মুস্তাফা সাকিব

হিন্দুকুশ পর্বতমালার রুক্ষ ভৌগোলিক পরিবেশে ‘বিচ্ছিন্নতা’ দীর্ঘদিন ধরেই টিকে থাকার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে এসে তালেবান-শাসিত প্রশাসনের জন্য সেই বিচ্ছিন্নতাই এখন এক ফাঁদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দুটি অস্থিতিশীল ফ্রন্টের মাঝে পড়ে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম চাপের মুখে রয়েছে আফগানিস্তান।
পূর্ব দিকে পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এখন চরম আকার ধারণ করেছে, যা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে পশ্চিমে, ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার তীব্র সংঘাত আফগানিস্তানের প্রধান বিকল্প বাণিজ্য রুটটিকে একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলার মধ্য দিয়ে ইরানে যে সংঘাতের শুরু হয়, তা এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী নৌ ও আকাশপথের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো নিষ্ক্রিয় করতে মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপগুলো ইরানের বন্দরগুলোতে আংশিক অবরোধ আরোপ করায়, ওমান উপসাগরে সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
আফগানিস্তানের চারদিকেই স্থলভাগ। তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবার বা অন্যান্য জিনিসপত্র খুব একটা উৎপাদন করতে পারে না। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থা ভালো থাকলেই কেবল আফগানিস্তান ভালো থাকতে পারে। কাবুলের নেতারা এখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখে পড়েছেন। যুদ্ধ করে ক্ষমতায় এলেও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে তাদের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা খুব কঠিন হবে।

ডুরান্ড লাইন: দীর্ঘ লড়াই ও কথার যুদ্ধ
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক এখন অনেক বেশি খারাপ হয়ে গেছে, যা আর শুধু রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে পাকিস্তান ‘অপারেশন গাজাব লিল হক’ নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করেছে। পাকিস্তান বলছে, সন্ত্রাস দমনের জন্যই তারা এই অভিযান চালাচ্ছে। অন্যদিকে কাবুলের তালেবান নেতারা এর কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, বিনা কারণে আফগানিস্তানের স্বাধীনতার ওপর আঘাত করা হচ্ছে।
এই সংঘাতের মূলে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তানের দাবি, টিটিপি আফগান তালেবানদের আশ্রয়ে সেখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছে। তারা আরও অভিযোগ করেছে যে, এই গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে ২০২৪ সালে যেসব হামলা চালিয়েছিল, তাতে আড়াই হাজারেরও বেশি পাকিস্তানি নিহত হয়।
২০২৫ সালের শেষের দিকে এই হুমকি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পশ্চিমা দেশগুলোর ফেলে যাওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র টিটিপির হাতে চলে যাওয়ায় পাকিস্তানের উদ্বেগ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। তারা ভয় পাচ্ছিল যে, টিটিপি এখন আরও আধুনিক কৌশল ও শক্তি নিয়ে আক্রমণ চালাতে পারবে। আর এ কারণেই পাকিস্তান কেবল মাঝে মাঝে সীমান্তে হামলা চালানোর নীতি থেকে সরে এসে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো সীমান্তে একটি স্থায়ী নিরাপদ অঞ্চল (বাফার জোন) গড়ে তোলা।
২২ ফেব্রুয়ারি, আফগানিস্তানের খোস্ত ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। ইসলামাবাদের দাবি, তারা টিটিপির গোপন আস্তানাগুলোকে লক্ষ্য করেই এই হামলা চালিয়েছে। তবে স্থানীয় কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনগুলো থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এই হামলায় বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
আফগানিস্তানে নিয়োজিত জাতিসংঘের সহায়তা মিশন নিশ্চিত করেছে যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত সীমান্ত পেরিয়ে আসা এসব গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় সারা দেশে অন্তত ৫৬ জন সাধারণ নাগরিক নিহত এবং ১২৯ জন আহত হয়েছেন। এসব হতাহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
অতি সম্প্রতি পাকিস্তান তাদের হামলার পরিধি আরও বাড়িয়েছে। এখন তারা তালেবানদের বিভিন্ন স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এর মধ্যে কান্দাহারে থাকা তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সাথে যুক্ত একটি সামরিক ঘাঁটিও তাদের হামলার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এর প্রতিশোধ নিতে তালেবান সীমান্তরক্ষী বাহিনীও পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ভারী কামানের গোলাবর্ষণ শুরু করেছে। এর ফলে ডুরান্ড লাইন (পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত) এখন সরাসরি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তোরখাম এবং স্পিন বোলদাকসহ আটটি প্রধান সীমান্ত পারাপারের পথ এখন পুরোপুরি বন্ধ।
বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইরানের বিকল্প পথটিও
২০২৫ সালের শেষের দিকে বারবার সীমান্ত বন্ধ থাকায় পাকিস্তানের বাণিজ্য রুটটি একেবারেই ভরসাহীন হয়ে পড়ে। তখন তালেবান বাধ্য হয়েই কৌশলগত কারণে পশ্চিমের দিকে, অর্থাৎ ইরানের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। আফগানিস্তান তখন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর দিকে ঘুরিয়ে নেয়। আফগান কর্মকর্তাদের মতে, সেসময় পাকিস্তানের রাস্তার চেয়ে ইরানের রাস্তা দিয়ে অনেক দ্রুত মালামাল আনা-নেওয়া করা যাচ্ছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ২০২৫ সালের শেষের দিকে জানিয়েছিল, ওই বছরের শেষ ছয় মাসে আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৬০ কোটি (১.৬ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সাথে তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১০ কোটি (১.১ বিলিয়ন) ডলার। এই হিসাব থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আফগানিস্তান তাদের ব্যবসার জন্য প্রধান রুট হিসেবে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে ইরানের দিকেই ঝুঁকছিল।
এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ইরানের চাবাহার বন্দরের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া। ভারতের বিনিয়োগে তৈরি এই বন্দর ব্যবহার করে আফগানিস্তান পাকিস্তানকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে পারছিল। এর ফলে পূর্ব সীমান্তে রাজনৈতিক ঝামেলার কারণে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির ঝুঁকিও অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
কিন্তু ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে আফগানিস্তানের এই বিকল্প পরিকল্পনাটিও এখন পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। ইসলাম কালা সীমান্তে থাকা তালেবান কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে দাবি করছেন যে, মালামাল আনা-নেওয়া এখনো স্বাভাবিকভাবেই চলছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি একদমই উল্টো, পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সেখানে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
আফগানিস্তানের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট (বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চেম্বার) জানিয়েছে, যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় চাবাহার বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য খান জান আলকোজাই নিশ্চিত করেছেন যে, আফগানিস্তানের জাহাজগুলো এখন চাবাহার বন্দরে আটকে আছে। তিনি জানান, অতিরিক্ত ভিড় ও সামরিক ঝামেলার কারণে জাহাজে মালপত্র ওঠানো-নামানো বন্ধ রয়েছে এবং বলতে গেলে সবকিছু থমকে আছে।
সমুদ্রপথের এই অবরোধ যে শুধু ইরান সরকারকেই একঘরে করে ফেলছে তা নয়, বরং এটি আফগানিস্তানের ওপরও চারপাশ থেকে চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশটি এমনিতেই পাকিস্তানের সাথে উন্মুক্ত যুদ্ধের কারণে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। আফগানিস্তান এখন আর কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর এসব যুদ্ধের কারণে তারা এখন পুরো বিশ্ব থেকে আক্ষরিক অর্থেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

ঘনিয়ে আসছে ভয়াবহ মানবিক সংকট
আফগানিস্তানের ওপর ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাবটি সম্ভবত মানুষের এই ব্যাপক প্রত্যাবর্তন। ইরানে বর্তমানে ৪৫ লাখেরও বেশি আফগান নাগরিক রয়েছেন। কিন্তু সংঘাত তীব্র হওয়ার সাথে সাথে তেহরান আফগানদের জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানোর নীতি আরও জোরদার করেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মতে, প্রতিদিন প্রায় ১,৭০০ আফগান ইরান থেকে দেশে ফিরছেন। এগুলো কোনো পরিকল্পিত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বোমা হামলা এবং অর্থনৈতিক ধস থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা এসব পরিবার এমন এক আফগানিস্তানে এসে পৌঁছাচ্ছে, যে দেশ তার বর্তমান জনগণকেই ঠিকমতো খাবার দিতে পারছে না।
কর্মসংস্থানহীন একটি অর্থনীতিতে কর্মক্ষম মানুষদের এমন হঠাৎ ফিরে আসাটা দেশের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় বিষয়ক দপ্তরের তথ্যমতে, আফগানিস্তানের এক কোটি ৭৪ লাখ মানুষ ইতোমধ্যেই চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এর ওপর ইরান ও পাকিস্তান উভয় দিক থেকেই পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও তালেবানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল
সরকার পরিচালনার জন্য কাস্টমস বা শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থের ওপর তালেবানরা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু এখন এই চাপ আরও বেড়েছে, কারণ দেশের প্রধান দুটি বাণিজ্য পথই পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ায় কেন্দ্রীয় রাজকোষ চরম অর্থ সংকটে পড়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে তালেবান এতদিন যে দাবি করে আসছিল, তা এখন এক বড় পরীক্ষার মুখে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই সরকার আফগানিস্তানে কয়েক দশক ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সাথে চলমান এই সংঘাত সেই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আবারও আফগানিস্তানের ভেতরে টেনে এনেছে।
এরই মধ্যে কান্দাহারে অবস্থানরত আদর্শিক কট্টরপন্থী নেতা এবং কাবুলের বাস্তববাদী প্রশাসকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। কাবুলের বাস্তববাদীরা চান, আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছে বাণিজ্য পুনরায় চালু করা হোক।
অন্যদিকে কট্টরপন্থীদের মতে, ইসলামাবাদকে যেকোনো ধরনের ছাড় দেওয়া মানেই হলো আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সাথে বেইমানি করা।

তালেবানের কঠিন সমীকরণ এবং চীনের দুশ্চিন্তা
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, তালেবান যদি পাকিস্তানের চাপে নতি স্বীকার করে টিটিপির পাশ থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে ওই যোদ্ধাদের অনেকেই হয়ত ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সের (আইএসকেপি) মতো চরমপন্থী দলগুলোতে যোগ দেবে। এর ফলে দেশের ভেতরেই আরও ভয়ংকর এক বিদ্রোহের সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে, তালেবান যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েই যায়, তবে তাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই চলমান সংঘাত এ অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যের জন্যও সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। বেইজিং অনেক দিন ধরেই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতু হিসেবে আফগানিস্তানকে তুলে ধরতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু একটি সেতুর দুপাশের পরিস্থিতি যদি শান্ত বা স্থিতিশীল না থাকে, তবে সেই সেতুবন্ধন কোনো কাজে আসে না। আফগানিস্তান যদি এভাবেই চারদিকের চাপে পড়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়, তবে মেস আইনাক তামার খনিসহ দেশটিতে থাকা চীনের সব বিপুল বিনিয়োগই অনিশ্চয়তার মুখে আটকে পড়বে।
সংযোগ সেতু থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ
গত তিন বছর ধরে তালেবান তাদের এক প্রতিবেশীকে অন্য প্রতিবেশীর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে বেশ ভালোভাবেই পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছিল। বিশেষ করে পাকিস্তানের চাপ এড়াতে তারা ইরানের বাণিজ্য রুটগুলোকে কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু ভারসাম্য রক্ষার এই কৌশলের জন্য অন্তত একজন প্রতিবেশীর স্থিতিশীল থাকা প্রয়োজন ছিল।
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ আফগানিস্তানের সেই শেষ বিকল্প বাণিজ্য পথটিও বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে ইরান ও পাকিস্তান উভয় দেশই বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় আফগানিস্তান এখন আর কোনো সংযোগ সেতু নেই, বরং এটি এখন চারদিক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে পরিণত হয়েছে।
যেহেতু দক্ষিণ ও পশ্চিমের পুরনো পথগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মধ্য এশিয়ার মধ্য দিয়ে দ্রুত মানবিক সহায়তার পথ (করিডোর) চালু করা। অন্যদিকে, তালেবানের সামনে এখন কেবল দুটি পথই খোলা আছে- হয় তাদের টিটিপি ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমিয়ে আনতে হবে, নয়তো একটি খণ্ডিত ও দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশের শাসনভার নিয়ে বসে থাকতে হবে।
লেখক: ড. মুস্তাফা সাকিব রাটগার্স ইউনিভার্সিটি, ক্যামডেনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন সহযোগী গবেষক এবং ভিজিটিং স্কলার।
*লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ থেকে অনূদিত*

হিন্দুকুশ পর্বতমালার রুক্ষ ভৌগোলিক পরিবেশে ‘বিচ্ছিন্নতা’ দীর্ঘদিন ধরেই টিকে থাকার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে এসে তালেবান-শাসিত প্রশাসনের জন্য সেই বিচ্ছিন্নতাই এখন এক ফাঁদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দুটি অস্থিতিশীল ফ্রন্টের মাঝে পড়ে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম চাপের মুখে রয়েছে আফগানিস্তান।
পূর্ব দিকে পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এখন চরম আকার ধারণ করেছে, যা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে পশ্চিমে, ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার তীব্র সংঘাত আফগানিস্তানের প্রধান বিকল্প বাণিজ্য রুটটিকে একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলার মধ্য দিয়ে ইরানে যে সংঘাতের শুরু হয়, তা এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী নৌ ও আকাশপথের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো নিষ্ক্রিয় করতে মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপগুলো ইরানের বন্দরগুলোতে আংশিক অবরোধ আরোপ করায়, ওমান উপসাগরে সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
আফগানিস্তানের চারদিকেই স্থলভাগ। তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবার বা অন্যান্য জিনিসপত্র খুব একটা উৎপাদন করতে পারে না। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থা ভালো থাকলেই কেবল আফগানিস্তান ভালো থাকতে পারে। কাবুলের নেতারা এখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখে পড়েছেন। যুদ্ধ করে ক্ষমতায় এলেও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে তাদের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা খুব কঠিন হবে।

ডুরান্ড লাইন: দীর্ঘ লড়াই ও কথার যুদ্ধ
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক এখন অনেক বেশি খারাপ হয়ে গেছে, যা আর শুধু রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে পাকিস্তান ‘অপারেশন গাজাব লিল হক’ নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করেছে। পাকিস্তান বলছে, সন্ত্রাস দমনের জন্যই তারা এই অভিযান চালাচ্ছে। অন্যদিকে কাবুলের তালেবান নেতারা এর কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, বিনা কারণে আফগানিস্তানের স্বাধীনতার ওপর আঘাত করা হচ্ছে।
এই সংঘাতের মূলে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তানের দাবি, টিটিপি আফগান তালেবানদের আশ্রয়ে সেখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছে। তারা আরও অভিযোগ করেছে যে, এই গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে ২০২৪ সালে যেসব হামলা চালিয়েছিল, তাতে আড়াই হাজারেরও বেশি পাকিস্তানি নিহত হয়।
২০২৫ সালের শেষের দিকে এই হুমকি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পশ্চিমা দেশগুলোর ফেলে যাওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র টিটিপির হাতে চলে যাওয়ায় পাকিস্তানের উদ্বেগ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। তারা ভয় পাচ্ছিল যে, টিটিপি এখন আরও আধুনিক কৌশল ও শক্তি নিয়ে আক্রমণ চালাতে পারবে। আর এ কারণেই পাকিস্তান কেবল মাঝে মাঝে সীমান্তে হামলা চালানোর নীতি থেকে সরে এসে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো সীমান্তে একটি স্থায়ী নিরাপদ অঞ্চল (বাফার জোন) গড়ে তোলা।
২২ ফেব্রুয়ারি, আফগানিস্তানের খোস্ত ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। ইসলামাবাদের দাবি, তারা টিটিপির গোপন আস্তানাগুলোকে লক্ষ্য করেই এই হামলা চালিয়েছে। তবে স্থানীয় কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনগুলো থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এই হামলায় বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
আফগানিস্তানে নিয়োজিত জাতিসংঘের সহায়তা মিশন নিশ্চিত করেছে যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত সীমান্ত পেরিয়ে আসা এসব গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় সারা দেশে অন্তত ৫৬ জন সাধারণ নাগরিক নিহত এবং ১২৯ জন আহত হয়েছেন। এসব হতাহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
অতি সম্প্রতি পাকিস্তান তাদের হামলার পরিধি আরও বাড়িয়েছে। এখন তারা তালেবানদের বিভিন্ন স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এর মধ্যে কান্দাহারে থাকা তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সাথে যুক্ত একটি সামরিক ঘাঁটিও তাদের হামলার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এর প্রতিশোধ নিতে তালেবান সীমান্তরক্ষী বাহিনীও পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ভারী কামানের গোলাবর্ষণ শুরু করেছে। এর ফলে ডুরান্ড লাইন (পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত) এখন সরাসরি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তোরখাম এবং স্পিন বোলদাকসহ আটটি প্রধান সীমান্ত পারাপারের পথ এখন পুরোপুরি বন্ধ।
বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইরানের বিকল্প পথটিও
২০২৫ সালের শেষের দিকে বারবার সীমান্ত বন্ধ থাকায় পাকিস্তানের বাণিজ্য রুটটি একেবারেই ভরসাহীন হয়ে পড়ে। তখন তালেবান বাধ্য হয়েই কৌশলগত কারণে পশ্চিমের দিকে, অর্থাৎ ইরানের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। আফগানিস্তান তখন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর দিকে ঘুরিয়ে নেয়। আফগান কর্মকর্তাদের মতে, সেসময় পাকিস্তানের রাস্তার চেয়ে ইরানের রাস্তা দিয়ে অনেক দ্রুত মালামাল আনা-নেওয়া করা যাচ্ছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ২০২৫ সালের শেষের দিকে জানিয়েছিল, ওই বছরের শেষ ছয় মাসে আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৬০ কোটি (১.৬ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সাথে তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১০ কোটি (১.১ বিলিয়ন) ডলার। এই হিসাব থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আফগানিস্তান তাদের ব্যবসার জন্য প্রধান রুট হিসেবে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে ইরানের দিকেই ঝুঁকছিল।
এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ইরানের চাবাহার বন্দরের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া। ভারতের বিনিয়োগে তৈরি এই বন্দর ব্যবহার করে আফগানিস্তান পাকিস্তানকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে পারছিল। এর ফলে পূর্ব সীমান্তে রাজনৈতিক ঝামেলার কারণে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির ঝুঁকিও অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
কিন্তু ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে আফগানিস্তানের এই বিকল্প পরিকল্পনাটিও এখন পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। ইসলাম কালা সীমান্তে থাকা তালেবান কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে দাবি করছেন যে, মালামাল আনা-নেওয়া এখনো স্বাভাবিকভাবেই চলছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি একদমই উল্টো, পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সেখানে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
আফগানিস্তানের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট (বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চেম্বার) জানিয়েছে, যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় চাবাহার বন্দর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য খান জান আলকোজাই নিশ্চিত করেছেন যে, আফগানিস্তানের জাহাজগুলো এখন চাবাহার বন্দরে আটকে আছে। তিনি জানান, অতিরিক্ত ভিড় ও সামরিক ঝামেলার কারণে জাহাজে মালপত্র ওঠানো-নামানো বন্ধ রয়েছে এবং বলতে গেলে সবকিছু থমকে আছে।
সমুদ্রপথের এই অবরোধ যে শুধু ইরান সরকারকেই একঘরে করে ফেলছে তা নয়, বরং এটি আফগানিস্তানের ওপরও চারপাশ থেকে চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশটি এমনিতেই পাকিস্তানের সাথে উন্মুক্ত যুদ্ধের কারণে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। আফগানিস্তান এখন আর কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর এসব যুদ্ধের কারণে তারা এখন পুরো বিশ্ব থেকে আক্ষরিক অর্থেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

ঘনিয়ে আসছে ভয়াবহ মানবিক সংকট
আফগানিস্তানের ওপর ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাবটি সম্ভবত মানুষের এই ব্যাপক প্রত্যাবর্তন। ইরানে বর্তমানে ৪৫ লাখেরও বেশি আফগান নাগরিক রয়েছেন। কিন্তু সংঘাত তীব্র হওয়ার সাথে সাথে তেহরান আফগানদের জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানোর নীতি আরও জোরদার করেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মতে, প্রতিদিন প্রায় ১,৭০০ আফগান ইরান থেকে দেশে ফিরছেন। এগুলো কোনো পরিকল্পিত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বোমা হামলা এবং অর্থনৈতিক ধস থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা এসব পরিবার এমন এক আফগানিস্তানে এসে পৌঁছাচ্ছে, যে দেশ তার বর্তমান জনগণকেই ঠিকমতো খাবার দিতে পারছে না।
কর্মসংস্থানহীন একটি অর্থনীতিতে কর্মক্ষম মানুষদের এমন হঠাৎ ফিরে আসাটা দেশের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় বিষয়ক দপ্তরের তথ্যমতে, আফগানিস্তানের এক কোটি ৭৪ লাখ মানুষ ইতোমধ্যেই চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এর ওপর ইরান ও পাকিস্তান উভয় দিক থেকেই পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও তালেবানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল
সরকার পরিচালনার জন্য কাস্টমস বা শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থের ওপর তালেবানরা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু এখন এই চাপ আরও বেড়েছে, কারণ দেশের প্রধান দুটি বাণিজ্য পথই পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ায় কেন্দ্রীয় রাজকোষ চরম অর্থ সংকটে পড়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে তালেবান এতদিন যে দাবি করে আসছিল, তা এখন এক বড় পরীক্ষার মুখে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই সরকার আফগানিস্তানে কয়েক দশক ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সাথে চলমান এই সংঘাত সেই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আবারও আফগানিস্তানের ভেতরে টেনে এনেছে।
এরই মধ্যে কান্দাহারে অবস্থানরত আদর্শিক কট্টরপন্থী নেতা এবং কাবুলের বাস্তববাদী প্রশাসকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। কাবুলের বাস্তববাদীরা চান, আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছে বাণিজ্য পুনরায় চালু করা হোক।
অন্যদিকে কট্টরপন্থীদের মতে, ইসলামাবাদকে যেকোনো ধরনের ছাড় দেওয়া মানেই হলো আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সাথে বেইমানি করা।

তালেবানের কঠিন সমীকরণ এবং চীনের দুশ্চিন্তা
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, তালেবান যদি পাকিস্তানের চাপে নতি স্বীকার করে টিটিপির পাশ থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে ওই যোদ্ধাদের অনেকেই হয়ত ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সের (আইএসকেপি) মতো চরমপন্থী দলগুলোতে যোগ দেবে। এর ফলে দেশের ভেতরেই আরও ভয়ংকর এক বিদ্রোহের সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে, তালেবান যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েই যায়, তবে তাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই চলমান সংঘাত এ অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যের জন্যও সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। বেইজিং অনেক দিন ধরেই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতু হিসেবে আফগানিস্তানকে তুলে ধরতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু একটি সেতুর দুপাশের পরিস্থিতি যদি শান্ত বা স্থিতিশীল না থাকে, তবে সেই সেতুবন্ধন কোনো কাজে আসে না। আফগানিস্তান যদি এভাবেই চারদিকের চাপে পড়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়, তবে মেস আইনাক তামার খনিসহ দেশটিতে থাকা চীনের সব বিপুল বিনিয়োগই অনিশ্চয়তার মুখে আটকে পড়বে।
সংযোগ সেতু থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ
গত তিন বছর ধরে তালেবান তাদের এক প্রতিবেশীকে অন্য প্রতিবেশীর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে বেশ ভালোভাবেই পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছিল। বিশেষ করে পাকিস্তানের চাপ এড়াতে তারা ইরানের বাণিজ্য রুটগুলোকে কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু ভারসাম্য রক্ষার এই কৌশলের জন্য অন্তত একজন প্রতিবেশীর স্থিতিশীল থাকা প্রয়োজন ছিল।
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ আফগানিস্তানের সেই শেষ বিকল্প বাণিজ্য পথটিও বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে ইরান ও পাকিস্তান উভয় দেশই বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় আফগানিস্তান এখন আর কোনো সংযোগ সেতু নেই, বরং এটি এখন চারদিক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে পরিণত হয়েছে।
যেহেতু দক্ষিণ ও পশ্চিমের পুরনো পথগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মধ্য এশিয়ার মধ্য দিয়ে দ্রুত মানবিক সহায়তার পথ (করিডোর) চালু করা। অন্যদিকে, তালেবানের সামনে এখন কেবল দুটি পথই খোলা আছে- হয় তাদের টিটিপি ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমিয়ে আনতে হবে, নয়তো একটি খণ্ডিত ও দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশের শাসনভার নিয়ে বসে থাকতে হবে।
লেখক: ড. মুস্তাফা সাকিব রাটগার্স ইউনিভার্সিটি, ক্যামডেনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন সহযোগী গবেষক এবং ভিজিটিং স্কলার।
*লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ থেকে অনূদিত*