কূটনীতিতে সব অর্জনের মূল্য টাকার অঙ্কে মাপা যায় না। এবারের সফরে এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেগুলো আগামী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
মেরিনা মিতু

ঝলমলে রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা, গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ধারাবাহিক বৈঠক, ১৭টি সমঝোতা স্মারক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিস্তৃত ঘোষণা–এসবই ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে।
এই চার দিনে কোনো হাজার কোটি ডলারের ঋণ ঘোষণা হয়নি। নতুন কোনো মেগা প্রকল্পও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়নি। ফলে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি খুব বেশি নয়। এই নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে জোরালো আলোচনা। কেউ এই সফরকে ইতিবাচক হিসেবে নিলেও অনেকেই দেখছেন ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে।
এই সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ সফরের দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে মতভেদ থাকলেও একটি প্রশ্নে অনেকেরই কৌতূহল এক জায়গায় এসে মিলেছে–চীন থেকে বাংলাদেশ আসলে কী পেল? বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ বা আর্থিক প্রতিশ্রুতি–কী আদায় করতে পেরেছে ঢাকা?
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ফেসবুকে লিখেছেন, “ভারতকে উপেক্ষা করে চীন সফর; ভারতের গোলামি থেকে বের হলো বিএনপি সরকার–এ জন্য সাধুবাদ। তবে চীন থেকে তো খালি হাতেই ফিরলেন। কত টাকার সহযোগিতা নিয়ে এলেন, সেটাই জনগণ জানতে চায়।”
শুধু আনোয়ার হোসেন নন, একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন আরও অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী। তাদের মতে, কূটনৈতিক সফরের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা এনে দিল, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধরনের প্রশ্ন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকেও করেছেন সাংবাদিকরা। তাতে তিনি ‘বিব্রত’ হয়েছেন। গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেছেন, “কোনো দিন কোনো সরকারপ্রধান আরেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে দিস্তা কাগজ নিয়ে, পেন্সিল নিয়ে বসে না, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যায় না। একটু আত্মসম্মান রাখেন। আমরা অন্য জায়গায় পৌঁছে গেছি। এটা বিশ্বাস করুন। এগুলো খুব বিব্রতকর প্রশ্ন।”
সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কূটনীতিতে সব অর্জনের মূল্য টাকার অঙ্কে মাপা যায় না। এবারের সফরে এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেগুলো আগামী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “প্রথম দেখায় সফরটিকে অনেকের কাছে ‘টাকার অঙ্কে’ খুব বড় সাফল্য মনে নাও হতে পারে। কোনো ১০ বা ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ঘোষণা হয়নি, নতুন মেগা প্রকল্পের অর্থায়নও চূড়ান্ত হয়নি। তবে এবারের সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন অর্থ নয়; বরং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের কৌশলগত ভিত্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। সেই জায়গাতে সরকারের শতভাগ সফলতা রয়েছে বলে মনে করি।”
চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক কাঠামোয় উন্নীত করা, মিয়ানমার হয়ে নতুন অর্থনৈতিক করিডোরের আলোচনা, প্রথমবারের মতো ‘টু প্লাস টু’ নিরাপত্তা সংলাপ, তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহযোগিতা, জিডিআইয়ে যোগদান এবং ১৭টি সমঝোতা–সব মিলিয়ে সফরের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো দৃশ্যমান অবকাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত।

প্রশ্ন হচ্ছে–বাংলাদেশ ঠিক কী পেল?
সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এতদিন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ছিল ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ পর্যায়ে। এবারের সফরে সেটিকে উন্নীত করে ‘কমিউনিটি উইথ আ শেয়ার্ড ফিউচার’ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক ভাষায় এটি শুধু একটি নতুন নাম নয়। এটি বোঝায়, দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
চীন সাধারণত যেসব দেশকে আঞ্চলিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তাদের সঙ্গেই এই ধরনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার পর বাংলাদেশও এখন সেই তালিকায় যুক্ত হলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন চরচাকে বলেন, “আমি বলব, সাম্প্রতিক সময়ে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সবচেয়ে সফল সফরগুলোর একটি এটি। কারণ, এবার চীন শুধু একটি সরকারের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বার্তা দিয়েছে।”
মিয়ানমার হয়ে নতুন করিডোর
সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর।
বহু বছর ধরে স্থবির থাকা বিসিআইএম ধারণাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে বেইজিং। এবার ভারতের পরিবর্তে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সড়ক, রেল ও সমুদ্র যোগাযোগের একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বড় সুযোগ তৈরি হবে–
তবে করিডোরটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর একটি বড় অংশ যাবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা সংকট বিরাজ করছে।

তবু লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, “চীন যখন এমন প্রস্তাব দিয়েছে, তখন তারা নিশ্চয়ই সম্ভাবনা দেখেই দিয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “এইটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। এটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার না করেই চীনের সঙ্গে স্থল যোগাযোগের নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারে।”
নিরাপত্তাতেও নতুন সমীকরণ
এই সফরের আরেকটি বড় দিক ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও চীন পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘টু প্লাস টু’ সাধারণত সেই দেশগুলোর সঙ্গেই করা হয়, যাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বড় অংশই চীন থেকে আসে। এখন সেই সম্পর্ক শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ না থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নিয়মিত সংলাপে রূপ নিতে পারে।
‘টু প্লাস টু’ ব্যবস্থাকে সফরের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলগত সংলাপের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই সংলাপ এগিয়ে নেওয়া হবে এবং এর কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
তিস্তা প্রকল্পে অর্থ নয়, এল রাজনৈতিক বার্তা
তিস্তা মহাপরিকল্পায় চীনের কাছ থেকে অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে–এমন প্রত্যাশা ছিল অনেকের। তবে এবারের সফরে সে ধরনের কোনো ঘোষণা না এলেও প্রকল্পটির বাস্তবায়নে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং।
দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী পরিকল্পনা, বন্যার পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে বাংলাদেশ ও চীন।
একইসঙ্গে চীন জানিয়েছে, নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা দেবে তারা। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের যৌথ কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বেইজিং।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থায়নের সরাসরি ঘোষণা না এলেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে চীনের প্রতিশ্রুতি প্রকল্পটির বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের সিদ্ধান্তের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়।
তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের ‘উদ্বেগের’ প্রসঙ্গে শুক্রবার এক প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে প্রস্তুত চীন। এক্ষেত্রে অর্থনীতি ও বাণিজ্য, পানি সংরক্ষণ ও জীবিকার মতো ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়াতে চায়।
গুও জিয়াকুন বলেন, “জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে কী করা যায়, তার জন্য প্রস্তুত আছে চীন। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপমুক্ত থাকা উচিত।”
জিডিআইয়ে গিয়ে কী পেল বাংলাদেশ?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) যোগ দেওয়া এবারের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
প্রায় চার বছর ধরে আলোচনার পর বাংলাদেশ অবশেষে এই উদ্যোগে যুক্ত হলো।
জিডিআই মূলত উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রযুক্তি সহযোগিতা, কৃষি, জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চীনের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম।
বিআরআইয়ের পর এটি বাংলাদেশের জন্য চীনের আরেকটি বড় উন্নয়ন কাঠামোয় প্রবেশের সুযোগ।
১৭টি সমঝোতা: গুরুত্ব কোথায়?
সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা ও চুক্তি সই হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে–
এসবের অনেকগুলোর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং-এর এক কর্মকর্তা।
সব অর্জনের পরও কয়েকটি প্রশ্ন এখনো সামনে রয়েছে।
এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ চরচাকে বলেন, “চীনের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতির ঘাটতি নেই। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাংলাদেশের বাস্তবায়ন সক্ষমতা। অতীতেও অনেক প্রতিশ্রুতি কাগজে ছিল, কিন্তু বাস্তবে এগোয়নি।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে ঢাকা কতটা সক্ষম হয়, তা এখন দেখার বিষয়। কারণ, কূটনীতিতে চুক্তির চেয়ে বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ চরচাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশের স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন। আমরা বিশ্বাস করি, একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।”
তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “সব কূটনৈতিক সফরের ফল তাৎক্ষণিকভাবে অর্থের অঙ্কে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় ভবিষ্যতের বড় বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়। চীন সফর সেই ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে আমরা মনে করি।”

ঝলমলে রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা, গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ধারাবাহিক বৈঠক, ১৭টি সমঝোতা স্মারক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিস্তৃত ঘোষণা–এসবই ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে।
এই চার দিনে কোনো হাজার কোটি ডলারের ঋণ ঘোষণা হয়নি। নতুন কোনো মেগা প্রকল্পও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়নি। ফলে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি খুব বেশি নয়। এই নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে জোরালো আলোচনা। কেউ এই সফরকে ইতিবাচক হিসেবে নিলেও অনেকেই দেখছেন ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে।
এই সফর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ সফরের দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে মতভেদ থাকলেও একটি প্রশ্নে অনেকেরই কৌতূহল এক জায়গায় এসে মিলেছে–চীন থেকে বাংলাদেশ আসলে কী পেল? বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ বা আর্থিক প্রতিশ্রুতি–কী আদায় করতে পেরেছে ঢাকা?
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ফেসবুকে লিখেছেন, “ভারতকে উপেক্ষা করে চীন সফর; ভারতের গোলামি থেকে বের হলো বিএনপি সরকার–এ জন্য সাধুবাদ। তবে চীন থেকে তো খালি হাতেই ফিরলেন। কত টাকার সহযোগিতা নিয়ে এলেন, সেটাই জনগণ জানতে চায়।”
শুধু আনোয়ার হোসেন নন, একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন আরও অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী। তাদের মতে, কূটনৈতিক সফরের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা এনে দিল, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধরনের প্রশ্ন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকেও করেছেন সাংবাদিকরা। তাতে তিনি ‘বিব্রত’ হয়েছেন। গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেছেন, “কোনো দিন কোনো সরকারপ্রধান আরেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে দিস্তা কাগজ নিয়ে, পেন্সিল নিয়ে বসে না, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যায় না। একটু আত্মসম্মান রাখেন। আমরা অন্য জায়গায় পৌঁছে গেছি। এটা বিশ্বাস করুন। এগুলো খুব বিব্রতকর প্রশ্ন।”
সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কূটনীতিতে সব অর্জনের মূল্য টাকার অঙ্কে মাপা যায় না। এবারের সফরে এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেগুলো আগামী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “প্রথম দেখায় সফরটিকে অনেকের কাছে ‘টাকার অঙ্কে’ খুব বড় সাফল্য মনে নাও হতে পারে। কোনো ১০ বা ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ঘোষণা হয়নি, নতুন মেগা প্রকল্পের অর্থায়নও চূড়ান্ত হয়নি। তবে এবারের সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন অর্থ নয়; বরং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের কৌশলগত ভিত্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। সেই জায়গাতে সরকারের শতভাগ সফলতা রয়েছে বলে মনে করি।”
চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক কাঠামোয় উন্নীত করা, মিয়ানমার হয়ে নতুন অর্থনৈতিক করিডোরের আলোচনা, প্রথমবারের মতো ‘টু প্লাস টু’ নিরাপত্তা সংলাপ, তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহযোগিতা, জিডিআইয়ে যোগদান এবং ১৭টি সমঝোতা–সব মিলিয়ে সফরের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো দৃশ্যমান অবকাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত।

প্রশ্ন হচ্ছে–বাংলাদেশ ঠিক কী পেল?
সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এতদিন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ছিল ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ পর্যায়ে। এবারের সফরে সেটিকে উন্নীত করে ‘কমিউনিটি উইথ আ শেয়ার্ড ফিউচার’ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক ভাষায় এটি শুধু একটি নতুন নাম নয়। এটি বোঝায়, দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
চীন সাধারণত যেসব দেশকে আঞ্চলিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তাদের সঙ্গেই এই ধরনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার পর বাংলাদেশও এখন সেই তালিকায় যুক্ত হলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন চরচাকে বলেন, “আমি বলব, সাম্প্রতিক সময়ে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সবচেয়ে সফল সফরগুলোর একটি এটি। কারণ, এবার চীন শুধু একটি সরকারের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বার্তা দিয়েছে।”
মিয়ানমার হয়ে নতুন করিডোর
সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর।
বহু বছর ধরে স্থবির থাকা বিসিআইএম ধারণাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে বেইজিং। এবার ভারতের পরিবর্তে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সড়ক, রেল ও সমুদ্র যোগাযোগের একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বড় সুযোগ তৈরি হবে–
তবে করিডোরটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর একটি বড় অংশ যাবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা সংকট বিরাজ করছে।

তবু লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, “চীন যখন এমন প্রস্তাব দিয়েছে, তখন তারা নিশ্চয়ই সম্ভাবনা দেখেই দিয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “এইটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। এটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, এই করিডোরের মাধ্যমে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার না করেই চীনের সঙ্গে স্থল যোগাযোগের নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারে।”
নিরাপত্তাতেও নতুন সমীকরণ
এই সফরের আরেকটি বড় দিক ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও চীন পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘টু প্লাস টু’ সাধারণত সেই দেশগুলোর সঙ্গেই করা হয়, যাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বড় অংশই চীন থেকে আসে। এখন সেই সম্পর্ক শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ না থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নিয়মিত সংলাপে রূপ নিতে পারে।
‘টু প্লাস টু’ ব্যবস্থাকে সফরের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলগত সংলাপের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই সংলাপ এগিয়ে নেওয়া হবে এবং এর কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
তিস্তা প্রকল্পে অর্থ নয়, এল রাজনৈতিক বার্তা
তিস্তা মহাপরিকল্পায় চীনের কাছ থেকে অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে–এমন প্রত্যাশা ছিল অনেকের। তবে এবারের সফরে সে ধরনের কোনো ঘোষণা না এলেও প্রকল্পটির বাস্তবায়নে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং।
দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী পরিকল্পনা, বন্যার পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে বাংলাদেশ ও চীন।
একইসঙ্গে চীন জানিয়েছে, নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা দেবে তারা। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের যৌথ কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বেইজিং।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থায়নের সরাসরি ঘোষণা না এলেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে চীনের প্রতিশ্রুতি প্রকল্পটির বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের সিদ্ধান্তের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়।
তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের ‘উদ্বেগের’ প্রসঙ্গে শুক্রবার এক প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে প্রস্তুত চীন। এক্ষেত্রে অর্থনীতি ও বাণিজ্য, পানি সংরক্ষণ ও জীবিকার মতো ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়াতে চায়।
গুও জিয়াকুন বলেন, “জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে কী করা যায়, তার জন্য প্রস্তুত আছে চীন। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপমুক্ত থাকা উচিত।”
জিডিআইয়ে গিয়ে কী পেল বাংলাদেশ?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) যোগ দেওয়া এবারের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
প্রায় চার বছর ধরে আলোচনার পর বাংলাদেশ অবশেষে এই উদ্যোগে যুক্ত হলো।
জিডিআই মূলত উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রযুক্তি সহযোগিতা, কৃষি, জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চীনের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম।
বিআরআইয়ের পর এটি বাংলাদেশের জন্য চীনের আরেকটি বড় উন্নয়ন কাঠামোয় প্রবেশের সুযোগ।
১৭টি সমঝোতা: গুরুত্ব কোথায়?
সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা ও চুক্তি সই হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে–
এসবের অনেকগুলোর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং-এর এক কর্মকর্তা।
সব অর্জনের পরও কয়েকটি প্রশ্ন এখনো সামনে রয়েছে।
এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ চরচাকে বলেন, “চীনের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতির ঘাটতি নেই। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাংলাদেশের বাস্তবায়ন সক্ষমতা। অতীতেও অনেক প্রতিশ্রুতি কাগজে ছিল, কিন্তু বাস্তবে এগোয়নি।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে ঢাকা কতটা সক্ষম হয়, তা এখন দেখার বিষয়। কারণ, কূটনীতিতে চুক্তির চেয়ে বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ চরচাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশের স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন। আমরা বিশ্বাস করি, একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।”
তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “সব কূটনৈতিক সফরের ফল তাৎক্ষণিকভাবে অর্থের অঙ্কে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় ভবিষ্যতের বড় বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়। চীন সফর সেই ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে আমরা মনে করি।”