সক্ষমতা তাদের ছিল না।
২০০৮ সালের পর জোটনির্ভর রাজনীতির কারণে দলটি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেও নিজস্ব ভোট বাড়াতে পারেনি। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালে ভোট কমে প্রায় ৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৪ সালে ৩৪টি, ২০১৮ সালে ২১টি এবং ২০২৪ সালে ১১টি আসন নিয়ে কখনো সরকারের অংশীদার, কখনো ‘সরকার নিয়ন্ত্রিত’ বিরোধী দল–এই দ্বৈত ভূমিকায় দলটি নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে। বিরোধী দলে থেকেও সরকারের দলটির নেতারা মন্ত্রী হওয়ার কারণেই তারা ‘গৃহপালিত বিরোধীদলের’ তকমা পায়। তবে এই কৌশল দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়কে দুর্বল করে দেয়। সবশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটির অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি পতনের ইঙ্গিত দেয়।
রংপুরে জাপা: দুর্গ থেকে পতন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে রংপুর একসময় জাতীয় পার্টির অপ্রতিদ্বন্দ্বী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদের নিজ এলাকা হওয়ায় এই অঞ্চলে জাপার প্রভাব ছিল বেশি। কিন্তু ১৯৮৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ভোটের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়–এই শক্ত ঘাঁটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে এক সময় সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে গেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে ঘটেছে নাটকীয় পরিবর্তন। রংপুর জেলার ছয়টির মধ্যে সব আসনেই জাতীয় পার্টি হেরে যায়। শুধু পরাজয়ই নয়–বেশির ভাগ আসনে তারা তৃতীয় বা তারও নিচের অবস্থানে নেমে গেছে। এমনকি রংপুর-৩, যা দীর্ঘদিন দলের ‘রাজনৈতিক রাজধানী’ হিসেবে বিবেচিত ছিল, সেখানেও তারা ধরাশায়ী। এই আসনে জিএম কাদের তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে হেরে গেছেন। তিনি পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৩৮৫। অথচ ২০২৪ সালে তিনি এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন।
এ ছাড়া দলের দুর্গ খ্যাত কুড়িগ্রাম জেলার চারটি সংসদীয় আসনে লাঙ্গল প্রতীকে দলটির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কোনোটিতেই জয়ী হতে পারেননি। বরং চারটি আসনের তিনটিতেই জামানত হারিয়েছেন তারা।
যদিও রংপুরে জাপার ফলাফল প্রসঙ্গে রংপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জাপার কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা চরচাকে বলেন, ‘‘বিগত নির্বাচনটা তো ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের একটা অংশ–সেই হিসাবে নির্বাচনটা হয়েছে। তার কারণ, নির্বাচনের সাত দিন আগে কাউনিয়া-পীরগাছা নাহিদ সাহেব (এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম) এসে ডিক্লারেশন দিয়ে গেছে, জাতীয় পার্টির কবর রচনা হবে ১২ তারিখে। এই কথাগুলো ইঙ্গিত করে যে, জাতীয় পার্টিকে ভোটে নয়, ডিজাইন করে হারানো হয়েছে।’’
১৯৯১ সালে স্বৈরশাসনের পতনের পর জাপা জাতীয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও রংপুরে তাদের প্রভাব পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়কালে দলটি এখানে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকে। তবে এই শক্তি ছিল অনেকাংশেই এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল।
২০০৮ সালের পর থেকে জাপার রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসে–জোটনির্ভরতা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে রংপুরের একাধিক আসনে তারা জয় পায় বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই নির্বাচিত হয়। কিন্তু জোটনির্ভরতা দলটির নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ক্রমে ক্ষয় হতে থাকে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের ভাঙনই এই ফলাফলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসন জন্য নাগরিক–সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি খন্দকার ফখরুল আলম বেঞ্জু। চরচাকে তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় পার্টি মূলত একটি ইমোশনাল রাজনৈতিক দল, যার ফাউন্ডেশন দুর্বল এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। রংপুরের মানুষকে তারা ইমোশনালি জড়িয়ে ধরেছে–‘আমাদের ছেলে’ জাতীয় অনুভূতি। সেটিকে পুঁজি করে তারা জয়ী হয়েছিল, কিন্তু সেই ইমোশনকে মূল্যায়ন করনি জাপা।”
সব মিলিয়ে, রংপুরের রাজনৈতিক বাস্তবতা জাপার সামগ্রিক অবস্থারই প্রতিচ্ছবি। একসময় যে অঞ্চল দলটির শক্তির মূল উৎস ছিল, আজ সেটিই তাদের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
ঐক্যের সম্ভাবনাও ক্ষীণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দলের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হামলা-মামলার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিরোধে পড়ে জাপা। ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার জাপার দশম জাতীয় কাউন্সিলে নতুন জাপা ঘোষণা করেন। দুই অংশের এই বিরোধ আদালতেও গড়ায়। দলের এই বিরোধ প্রভাব ফেলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও।
নানা জল্পনা কল্পনার পর জাপার অধিকাংশ নেতা জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন অংশের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে এ ভাঙনের ফলে জাপা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। সংসদ নির্বাচনের পর দুই অংশের মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা কম।
জাপার একাংশের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চরচাকে বলেন, “আমরা চেয়েছি পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। আমরা চেয়েছি পার্টিকে আরও গণতান্ত্রিক করতে। এইটা ইট ইজ আপটু কাদের সাহেব। তিনি কীভাবে রাজনীতি করতে চাচ্ছেন সেটা। তবে আমার মনে হয় না তার সাথে ঐক্য করা যাবে। তিনি সবসময় বলেছেন এনাদেরকে বাদ দিয়ে পার্টি স্ট্রং হবে; উনি চান না যে, আমরা পার্টিতে থাকি।”
তবে শামীম হায়দার পাটোয়ারী চরচাকে বলেন, “দলে অনেকেই ফিরে আসতে চাচ্ছে। আমরা তাদের সাথে কথাও বলছি। পার্টির চেয়ারম্যান এবং প্রেসিডিয়ামের সিদ্ধান্ত বা তৃণমূলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক হয়তো ধাপে ধাপে অনেককেই নেওয়া হবে। পার্টির চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় পার্টির (জাপা) জন্য নতুন ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশির ভাগ সময় সরকার গঠনে ভূমিকা রাখা দলটি এবার শুধু সংসদে প্রতিনিধিত্বই হারায়নি, বরং নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে শোচনীয় পরাজয়ের মুখে পড়েছে। ভাঙন দলটির জন্য নতুন কোনো বিষয় না হলেও নির্বাচনের আগে এমন পরিস্থিতির কারণে সাংগঠনিক অবস্থা্ও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে নাজুক।
আওয়ামী লীগের আমলে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে জাপা ছিল প্রধান বিরোধী দল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সমঝোতা এবং সংসদে ভূমিকার জন্য হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত দলটি ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ তকমা পায়।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাপাকে তার খেসারতও দিতে হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ বা নির্বাচন কমিশনের সংলাপে ডাক পায়নি দলটি। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পড়তে হয়েছে বাধার মুখে। ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে জাপাকে নিষিদ্ধ করার দাবিও ওঠে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে জাপা লাঙ্গল প্রতীকে ১৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। কোনো আসনেই দলটির প্রার্থীরা নূন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নিজ এলাকা রংপুর জেলায় দলের ঘাঁটি বলে বিবেচিত তিনটি আসনে লাঙ্গলের প্রার্থীরা হয়েছেন তৃতীয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে থাকার কারণে শুধু আবেগ দিয়ে জনগণকে আকর্ষণ করতে পারেনি জাপা। সে কারণেই ভোটের ফলে এই বিপর্যয়।
দলের রাজনীতি ও নেতাকর্মীদের ওপর ভোটের ফলের প্রভাব পড়েছে স্বীকার করে জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী চরচাকে বলেন, ‘‘অবশ্যই আমাদের নেতাকর্মীরা মনক্ষুণ্ন হয়েছে। তবে আমরা মনোবল হারাইনি, সবাইকে একত্রিত করছি।’’
১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপার পথ চলাকে তিন পর্যায়ে ভাগ করা যায়। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬–দ্রুত উত্থান ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের সময়কাল। ২০০১ থেকে ২০১৮–জোটনির্ভর টিকে থাকার সময় এবং ২০২৪ থেকে ২০২৬–দ্রুত পতন ও প্রান্তিক হয়ে পড়ার সময়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান চরচাকে বলেন, “জাতীয় পার্টির পতন ১৯৯১ সালে ঘটে। কিন্তু সেই পতনটা আর্টিফিশিয়ালি। দুই দলই চেয়েছে জাতীয় পার্টিকে টানতে। জাতীয় পার্টি কিছুটা অস্তিত্ব রক্ষা করতে পেরেছিল। ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের সঙ্গে যাওয়ার কারণে তখন আর জাতীয় পার্টির প্রতি মানুষের কোনো আগ্রহ ছিল না।”
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, “চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা গেল, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের বি-টিম হিসেবে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদ রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করল। তখন আর মানুষের কোনো আগ্রহ জাতীয় পার্টির প্রতি নেই। নির্বাচনে যা দেখা গেছে, তাতে মনে হয় জাতীয় পার্টি আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।”
চার দশকে শীর্ষ থেকে শূন্যে
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। এর মাত্র দুই বছর পর ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে দলটি ২৫১টি আসন পেয়ে একপ্রকার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে এই সময়ের নির্বাচনগুলো ছিল বিতর্কিত এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল না, যা এই সাফল্যের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর পর এবারই প্রথম দলটি সংসদে নেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, মশিউর রহমান রাঙ্গাসহ প্রভাবশালী নেতারা নিজ নিজ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছেন তৃতীয়। মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ জাপার মোট ২৮ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাপার ভোটের হার প্রায় ১ শতাংশের নিচে নেমে যায়। এটা দলটির বড় ধরনের পতন নির্দেশ করে, যা তাদের প্রান্তিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে দলটি যথাক্রমে প্রায় ৪২% ও ৬৮% ভোট পেলেও এই সাফল্য ছিল ক্ষমতানির্ভর এবং বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনের ফল। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এলে ভোটের হার হঠাৎ কমে প্রায় ১২ শতাংশে নেমে আসে। দলটি মাত্র ৩৫টি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়।

এরপর ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টি ৭ থেকে ১৬ শতাংশ ভোটের মধ্যে সীমিত একটি ভিত্তি ধরে রাখে এবং তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিকে থাকে। ১৯৯৬ সালে ৩২টি, ২০০১ সালে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে ২৭টি আসন নিয়ে দলটি মাঝারি শক্তি হিসেবে টিকে থাকলেও এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার সক্ষমতা তাদের ছিল না।
২০০৮ সালের পর জোটনির্ভর রাজনীতির কারণে দলটি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেও নিজস্ব ভোট বাড়াতে পারেনি। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালে ভোট কমে প্রায় ৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৪ সালে ৩৪টি, ২০১৮ সালে ২১টি এবং ২০২৪ সালে ১১টি আসন নিয়ে কখনো সরকারের অংশীদার, কখনো ‘সরকার নিয়ন্ত্রিত’ বিরোধী দল–এই দ্বৈত ভূমিকায় দলটি নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে। বিরোধী দলে থেকেও সরকারের দলটির নেতারা মন্ত্রী হওয়ার কারণেই তারা ‘গৃহপালিত বিরোধীদলের’ তকমা পায়। তবে এই কৌশল দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়কে দুর্বল করে দেয়। সবশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটির অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি পতনের ইঙ্গিত দেয়।
রংপুরে জাপা: দুর্গ থেকে পতন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে রংপুর একসময় জাতীয় পার্টির অপ্রতিদ্বন্দ্বী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদের নিজ এলাকা হওয়ায় এই অঞ্চলে জাপার প্রভাব ছিল বেশি। কিন্তু ১৯৮৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ভোটের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়–এই শক্ত ঘাঁটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে এক সময় সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে গেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে ঘটেছে নাটকীয় পরিবর্তন। রংপুর জেলার ছয়টির মধ্যে সব আসনেই জাতীয় পার্টি হেরে যায়। শুধু পরাজয়ই নয়–বেশির ভাগ আসনে তারা তৃতীয় বা তারও নিচের অবস্থানে নেমে গেছে। এমনকি রংপুর-৩, যা দীর্ঘদিন দলের ‘রাজনৈতিক রাজধানী’ হিসেবে বিবেচিত ছিল, সেখানেও তারা ধরাশায়ী। এই আসনে জিএম কাদের তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে হেরে গেছেন। তিনি পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৩৮৫। অথচ ২০২৪ সালে তিনি এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন।
এ ছাড়া দলের দুর্গ খ্যাত কুড়িগ্রাম জেলার চারটি সংসদীয় আসনে লাঙ্গল প্রতীকে দলটির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কোনোটিতেই জয়ী হতে পারেননি। বরং চারটি আসনের তিনটিতেই জামানত হারিয়েছেন তারা।
যদিও রংপুরে জাপার ফলাফল প্রসঙ্গে রংপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জাপার কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা চরচাকে বলেন, ‘‘বিগত নির্বাচনটা তো ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের একটা অংশ–সেই হিসাবে নির্বাচনটা হয়েছে। তার কারণ, নির্বাচনের সাত দিন আগে কাউনিয়া-পীরগাছা নাহিদ সাহেব (এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম) এসে ডিক্লারেশন দিয়ে গেছে, জাতীয় পার্টির কবর রচনা হবে ১২ তারিখে। এই কথাগুলো ইঙ্গিত করে যে, জাতীয় পার্টিকে ভোটে নয়, ডিজাইন করে হারানো হয়েছে।’’
১৯৯১ সালে স্বৈরশাসনের পতনের পর জাপা জাতীয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও রংপুরে তাদের প্রভাব পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়কালে দলটি এখানে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকে। তবে এই শক্তি ছিল অনেকাংশেই এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল।
২০০৮ সালের পর থেকে জাপার রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসে–জোটনির্ভরতা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে রংপুরের একাধিক আসনে তারা জয় পায় বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই নির্বাচিত হয়। কিন্তু জোটনির্ভরতা দলটির নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ক্রমে ক্ষয় হতে থাকে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের ভাঙনই এই ফলাফলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসন জন্য নাগরিক–সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি খন্দকার ফখরুল আলম বেঞ্জু। চরচাকে তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় পার্টি মূলত একটি ইমোশনাল রাজনৈতিক দল, যার ফাউন্ডেশন দুর্বল এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। রংপুরের মানুষকে তারা ইমোশনালি জড়িয়ে ধরেছে–‘আমাদের ছেলে’ জাতীয় অনুভূতি। সেটিকে পুঁজি করে তারা জয়ী হয়েছিল, কিন্তু সেই ইমোশনকে মূল্যায়ন করনি জাপা।”
সব মিলিয়ে, রংপুরের রাজনৈতিক বাস্তবতা জাপার সামগ্রিক অবস্থারই প্রতিচ্ছবি। একসময় যে অঞ্চল দলটির শক্তির মূল উৎস ছিল, আজ সেটিই তাদের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
ঐক্যের সম্ভাবনাও ক্ষীণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দলের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হামলা-মামলার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিরোধে পড়ে জাপা। ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার জাপার দশম জাতীয় কাউন্সিলে নতুন জাপা ঘোষণা করেন। দুই অংশের এই বিরোধ আদালতেও গড়ায়। দলের এই বিরোধ প্রভাব ফেলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও।
নানা জল্পনা কল্পনার পর জাপার অধিকাংশ নেতা জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন অংশের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে এ ভাঙনের ফলে জাপা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। সংসদ নির্বাচনের পর দুই অংশের মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা কম।
জাপার একাংশের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চরচাকে বলেন, “আমরা চেয়েছি পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। আমরা চেয়েছি পার্টিকে আরও গণতান্ত্রিক করতে। এইটা ইট ইজ আপটু কাদের সাহেব। তিনি কীভাবে রাজনীতি করতে চাচ্ছেন সেটা। তবে আমার মনে হয় না তার সাথে ঐক্য করা যাবে। তিনি সবসময় বলেছেন এনাদেরকে বাদ দিয়ে পার্টি স্ট্রং হবে; উনি চান না যে, আমরা পার্টিতে থাকি।”
তবে শামীম হায়দার পাটোয়ারী চরচাকে বলেন, “দলে অনেকেই ফিরে আসতে চাচ্ছে। আমরা তাদের সাথে কথাও বলছি। পার্টির চেয়ারম্যান এবং প্রেসিডিয়ামের সিদ্ধান্ত বা তৃণমূলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক হয়তো ধাপে ধাপে অনেককেই নেওয়া হবে। পার্টির চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত।”

জর্জের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে জে. ক্রিস্টোফার লানেভের নাম সামনে আসা এবং একই সঙ্গে জে. ডেভিড এম হুডনে ও মে. জে. উইলিয়াম গ্রিন জুনিয়ার-কে অপসারণের ঘটনা দেখায়, এটি একক কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে একটি বিস্তৃত পুনর্গঠনের অংশ। এর আগে জে. জেমস জে মিঙ্গাস-এর আগাম অবসরও একই ধারার ইঙ্গিত দেয়।

ইরানে স্থলযুদ্ধ-এক সময় যা ছিল প্রায় অকল্পনীয়, আজ তা বাস্তব আলোচনার কেন্দ্রে। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করা যেমন কঠিন, তা বজায় রাখা তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কিন্তু সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত সেই সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন ‘যুদ্ধ হবে কি না’ তা নয়, বরং