চরচা ডেস্ক

মার্কিন সাংবাদিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিওন হাডারের বিশ্লেষণে একটি কেন্দ্রীয় থিম বারবার ফিরে আসে—যুক্তরাষ্ট্র তার অতীত থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ, বিশেষ করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ হাডারের মতে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং কৌশলগত স্মৃতিভ্রংশের এক অবধারিত পরিণতি।
২৪ মার্চ ‘এশিয়া টাইমস’-এ প্রকাশিত একটি লেখায় হাডার শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরেন: ওয়াশিংটনে ‘ক্যাসান্দ্রা’ (গ্রিক পুরাণের একটি চরিত্র) হওয়ার হতাশা। গ্রিক পুরাণের এই চরিত্রটি ভবিষ্যৎ দেখতে পেলেও কেউ তার কথা বিশ্বাস করত না। লেখক ইঙ্গিত দেন, তিনি নিজেও দীর্ঘ তিন দশক ধরে সতর্ক করে আসছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়া একসময় ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। আজকের ইরান যুদ্ধ সেই সতর্কবাণীরই বাস্তব রূপ।
যুদ্ধের উদ্দেশ্য: বহুমুখী কিন্তু অস্পষ্ট
এই যুদ্ধের অন্যতম বড় সমস্যা হলো এর অস্পষ্ট উদ্দেশ্য। হাডার দেখান, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের কারণ হিসেবে একাধিক ব্যাখ্যা দিয়েছে ইরানের সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধ, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, এমনকি শাসন পরিবর্তন। কিন্তু এই বহুমুখী ব্যাখ্যাই প্রমাণ করে যে প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়।
যখন একটি সরকার যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করতে পারে না, তখন সেটি প্রায়ই নির্দেশ করে যে আসল কারণটি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় কিংবা পুরোপুরি সত্য নয়। ফলে যুদ্ধের নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
যুদ্ধের বাস্তব মূল্য: রক্ত, অর্থনীতি ও অস্থিরতা
হাডারের বিশ্লেষণে সবচেয়ে জোরালো অংশ হলো যুদ্ধের বাস্তব মূল্য তুলে ধরা। কুয়েত ও সৌদি আরবে মার্কিন সেনার মৃত্যু কিংবা ইরাকে বিমান দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু সামরিক নয়, মানবিকও।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক অর্থনীতিও এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে গেছে এবং তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিমান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ কীভাবে দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল: স্বাধীন নাকি নির্ভরশীল?
হাডারের একটি বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত সিদ্ধান্তে ইসরায়েলের প্রভাবের অধীনে কাজ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ওমানের মধ্যস্থতাকারী বদর আল বুসাইদি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুদ্ধের আগে পারমাণবিক আলোচনায় বেশ অগ্রগতি হচ্ছিল। অর্থাৎ, একটি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ছিল।

তবুও যুদ্ধ শুরু হওয়া এই ধারণাকেই শক্তিশালী করে যে, কূটনৈতিক পথ ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। লেখকের মতে, এটি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধেরই পুনরাবৃত্তি—যেখানে যুদ্ধের দামামা বাজানোর আগে কূটনীতিকে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছিল।
কৌশলগত ক্ষতি: চীনের লাভ, আমেরিকার ক্ষয়
এই যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব হলো বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন। হাডার দেখান, চীন সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়েও কৌশলগতভাবে লাভবান হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ও আর্থিক শক্তি ক্ষয় করছে, তখন চীন খুব নিবিড়ভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ করছে। একই সাথে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক প্রভাবও হ্রাস পাচ্ছে।
তাছাড়া, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকে এমনভাবে ব্যস্ত রাখছে, যা এশিয়ায় (বিশেষ করে চীনের সাথে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে) মার্কিন প্রস্তুতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
‘ধ্বংসাত্মক বিচ্ছিন্নতা’: একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা
হাডার তার আগের সাড়াজাগানো কাজ ‘স্যান্ডস্টর্ম’-এ ‘ধ্বংসাত্মক বিচ্ছিন্নতা’র যে ধারণাটি তুলে ধরেছিলেন এখানেও সেটিরই পুনরাবৃত্তি করেছেন।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক ফাঁদে পড়েছে যেখান থেকে সে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি সরেও আসতে পারছে না, আবার সেখানে কোনো কার্যকর ও স্থিতিশীল নীতি প্রয়োগ করতেও পারছে না। ফলে সে এক ধরনের অস্থির ও বিপজ্জনক চোরাবালিতে আটকে গেছে। এর বিপরীতে একটি ‘গঠনমূলক বিচ্ছিন্নতা’ হতে পারত যেখানে কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সমস্যার টেকসই সমাধান খোঁজা হতো। গঠনমূলক বিচ্ছিন্নতা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বাহ্যিক জগত বা দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে সচেতনভাবে কেউ নিজেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের কাজের গুণমান উন্নয়ন করে প্রশান্তি অর্জন করে।
পারমাণবিক ইস্যু: সামরিক সমাধানের সীমাবদ্ধতা
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগকে হাডার পুরোপুরি উড়িয়ে দেন না। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সামরিক হামলা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সুসংগঠিত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ছিল না। তাছাড়া ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বোমা ফেলে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের মৌলিক আচরণ পরিবর্তন করা যায় না। বরং কূটনীতি, অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং ধীরে ধীরে পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলার মাধ্যমেই স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব।

ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা: আরও বড় সংকটের ঝুঁকি
এই যুদ্ধের একটি বিপজ্জনক দিক হলো এর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে পরিবর্তন, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং বহুমুখী সংঘাত সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। হরমুজ প্রণালী এখনও অস্থির এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ফলে এই যুদ্ধ সাময়িকভাবে শেষ হলেও এর নেতিবাচক ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হবে।
শিক্ষা না নিলে পুনরাবৃত্তি
লিওন হাডারের মূল বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট যুক্তরাষ্ট্র যদি তার অতীত ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়, তবে এই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে। মধ্যপ্রাচ্য কখনোই বাইরের কোনো সামরিক হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানায়নি। বরং এই ধরনের আগ্রাসন সবসময়ই চরম অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।
হাডার মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মনে করিয়ে দেন, সামরিক পেশিশক্তি কখনোই ধৈর্যশীল ও স্বার্থভিত্তিক কূটনীতির বিকল্প হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয় এটি একটি বড় বৈশ্বিক সতর্কবার্তা। কোনো পরাশক্তি যদি তার কৌশলগত স্মৃতি হারিয়ে ফেলে, তবে সে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে; আর প্রতিবারই তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়।

মার্কিন সাংবাদিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিওন হাডারের বিশ্লেষণে একটি কেন্দ্রীয় থিম বারবার ফিরে আসে—যুক্তরাষ্ট্র তার অতীত থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ, বিশেষ করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ হাডারের মতে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং কৌশলগত স্মৃতিভ্রংশের এক অবধারিত পরিণতি।
২৪ মার্চ ‘এশিয়া টাইমস’-এ প্রকাশিত একটি লেখায় হাডার শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরেন: ওয়াশিংটনে ‘ক্যাসান্দ্রা’ (গ্রিক পুরাণের একটি চরিত্র) হওয়ার হতাশা। গ্রিক পুরাণের এই চরিত্রটি ভবিষ্যৎ দেখতে পেলেও কেউ তার কথা বিশ্বাস করত না। লেখক ইঙ্গিত দেন, তিনি নিজেও দীর্ঘ তিন দশক ধরে সতর্ক করে আসছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়া একসময় ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। আজকের ইরান যুদ্ধ সেই সতর্কবাণীরই বাস্তব রূপ।
যুদ্ধের উদ্দেশ্য: বহুমুখী কিন্তু অস্পষ্ট
এই যুদ্ধের অন্যতম বড় সমস্যা হলো এর অস্পষ্ট উদ্দেশ্য। হাডার দেখান, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের কারণ হিসেবে একাধিক ব্যাখ্যা দিয়েছে ইরানের সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধ, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, এমনকি শাসন পরিবর্তন। কিন্তু এই বহুমুখী ব্যাখ্যাই প্রমাণ করে যে প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়।
যখন একটি সরকার যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করতে পারে না, তখন সেটি প্রায়ই নির্দেশ করে যে আসল কারণটি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় কিংবা পুরোপুরি সত্য নয়। ফলে যুদ্ধের নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
যুদ্ধের বাস্তব মূল্য: রক্ত, অর্থনীতি ও অস্থিরতা
হাডারের বিশ্লেষণে সবচেয়ে জোরালো অংশ হলো যুদ্ধের বাস্তব মূল্য তুলে ধরা। কুয়েত ও সৌদি আরবে মার্কিন সেনার মৃত্যু কিংবা ইরাকে বিমান দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু সামরিক নয়, মানবিকও।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক অর্থনীতিও এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে গেছে এবং তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিমান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ কীভাবে দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল: স্বাধীন নাকি নির্ভরশীল?
হাডারের একটি বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত সিদ্ধান্তে ইসরায়েলের প্রভাবের অধীনে কাজ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ওমানের মধ্যস্থতাকারী বদর আল বুসাইদি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুদ্ধের আগে পারমাণবিক আলোচনায় বেশ অগ্রগতি হচ্ছিল। অর্থাৎ, একটি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ছিল।

তবুও যুদ্ধ শুরু হওয়া এই ধারণাকেই শক্তিশালী করে যে, কূটনৈতিক পথ ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। লেখকের মতে, এটি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধেরই পুনরাবৃত্তি—যেখানে যুদ্ধের দামামা বাজানোর আগে কূটনীতিকে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছিল।
কৌশলগত ক্ষতি: চীনের লাভ, আমেরিকার ক্ষয়
এই যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব হলো বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন। হাডার দেখান, চীন সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়েও কৌশলগতভাবে লাভবান হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ও আর্থিক শক্তি ক্ষয় করছে, তখন চীন খুব নিবিড়ভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ করছে। একই সাথে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক প্রভাবও হ্রাস পাচ্ছে।
তাছাড়া, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকে এমনভাবে ব্যস্ত রাখছে, যা এশিয়ায় (বিশেষ করে চীনের সাথে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে) মার্কিন প্রস্তুতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
‘ধ্বংসাত্মক বিচ্ছিন্নতা’: একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা
হাডার তার আগের সাড়াজাগানো কাজ ‘স্যান্ডস্টর্ম’-এ ‘ধ্বংসাত্মক বিচ্ছিন্নতা’র যে ধারণাটি তুলে ধরেছিলেন এখানেও সেটিরই পুনরাবৃত্তি করেছেন।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক ফাঁদে পড়েছে যেখান থেকে সে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি সরেও আসতে পারছে না, আবার সেখানে কোনো কার্যকর ও স্থিতিশীল নীতি প্রয়োগ করতেও পারছে না। ফলে সে এক ধরনের অস্থির ও বিপজ্জনক চোরাবালিতে আটকে গেছে। এর বিপরীতে একটি ‘গঠনমূলক বিচ্ছিন্নতা’ হতে পারত যেখানে কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সমস্যার টেকসই সমাধান খোঁজা হতো। গঠনমূলক বিচ্ছিন্নতা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বাহ্যিক জগত বা দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে সচেতনভাবে কেউ নিজেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের কাজের গুণমান উন্নয়ন করে প্রশান্তি অর্জন করে।
পারমাণবিক ইস্যু: সামরিক সমাধানের সীমাবদ্ধতা
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগকে হাডার পুরোপুরি উড়িয়ে দেন না। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সামরিক হামলা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সুসংগঠিত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ছিল না। তাছাড়া ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বোমা ফেলে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের মৌলিক আচরণ পরিবর্তন করা যায় না। বরং কূটনীতি, অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং ধীরে ধীরে পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলার মাধ্যমেই স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব।

ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা: আরও বড় সংকটের ঝুঁকি
এই যুদ্ধের একটি বিপজ্জনক দিক হলো এর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে পরিবর্তন, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং বহুমুখী সংঘাত সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। হরমুজ প্রণালী এখনও অস্থির এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ফলে এই যুদ্ধ সাময়িকভাবে শেষ হলেও এর নেতিবাচক ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হবে।
শিক্ষা না নিলে পুনরাবৃত্তি
লিওন হাডারের মূল বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট যুক্তরাষ্ট্র যদি তার অতীত ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়, তবে এই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে। মধ্যপ্রাচ্য কখনোই বাইরের কোনো সামরিক হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানায়নি। বরং এই ধরনের আগ্রাসন সবসময়ই চরম অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।
হাডার মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মনে করিয়ে দেন, সামরিক পেশিশক্তি কখনোই ধৈর্যশীল ও স্বার্থভিত্তিক কূটনীতির বিকল্প হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয় এটি একটি বড় বৈশ্বিক সতর্কবার্তা। কোনো পরাশক্তি যদি তার কৌশলগত স্মৃতি হারিয়ে ফেলে, তবে সে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে; আর প্রতিবারই তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়।