Advertisement Banner

থানায় মূল্যবান সম্পদ রাখার পরামর্শ কমিশনারের, অনীহা পুলিশের

থানায় মূল্যবান সম্পদ রাখার পরামর্শ কমিশনারের, অনীহা পুলিশের
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানী ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার আগে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল বাসায় অরক্ষিত অবস্থায় না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার। তিনি বলেছেন, সম্ভব হলে এসব মূল্যবান সামগ্রী ঢাকায় আত্মীয়স্বজনের কাছে রেখে যেতে হবে। আর ঢাকায় আত্মীয়স্বজন না থাকলে প্রয়োজনে থানায়ও রাখা যেতে পারে।

তবে কমিশনারের এই বক্তব্যে অনীহা মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের। থানার চিত্র বলছে, মূল্যবান সম্পদ রাখার বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিরুৎসাহিত না করলেও বাস্তবে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তারা ব্যাংকের লকার ব্যবহারের পরামর্শই বেশি দিচ্ছেন।

গত রোববার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঈদে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা ও ফাঁকা রাজধানীর নিরাপত্তা পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে কমিশনার মো. সরওয়ার নগরবাসীর উদ্দেশে একাধিক নিরাপত্তা নির্দেশনা দেন।

কমিশনার বলেন, “ঈদের ছুটিতে রাজধানী অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। তাই নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার বা গুরুত্বপূর্ণ দলিল বাসায় অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যাবেন না। সম্ভব হলে আত্মীয়স্বজনের বাসায় রেখে যান। ঢাকায় কারও আত্মীয়স্বজন না থাকলে প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা নিতে পারেন। থানায়ও রেখে যেতে পারেন।”

পাশাপাশি বাসা ছাড়ার আগে দরজা-জানালা সঠিকভাবে বন্ধ আছে কি না তা নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ পরীক্ষা করে যাওয়া, বাসাবাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বা পুরোনো ক্যামেরা সচল রাখা এবং রাতের বেলায় বাসার আশপাশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

থানায় বাস্তব চিত্র

মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও শাহবাগ থানাসহ বিভিন্ন থানায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখনো পর্যন্ত কোনো নাগরিক স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ বা গুরুত্বপূর্ণ দলিল থানায় জমা রাখতে আসেননি। এমনকি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আবেদনও পড়েনি। ডিএমপির তেজগাঁও ও রমনা বিভাগের ১২টি থানাতেও একই চিত্র পাওয়া গেছে।

রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, “এখনো কোনো নাগরিক তাদের কোনো কিছু রাখতে আসেননি। কেউ চাইলে আমরা নিয়ম অনুযায়ী রাখব। তবে নাগরিকদের মূল্যবান জিনিসপত্র থানায় না রেখে ব্যাংকের লকারে রাখাই বেশি ভালো।”

কীভাবে রাখা যাবে থানায়?

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) জানান, সাধারণত নির্বাচনের আগে যেসব নাগরিকের বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, সেগুলো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে থানায় জমা রাখা হয়। পরে জিডির কপি দেখিয়ে অস্ত্র ফেরত নেওয়া যায়।

একই পদ্ধতিতে কোনো নাগরিক স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ বা মূল্যবান দলিল থানায় রাখতে চাইলে জিডি করে জমা রাখতে পারবেন। পরে জিডির কপি দেখিয়ে তা ফেরত নিতে হবে। এসব জিনিস থানার সুরক্ষিত কক্ষে সংরক্ষণ করা হবে। তবে নাগরিকদের মালামাল রাখার জন্য থানায় আলাদা করে কোনো লকার বা ভোল্ট নেই। সাধারণ থানায় একটি অস্ত্রগার রয়েছে। সেটি সবসময়ই নিরাপত্তা ও সুরক্ষিত রাখা হয়। আর কেউ কোনো কিছু জমা রাখলে সেখানেই রাখা হবে।

তবে এখানেই রয়েছে বড় বাস্তব প্রতিবন্ধকতা। তেজগাঁও থানার ওসি কৈশ্যনু মারমা বলেন, “এখনো কেউ রাখতে আসেনি। কেউ চাইলে অবশ্যই রাখবো। কিন্তু স্বর্ণালংকার আসল কি না, বা টাকা জাল কি না! তা যাচাই করার মতো কোনো যন্ত্রপাতি থানায় নেই। বাইরে থেকে যাচাই-বাছাই করে আনতে হবে। পরে কেউ অভিযোগ তুললে সেটা আমাদের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।”

শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “থানায় রাখার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। এখানে জিনিসপত্র নিরাপদেই থাকবে। কিন্তু কেউ নকল স্বর্ণ রেখে পরে অভিযোগ করলেন যে তা পরিবর্তন করা হয়েছে, তখন আমরা কী করব? আবার কেউ জাল টাকা রেখে পরে অভিযোগ তুলতে পারেন। এ ধরনের ঝুঁকি আছে।”

তার মতে, “নাগরিকদের মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার জন্য ব্যাংকের আলাদা আলাদা লকারের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে লকারের চাবি গ্রাহকের কাছেই থাকে। সেটাই বেশি নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত।”

ব্যাংক লকারই নিরাপদ বিকল্প?

থানায় পৃথক লকার ব্যবস্থা না থাকায় এবং স্বর্ণ বা নগদ অর্থ যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত সুবিধা না থাকায় পুলিশ কর্মকর্তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকের লকার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, ব্যাংকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মালিকানা, যাচাই এবং নিরাপত্তা, সবকিছুই সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে থাকে।

অন্যদিকে, থানায় জমা রাখার ক্ষেত্রে জিডির মাধ্যমে নথিভুক্ত করা হলেও যাচাইসংক্রান্ত জটিলতা ভবিষ্যতে বিতর্ক বা অভিযোগের জন্ম দিতে পারে—এ আশঙ্কাই করছেন থানা-পুলিশ।

নাগরিকদের করণীয়

ঈদে রাজধানী ছাড়ার আগে নগরবাসীকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল বাসায় অরক্ষিত অবস্থায় না রেখে সম্ভব হলে আত্মীয়স্বজনের কাছে সংরক্ষণ করতে হবে। বাসা ত্যাগের আগে দরজা-জানালা ঠিকভাবে বন্ধ আছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ পরীক্ষা করে যেতে হবে। পাশাপাশি বাসাবাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বা পুরোনো ক্যামেরা সচল রাখা এবং আশপাশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তবে কমিশনার থানায় মূল্যবান সম্পদ রাখার সুযোগের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে পুলিশের অবস্থান কিছুটা সতর্ক। আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি না থাকলেও যাচাই-বাছাই ও সংরক্ষণসংক্রান্ত বাস্তব সীমাবদ্ধতার কারণে পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যাংকের লকার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন।

সম্পর্কিত