ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প সমর্থকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন

এমা অ্যাশফোর্ড
এমা অ্যাশফোর্ড
ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প সমর্থকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর, তেহরানে একটি বিস্ফোরণের ফলে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–বোর্ড অব পিসের প্রধান, ফিফা পিস প্রাইজের বিজয়ী এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অর্থহীন যুদ্ধগুলোর কট্টর বিরোধী–তিনিই গত শনিবার ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করেন। দিন শেষে তিনি প্রমাণ করেন যে, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ইরানবিরোধী কট্টরপন্থীদের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে তিনি অক্ষম। এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ যে, অস্পষ্ট উদ্দেশ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রলোভন প্রতিরোধ করতেও ব্যর্থ।

ট্রাম্পের ঐতিহ্যগত দুর্বল আবেগনিয়ন্ত্রণ বিবেচনায় নিলে এটি হয়তো বিস্ময়কর নয়। কিন্তু আরেকটি পছন্দসই যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তটি শুধু প্রেসিডেন্টের সমর্থকদের সঙ্গেই নয়, বরং বৃহত্তর আমেরিকান জনগণের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা।

ট্রাম্পের নিজস্ব জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারা তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে তাকে শান্তির প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। স্টিফেন মিলার তো একবার কমলা হ্যারিসের প্রচারণাকে “যুদ্ধপাগল নিওকনরা [যারা] আপনার সন্তানদের এমন যুদ্ধে মরতে পাঠাতে ভালোবাসে, যেগুলো তারা নিজেরা কখনো লড়বে না,” বলে বর্ণনা করেছিলেন।

ট্রাম্প এখন সেই ব্যক্তিতেই পরিণত হয়েছেন, যাকে তিনি একসময় নিন্দা করতেন। দীর্ঘদিনের সমর্থক টাকার কার্লসন আজকের হামলাগুলোকে ‘সম্পূর্ণ জঘন্য ও অশুভ’ বলে বর্ণনা করেছেন। ট্রাম্প একটি সংক্ষিপ্ত ও সফল যুদ্ধের আশায় পাশা ঘুঁটি চালছেন। এখন তাকে অপেক্ষা করতে হবে এটা বোঝার জন্য যে, তিনি কি বরং যুক্তরাষ্ট্রকে সেই বিষয়েই জড়িয়ে ফেলেছেন, যা তিনি এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন–অর্থাৎ আরেকটি বিপর্যয়কর মধ্যপ্রাচ্য জটিলতায়।

ইরানে কী ঘটবে তা বলার এখনো সময় আসেনি। কিন্তু এটি খুবই স্পষ্ট যে, তার সমর্থকভিত্তি বা আমেরিকান জনগণ যা চেয়েছিল, এটি তা নয়।

আমরা এখানে এলাম কীভাবে?

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি আসলে তার শক্তিশালী বিষয়গুলোর একটি ছিল, যেখানে তিনি ইউক্রেন থেকে গাজা হয়ে চীন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি বড় পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে হ্যারিসের ওপর সামান্য কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।

আসলে, পররাষ্ট্রনীতি মহলে অনেকের সংশয় থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কাঠামোটি ভোটারদের কাছে সাড়া জাগিয়েছিল: ইউক্রেন, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বের সব সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব নেবে–এই প্রশ্নগুলোতে তার বার্তা রিপাবলিকানদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ভোটারদের কাছেও জনপ্রিয় ছিল।

কিন্তু ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ যখন বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততায় আমেরিকান স্বার্থ পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি থেকে সরে গিয়ে প্রেসিডেন্টের খেয়ালখুশি, দমনমূলক মনোভাব এবং সামরিক দুঃসাহসিকতার প্রতি ঝোঁকের প্রতিফলনে পরিণত হলো– তখন ট্রাম্পের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতির অনুমোদন কমে গেছে। গত কয়েক মাসে তা ৪১ শতাংশ থেকে ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি এখনো তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয়। কিন্তু তার সমর্থকদের মধ্যেও নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে উল্লেখযোগ্য আপত্তি রয়েছে: প্রায় ৭০ শতাংশ রিপাবলিকান গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতা করেন, এবং মাত্র ১৭ শতাংশ বলেছেন যে তারা ইরানে শাসন পরিবর্তনকে সমর্থন করবেন।

এটা না ভাবতে পারা কঠিন যে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি আসলে ভোটাররা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ থেকে যা চেয়েছিলেন, তা নয়। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ শব্দবন্ধটিই সবসময় কিছুটা সমস্যার ছিল।

প্রথম প্রচারণায় ট্রাম্পের এই শব্দ ব্যবহার বুদ্ধিজীবী মহলে সমালোচনার ঝড় তোলে। কারণ তারা এটিকে ১৯৩০-এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন। কিন্তু ঠিক একই কারণে এটি ভোটারদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। এটি মনে হয়েছিল শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী অতিসরল উদারনৈতিক ঐকমত্যের প্রত্যাখ্যান, যা আমেরিকান স্বার্থ ও প্রয়োজনকে অন্য দেশের স্বার্থকে নিচে স্থান দিয়েছিল।

বিশ্বে আমেরিকার সম্পৃক্ততা নিয়ে ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গির দীর্ঘমেয়াদি জরিপও এটিকে সমর্থন করে। সাম্প্রতিক এপি-নরক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৭ শতাংশ মার্কিনি চান যে আমেরিকা বিশ্বের সমস্যা সমাধানে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিক; ৪৫ শতাংশ চান কম সক্রিয় হোক। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স, যা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকানদের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে জরিপ করে আসছে, তারাও গত পাঁচ বছরে বিশ্বে সক্রিয় মার্কিন ভূমিকার প্রতি সমর্থন প্রায় ১০ শতাংশ কমতে দেখেছে।

বাস্তবে, অধিকাংশ আমেরিকান নিয়মিতভাবে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন, এবং এটি খুব কমই শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে স্থান পায়। কিন্তু এই গতিশীলতা ট্রাম্পের জন্য নতুন কিছু নয়।

মনে রাখা উচিত, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রথমদিকের পররাষ্ট্রনীতি স্লোগানগুলোর একটি ছিল ‘মধ্যবিত্তের জন্য পররাষ্ট্রনীতি’, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে যুক্ত করতে এবং পররাষ্ট্রনীতিকে আমেরিকানদের চাহিদার প্রতি আরও দৃশ্যমান ও সাড়া-দায়ী করতে চেয়েছিল।

তবে বাইডেন প্রশাসনের মতোই, দায়িত্বে এসে ট্রাম্পের নীতিগুলোও ক্রমশ ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় বলে মনে হওয়া আরও সংযত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ঘোষিত পথ থেকে সরে গেছে।

শুরুটা আশাব্যঞ্জক ছিল

ট্রাম্প গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে পেরেছিলেন, ইউক্রেন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে অভিবাসী আটক ফ্লাইট গ্রহণে রাজি করিয়েছিলেন, এবং এমনকি ইউরোপীয় নেতাদের কাছ থেকে ন্যাটোর ভেতরে নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও ব্যয় করার প্রতিশ্রুতিও আদায় করেছিলেন।

তবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এসে পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বিমান হামলায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, মাটির নিচে ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করেন, কিন্তু প্রকৃত সমস্যার কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দেননি।

বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে তার তলোয়ার ঝনঝনানি মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়ের সঙ্গেই উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং ইতিবাচক ফল খুব কমই দিয়েছে। ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির শুরু থেকে শুল্কের ২০০ বিলিয়ন ডলারের ৯৬ শতাংশই আমেরিকান ভোক্তা ও আমদানিকারকেরা বহন করেছেন।

ট্রাম্পের পশ্চিম গোলার্ধ নীতিও রয়েছে, যা সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন, মাদক এবং অন্যান্য দেশিয় বিষয় দিয়ে শুরু হয়েছিল– যেগুলো এখনো ভোটারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অন্যান্য কট্টরপন্থী উপদেষ্টাদের প্রভাবে এই নীতি ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপ এবং কিউবায় শাসন পরিবর্তন নিয়ে ঢিলেঢালা বক্তব্যে রূপ নিয়েছে।

অনেক সময় ট্রাম্পের নীতিগুলো কোনো সুস্পষ্ট নীতিগত যুক্তির চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষোভ দ্বারা চালিত বলে মনে হয়। যেমন নোবেল কমিটি তাকে সম্মান না দেওয়ায় তার বারবার ক্ষোভ প্রকাশ। তবে এখনো ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ভালো দিকগুলো আছে (যেমন ইউক্রেন নিয়ে চলমান শান্তি আলোচনা)। কিন্তু সেগুলো ক্রমশ অন্যান্য, প্রায় এলোমেলো নীতির কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে, যেগুলোর অধিকাংশ আমেরিকানদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে খুব কম সম্পর্ক রয়েছে।

বাস্তবে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর কেন্দ্রীয় সমস্যা হলো এর কখনোই সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ছিল না। অর্থাৎ আমেরিকান স্বার্থ কী? এটি নির্ধারণ করে কে?

প্রচলিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে ভেঙেচুরে দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সক্ষমতা তাকে সাম্প্রতিক দশকগুলোর অনেক বাধা অতিক্রম করতে দিয়েছে, যা আমেরিকানদের উপকারে আসতে পারে। কিন্তু এই অপ্রত্যাশিত বিষয়, আশপাশের লোকদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও দমন করার প্রবণতা, এবং আমেরিকান জনগণের স্বার্থের ওপরে নিজের স্বার্থ ও অহমকে স্থান দেওয়া– এসবই তাকে দীর্ঘমেয়াদে আরও টেকসই পররাষ্ট্রনীতি গঠনের জন্য দুর্বল করে তোলে। আজকের ইরান হামলাগুলো এই সমস্যার প্রতীক।

গত সপ্তাহে জরিপে অংশ নেওয়া আমেরিকানদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ বলেছেন, তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ সমর্থন করবেন, তবুও প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধের পক্ষে আমেরিকান জনগণের কাছে যুক্তি তুলে ধরার জন্যও থামেননি। তাকে সীমাবদ্ধ করছে কেবল তার ‘নিজস্ব নৈতিকতা’।

তবে ইতিহাস যদি পথপ্রদর্শক হয়, এই যুদ্ধ সম্ভবত বিদেশে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততার প্রতি জনঅসন্তোষই বাড়াবে।
আমেরিকানরা সক্ষম মিত্র, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবন, এবং বিশ্বে আরও সংযত ভূমিকা চান– যা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ফলপ্রসূ অংশীদার হিসেবে যুক্ত থাকবে।

তারা মধ্যপ্রাচ্যে অন্তহীন পছন্দসই যুদ্ধ চান না, জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের নীতির ভূতুড়ে পুনরুত্থানও চান না। তারা ‘আমেরিকান অপমান’– যা পৃথিবীর প্রতিটি দেশকে বিচ্ছিন্ন করে, তা তারা চান না। মার্কিন জনগণের প্রয়োজন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যা আমেরিকানদের অগ্রাধিকার দেয়। এই প্রশাসনের কাছ থেকে তারা তা পাচ্ছেন না।

লেখক: ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের কলাম লেখক এবং স্টিমসন সেন্টারের ‘রিইম্যাজিনিং ইউ.এস. গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো

(লেখাটি ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের সৌজন্যে।)

সম্পর্কিত