কাজী সাজিদুল হক
খাদ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট টেস্টঅ্যাটলাস-এর তালিকায় সেরা রুটি হিসেবে নাম উঠে এসেছে ‘বাটার-গার্লিক নান’র। নান রুটি বাংলাদেশে সকাল ও সন্ধ্যার নাশতায় জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় বাটার-গার্লিক নানও পাওয়া যায়। তবে, টেস্টঅ্যাটলাসে এটা মূলত ভারতীয় খাবার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। টেস্টঅ্যাটলাসে নাম ওঠার পর বিবিসি নানের সুলুক সন্ধান করেছে।
বিশ্ব জুড়ে নান ভারতীয় খাবার হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয়। বাটার চিকেনও ভারতীয় খাবার হিসেবে বহুল পরিচিত। তবে সঙ্গে নান না থাকলে বাটার চিকেন তার আসল রূপে ধরা দেয় না।
বর্তমানে ভারতীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের খাবার পরিবেশন করা রেস্তোরাঁগুলোতে নানের নানা রূপ দেখা যায়। কিন্তু এক সময় এ শুধু মুসলিম সুলতান-বাদশাহদের জন্যই পরিবেশিত হতো। কীভাবে রাজকীয় রান্নাঘর থেকে নান আমাদের প্লেটে এসে পৌঁছাল?
বিবিসি বলছে, নানের উৎপত্তির ইতিহাস কিছুটা অস্পষ্ট। তবে অনেক খাদ্য-ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই চ্যাপ্টা রুটির জন্ম প্রাচীন পারস্যে। কারণ এর নামটি ফারসি ভাষার ‘রুটি’ শব্দ থেকে এসেছে। প্রাচীন পারস্যবাসীরা পানি ও ময়দা দিয়ে এই রুটি বানাতেন, যা সম্ভবত গরম পাথরের ওপর সেঁকা হতো।
১৩ থেকে ১৬ শতকের মধ্যে উপমহাদেশের বড় অংশ শাসন করা সুলতানদের সঙ্গে নান আমাদের উপমহাদেশে আসে। মুসলিম শাসকেরা তাদের পশ্চিম ও মধ্য এশীয় শিকড়ের কথা বলা নানা খাদ্য সংস্কৃতি সঙ্গে নিয়ে আসেন, যার মধ্যে ছিল তন্দুর (মাটির চুলা) ব্যবহার করে রান্না করা।
আলাউদ্দিন খিলজি ও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে দরবারি জীবনের বিবরণ দেওয়া ইন্দো-ফারসি কবি আমীর খসরু তার লেখায় নানের দুটি ধরন উল্লেখ করেছেন। নান-ই-তানুক ও নান-ই-তানুরি।
নান-ই-তানুক ছিল নরম ও পাতলা। আর নান-ই-তানুরি ছিল তন্দুরে বেক করা মোটা ও ফুলে ওঠা চ্যাপ্টা রুটি। দিল্লি সালতানাতের সময় নান সাধারণত বিভিন্ন ধরনের মাংসের পদ-যেমন কাবাব ও কিমার সঙ্গে খাওয়া হতো।
রাজকীয় রান্নাঘরের রাঁধুনিরা আটা/ময়দা মাখানোর বিশেষ ধরনের কৌশল চালু করে এবং সে সময়ের বিরল উপাদান ইস্ট যোগ করে নান তৈরিকে আরও এগিয়ে নেন। যাতে রুটি আরও নরম ও ফোলা হয়। জটিল ও ব্যয়বহুল প্রস্তুতির কারণে নান হয়ে ওঠে এক বিলাসবহুল খাবার, যা মূলত অভিজাতরাই উপভোগ করতেন। পরবর্তী মুঘল শাসনামলেও এই ধারা বজায় ছিল।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ইতিহাসবিদ নেহা ভারমানি বিবিসিকে বলেন, “নান বাইস নামে পরিচিত বিশেষায়িত রাঁধুনিরা এই নান বানাতেন এবং নান নিয়ে নানানরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তাদের উদ্ভাবন বোঝাতে বিশেষ বিশেষ বিশেষণ ব্যবহার করা হতো। যেমন, নান-ই-ওয়ারকি ছিল পাতলা, খসখসে স্তরযুক্ত রুটি। আর নান-ই-তাঙ্গি ছিল ছোট আকারের রুটি, যা ঝোল জাতীয় কিছুর সঙ্গে খাওয়া হতো। কারণ এই রুটি ভালোভাবে ঝোল শুষে নিতে পারত।”

নানগুলোর নামকরণ অনেক সময় যে রান্নাঘরে সেগুলো তৈরি হতো, তার নাম অনুসারেও করা হতো।
নেহা ভারমানি বলেন, “বাকর খানি-বিস্কুটের মতো এক ধরনের চ্যাপ্টা রুটি। এই নামটি পেয়েছে কারণ, এটি জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাকির নজম সাইনি’র রান্নাঘরে তৈরি হতো।”
ঢাকাই বাকরখানির সঙ্গে অবশ্য অন্য গল্প জড়িয়ে আছে।
নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তীর ঢাকা’ বইয়ে আছে এক করুণ কাহিনির কথা।
বাংলার মসনদে তখন মুর্শিদকুলি খাঁ। তুর্কি তরুণ আগা বাকের ভাগ্যের অন্বেষণে আসেন উপমহাদেশে। নাম লেখান সেনাবাহিনীতে। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে মুর্শিদকুলি খাঁর সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে আসীন হন তিনি। গল্প আছে, সে সময়ের বিখ্যাত গায়িকা ও নৃত্যশিল্পী খনি বেগমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে বাঁধা পড়েন আগা বাকের।
কিন্তু উজির জাহান্দর খাঁর ছেলে জয়নুল খাঁর দৃষ্টি পড়ে খনি বেগমের ওপর। এ নিয়ে বাকেরের সঙ্গে লড়াই বাঁধে তার। জয়নুল পালিয়ে যান। কিন্তু রটে যায়, আগা বাকের জয়নুলকে খুন করেছেন। মুর্শিদকুলি খাঁ বাকেরকে শাস্তি দেন। তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বাঘের খাঁচায়। কিন্তু জ্যান্ত বাঘের সঙ্গে লড়ে জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসেন আগা বাকের।
এই লড়াই চলার সুযোগ নেন জয়নুল। খনি বেগমকে অপহরণ করে গহীন অরণ্যে পালিয়ে যান। অনমনীয় খনি বেগমকে কিছুতেই রাজি করাতে না পেরে আটকে রাখেন চন্দ্রদ্বীপে তথা আজকের বরিশাল। এই সংবাদ পৌঁছে যায় বাকেরের কাছে।
সেনাপতি কালো গাজীকে নিয়ে খনি বেগমকে মুক্ত করতে ছুটে যান বাকের। জয়নুল খাঁর বাবাও ছেলেকে শাস্তি দিতে আসেন চন্দ্রদ্বীপে। তার তরবারির আঘাতেই মৃত্যু হয় জয়নুলের। কিন্তু যাওয়ার আগে ছুরি বসিয়ে দেন খনি বেগমের বুকে।
খনি বেগমের মৃত্যু হয়। শোকে পাগলপ্রায় বাকের সেখানেই থাকতে শুরু করেন। এরপর এক সময় উমেদপুরের জমিদারি লাভ করেন তিনি। সেলিমাবাদ ও চন্দ্রদ্বীপের নিয়ন্ত্রণও আসে তার হাতে। ১৭৯৭ সালে ইংরেজ শাসনামলে তার নামেই বর্তমান বরিশাল জেলার নামকরণ করা হয়েছিল বাকেরগঞ্জ। পরে অবশ্য মুর্শিদকুলি খাঁর উৎসাহে অন্যত্র বিয়ে করেছিলেন বাকের। সেখানে তার দুই পুত্র আগা সাদেক ও মির্জা মাহদীর জন্ম হয়।
তবে খনি বেগমের স্মৃতি কখনোই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি বাকের। তাই তার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত রুটি ধরনের খাবারটির নাম রাখেন ‘বাকের-খনি’। সেটি কালক্রমে পরিচিত হয় বাকরখানি নামে।
ব্রিটিশ শাসনামলে নান অভিজাতদের খাবার হিসেবেই থেকে যায়। নেহা ভারমানি বলেন, “তবে সময়ের সঙ্গে জটিল প্রস্তুতির জায়গায় সহজ কৌশল চলে আসে, আর নানের আরও সাধারণ রূপ সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে যায়। যেমনটা আজ আমরা বেশিরভাগ স্থানীয় রেস্তোরাঁয় দেখি।”
বর্তমানে নান তৈরি করা হয় ময়দা, দই ও ইস্ট মিশিয়ে নরম খামির বানিয়ে। খামির ফুলে ওঠার জন্য রেখে দেওয়া হয়, তারপর ছোট বল করে হাতে চেপে আকার দেওয়া হয়। এরপর খুব গরম তন্দুরে এটি রাখা হয়, যতক্ষণ না এটি ফুলে ওঠে এবং নিচে বাদামি রঙ না হয়।
কিন্তু নানের গল্প এখানেই শেষ নয়।
১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে, ভারত ও বাইরে ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁগুলো নান নিয়ে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। নিউইয়র্কের শেফ সুভীর সারান বলেন, “নান হলো গৌরবময় রন্ধনশিল্পের উপহার, যা সে বিশ্বকে দিয়েছে।”
ঢাকায় নান
হাকিম হাবিবুর রহমান বিভাগ পূর্ব ঢাকার নাগরিক জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রদের একজন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ঢাকা পাচাস বারাস পেহলে’ তারই রচনা। ওই বইয়ে ঢাকার রুটি নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায় রেখেছেন হাকিম সাহেব।
তিনি লিখেছেন, “ঢাকায় পূর্বে ঘরে ঘরে ঘড়ি ছিল না। এজন্য চক থেকে দুধ এবং দুধের সর বিক্রেতাদের দোকান উঠে যাওয়া রাত বারোটা বাজার সুনির্দিষ্ট চিহ্ন মনে করা হতো এবং ভোর হবার নিশ্চিত পরিচয় ছিল তন্দুরের অগ্নি প্রজ্বলন। শীত হোক অথবা বর্ষা, এই দুই পেশার লোকেরা নিজেদের অভ্যাসে এত দৃঢ় এবং মজবুত ছিল যে, তাদের কার্যকলাপ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতো। সমগ্র বাংলার মধ্যে ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং যদিও বাংলার সাধারণ খাদ্য চাউল অর্থাৎ ভাত, কিন্তু ঢাকায় সাধারণভাবে বাজারসমূহে এত ধরনের রুটি পাওয়া যায় যে, যে সমস্ত দেশে রুটিই শুধুমাত্র খাওয়া হয়ে থাকে সেখানেও এত প্রাচুর্য এবং বিভিন্নতা নেই।”
অর্থাৎ হাকিম সাহেব নানানরকম রুটি দেখেছেন এবং খেয়েছেন জানিয়ে চুপ করে থাকেননি। রুটি প্রধান দেশের সঙ্গে ঢাকার তুলনা করেছেন।
হাবিবুর রহমান আরও লিখেছেন, “ঢাকার শহুরে বাসিন্দারা প্রকৃতপক্ষে রুটি খেতে অভ্যস্ত এবং দুই/তিনশ’ বৎসর সময়ে তাদেরকে শুধুমাত্র এতটুকু পরিবর্তন করেছে যে, তারা শুধুমাত্র দুপুরে ভাত খাওয়া শুরু করেছে। আমি চোখ মেলেই এই দেখেছি যে, সমগ্র ঢাকা সকালে নাস্তায় বাকরখানি খাচ্ছে।”
হাকিম সাহেব যে শহুরে বাসিন্দাদের কথা বলছেন তা আজকের সময়ে সঙ্গে মেলালে ভুল হবে। তিনি মূলত অভিজাত নাগরিকদের কথাই বলেছেন।
তন্দুরের কথা উল্লেখ করে হাবিবুর রহমান লিখেছেন, “স্মরণযোগ্য যে, তন্দুর মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুস্থানে এবং তাদের মাধ্যমে সমগ্র প্রদেশে পৌঁছেছে এবং এখানে যেসব মুসলমান প্রথমত আসেন তারা জাতে তুর্কি এবং আফগানী ছিলেন। এজন্য তাদের সঙ্গে প্রথমদিকে যে মুসলিম রুটি এখানে পরিচিতি লাভ করে তা ছিল এই নানরুটি, যা আজও সমগ্র আফগানিস্তান বরং উত্তর ভারতের সমগ্র শহরে সাধারণভাবে বিক্রি হয় এবং খাদ্য হিসেবে ও হজমের দিক থেকে এটি সবচেয়ে উত্তম মনে করা হয়।”
হাকিম হাবিবুর রহমান আরও লিখেছেন, “বাংলায় যতদূর জানা যায়, কলকাতা ছাড়া শুধুমাত্র ঢাকাতেই নানরুটি তৈরি হয় এবং বাজারে বিক্রি হয়। আমি আমার বাল্যকালে দুই পেশোয়ারী, রজমান খান এবং নূরুল্লাহ খানকে এবং যৌবনে ইউপির বাসিন্দা রুস্তম নামক নান বিক্রেতাদের দেখেছি, যারা নান রুটি তৈরি করত এবং স্থানীয় আফগানী ও পেশোয়ারীরা তাদের কাছ থেকে রুটি কিনত। কিন্তু ঐ সাদা রুটির খরিদ্দার ঢাকাবাসীদের মধ্যে বেশি ছিল না। অতঃপর বহুদিন পর্যন্ত ঢাকা নানরুটি মুক্ত থাকে। এই রুটিকে এখানে আবীরুটি বলে। বর্তমানে কয়েক বছর থেকে বাজারে ‘নিহারী’ এসেছে, যে কারণে পুনরায় নান রুটির প্রচলন হয়েছে।”
অর্থাৎ, বাড়ির রান্না ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে নিহারি যখন বাজারে তথা দোকানে বিক্রি শুরু হলো তখন থেকে ঢাকায় নান জনপ্রিয় হওয়া শুরু করল।
খাদ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট টেস্টঅ্যাটলাস-এর তালিকায় সেরা রুটি হিসেবে নাম উঠে এসেছে ‘বাটার-গার্লিক নান’র। নান রুটি বাংলাদেশে সকাল ও সন্ধ্যার নাশতায় জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় বাটার-গার্লিক নানও পাওয়া যায়। তবে, টেস্টঅ্যাটলাসে এটা মূলত ভারতীয় খাবার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। টেস্টঅ্যাটলাসে নাম ওঠার পর বিবিসি নানের সুলুক সন্ধান করেছে।
বিশ্ব জুড়ে নান ভারতীয় খাবার হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয়। বাটার চিকেনও ভারতীয় খাবার হিসেবে বহুল পরিচিত। তবে সঙ্গে নান না থাকলে বাটার চিকেন তার আসল রূপে ধরা দেয় না।
বর্তমানে ভারতীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের খাবার পরিবেশন করা রেস্তোরাঁগুলোতে নানের নানা রূপ দেখা যায়। কিন্তু এক সময় এ শুধু মুসলিম সুলতান-বাদশাহদের জন্যই পরিবেশিত হতো। কীভাবে রাজকীয় রান্নাঘর থেকে নান আমাদের প্লেটে এসে পৌঁছাল?
বিবিসি বলছে, নানের উৎপত্তির ইতিহাস কিছুটা অস্পষ্ট। তবে অনেক খাদ্য-ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই চ্যাপ্টা রুটির জন্ম প্রাচীন পারস্যে। কারণ এর নামটি ফারসি ভাষার ‘রুটি’ শব্দ থেকে এসেছে। প্রাচীন পারস্যবাসীরা পানি ও ময়দা দিয়ে এই রুটি বানাতেন, যা সম্ভবত গরম পাথরের ওপর সেঁকা হতো।
১৩ থেকে ১৬ শতকের মধ্যে উপমহাদেশের বড় অংশ শাসন করা সুলতানদের সঙ্গে নান আমাদের উপমহাদেশে আসে। মুসলিম শাসকেরা তাদের পশ্চিম ও মধ্য এশীয় শিকড়ের কথা বলা নানা খাদ্য সংস্কৃতি সঙ্গে নিয়ে আসেন, যার মধ্যে ছিল তন্দুর (মাটির চুলা) ব্যবহার করে রান্না করা।
আলাউদ্দিন খিলজি ও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে দরবারি জীবনের বিবরণ দেওয়া ইন্দো-ফারসি কবি আমীর খসরু তার লেখায় নানের দুটি ধরন উল্লেখ করেছেন। নান-ই-তানুক ও নান-ই-তানুরি।
নান-ই-তানুক ছিল নরম ও পাতলা। আর নান-ই-তানুরি ছিল তন্দুরে বেক করা মোটা ও ফুলে ওঠা চ্যাপ্টা রুটি। দিল্লি সালতানাতের সময় নান সাধারণত বিভিন্ন ধরনের মাংসের পদ-যেমন কাবাব ও কিমার সঙ্গে খাওয়া হতো।
রাজকীয় রান্নাঘরের রাঁধুনিরা আটা/ময়দা মাখানোর বিশেষ ধরনের কৌশল চালু করে এবং সে সময়ের বিরল উপাদান ইস্ট যোগ করে নান তৈরিকে আরও এগিয়ে নেন। যাতে রুটি আরও নরম ও ফোলা হয়। জটিল ও ব্যয়বহুল প্রস্তুতির কারণে নান হয়ে ওঠে এক বিলাসবহুল খাবার, যা মূলত অভিজাতরাই উপভোগ করতেন। পরবর্তী মুঘল শাসনামলেও এই ধারা বজায় ছিল।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ইতিহাসবিদ নেহা ভারমানি বিবিসিকে বলেন, “নান বাইস নামে পরিচিত বিশেষায়িত রাঁধুনিরা এই নান বানাতেন এবং নান নিয়ে নানানরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তাদের উদ্ভাবন বোঝাতে বিশেষ বিশেষ বিশেষণ ব্যবহার করা হতো। যেমন, নান-ই-ওয়ারকি ছিল পাতলা, খসখসে স্তরযুক্ত রুটি। আর নান-ই-তাঙ্গি ছিল ছোট আকারের রুটি, যা ঝোল জাতীয় কিছুর সঙ্গে খাওয়া হতো। কারণ এই রুটি ভালোভাবে ঝোল শুষে নিতে পারত।”

নানগুলোর নামকরণ অনেক সময় যে রান্নাঘরে সেগুলো তৈরি হতো, তার নাম অনুসারেও করা হতো।
নেহা ভারমানি বলেন, “বাকর খানি-বিস্কুটের মতো এক ধরনের চ্যাপ্টা রুটি। এই নামটি পেয়েছে কারণ, এটি জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাকির নজম সাইনি’র রান্নাঘরে তৈরি হতো।”
ঢাকাই বাকরখানির সঙ্গে অবশ্য অন্য গল্প জড়িয়ে আছে।
নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তীর ঢাকা’ বইয়ে আছে এক করুণ কাহিনির কথা।
বাংলার মসনদে তখন মুর্শিদকুলি খাঁ। তুর্কি তরুণ আগা বাকের ভাগ্যের অন্বেষণে আসেন উপমহাদেশে। নাম লেখান সেনাবাহিনীতে। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে মুর্শিদকুলি খাঁর সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে আসীন হন তিনি। গল্প আছে, সে সময়ের বিখ্যাত গায়িকা ও নৃত্যশিল্পী খনি বেগমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে বাঁধা পড়েন আগা বাকের।
কিন্তু উজির জাহান্দর খাঁর ছেলে জয়নুল খাঁর দৃষ্টি পড়ে খনি বেগমের ওপর। এ নিয়ে বাকেরের সঙ্গে লড়াই বাঁধে তার। জয়নুল পালিয়ে যান। কিন্তু রটে যায়, আগা বাকের জয়নুলকে খুন করেছেন। মুর্শিদকুলি খাঁ বাকেরকে শাস্তি দেন। তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বাঘের খাঁচায়। কিন্তু জ্যান্ত বাঘের সঙ্গে লড়ে জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসেন আগা বাকের।
এই লড়াই চলার সুযোগ নেন জয়নুল। খনি বেগমকে অপহরণ করে গহীন অরণ্যে পালিয়ে যান। অনমনীয় খনি বেগমকে কিছুতেই রাজি করাতে না পেরে আটকে রাখেন চন্দ্রদ্বীপে তথা আজকের বরিশাল। এই সংবাদ পৌঁছে যায় বাকেরের কাছে।
সেনাপতি কালো গাজীকে নিয়ে খনি বেগমকে মুক্ত করতে ছুটে যান বাকের। জয়নুল খাঁর বাবাও ছেলেকে শাস্তি দিতে আসেন চন্দ্রদ্বীপে। তার তরবারির আঘাতেই মৃত্যু হয় জয়নুলের। কিন্তু যাওয়ার আগে ছুরি বসিয়ে দেন খনি বেগমের বুকে।
খনি বেগমের মৃত্যু হয়। শোকে পাগলপ্রায় বাকের সেখানেই থাকতে শুরু করেন। এরপর এক সময় উমেদপুরের জমিদারি লাভ করেন তিনি। সেলিমাবাদ ও চন্দ্রদ্বীপের নিয়ন্ত্রণও আসে তার হাতে। ১৭৯৭ সালে ইংরেজ শাসনামলে তার নামেই বর্তমান বরিশাল জেলার নামকরণ করা হয়েছিল বাকেরগঞ্জ। পরে অবশ্য মুর্শিদকুলি খাঁর উৎসাহে অন্যত্র বিয়ে করেছিলেন বাকের। সেখানে তার দুই পুত্র আগা সাদেক ও মির্জা মাহদীর জন্ম হয়।
তবে খনি বেগমের স্মৃতি কখনোই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি বাকের। তাই তার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত রুটি ধরনের খাবারটির নাম রাখেন ‘বাকের-খনি’। সেটি কালক্রমে পরিচিত হয় বাকরখানি নামে।
ব্রিটিশ শাসনামলে নান অভিজাতদের খাবার হিসেবেই থেকে যায়। নেহা ভারমানি বলেন, “তবে সময়ের সঙ্গে জটিল প্রস্তুতির জায়গায় সহজ কৌশল চলে আসে, আর নানের আরও সাধারণ রূপ সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে যায়। যেমনটা আজ আমরা বেশিরভাগ স্থানীয় রেস্তোরাঁয় দেখি।”
বর্তমানে নান তৈরি করা হয় ময়দা, দই ও ইস্ট মিশিয়ে নরম খামির বানিয়ে। খামির ফুলে ওঠার জন্য রেখে দেওয়া হয়, তারপর ছোট বল করে হাতে চেপে আকার দেওয়া হয়। এরপর খুব গরম তন্দুরে এটি রাখা হয়, যতক্ষণ না এটি ফুলে ওঠে এবং নিচে বাদামি রঙ না হয়।
কিন্তু নানের গল্প এখানেই শেষ নয়।
১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে, ভারত ও বাইরে ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁগুলো নান নিয়ে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। নিউইয়র্কের শেফ সুভীর সারান বলেন, “নান হলো গৌরবময় রন্ধনশিল্পের উপহার, যা সে বিশ্বকে দিয়েছে।”
ঢাকায় নান
হাকিম হাবিবুর রহমান বিভাগ পূর্ব ঢাকার নাগরিক জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রদের একজন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ঢাকা পাচাস বারাস পেহলে’ তারই রচনা। ওই বইয়ে ঢাকার রুটি নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায় রেখেছেন হাকিম সাহেব।
তিনি লিখেছেন, “ঢাকায় পূর্বে ঘরে ঘরে ঘড়ি ছিল না। এজন্য চক থেকে দুধ এবং দুধের সর বিক্রেতাদের দোকান উঠে যাওয়া রাত বারোটা বাজার সুনির্দিষ্ট চিহ্ন মনে করা হতো এবং ভোর হবার নিশ্চিত পরিচয় ছিল তন্দুরের অগ্নি প্রজ্বলন। শীত হোক অথবা বর্ষা, এই দুই পেশার লোকেরা নিজেদের অভ্যাসে এত দৃঢ় এবং মজবুত ছিল যে, তাদের কার্যকলাপ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতো। সমগ্র বাংলার মধ্যে ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং যদিও বাংলার সাধারণ খাদ্য চাউল অর্থাৎ ভাত, কিন্তু ঢাকায় সাধারণভাবে বাজারসমূহে এত ধরনের রুটি পাওয়া যায় যে, যে সমস্ত দেশে রুটিই শুধুমাত্র খাওয়া হয়ে থাকে সেখানেও এত প্রাচুর্য এবং বিভিন্নতা নেই।”
অর্থাৎ হাকিম সাহেব নানানরকম রুটি দেখেছেন এবং খেয়েছেন জানিয়ে চুপ করে থাকেননি। রুটি প্রধান দেশের সঙ্গে ঢাকার তুলনা করেছেন।
হাবিবুর রহমান আরও লিখেছেন, “ঢাকার শহুরে বাসিন্দারা প্রকৃতপক্ষে রুটি খেতে অভ্যস্ত এবং দুই/তিনশ’ বৎসর সময়ে তাদেরকে শুধুমাত্র এতটুকু পরিবর্তন করেছে যে, তারা শুধুমাত্র দুপুরে ভাত খাওয়া শুরু করেছে। আমি চোখ মেলেই এই দেখেছি যে, সমগ্র ঢাকা সকালে নাস্তায় বাকরখানি খাচ্ছে।”
হাকিম সাহেব যে শহুরে বাসিন্দাদের কথা বলছেন তা আজকের সময়ে সঙ্গে মেলালে ভুল হবে। তিনি মূলত অভিজাত নাগরিকদের কথাই বলেছেন।
তন্দুরের কথা উল্লেখ করে হাবিবুর রহমান লিখেছেন, “স্মরণযোগ্য যে, তন্দুর মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুস্থানে এবং তাদের মাধ্যমে সমগ্র প্রদেশে পৌঁছেছে এবং এখানে যেসব মুসলমান প্রথমত আসেন তারা জাতে তুর্কি এবং আফগানী ছিলেন। এজন্য তাদের সঙ্গে প্রথমদিকে যে মুসলিম রুটি এখানে পরিচিতি লাভ করে তা ছিল এই নানরুটি, যা আজও সমগ্র আফগানিস্তান বরং উত্তর ভারতের সমগ্র শহরে সাধারণভাবে বিক্রি হয় এবং খাদ্য হিসেবে ও হজমের দিক থেকে এটি সবচেয়ে উত্তম মনে করা হয়।”
হাকিম হাবিবুর রহমান আরও লিখেছেন, “বাংলায় যতদূর জানা যায়, কলকাতা ছাড়া শুধুমাত্র ঢাকাতেই নানরুটি তৈরি হয় এবং বাজারে বিক্রি হয়। আমি আমার বাল্যকালে দুই পেশোয়ারী, রজমান খান এবং নূরুল্লাহ খানকে এবং যৌবনে ইউপির বাসিন্দা রুস্তম নামক নান বিক্রেতাদের দেখেছি, যারা নান রুটি তৈরি করত এবং স্থানীয় আফগানী ও পেশোয়ারীরা তাদের কাছ থেকে রুটি কিনত। কিন্তু ঐ সাদা রুটির খরিদ্দার ঢাকাবাসীদের মধ্যে বেশি ছিল না। অতঃপর বহুদিন পর্যন্ত ঢাকা নানরুটি মুক্ত থাকে। এই রুটিকে এখানে আবীরুটি বলে। বর্তমানে কয়েক বছর থেকে বাজারে ‘নিহারী’ এসেছে, যে কারণে পুনরায় নান রুটির প্রচলন হয়েছে।”
অর্থাৎ, বাড়ির রান্না ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে নিহারি যখন বাজারে তথা দোকানে বিক্রি শুরু হলো তখন থেকে ঢাকায় নান জনপ্রিয় হওয়া শুরু করল।