Advertisement Banner

কিচেন কেবিনেট: ড. ইউনূসকে সামনে ঠেলে দায় সারছে সবাই?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কিচেন কেবিনেট: ড. ইউনূসকে সামনে ঠেলে দায় সারছে সবাই?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে ড. ইউনূস। ছবি: ফেসবুক

কিচেন কেবিনেট নিয়ে নতুন করে মুখ খুললেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। ফলে কিচেন কেবিনেট নিয়ে আলোচনার পালে আবার লেগেছে জোর হাওয়া।

মূলত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. তৌহিদ হোসেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই কিচেন কেবিনেট নিয়ে কথা বলেন।

গত মাসের শেষদিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় সাত সদস্যের একটি কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সেখান থেকেই আসত।”

এ নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হলে আরেক সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে কথা বলেন। সেখানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল বলে উল্লেখ করেন আসিফ।

গত ২৬ মে বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেন, “কিচেন কেবিনেট ছিল। কিন্তু আমি সেটার সদস্য ছিলাম না।”

অবশ্য এ নিয়ে আলোচনাটি অনেক আগের। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় থেকেই এ নিয়ে আলোচনা ছিল। তবে সে সময় সরকারের কোনো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এ নিয়ে কেউ মুখ খোলেনি।

উপদেষ্টাদের কেউ আমাকে ডাকেওনি। আমার সঙ্গে কনসাল্ট করার প্রয়োজনও মনে করেনি। সেখানে কী হতো আমি জানি না। হয়তো ওই মনোভাবের লোক আমি ছিলাম না। আমি তাদের সাথে একমত হতে পারতাম না–তারা ধরে নিয়েছে। যারা এই কাজ করেছে তারা চিহ্নিত। আমি শুধু নাম শুনেছি। তারা আমার কলিগ ছিলেন।

কিন্তু অনেক আগে থেকেই সরকারের ভেতরের শক্তিশালী একটি অংশের কথা শোনা যাচ্ছিল। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে নানা জায়গায় আলোচনা চললেও বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খুলছিল না।

তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে একটু একটু করে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে থাকে। এ নিয়ে প্রথম মুখ খোলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।

মাহফুজ আলম, ড. ইউনূস ও আসিফ মাহমুদ। ফাইল ছবি
মাহফুজ আলম, ড. ইউনূস ও আসিফ মাহমুদ। ফাইল ছবি

জাতীয় দৈনিক মানবজমিনকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ড. ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের একটা কিচেন কেবিনেট ছিল, যার সদস্য তিনি ছিলেন না। সেখানে কী আলোচনা হতো, সে সম্পর্কে তাদের জানানো হতো না। সদস্যরা ছিলেন ইউনূসের নিকটজন।

সাখাওয়াত বলেন, “এসব আলোচনার মধ্যেও আমি থাকিনি। আমাকে রাখাও হয়নি।” পরে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “উপদেষ্টাদের কেউ আমাকে ডাকেওনি। আমার সঙ্গে কনসাল্ট করার প্রয়োজনও মনে করেনি। সেখানে কী হতো আমি জানি না। হয়তো ওই মনোভাবের লোক আমি ছিলাম না। আমি তাদের সাথে একমত হতে পারতাম না–তারা ধরে নিয়েছে। যারা এই কাজ করেছে তারা চিহ্নিত। আমি শুধু নাম শুনেছি। তারা আমার কলিগ ছিলেন।”

বলে রাখা ভালো–রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় কিচেন কেবিনেট বলতে আনুষ্ঠানিক কোনো ফোরাম নেই। এই শব্দবন্ধ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের কিছু বিশ্বস্ত সহকর্মীকে নিয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠীকে বোঝায়, যাদের সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন ও সিদ্ধান্ত নেন।

আগেই বলা হয়েছে সম্প্রতি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের এক সাক্ষাৎকারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি ওই সাক্ষাৎকারে জানান, কিচেন কেবিনেটের এই উপদেষ্টারা প্রতি মঙ্গলবার সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন যমুনায় বৈঠকে বসতেন। এদের হস্তক্ষেপ ও মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিক্যাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হলো এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হলো। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামাত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল

এদিকে আরেক সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও এই কিচেন কেবিনেটের কথা উল্লেখ করে পোস্ট দিয়েছেন। বলে রাখা ভালো, ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ড. ইউনূস এই মাহফুজ আলমকেই জুলাই আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে গত ১৯ মে দেওয়া পোস্টে সেই মাহফুজ আলমই লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিক্যাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হলো এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হলো। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামাত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল।”

শুরুতেই বলা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন এক সাক্ষাৎকারে প্রথম ‘কিচেন কেবিনেটের’ কথা বলেছিলেন। এ নিয়ে তোলপাড় শুরুর পর, মুখ খুলতে শুরু করেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা।

গত মার্চে এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “প্রথম কথা হলো–কিচেন কেবিনেট যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারেই সিদ্ধ একটা প্রথা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেবিনেটের বাইরে ওখানে নেওয়া হতো–বিষয়টা তা না। আপনি যেকোনো একটা বিষয়ে আলোচনা করবেন, আমাদের কতজন ছিল–২০/২২ জন, আপনি সবাইকে ডেকে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা তো হয় না। আমাদের মধ্যে সকলে এক রকম রাজনীতি বুঝত না। সকলের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যোগাযোগ ছিল না। আমার যেমন কোনো যোগাযোগই ছিল না। সাখাওয়াত সাহেব কিন্তু এটা বলতে পারেন নাই যে, কিচেন কেবিনেটে কারা ছিল? তিনি কিছু স্মল মিটিংকে রেফার করেছেন। উনি এটাও বলতে পারেন নাই যে, কোন সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটের বাইরে হয়েছে।”

তৌহিদ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার সখাওয়াত–সবার বক্তব্য থেকে এই কিচেন কেবিনেটের আকার সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। আর তা হলো–৭ জন। কিন্তু কোন সাতজন–তা এখনো অজানা।

কিচেন কেবিনেটের সেই ৭ জন নেই আগের ভূমিকায়, কিন্তু তাদের প্রভাব কি রয়ে গেছে। বিশেষ করে খলিলুর রহমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর এ প্রশ্ন ভীষণভাবেই বাস্তব।

সম্পর্কিত