Advertisement Banner

দেশে দেশে নববর্ষ, কোথায় কেমন?

দেশে দেশে নববর্ষ, কোথায় কেমন?
চীনের চন্দ্র নববর্ষ। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ খাওয়া, দলবেঁধে মেলায় যাওয়া আর বাজারে পুরনো ধারদেনা শোধ করে নতুন হালখাতা খোলা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতিতেই নববর্ষ পালনের রীতি আছে। আছে ভিন্ন সময় আর ভিন্ন রীতিনীতি।

প্রথমেই ইরানের নববর্ষ নওরোজ নিয়ে কথা বলা যাক। প্রাচীন পারস্য দেশের নববর্ষ নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন–

রূপের সওদা কে করিবি তোরা আয় রে আয়,

নওরোজের এই মেলায়!

ডামাডোল আজি চাঁদের হাট

লুট হল রূপ হল লোপাট!

খুলে ফেলে লাজ শরম-ঠাট

রূপসিরা সব রূপ বিলায়

বিনি-কিম্মতে হাসি-ইঙ্গিতে হেলাফেলায়

নওরোজের এই মেলায়!

প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বাদশাহ জামশিদের সময়ে নওরোজ উৎসবের প্রচলন হয় বলে বিবেচনা করা হয়। ইরানের বিখ্যাত কবি ও লেখকরা যেমন হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসী, আবু রায়হান বিরুনী ও তাবারিও জামশিদকে নওরোজের প্রচলনকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইরানিরা চাহার শাম্বে সুরি (বছরের শেষ বুধবার) উৎসবের মাধ্যমে নওরোজকে স্বাগত জানায়।

তবে শুধু ইরানি বা পার্সিরাই নয়, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, সিরিয়া ও আর্মেনিয়ায় বসবাসরত কুর্দিরা দীর্ঘকাল ধরে নওরোজ উদযাপন করে আসছে। উৎসবের ঠিক আগের রাতে তারা প্রথা অনুযায়ী আগুন জ্বালায়।

পারস্যের মহাকাব্য ‘শাহনামা’য় বর্ণিত জরাথ্রুস্টীয় পুরাণের ওপর ভিত্তি করেই তাদের এই উৎসবের আদি কথা প্রচলিত। মজার বিষয় হলো–কুর্দিরা নওরোজের সূচনার সাথে পার্সিদের মতো রাজা জামশিদের সেই চিরচেনা গল্পটি জুড়ে দেয় না। বরং কুর্দিদের বয়ানে এই দিনটির গুরুত্ব ফুটে ওঠে প্রাচীন কামার কাভেহ-র হাতে অত্যাচারী শাসক জহহাক-এর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।

তাই কুর্দিদের কাছে এই উৎসব মানেই হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, আর শোষণের বিরুদ্ধে বিজয়ের উদযাপন। আর বর্তমান সময়ে কুর্দিদের এই নওরোজ উদযাপন কেবল একটি নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং একটি স্বাধীন ‘কুর্দিস্তান’ গড়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতীকেও পরিণত হয়েছে। এ বছর যুদ্ধের মধ্যেও নওরোজ পালন করেছে ইরানি ও কুর্দিরা।

ইরানের নওরোজ উৎসব। ছবি:  উইকিমিডিয়া কমনস
ইরানের নওরোজ উৎসব। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

বহুবর্ণিল চীনের নববর্ষ

চীনে চান্দ্রপঞ্জিকা অনুযায়ী জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে যেকোনো দিন নতুন বছরের প্রথম দিন হতে পারে। এটি ১৫ দিনব্যাপী একটি বিশাল উৎসব, যা পারিবারিক পুনর্মিলন, উৎসবের ভোজ, সৌভাগ্যের প্রতীক লাল লণ্ঠন এবং লাকি মানি বা উপহারের টাকাভর্তি লাল খামে ভরপুর থাকে। অশুভ শক্তিকে তাড়াতে এবং সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে এখানে সিংহ নাচের আয়োজন করা হয়। এই উৎসবে সবখানেই লাল রঙের ছড়াছড়ি দেখা যায়। কারণ, লাল রংকে চীনা ঐতিহ্যে সুরক্ষা ও ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ভিয়েতনামে ‘তেত’

ভিয়েতনামে চন্দ্র নববর্ষ ‘তেত নগুয়েন দান’ হিসেবে উদযাপিত হয়, যা সাধারণত সংক্ষেপে ‘তেত’ নামে পরিচিত। চীনা নববর্ষের মতো এটিও একই চন্দ্রপঞ্জিকা অনুসরণ করে। তবে ‘তেত’ কেবল সৌভাগ্যের উৎসব নয়।। বরং এটি একটি নৈতিক শুদ্ধিকরণ বা মোরাল রিসেট-এর মাধ্যম।

তেত-এর মূল বার্তা হলো অসম্পূর্ণ বাধ্যবাধকতা বা দায়বদ্ধতা ছাড়াই নতুন বছর শুরু করা উচিত। ভিয়েতনামী বিশ্বাস অনুযায়ী, অমিমাংসিত বিষয়; যেমন–পুরনো দিনের মান-অভিমান, পারিবারিক দূরত্ব ও পূর্বপুরুষদের প্রতি অবহেলা নতুন বছরে বয়ে নিয়ে গেলে জীবনে ভারসাম্যের অভাব ঘটে। এসব ভুলে নতুন বছর শুরুর বার্তা দেয় এই ভিয়েতনামি চন্দ্র নববর্ষ।

তিব্বতে ‘লোসার’

তিব্বতের লোসার। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
তিব্বতের লোসার। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

তিব্বতি সংস্কৃতি যেসব অঞ্চলে আছে, সেখানে চন্দ্র নববর্ষ লোসার নামে উদযাপিত হয়। লোসার মূলত তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম ও প্রাচীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। ভিয়েতনামি নববর্ষের মতো এটিও আত্মশুদ্ধির একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত।

এই উৎসবে মঠগুলো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। সেখানে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক নৃত্য, নৈবেদ্য ও প্রার্থনা করা হয়। লোসার কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান নয়। এটি এক প্রস্তুতিমূলক প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য–গত বছরের কোনো আধ্যাত্মিক রেশ ছাড়াই নতুন বছরের যাত্রা নিশ্চিত করা। তিব্বত, ভুটান, নেপালের কিছু অংশে লোসার পালন করা হয়।

থাইল্যান্ডের সংক্রান

থাইল্যান্ড ১ জানুয়ারিকে স্বীকৃতি দিলেও দেশটির ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ–‘সংক্রান’ উদ্‌যাপিত হয় এপ্রিল মাসে। এই উৎসবের সময় মানুষেরা রাস্তায় নেমে পরস্পরের দিকে ওয়াটার গান ও বালতিতে করে পানি ছোড়ে। এই পানি ছোড়া মূলত দুর্ভাগ্য ধুয়ে-মুছে নতুনকে স্বাগত জানানোর প্রতীক। এ ছাড়া সপরিবারে মন্দিরে গিয়ে বুদ্ধমূর্তির ওপর পবিত্র পানি অর্পণ এবং বড়দের হাতে সুগন্ধি জল ঢেলে শ্রদ্ধা নিবেদনের চল রয়েছে।

থাইল্যান্ডের সংক্রান উৎসব। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
থাইল্যান্ডের সংক্রান উৎসব। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

১২ ঘণ্টায় ১২ আঙুর

স্পেনের নববর্ষে আবার আঙুর খাওয়ার রীতি আছে। মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটায় বারোটা বাজার প্রতিটি ঘণ্টার সাথে একটি করে মোট ১২টি আঙুর খেতে হবে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মধ্যরাতের মধ্যে বারোটি আঙুর খেয়ে শেষ করতে পারলে নতুন বছরের প্রতিটি মাসে সৌভাগ্য সাথী হবে। প্রথাটির নাম–লাস দোচে উভাস দে লা সুয়ের্তে, যার অর্থ ‘সৌভাগ্যের বারোটি আঙুর’। স্পেনের মানুষজন টেলিভিশনের সামনে জড়ো হয়ে মাদ্রিদের পুয়ের্তা দে সল-এর ঘড়ি টাওয়ারের কাউন্টডাউন দেখে।

ব্রাজিলে নববর্ষ সমুদ্রসৈকতে

এই দেশে নববর্ষ উদযাপনকে বলে রেভেইলন। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে লাখ লাখ মানুষ সাদা পোশাক পরে সমুদ্রসৈকতে সমবেত হয়। সাদা রং এখানে আগামী বছরের শান্তি এবং ইতিবাচক শক্তির প্রতীক। ঠিক মধ্যরাতের পর সাগরের পানিতে নেমে সাতটি ঢেউ ডিঙিয়ে নতুন বছরের জন্য সাতটি ইচ্ছা পূরণের প্রার্থনা করে। এ ছাড়া অনেকে সাগরের দেবী ইয়েমানজার উদ্দেশে ফুল বা ছোট ছোট উপহার পানিতে ভাসিয়ে দেয়।

ব্রাজিলে নববর্ষ পালন
ব্রাজিলে নববর্ষ পালন

হিজরি নববর্ষ

হিজরি নববর্ষ বা ইসলামি নববর্ষ সারা বিশ্বের মুসলিমরা পালন করে থাকে। এটি ইসলামি পঞ্জিকার প্রথম মাস মহররমের শুরুর দিনে পালন করা হয়। চাঁদের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় বলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এই উৎসবের তারিখ পরিবর্তিত হয়।

শিয়া সম্প্রদায় এই দিনটি জাঁকজমকভাবে পালন করলেও সুন্নিরা সাধারণত মসজিদে যায়, কুরআন তিলাওয়াত করে এবং পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটায়। মূলত এটি আত্মসমালোচনা করার এবং আসন্ন বছরে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ খোঁজার একটি সময়।

নিউজিল্যান্ডে উৎসব মানে গল্প

নিউজিল্যান্ডে মাওরি আদিবাসীরা গল্প বলার মাধ্যমে তাদের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ ‘মাতারিকি’ পালন করে। প্রতি বছর এই উৎসবের নির্দিষ্ট তারিখ পরিবর্তিত হলেও সাধারণত এটি মে মাসের শেষ দিকে অথবা জুন মাসের শুরুতে পালন করা হয়। ভোরের আকাশে ‘মাতারিকি’ নামক একটি নক্ষত্রপুঞ্জ (যা প্লাইডেস নামেও পরিচিত) দৃশ্যমান হওয়ার মধ্য দিয়েই এর সূচনা ঘটে। মাওরিরা তাদের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও উপকথা বর্ণনা এবং ঐতিহ্যবাহী নাচের মাধ্যমে দিনটি উদ্‌যাপন করে।

ইথিওপিয়ার ‘এনকুতাতাশ’

আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়াতে ঐতিহ্যবাহী নববর্ষের নাম ‘এনকুতাতাশ’। এর অর্থ হলো ‘রত্নের উপহার’। তাদের চার বছরের একটি বিশেষ চক্র রয়েছে, যেখানে প্রতিটি বছরের নামকরণ একেকজন ধর্মপ্রচারকের নামে। প্রচলিত আছে– রানী শেবা আসলে একজন ইথিওপীয় ছিলেন। রাজা সলোমনের সঙ্গে দেখা করে যখন তিনি ফেরেন, তখন তাকে নিজ দেশে ‘এনকু’ বা রত্নভাণ্ডার পূর্ণ করে স্বাগত জানানো হয়। উৎসবের দিন খুব ভোরে সবাই ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে গির্জায় যায় এবং এরপর সবাই মিলে ‘ইনজেরা’ নামক চ্যাপ্টা রুটি ও ‘ওয়াত’ বা স্টু দিয়ে পারিবারিক ভোজ সম্পন্ন করে। নতুন পোশাক পরে শিশুরা নাচে-গানে গ্রাম মুখরিত করে তোলে। এবং সন্ধ্যায় প্রতিটি বাড়িতে গান ও নাচের আসর বসাতে আগুন জ্বালানো হয়। মেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফুলের তোড়া উপহার দেয় ও গান গায়। আর ছেলেরা নিজেদের আঁকা ছবি বিক্রি করে।

সম্পর্কিত