চরচা ডেস্ক

অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বিভাজনমূলক ঘটনাগুলোর একটি হলো সাবেক যুদ্ধনায়ক বেন রবার্টস-স্মিথকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। একসময় যিনি দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’প্রাপ্ত বীর হিসেবে জাতীয় গৌরবের প্রতীক ছিলেন, এখন তিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। এই রূপান্তর কেবল ব্যক্তিগত পতনের গল্প নয়; এটি অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানের গভীর সংকটের প্রতিফলন।
২০২৬ সালের এপ্রিলে রবার্টস-স্মিথকে ফেডারেল পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে পাঁচজন নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক হত্যার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজে দুজনকে হত্যা করেন এবং তার অধীনস্থ সৈন্যদের দিয়ে আরও তিনজনকে হত্যা করান। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রতিটি অভিযোগের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে।
এই ঘটনা হঠাৎ করে আসেনি; বরং প্রায় এক দশক ধরে চলা একটি বিতর্কের চূড়ান্ত পরিণতি। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি গণমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয় যে আফগানিস্তানে অস্ট্রেলীয় সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল। এই প্রতিবেদনই প্রথমবারের মতো বিষয়টি জনসমক্ষে নিয়ে আসে– যদিও সামরিক মহলে এসব অভিযোগ আগে থেকেই প্রচলিত ছিল।
রবার্টস-স্মিথ এই প্রতিবেদনগুলোর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। কিন্তু ২০২৩ সালে আদালত রায় দেয় যে, অভিযোগগুলো ‘সম্ভাবনার ভারসাম্য’ (balance of probabilities) অনুযায়ী সত্য। আদালত বিশ্বাস করেন যে, তিনি নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের হত্যায় জড়িত ছিলেন। পরবর্তী আপিলও ব্যর্থ হয়। এর ফলে তার ব্যক্তিগত সুনাম ধ্বংস হয়ে যায়, এবং অস্ট্রেলীয় সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই পুরো ঘটনাটি এখন অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে এক ধরনের ‘কালচার ওয়ার’-এ পরিণত হয়েছে। ডানপন্থীদের কাছে রবার্টস-স্মিথ এখনো একজন বীর, যিনি দেশের জন্য লড়েছেন এবং অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত হয়েছেন। বিপরীতে, বামপন্থী ও প্রগতিশীল গোষ্ঠীর কাছে তিনি একজন যুদ্ধাপরাধী, যার বিচার হওয়া জরুরি।
রাজনীতিবিদদের অবস্থানও এই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে। গ্রিনস দলের সিনেটর ডেভিড শোয়েব্রিজ বলেছেন, “সাজানো সম্মাননা যুদ্ধাপরাধ থেকে আইনি সুরক্ষা দিতে পারে না।” অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড ও টনি অ্যাবট রবার্টস-স্মিথের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। তারা যুক্তি দিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিকে সাধারণ নাগরিক জীবনের মানদণ্ডে বিচার করা ঠিক নয়।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো– সামরিক নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা। এখন পর্যন্ত তদন্তগুলো মূলত মাঠপর্যায়ের সৈন্যদের কর্মকাণ্ডের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তারা, যারা এই অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তারা কি সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকবেন?
এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির বিচার নয়; বরং একটি পুরো সামরিক কাঠামোর নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার বিষয়। যদি উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা খতিয়ে না দেখা হয়, তাহলে বিচার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
একইসঙ্গে, এই ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রনীতির দিকেও আলোকপাত করে। কেন অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল? এবং কেন এখনো দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানে যুক্ত থাকে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো– এই পুরো বিতর্ক বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করছে। ‘কালচার ওয়ার’-এর উত্তাপে প্রকৃত ইস্যুগুলো, যেমন যুদ্ধাপরাধের কাঠামোগত কারণ, সামরিক সংস্কৃতি, এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা–এসবই পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, রবার্টস-স্মিথ দোষী নাকি নির্দোষ– তা আদালতই নির্ধারণ করবে। কিন্তু তার ঘটনাটি ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার সমাজ ও রাজনীতিকে গভীরভাবে বিভক্ত করেছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে একটি ব্যক্তি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংঘাতের প্রতীকে পরিণত হতে পারে।
সমসাময়িক অস্ট্রেলিয়ায়, বেন রবার্টস-স্মিথ যেন সেই প্রতীক– যার মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারেন। যদি তিনি না থাকতেন, হয়তো এই বিভাজন তৈরি করার জন্য আরেকজনকে খুঁজে নেওয়া হতো।

অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বিভাজনমূলক ঘটনাগুলোর একটি হলো সাবেক যুদ্ধনায়ক বেন রবার্টস-স্মিথকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। একসময় যিনি দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’প্রাপ্ত বীর হিসেবে জাতীয় গৌরবের প্রতীক ছিলেন, এখন তিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। এই রূপান্তর কেবল ব্যক্তিগত পতনের গল্প নয়; এটি অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানের গভীর সংকটের প্রতিফলন।
২০২৬ সালের এপ্রিলে রবার্টস-স্মিথকে ফেডারেল পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে পাঁচজন নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক হত্যার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজে দুজনকে হত্যা করেন এবং তার অধীনস্থ সৈন্যদের দিয়ে আরও তিনজনকে হত্যা করান। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রতিটি অভিযোগের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে।
এই ঘটনা হঠাৎ করে আসেনি; বরং প্রায় এক দশক ধরে চলা একটি বিতর্কের চূড়ান্ত পরিণতি। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি গণমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয় যে আফগানিস্তানে অস্ট্রেলীয় সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল। এই প্রতিবেদনই প্রথমবারের মতো বিষয়টি জনসমক্ষে নিয়ে আসে– যদিও সামরিক মহলে এসব অভিযোগ আগে থেকেই প্রচলিত ছিল।
রবার্টস-স্মিথ এই প্রতিবেদনগুলোর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। কিন্তু ২০২৩ সালে আদালত রায় দেয় যে, অভিযোগগুলো ‘সম্ভাবনার ভারসাম্য’ (balance of probabilities) অনুযায়ী সত্য। আদালত বিশ্বাস করেন যে, তিনি নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের হত্যায় জড়িত ছিলেন। পরবর্তী আপিলও ব্যর্থ হয়। এর ফলে তার ব্যক্তিগত সুনাম ধ্বংস হয়ে যায়, এবং অস্ট্রেলীয় সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই পুরো ঘটনাটি এখন অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে এক ধরনের ‘কালচার ওয়ার’-এ পরিণত হয়েছে। ডানপন্থীদের কাছে রবার্টস-স্মিথ এখনো একজন বীর, যিনি দেশের জন্য লড়েছেন এবং অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত হয়েছেন। বিপরীতে, বামপন্থী ও প্রগতিশীল গোষ্ঠীর কাছে তিনি একজন যুদ্ধাপরাধী, যার বিচার হওয়া জরুরি।
রাজনীতিবিদদের অবস্থানও এই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে। গ্রিনস দলের সিনেটর ডেভিড শোয়েব্রিজ বলেছেন, “সাজানো সম্মাননা যুদ্ধাপরাধ থেকে আইনি সুরক্ষা দিতে পারে না।” অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড ও টনি অ্যাবট রবার্টস-স্মিথের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। তারা যুক্তি দিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিকে সাধারণ নাগরিক জীবনের মানদণ্ডে বিচার করা ঠিক নয়।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো– সামরিক নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা। এখন পর্যন্ত তদন্তগুলো মূলত মাঠপর্যায়ের সৈন্যদের কর্মকাণ্ডের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তারা, যারা এই অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তারা কি সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকবেন?
এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির বিচার নয়; বরং একটি পুরো সামরিক কাঠামোর নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার বিষয়। যদি উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা খতিয়ে না দেখা হয়, তাহলে বিচার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
একইসঙ্গে, এই ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রনীতির দিকেও আলোকপাত করে। কেন অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল? এবং কেন এখনো দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানে যুক্ত থাকে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো– এই পুরো বিতর্ক বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করছে। ‘কালচার ওয়ার’-এর উত্তাপে প্রকৃত ইস্যুগুলো, যেমন যুদ্ধাপরাধের কাঠামোগত কারণ, সামরিক সংস্কৃতি, এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা–এসবই পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, রবার্টস-স্মিথ দোষী নাকি নির্দোষ– তা আদালতই নির্ধারণ করবে। কিন্তু তার ঘটনাটি ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার সমাজ ও রাজনীতিকে গভীরভাবে বিভক্ত করেছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে একটি ব্যক্তি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংঘাতের প্রতীকে পরিণত হতে পারে।
সমসাময়িক অস্ট্রেলিয়ায়, বেন রবার্টস-স্মিথ যেন সেই প্রতীক– যার মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারেন। যদি তিনি না থাকতেন, হয়তো এই বিভাজন তৈরি করার জন্য আরেকজনকে খুঁজে নেওয়া হতো।