প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় সামরিক হামলা চালান কোনো সুসংগত যুক্তি উপস্থাপন না করে এবং কংগ্রেসের সামনে বিষয়টি প্রকাশ্যে না এনে। এর ফলে ফেডারেল সরকারের প্রতি জনসাধারণের আস্থা আরও ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
এই আস্থা ১৯৭০-এর দশকের শুরু থেকেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। কেউ কেউ ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, কিংবা এজরা ক্লেইন ও ডেরেক থমসনের মতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকে এর কারণ হিসেবে দেখান। এসব কারণই ব্যাখ্যা করে কেন অনেক আমেরিকান সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান। তবে আস্থা ক্ষয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে যুদ্ধ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ সেই আস্থাকে ভেঙে দেয়, যা আমেরিকানরা নিউ ডিল ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফেডারেল সরকারের ওপর গড়ে তুলেছিল। সামরিক অভিযানের ভুল ব্যবস্থাপনা একটি জাতির কতটা ক্ষতি করতে পারে– এই স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে আছে।
প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন যখন ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বাড়ান, তখনও দেশের বেশির ভাগ মানুষ ফেডারেল (কেন্দ্রীয়) সরকারের প্রতি আস্থা রাখত। ১৯৩০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের নিউ ডিল কর্মসূচি এবং ১৯৪০-এর দশকে বৈশ্বিক ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার সাফল্য– এই দুই বিষয় ওয়াশিংটনের সক্ষমতার ওপর জনআস্থা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সময়ে ফেডারেল সরকারের পরিধি ও কার্যক্রম নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়, যা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় থাকা লাখো আমেরিকানকে স্বস্তি দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলে।
এই কারণেই ১৯৫০-এর দশকের জনপ্রিয় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার মনে করতেন, রুজভেল্টের ঐতিহ্য ভেঙে ফেলার যেকোনো চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে বিপর্যয় ডেকে আনবে। ১৯৫৪ সালে তিনি তার ভাই এডগারকে লিখেছিলেন, “যদি কোনো রাজনৈতিক দল সামাজিক নিরাপত্তা, বেকারভাতা বাতিল করতে এবং শ্রম আইন ও কৃষি কর্মসূচি তুলে দিতে চায়, তবে সেই দলের নাম আর আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে শোনা যাবে না।” ১৯৫৮ সালে, ন্যাশনাল ইলেকশন স্টাডি অনুযায়ী, ৭৩ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করত যে ফেডারেল সরকার ‘প্রায় সবসময় বা বেশির ভাগ সময় সঠিক কাজটি করবে।’
প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, যিনি ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন প্রজন্মকে ওয়াশিংটনের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস করতে উদ্বুদ্ধ করেন। তার অভিষেক ভাষণে তিনি বলেন, “দেশ আপনার জন্য কী করতে পারে তা জিজ্ঞেস করবেন না– আপনি দেশের জন্য কী করতে পারেন তা জিজ্ঞেস করুন।”
এরপর আসে ভিয়েতনামের বিপর্যয়। ১৯৬৭ ও ১৯৬৮ সালে জনসাধারণ বুঝতে শুরু করে যে, প্রশাসন যুদ্ধ সম্পর্কে সত্য বলছে না। যখন মাঠে থাকা সাংবাদিকেরা সরকারি সামরিক বিবৃতির বাইরে গিয়ে বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে শুরু করেন তখন তা আরও স্পষ্ট হয়। ধীরে ধীরে গণমাধ্যম এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে, যা উত্তর ভিয়েতনাম ও ভিয়েত কংয়ের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর সমস্যাগুলো প্রকাশ করে। একই সময়ে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনও সংবাদপত্র, লিফলেট ও সমাবেশের মাধ্যমে সরকারি বক্তব্যের সত্যতা চ্যালেঞ্জ করে নিজেদের তথ্য তুলে ধরতে থাকে।
ভিয়েতনাম ও আমেরিকার মধ্যকার যুদ্ধ। ছবি: রয়টার্সএই দুই প্রবণতা একত্রিত হয় ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন সিবিএস-এর উপস্থাপক ওয়াল্টার ক্রনকাইট টেট আক্রমণের সময় ভিয়েতনাম সফর শেষে টেলিভিশনে বলেন, যা সরকারি দাবি (যুদ্ধ শেষের পথে) এর বিপরীত ছিল বাস্তবতা। এবং সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতার প্রচলিত সীমা ভেঙে তিনি বলেন: “এই প্রতিবেদকের কাছে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পথ হলো আলোচনা– বিজয়ী হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্র রক্ষার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা একটি সম্মানজনক জাতি হিসেবে।”
১৯৬৫ সালে জনসন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি কংগ্রেসের মাধ্যমে পাস করান, কিন্তু তার মেয়াদের শেষ দিকে তিনি একটি ‘বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট’-এ আটকে পড়েন, যা বহু ভোটারকে তার কথার ওপর আস্থা হারাতে বাধ্য করে।
১৯৭১ সালে পেন্টাগন পেপারস প্রকাশ– যা প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি গোপন গবেষণা ছিল। ড্যানিয়েল এলসবার্গ সাংবাদিকদের কাছে ফাঁস করেন। এটাই যুদ্ধ ঘিরে মিথ্যা, প্রতারণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের পুরো ইতিহাস উন্মোচন করে। সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিকসনের প্রকাশনা বন্ধের চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও দ্য ওয়াশিংটর পোস্ট-সহ বহু গণমাধ্যম আমেরিকানদের সামনে তুলে ধরে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র একটি মারাত্মক জটিল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর অনেক কিছুই ছিল প্রেসিডেন্ট ও কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের বক্তব্যের উল্টো।
যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত: যেমন ১৯৬৪ সালের আগস্টে গালফ অব টনকিন রেজোলিউশন পাস করানো হয়েছিল ভুল তথ্য বা সরাসরি মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে। এটি দেখায় যে প্রেসিডেন্টরা জনআস্থাকে ভঙ্গ করতে কতদূর যেতে প্রস্তুত ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে সরকার কীভাবে তাদের কর্মকাণ্ড গোপন রেখেছিল, তা আরও স্পষ্ট হয় কংগ্রেসম্যান ওটিস পাইক ও সিনেটর ফ্রাঙ্ক চার্চের নেতৃত্বে হওয়া শুনানিতে। সেখানে দেখা যায়, গণতন্ত্র রক্ষার নামে কর্মকর্তারা বিদেশি নেতাদের হত্যার চেষ্টা করেছেন, যুদ্ধবিরোধী মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালিয়েছেন এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করেছেন।
১৯৭৬ সালের নির্বাচনে জিমি কার্টার প্রতিশ্রুতি দেন, “আমি কখনো আমেরিকান জনগণের কাছে মিথ্যা বলব না।” কিন্তু তিনি এই ধারা বদলাতে পারেননি।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে জনআস্থা কমতে শুরু করে এবং ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ও নিক্সনের পদত্যাগের পর তা আরও তীব্র হয়। সেখান থেকে তা আর পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
মিথ্যার ধারাবাহিকতা চলতেই থাকে। ১৯৮৭ সালে ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারিতে দেখা যায়, রোনাল্ড রেগান প্রশাসন ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে এবং সেই অর্থ গোপনে নিকারাগুয়ার বিদ্রোহী কন্ট্রাদের দেয়– যদিও কংগ্রেস তা নিষিদ্ধ করেছিল।
১৯৯১ সালে অপারেশন ডেসার্ট স্টর্মের দ্রুত সাফল্য প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (সিনিয়র)-কে প্রশংসা এনে দিলেও, যুদ্ধের আগে প্রচারিত অনেক দাবি ছিল মিথ্যা তা প্রকাশ হয়ে যায়। যেমন কুয়েতে শিশুদের ইনকিউবেটর থেকে ছুড়ে ফেলার গল্প– পরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
২০০৩ সালে জর্জ বুশ (জুনিয়ার)-এর ইরাক যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত ভিয়েতনামের পর সবচেয়ে বিতর্কিত হয়ে ওঠে। ৯/১১-এর পর প্রশাসন দাবি করে, সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক আছে– যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তবুও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা এই দাবি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং অজনপ্রিয় হয়ে উঠলে, এসব দাবির প্রভাব বুশের উত্তরাধিকারের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এই পাঁচ দশকের মিথ্যা ও যুদ্ধ আমেরিকানদের মধ্যে এক ধরনের নৈরাশ্য, অবিশ্বাস ও সংশয় তৈরি করেছে। রিপাবলিকানরা অনেক সময় এই অবিশ্বাসের পরিবেশে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। কারণ তাদের নীতি সাধারণত সরকারের ভূমিকা সীমিত করার দিকে। বিপরীতে, ডেমোক্র্যাটরা শক্তিশালী সরকারের পক্ষে থাকায় এই ইতিহাসের ভার বেশি বহন করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন না নেওয়ায় আমেরিকানরা বুঝতে পারছে না কেন এই বিপজ্জনক হামলা চালানো হলো। প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য– যেমন ইরানের যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র থাকার দাবি– যা দ্রুত ভুল প্রমাণিত হয় এবং জনসমর্থন বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।
এর পাশাপাশি, এমন একজন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে যুদ্ধ হচ্ছে, যার মিথ্যা বলার ইতিহাস সুপরিচিত। এটিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সরকারের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন করতে চাইলে, তা যুদ্ধের সময় থেকেই শুরু করতে হবে। এরিক অল্টারম্যান তার বইতে লিখেছেন, “সরকারি মিথ্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো– এটি নিজেকে বারবার পুনরুৎপাদন করে। নেতা যত বেশি মিথ্যা বলে, তাকে তত বেশি মিথ্যা বলতে হয়।”
সামরিক অভিযানকে বৈধতা দিতে নেতারা যা প্রয়োজন তা বলার প্রলোভনে পড়তে পারেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মিথ্যা প্রকাশ পায়। জাতীয় নিরাপত্তার নামে সত্যকে উপেক্ষা করার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য প্রেসিডেন্টরা এড়িয়ে যেতে পারেন না।
এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু অভিযান নয়– প্রেসিডেন্টদের উত্তরাধিকার এবং ফেডারেল সরকারের অবস্থানও, যার ওপর সব আমেরিকান নির্ভর করে।
যদি কোনো প্রেসিডেন্ট সামরিক হামলা চালাতে চান, তবে তার উচিত সাহসের সঙ্গে সৎ যুক্তি জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং প্রতিষ্ঠাতাদের তৈরি গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে থেকে সমর্থন আদায় করা, তার বাইরে গিয়ে নয়।
লেখক: ফরেন পলিসির কলামিস্ট এবং অধ্যাপক, ইতিহাস ও পাবলিক অ্যাফেয়ার্স, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়।
(লেখাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ম্যাগাজিন ফেরন পলিসির সৌজন্যে)