Advertisement Banner

ফরেন পলিসির প্রধান সম্পাদক: ইরানে যুদ্ধে ট্রাম্প হেরে যাচ্ছেন

রবি আগরওয়াল
রবি আগরওয়াল
ফরেন পলিসির প্রধান সম্পাদক: ইরানে যুদ্ধে ট্রাম্প হেরে যাচ্ছেন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানে সফল হচ্ছে? এটি নির্ভর করে আপনি কাকে জিজ্ঞেস করছেন তার ওপর। গত সপ্তাহে প্রকাশিত পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ আমেরিকান এই সংঘাত মোকাবেলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা অনুমোদন করেননি, আর ৩৭ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো সাধারণভাবে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন, যা দেখায় মতামতের বিভাজন মূলত দলীয় পক্ষপাতের ওপর নির্ভরশীল। উল্লেখ্য, প্রতি ১০ জন রিপাবলিকানের মধ্যে সাতজন এই যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিকে সমর্থন করছেন, কিন্তু প্রতি ১০ জন ডেমোক্র্যাটের মধ্যে মাত্র একজন তা সমর্থন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার সফলতা বিচার করার আরেকটি উপায় হতে পারে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা। এই মাপকাঠিতে এবং এক মাসের সংঘাতের পর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের অনেক বেশি ক্ষতি করতে পেরেছে, উল্টোটা নয়। ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি; ইরানের বিমান ও নৌবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে; তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও পিছিয়ে পড়েছে; ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা কমে গেছে; এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ তীব্র বোমাবর্ষণের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, প্রধান বিষয় হলো– ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ ও বাণিজ্যপথ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে, যদিও তা এখন পর্যন্ত খুব বেশি স্থায়ী ক্ষতি করতে পারেনি।

তাহলে কেন মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র লড়াই জিতছে, কিন্তু সামগ্রিক যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে? এর উত্তর হয়তো প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দিক থেকে, ইরানের শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আঘাত করার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের লাভবান করার ক্ষমতা দেখায় যে ইসলামিক রিপাবলিকই ভালো অবস্থানে উঠে আসছে। যুদ্ধের ক্ষেত্রে টিকে থাকা এবং বিঘ্ন সৃষ্টি করা–এই দুটিই ছিল তেহরানের কৌশলগত লক্ষ্য। ট্রাম্পের দৃশ্যমান হতাশা স্পষ্ট করে যে তিনি যে দ্রুত সাফল্য চেয়েছিলেন, তা তিনি পাচ্ছেন না।

যুক্তরাষ্ট্রকে হারতে দেখা মনে হওয়ার প্রথম কারণ হলো যুদ্ধের শুরুতে তার সর্বোচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রুথ সোশালে পোস্ট করা এক ভিডিওতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, তিনি শাসন পরিবর্তন আশা করছেন। এছাড়াও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা শেষ করা, তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অঞ্চল অস্থিতিশীল করা থেকে বিরত রাখা, এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো তার লক্ষ্য। এগুলোর কোনোটিই এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।

যেমনটি ফরেন পলিসি-এর বিশ্লেষকরা যুদ্ধের শুরুতেই বলেছিলেন, ইরান তার নিজস্ব শাসন টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক পদগুলোর জন্য আগেই বিকল্প নেতৃত্ব নির্ধারণ করে রেখেছিল। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা কমেছে, তবুও এটি ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরান অতীতে কয়েক মাসের মধ্যেই তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন করার সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং এই যুদ্ধ শেষ হলেই আবার দ্রুত তা পুনর্গঠন করার সম্ভাবনা রয়েছে।

হিজবুল্লাহ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও টিকে আছে। এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এখনই যুদ্ধে প্রবেশ করেছে। সবশেষে, প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো ইরানের কোথায় রয়েছে কেউ জানে না।

দ্বিতীয় কারণ হলো– ইরান এখন পর্যন্ত বিশ্বে যে বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। জেট ফুয়েলের দাম ১২০ শতাংশ বেড়েছে…ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮৭ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এর বড় কারণ হলো ইরান হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও ২০ শতাংশ এলএনজি পরিবাহিত হয়। এই অবরোধ যত দীর্ঘ হবে…বিশ্ব তত বেশি চিপ ও খাদ্য সংকটে পড়বে। তবে এজন্য বিশ্বের মাত্র ১৮ শতাংশ ইরানকে দায়ী করেছে…২৯ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রকে এবং ৩৮ শতাংশ ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।

তৃতীয় কারণ হলো– যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে না অভ্যন্তরীণ, না আন্তর্জাতিক কোনো অনুমোদন নিয়েছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রকৃত মিত্র ইসরায়েল, যারা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন ও অজনপ্রিয়। ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক সম্পর্ক আরও দুর্বল হয়ে উঠছে।

চতুর্থত, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের তার প্রতিপক্ষদের অপ্রত্যাশিতভাবে লাভবান করছে। মার্কিন ট্রেজারি ইরান ও রাশিয়ার ওপর তেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তেহরান এখন আগের চেয়ে বেশি আয় করছে। মস্কো প্রতিদিন অতিরিক্ত ১৫০ মিলিয়ন ডলার পাচ্ছে।

সবশেষে, এই যুদ্ধ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও ট্রাম্পের সমর্থন কমিয়ে দিচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান সদস্য ন্যান্সি মেস বলেছেন, “আমি ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর পক্ষে নই।”

যুদ্ধের পূর্ণ মূল্যায়ন কেবল এর সমাপ্তির পরই সম্ভব। কিন্তু যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা শুধু টিকে থাকার কারণেই নিজেদের বিজয়ী মনে করবে। ভবিষ্যৎ নেতারা বুঝবেন– তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ ক্ষমতা হলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আঘাত করার সক্ষমতা। এটি হয়তো পুরোনো পারমাণবিক হুমকিও ত্যাগ করতে ইরানকে সাহায্য পারে।

তাহলে এই সংঘাতের অর্থ কী? সম্ভবত ট্রাম্প ইরানের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি ভুলভাবে বিচার করেছেন। এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের কষ্টে থাকা মানুষের কথা একবার ভাবুন। ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত…এক মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। ইসরায়েলে সাইরেন বাজলেই মানুষ বাঙ্কারে ছুটছে। এবং উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অস্থিরতার মুখোমুখি হচ্ছে যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি। যদি এই সব কিছুর ফল আবার আরেকটি ভবিষ্যৎ যুদ্ধ হয়, তাহলে এসব কিছুর মানে কী?

লেখক: ফরেন পলিসি-এর প্রধান সম্পাদক।

(লেখাটি ফরেন পলিসির সৌজন্যে এবং সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত)

সম্পর্কিত