কীভাবে ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কীভাবে ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো
গ্রেপ্তারের পর নিকোলাস মাদুরো। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে গেছে আমেরিকা, তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে মাদক-সন্ত্রাসের অভিযোগ। আমেরিকার আদালতে করা হবে তার বিচার।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে এমন এক ‘আক্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা নাকি দ্বিতীয় ‘বিশ্বযুদ্ধের পর আর কেউ দেখেননি’। তবে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আবার কিছুটা সংযত সুরে বলেছেন, এটি ছিল ‘মূলত একটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী অভিযান’।

ট্রাম্প-রুবিও যা-ই বলুক না কেন, মাদুরোকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার এই অভিযান আসলে তাদের বক্তব্যের মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করছে।

মাদুরোকে গ্রেপ্তারের এই অভিযান নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ইকোনমিস্ট।

এতে বলা হয়েছে, ৩ জানুয়ারি কারাকাসে চালানো এই হামলা ছিল এক নিখুঁত সামরিক অভিযান। মাদুরোর চলাফেরা সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য এবং সম্ভবত ভেতরের কারো সহায়তায় আমেরিকার এই হামলা পরিচালিত।

ওয়াশিংটন জানিয়েছে, মাদুরোকে ধরে আনতে যে অভিযান চালানো হয়েছে তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’।

৩ জানুয়ারির এক সংবাদ সম্মেলনে আমেরিকার সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’-এর বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, অভিযানের আগে পাঁচ মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ক্যারিবীয় অঞ্চলে আকাশ ও নৌ শক্তি জড়ো করেছিল। অভিযানের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে।

জেনারেল কেইনের ভাষায়, এই অভিযানে পশ্চিম গোলার্ধে থাকা ২০টি ভিন্ন ঘাঁটি থেকে ১৫০টিরও বেশি বিমান একযোগে উড়ে এসে ভেনেজুয়েলার আকাশে মিলিত হয়। আবহাওয়া অনুকূল হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে অভিযান চালানো সম্ভব হয়।

অভিযানে ব্যবহার করা হয় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০০ ফুট ওপর দিয়ে উড়তে সক্ষম স্টেলথ বিমান।

আমেরিকার হামলায় কারাকাসে ক্ষতিগ্রস্থ একটি যুদ্ধযান। ছবি: রয়টার্স
আমেরিকার হামলায় কারাকাসে ক্ষতিগ্রস্থ একটি যুদ্ধযান। ছবি: রয়টার্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো আমেরিকার সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিট ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস অ্যাভিয়েশন রেজিমেন্ট বা ‘নাইট স্টকারস’-এর। একই সঙ্গে আকাশে পাহারায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান- এফ-২২ ও এফ-৩৫।

কারাকাসের দিকে এগোতে এগোতে ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা “অচল ও নিষ্ক্রিয়” করতে শুরু করে আমেরিকান সেনারা। জেনারেল কেইনের তথ্যমতে, এ কাজে পেন্টাগনের মহাকাশ ও সাইবার কমান্ড যুক্ত ছিল।

উড়োজাহাজগুলো রাজধানীর পার্বত্য ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজেদের গোপন রাখে এবং স্থানীয় সময় রাত ২টার একটু পর মাদুরোর বাসভবনে পৌঁছে যায়। সেখানে গুলির মুখে পড়েন মার্কিন সেনারা। তাদের একটি উড়োজাহাজে গুলি লাগলেও সেটি উড়তে সক্ষম ছিল।

বাসিন্দাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে, উড়োজাহাজের একটি বহর শহরের ওপর দিয়ে কম উচ্চতায় উড়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকার অভিজাত বিশেষ বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’ মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে। মাদুরো একটি নিরাপদ কক্ষে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ভারী ইস্পাতের দরজা বন্ধ করার আগেই তাকে আটক করা হয়।

ট্রাম্পের ভাষ্য, ‘সেখানে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়েছে’। মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই মাদুরোকে নিয়ে আকাশ ও সমুদ্রপথে পুরো বহর ফিরে যায় বিশেষ মার্কিন বাহিনী।

এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় ১৯৮৯ সালে পানামায় আমেরিকার অভিযান। সে সময় পানামার সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আমেরিকা গ্রেপ্তার করেছিল। ওই অভিযানে অংশ নিয়েছিল ২৭ হাজারের বেশি সেনা, তাদের মধ্যে অর্ধেক পানামাতেই অবস্থান করছিল। সেটি অবশ্য পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন।

দেশ হিসেবে কিন্তু ভেনেজুয়েলা পানামা থেকে বড়, আবার তাদের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। তা সত্ত্বেও নরিয়েগা কিন্তু প্রথমে ধরা পড়েননি। তাকে ধরতে লেগেছিল দশ দিন।

এদিকে, মাসের পর মাস প্রস্তুতির পর এবং ২২ ডিসেম্বর ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকির পরও কোনো বাধা ছাড়াই কারাকাসের ভেতরে যেভাবে ঢুকে পড়েছে আমেরিকান সেনারা, তাতে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের দাবি হয়তো ঠিক-এই ধরনের অভিযান অন্য কোনো দেশ করতে পারত না। মাদুরোকে দ্রুত শনাক্ত ও সরিয়ে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অসাধারণ পরিকল্পনা ও গোয়েন্দা সক্ষমতারই ইঙ্গিত।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। ছবি: রয়টার্স
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। ছবি: রয়টার্স

২০১১ সালে পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা বা ধরার অভিযানের মতোই, ডেল্টা ফোর্স আগে থেকেই মাদুরোর নিরাপদ বাসভবনের আদলে একটি মডেল তৈরি করে অনুশীলন চালিয়েছে।

মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন জানায়, আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ আগস্ট থেকেই ভেনেজুয়েলার ভেতরে একটি দল মোতায়েন করেছিল এবং মাদুরোর সরকারের ভেতরেও তাদের একজন সূত্র ছিল।

ট্রাম্পের কথায় আরও ইঙ্গিত মেলে, যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার সক্ষমতা ব্যবহার করে কারাকাসের কিছু অংশে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “আমাদের একটি বিশেষ দক্ষতার কারণে কারাকাসের আলো বড় অংশে নিভে গিয়েছিল।”

অভিযানের সামরিক বাহিনীর যে বিশাল বহর ব্যবহার করা হয়েছে, তাও নজর কাড়ার মতো। ১৯৮০ সালে তেহরানে ব্যর্থ জিম্মি উদ্ধার অভিযানে মাত্র ১৪টি উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়েছিল, ওসামা বিন লাদেনের অভিযানে ছিল মাত্র পাঁচটি।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো, অভিযান যে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, এতে বোঝা যাচ্ছে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহল বা নিরাপত্তা বাহিনীর কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঁতাত করেছিল।

লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ আইরিন মিয়া বলেন, “আমার ধারণা, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ছবি: রয়টার্স

এই অভিযানের সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘যুদ্ধমন্ত্রী’ পিট হেগসেথের জন্যও স্বস্তি বয়ে এনেছে, যিনি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিগত আচরণ, গোপন তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে অভিযানের বৈধতা নিয়ে সমালোচনার মুখে ছিলেন। একই সঙ্গে এটি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে আমেরিকার বিশেষ বাহিনীর কার্যকারিতা তুলে ধরারও সুযোগ এনেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিযান মাদুরোর শাসনের মাথা কেটে দিলেও পুরো কাঠামো ভেঙে দেয়নি। আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রথম দিনের সামরিক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। তবে কারাকাসের এই অভিযান ভবিষ্যতের জন্য এক লোভনীয় মডেল হয়ে উঠতেই পারে।

এরপরের নিশানা কিউবা হবে কি না তা নিয়েও চলছে জল্পনা-কল্পনা। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, “কিউবার বিষয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত কথা বলবই।”

সম্পর্কিত