Advertisement Banner

অনিশ্চিত বিশ্বে রাষ্ট্রনীতির বদলে যাওয়া চিত্র

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
অনিশ্চিত বিশ্বে রাষ্ট্রনীতির বদলে যাওয়া চিত্র
প্রতীকী ছবি

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সাম্প্রতিক রূপান্তর এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রাষ্ট্রগুলো আর একক জোট, নির্ভরযোগ্য মিত্র বা স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না। ফরেন পলিসি পত্রিকার কলামিস্ট সুজান নোসেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে ‘হেজিং’– অর্থাৎ একাধিক শক্তির সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার কৌশল– রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং ইরান সংঘাত– এই ধারাবাহিক ধাক্কাগুলো বিশ্বায়নের পূর্বের স্থিতিশীল ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। ফলে দেশগুলো বাধ্য হয়েছে বাণিজ্য, কূটনীতি, জ্বালানি ও নিরাপত্তা নীতিতে নতুন পথ খুঁজতে।

অতীতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনেকটাই নির্ভর করত স্থায়ী জোট, মূল্যবোধ-ভিত্তিক অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক ব্লকের ওপর। কিন্তু এখন সেই কাঠামো আর যথেষ্ট নয়। ‘হেজিং’ কৌশল মূলত এমন এক বাস্তবতা থেকে জন্ম নিয়েছে যেখানে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই রাষ্ট্রগুলো একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, যাতে কোনো সংকটে বিকল্প পথ খোলা থাকে। একসময় এটি ছিল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত একটি কৌশল, যেমন ভারত নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করেও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। কিন্তু এখন এটি বিশ্ব রাজনীতির মূল প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, রাষ্ট্রগুলো আর একটি সুসংহত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভেতরে থেকে হেজিং করছে না; বরং এমন এক বাস্তবতায় কাজ করছে যেখানে সেই ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অবস্থাকে নোসেল ‘হেজেমনি’ নামে অভিহিত করেছেন– যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় একাধিক দিক খুলে রাখছে। এর ফলে বিশ্ব আরও অনিশ্চিত ও জটিল হয়ে উঠছে।

এক সময় বিশ্বায়নকে সমাধান হিসেবে দেখা হতো। ২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছিলেন, উন্মুক্ত বাজার ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রধান চালিকা শক্তি। সেই ধারণার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, যেখানে পণ্য এক দেশে ডিজাইন, অন্য দেশে উৎপাদন এবং তৃতীয় দেশে বিক্রি হতো। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট প্রথম বড় সতর্কবার্তা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যাংকের পতন কীভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, তা তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সম্পর্ককেই রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। যেমন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা বা চীনা প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ– এসবই ‘অস্ত্রীকৃত পারস্পরিক নির্ভরতা’র উদাহরণ।

কোভিড-১৯ মহামারি এই ঝুঁকিকে আরও উন্মোচিত করে। সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দেয় এবং দেশগুলো নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে বুঝিয়ে দেয় যে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে বিশ্বায়নের সেই ‘নিরাপদ’ ধারণা ভেঙে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে দেশগুলো এখন বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও তারা আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এমনকি বড় শক্তিগুলোও হেজিং করছে– যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রযুক্তি ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। আর চীন নিজস্ব প্রযুক্তি ও খাদ্য উৎপাদন জোরদার করছে।

গত এক বছরে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে সেই দেশগুলোর মধ্যে, যারা আগে বড় শক্তির ওপর নির্ভর করত। ইউরোপ নতুন বাণিজ্য চুক্তি করছে, কানাডা চীনের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ছে, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান তাদের বাজার সম্প্রসারণ করছে। একই সঙ্গে শিল্পনীতি ও আত্মনির্ভরতার ওপর জোর বাড়ছে। সরকারগুলো ভর্তুকি, স্থানীয় উৎপাদন ও কৌশলগত মজুদ গড়ে তুলছে।

নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো নিয়ে অনিশ্চিত অবস্থানের কারণে ইউরোপ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে এবং নিজস্ব সক্ষমতা জোরদার করছে। একইভাবে জাপান ও অন্যান্য দেশও নতুন সামরিক অংশীদারিত্ব গড়ছে। এর মূল কারণ হলো– কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভর করলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ইউরোপ রাশিয়ার পরিবর্তে অন্য উৎস থেকে গ্যাস নিচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপ রাশিয়ার পরিবর্তে অন্য উৎস থেকে গ্যাস নিচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

জ্বালানি ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে। ইউরোপ রাশিয়ার পরিবর্তে অন্য উৎস থেকে গ্যাস নিচ্ছে, জাপান তার নির্ভরতা কমাচ্ছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহেও বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা চলছে।

কূটনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন অঞ্চল ও শক্তির মধ্যে নতুন নতুন জোট ও চুক্তি হচ্ছে। দেশগুলো তাদের কূটনৈতিক বিকল্প বাড়াচ্ছে, যাতে তারা কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল না থাকে। এটি পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলছে।

তবে এই পরিবর্তনের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি কম কার্যকর হতে পারে, কারণ সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন করতে খরচ বাড়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, এই ধরনের বিভাজন অর্থনৈতিক উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যবোধভিত্তিক কূটনীতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কারণ দেশগুলো এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বাস্তব স্বার্থকে।

নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বাড়ছে। দেশগুলো অস্ত্র মজুত বাড়াচ্ছে, সংকেত বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছে এবং ছোটখাটো সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়ছে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। সব মিলিয়ে, ‘হেজিং’ এখন শুধু একটি কৌশল নয়, বরং একটি নতুন বাস্তবতা। এটি বিশ্বকে যেমন প্রতিফলিত করছে, তেমনি নতুনভাবে গঠনও করছে। এই ব্যবস্থায় সফল হতে হলে দেশগুলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, বহুমুখী সম্পর্ক এবং অভিযোজন ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তবে এই ব্যবস্থায় সব দেশ সমানভাবে লাভবান হবে না। অনেক দেশ আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক সমস্যাগুলো– যেমন জলবায়ু পরিবর্তন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি– সমাধানে মনোযোগ কমে যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত, নোসেলের বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে– বিশ্ব আর আগের মতো নয়। স্থিতিশীলতা, বিশ্বাস ও একক জোটের যুগ শেষ হয়ে গেছে। এখন রাষ্ট্রগুলোকে টিকে থাকতে হলে একাধিক পথ খোলা রাখতে হবে। অর্থাৎ, অনিশ্চিত এই বিশ্বে ‘হেজিং’ই হয়ে উঠেছে সফল রাষ্ট্রনীতির প্রধান ভিত্তি।

সম্পর্কিত