Advertisement Banner

মিয়ানমারের বিরল খনিজ চীনের ‘হাতে’, কী ভাবছে আমেরিকা?

মিয়ানমারের বিরল খনিজ চীনের ‘হাতে’, কী ভাবছে আমেরিকা?
বিরল খনিজ থাকা মিয়ানমারের কাচিন রাজ্য এখন বিদ্রোহীদের দখলে। ছবি: রয়টার্স

বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের স্নায়ু এখন একটি বিশেষ উপাদানের ওপর টিকে আছে। আর এর নাম হলো ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস’ বা বিরল মৃত্তিকা উপাদান। বিশেষ করে স্মার্টফোন, ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি থেকে শুরু করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন–সবকিছুতেই অপরিহার্য এই বিরল মৃত্তিকা। আর এই খনিজ সম্পদের মানচিত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ‘ফ্ল্যাশপয়েন্ট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার। মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যের পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা ‘হেভি রেয়ার আর্থ’ (এইচআরইই) এখন বেইজিং এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে প্রধান ঘুঁটি হয়ে উঠেছে।

মিয়ানমার বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ‘রেয়ার আর্থ’ উৎপাদনকারী দেশ। তবে এর চেয়েও বড় সত্য হলো, আধুনিক উচ্চ-প্রযুক্তিগত চুম্বক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ‘ডিসপ্রোসিয়াম’ এবং ‘টারবিয়ামের’ প্রায় ৭০ শতাংশই আসে মিয়ানমারের খনি থেকে। কিন্তু এই খনিজগুলো এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। এখন যদিও দেশটিতে নির্বাচন হয়েছে। জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইংই অবশ্য হয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট।  

সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কাচিন রাজ্যের ‘চিপউই-পাংওয়া’ খনিজ বলয় মূলত নিয়ন্ত্রণ করে বিদ্রোহী গোষ্ঠী কাচিন ইনডিপেনডেন্স অরগানাইজেশন (কেআইও)। বেইজিং অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে। তারা সরাসরি জান্তা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও একটি অলিখিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখে।

আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা গ্লোবাল উইটনেসের একাধিকা তদন্তে দাবি করা হয়, নিজ দেশে পরিবেশ দূষণ কমানোর জন্য খনিগুলো বন্ধ করে দিয়ে মিয়ানমারকে একটি ‘দূষণ কেন্দ্রে’ পরিণত করেছে চীন। মিয়ানমার থেকে উত্তোলিত আকরিক সরাসরি সীমান্ত পেরিয়ে চীনে যায়, কারণ এটি পরিশোধনের ক্ষমতা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের হাতে বর্তমানে নেই। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ডিপ্লোম্যাটও। তবে এ ব্যাপারে চীনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এই অভিযোগ অগ্রাহ্যও করেনি দেশটি।

আমেরিকার অস্বস্তি ও কোয়াড কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ই ‘ক্রিটিকাল মিনারেলস’ বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদকে জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০২৬ সালে এসে আমেরিকা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তারা দেখছে যে, মিয়ানমারের খনিজের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ মানেই হলো আমেরিকার হাই-টেক এবং প্রতিরক্ষা খাতের নিয়ন্ত্রণ বেইজিংয়ের হাতে থাকা।

এশিয়া টাইমস বলছে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমেরিকা তার মিত্র জোট ‘কোয়াডকে’ (আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) সক্রিয় করেছে।

কোয়াড দেশগুলোর লক্ষ্য হলো একটি ‘চীন-মুক্ত’ সরবরাহ চেইন তৈরি করা। কিন্তু সমস্যা হলো তিনটি–

১. রেয়ার আর্থ পরিশোধনের প্ল্যান্ট তৈরি করতে দীর্ঘ সময় এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন।

২. এই খনিজ পরিশোধন রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত বিষাক্ত, যা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৩. মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে আসা খনিজ কিনলে তা পরোক্ষভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অর্থায়ন করার সমতুল্য।

মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যের পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা ‘হেভি রেয়ার আর্থ’। ছবি: রয়টার্স
মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যের পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা ‘হেভি রেয়ার আর্থ’। ছবি: রয়টার্স

ভারতের ‘নর্থ-ইস্ট’ ও দ্বিমুখী সংকট

মিয়ানমারের সঙ্গে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত থাকা ভারতের অবস্থান এই লড়াইয়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল। ভারতের ‘ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিনারেল মিশন’-এর অধীনে নয়াদিল্লি চাচ্ছে মিয়ানমারের খনিজ সম্পদকে চীনের দিকে প্রবাহিত হতে না দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিয়ে আসতে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভারত যদি আসামের মতো অঞ্চলে বড় আকারের প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে, তবে তারা চীনের ‘একক ক্রেতার’ প্রভাব কমাতে পারবে। কিন্তু এর জন্য ভারতকে এক বিপজ্জনক কূটনীতি খেলতে হচ্ছে। একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য তাদের জান্তা সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে খনিজ সরবরাহের নিশ্চয়তার জন্য কাচিন বিদ্রোহীদের সঙ্গেও ‘অনানুষ্ঠানিক’ যোগাযোগ বজায় রাখতে হচ্ছে।

আসল যুদ্ধ যেখানে

অনেকেই মনে করেন খনি দখল করলেই জয় নিশ্চিত। কিন্তু মিয়ানমারের ক্ষেত্রে আসল ক্ষমতা খনিতে নয়, বরং পরিশোধনাগারে। চীন কেবল মিয়ানমারের খনির মালিক নয়, তারা মিয়ানমার থেকে আসা কাঁচামালকে পরিশোধিত করার ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা বিশেষায়িত প্রযুক্তির মালিক।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি হেভি রেয়ার আর্থ পৃথকীকরণ ক্ষমতা চীনের হাতে। আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া খনি থেকে পাথর তুলতে পারলেও, তা থেকে দরকারি উপাদান আলাদা করার জন্য চীনের কারখানার দ্বারস্থ হতে হয়। আমেরিকা এখন লিনাস বা এমপি ম্যাটেরিয়ালসের মতো প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা দিচ্ছে যাতে এই ‘ডাউনস্ট্রিম’ বা পরবর্তী ধাপের প্রক্রিয়াকরণ চীনের বাইরে সম্পন্ন করা যায়।

পরিবেশগত-মানবিক বিপর্যয়

মিয়ানমারের কাচিন অঞ্চলে বর্তমানে যে পদ্ধতিতে খনিজ উত্তোলন করা হচ্ছে, তাকে বলা হয় ‘ইন-সিটু লিচিং’। এতে পাহাড়ের গায়ে গর্ত করে সরাসরি বিষাক্ত অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া হয়। এর ফলে স্থানীয় নদ-নদী এবং ভূগর্ভস্থ পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যের বিরল খনিজ উত্তোলন। ছবি: রয়টার্স
মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যের বিরল খনিজ উত্তোলন। ছবি: রয়টার্স

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এই খনিজ বাণিজ্যের টাকা দিয়ে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র কিনছে এবং মাদক পাচার করছে। আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো যখন ‘ক্লিন এনার্জি’ বা সবুজ শক্তির কথা বলে, তখন সেই সৌর প্যানেল বা ই-কার তৈরিতে ব্যবহৃত মিয়ানমারের এই বিষাক্ত ও রক্তক্ষয়ী খনিজ তাদের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

কে জিতবে?

২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মিয়ানমার ও বিরল খনিজের ভূ-রাজনীতি তিনটি সম্ভাব্য পরিণতির দিকে যাচ্ছে। এক. চীন যদি তার পরিশোধনের একচেটিয়া অধিকার বজায় রাখতে পারে, তবে কোয়াড দেশগুলো শেষ পর্যন্ত বেইজিংয়ের শর্তেই খনিজ কিনতে বাধ্য হবে। তাতে চীনেরই জয় হবে।

দুই. যদি আমেরিকা ও ভারত দ্রুত মিয়ানমারের কাঁচামাল ব্যবহার করে নিজস্ব কারখানায় পরিশোধন শুরু করতে পারে, তবে চীনের দাপট কমবে। এতে আমেরিকাকেই জয়ী মনে হতে পারে।

তবে আরকেটি পথও আছে। মানবাধিকার এবং পরিবেশগত কারণে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো যদি মিয়ানমারের খনিজ কেনা বন্ধ করে দেয়, তবে এই পুরো ব্যবসাটি আরও অন্ধকার এবং অনিয়ন্ত্রিত পথে চলে যাবে, যা চীনের জন্য আরও লাভজনক হবে। এখানেও চীনের জয় হবে।

মোদ্দাকথা, এখানে চীনই দৌঁড়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে।

মিয়ানমারের কাচিন পাহাড়ের দখল কার হাতে থাকবে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো–ইন্দো-প্যাসিফিকের ‘সলভেন্ট এক্সট্রাকশন’ বা খনিজ পৃথকীকরণ প্ল্যান্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? খনিজ নিরাপত্তা এখন আর কেবল সরবরাহের বিষয় নয়, এটি একটি দেশের শিল্প সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। আমেরিকা ও তার মিত্রদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে একটি অগণতান্ত্রিক ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে নিজেদের গণতান্ত্রিক ও পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তি রক্ষা করা যায়। এই ভারসাম্য রক্ষাই নির্ধারণ করবে আগামীর বিশ্ব অর্থনীতিতে কে নেতৃত্ব দেবে।

তবে আপাতত মনে হচ্ছে, এই কাজ বেশ কঠিন। এখানে হুট করে ইরান কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো হামলাও করতে চাইবে না আমেরিকা। তবে অদূর ভবিষ্যতে সেই হামলার আশঙ্কা নাকচও করা যায় না। তেমন হলে, এই এলাকাও আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

সম্পর্কিত