চরচা ডেস্ক

হারিয়ে যাওয়া একটি ঘড়ি থেকে শুরু হয়েছে দুইশো বছরের এক বিস্ময়কর যাত্রা। আজও বিলাসবহুল ঘড়ি মানুষের মন জয় করে। এর পেছনে রয়েছে প্রকৌশল, শিল্প আর আবেগ।
১৮১২ সালে নেপোলিয়ান বোনাপার্টের বোন, নেপলসের রানি ক্যারোলিন মুরাতকে একটি বিশেষ ঘড়ি উপহার দেন আব্রাহাম-লুইস ব্রেগুয়েট (Abraham-Louis Breguet)। এই ঘড়িটিকে বিশ্বের প্রথম রিস্টওয়াচ বলা হয়। এর ছিল ডিম্বাকৃতি মুখ, রুপার ডায়াল এবং চুল ও সোনার সুতো দিয়ে তৈরি ব্রেসলেট। আজ সেই ঘড়ি আর নেই। কিন্তু তার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। সায়েন্টেফিক আমেরিকান পত্রিকার মে ২০২৬ সংখ্যায় জিয়ানা ব্রাইনার এই দীর্ঘ যাত্রার গল্প তুলে ধরেছেন।
আজকের বিলাসবহুল ঘড়ি অনেক জটিল। ২০১৯ সালে প্রথমবার তৈরি হয় নীরব কম্পমান অ্যালার্মসহ যান্ত্রিক ঘড়ি। রিচার্ড মিল্লে পাঁচ বছর সময় নিয়ে ৮১৬টি যন্ত্রাংশ দিয়ে একটি ঘড়ি বানাযন। এতে দুটি বেজেল থাকে—কার্বন ফাইবার ও টাইটানিয়ামের। ঘড়ির ভেতরের দোলন থেকে কম্পন তৈরি হয় এবং তা যিনি পরেন তার কব্জিতে পৌঁছায়। এই জগতে শিল্প, বিজ্ঞান, ফ্যাশন ও আবেগ একসাথে মিশে যায়।
নিউইয়র্কের হোরোলজিক্যাল সোসাইটির পরিচালক নিকোলাস মানোউসোস বলেন, কেউ শুধু সময় দেখার জন্য এত দামি ঘড়ি কেনেন না। মানুষ এগুলো কেনেন যেমন তারা শিল্পকর্ম বা পুরোনো গাড়ি কেনেন। তারা আকৃষ্ট হন কারুকাজ, সৌন্দর্য, ইতিহাস ও মানুষের হাতে তৈরি জিনিসের আবেগে।
ঘড়ি বিষয়ক জনপ্রিয় সাইট হোডিঙ্কির সম্পাদক ট্যানট্যান ওয়াং বলেন, এই ঘড়িগুলোর বিশেষত্ব হলো শিল্প ও বিজ্ঞান একসাথে চলে। সবচেয়ে জটিল ঘড়ির প্রতিটি অংশও সুন্দরভাবে সাজানো থাকে এবং হাতে তৈরি করা হয়।
আজকের দিনে স্মার্টফোন সময় দেখার কাজ সহজ করে দিয়েছে। তবুও মানুষ কেন বিলাসবহুল ঘড়ি কেনে? ওয়াং বলেন, এটি মানুষের নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছার সঙ্গে জড়িত। কেউ মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখে। আবার কেউ দেখে ইতিহাসের জন্য, কেউ প্রযুক্তির জন্য, কেউ ফ্যাশনের জন্য। তাই একেকজনের কাছে ঘড়ির মানে একেক রকম।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল জীবনের ভিড়ে ঘড়ি এক ধরনের শান্তি দেয়। যান্ত্রিক ঘড়ি ছোট হলেও এটি এক ধরনের প্রকৌশল বিস্ময়। অনেক পুরোনো কৌশল আজও ব্যবহৃত হয়। একটি ভালো ঘড়ি প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে। যা আজকের অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে বিরল।

মানোউসোস বলেন, ডিজিটাল যুগে ঘড়ি খুবই সৎ একটি বস্তু। এর গিয়ার, স্প্রিং, এসকেপমেন্ট– সবই চোখে দেখা যায়। এটি মনে করিয়ে দেয়, উদ্ভাবন শুধু কাজের জন্য নয়, এটি সুন্দরও হতে পারে।
ঘড়ি তৈরি কি শিল্প, নাকি বিজ্ঞান– এ প্রশ্নের জবাবে মানোউসোস বলেন, এটি তখনই সেরা হয় যখন দুটো আলাদা করা যায় না। একটি ঘড়িকে শক্তি সঞ্চয়, নিয়ন্ত্রণ ও সঠিকভাবে চালানোর সমস্যা সমাধান করতে হয়। একই সঙ্গে ঝাঁকুনি, তাপমাত্রা ও ঘর্ষণের প্রভাব সামলাতে হয়। সবকিছুই ছোট একটি যন্ত্রে বসাতে হয়। আবার একই সঙ্গে এটিকে সুন্দরও করতে হয়– ডায়াল ডিজাইন, কেস তৈরি, শব্দ তৈরি– সবই শিল্পের অংশ।
ওয়াং বলেন, ঘড়িতে সরাসরি শিল্পও আছে। বিশেষ করে ডায়ালে। গ্র্যান্ড ফু এনামেলিং একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। এতে কাচের গুঁড়ো পানির সাথে মিশিয়ে ডায়ালে আঁকা হয়। তারপর উচ্চ তাপে বারবার পোড়ানো হয়। এই প্রক্রিয়া অনেক সময় ব্যর্থ হয়। কিন্তু সফল হলে সেটি খুব মূল্যবান হয়ে ওঠে।
গত দশকের বড় অগ্রগতি কী? মানোউসোস বলেন, সিলিকনের ব্যবহার বড় পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে হেয়ারস্প্রিং ও এসকেপমেন্টে। সিলিকন হালকা, চৌম্বকবিরোধী এবং খুব নির্ভুলভাবে তৈরি করা যায়। ফলে ঘড়ি আরও স্থিতিশীল ও নির্ভুল হয়।
ওয়াং বলেন, কয়েক বছর আগে পাতলা ঘড়ি বানানোর প্রতিযোগিতা ছিল। প্রতিটি নতুন মডেল আগের চেয়ে আরও পাতলা। কিছু ঘড়ির পুরুত্ব দুইটি ক্রেডিট কার্ডের একটু বেশি মাত্র।
টুল ওয়াচ নিয়ে মানোউসোস বলেন, এগুলো তৈরি হয়েছে নির্দিষ্ট কাজের জন্য। যেমন পাইলট, ডুবুরি, পর্বতারোহী বা মহাকাশচারীদের জন্য। এগুলো শক্তিশালী, টেকসই এবং সহজে পড়া যায়। এতে থাকে স্পষ্ট ডায়াল, আলোকসজ্জা এবং বিভিন্ন মাপার সুবিধা।
ওয়াং বলেন, ওমেগা স্পিডমাস্টর মুনওয়াচ একটি বিখ্যাত টুল ওয়াচ। ১৯৬০-এর দশকে নাসা নভোচারীদের জন্য ঘড়ি বাছাই করেছিল। ১৯৬৫ সালে ওমেগার একটি মডেল সব পরীক্ষা পাস করে। আজও এই ঘড়ির নকশা অনেকটাই আগের মতো। তাই এটি ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
জটিল ঘড়ির বিষয়ে ওয়াং বলেন, কমপ্লিকেশন ঘড়ি তৈরির সীমা বাড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে আরও জটিল ঘড়ি তৈরির প্রবণতা বেড়েছে। ভবিষ্যতেও এই প্রবণতা থাকবে। তবে তিনি আশা করেন, এসব প্রযুক্তি আরও সুলভ হবে। যেমন একটি মিনিট রিপিটার ঘড়ি এখন খুব দামি। কিন্তু একদিন হয়তো সাধারণ মানুষও এটি কিনতে পারবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিলাসবহুল ঘড়ি শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়। এটি ইতিহাস, শিল্প, বিজ্ঞান ও মানুষের আবেগের এক অনন্য মিশ্রণ।

হারিয়ে যাওয়া একটি ঘড়ি থেকে শুরু হয়েছে দুইশো বছরের এক বিস্ময়কর যাত্রা। আজও বিলাসবহুল ঘড়ি মানুষের মন জয় করে। এর পেছনে রয়েছে প্রকৌশল, শিল্প আর আবেগ।
১৮১২ সালে নেপোলিয়ান বোনাপার্টের বোন, নেপলসের রানি ক্যারোলিন মুরাতকে একটি বিশেষ ঘড়ি উপহার দেন আব্রাহাম-লুইস ব্রেগুয়েট (Abraham-Louis Breguet)। এই ঘড়িটিকে বিশ্বের প্রথম রিস্টওয়াচ বলা হয়। এর ছিল ডিম্বাকৃতি মুখ, রুপার ডায়াল এবং চুল ও সোনার সুতো দিয়ে তৈরি ব্রেসলেট। আজ সেই ঘড়ি আর নেই। কিন্তু তার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। সায়েন্টেফিক আমেরিকান পত্রিকার মে ২০২৬ সংখ্যায় জিয়ানা ব্রাইনার এই দীর্ঘ যাত্রার গল্প তুলে ধরেছেন।
আজকের বিলাসবহুল ঘড়ি অনেক জটিল। ২০১৯ সালে প্রথমবার তৈরি হয় নীরব কম্পমান অ্যালার্মসহ যান্ত্রিক ঘড়ি। রিচার্ড মিল্লে পাঁচ বছর সময় নিয়ে ৮১৬টি যন্ত্রাংশ দিয়ে একটি ঘড়ি বানাযন। এতে দুটি বেজেল থাকে—কার্বন ফাইবার ও টাইটানিয়ামের। ঘড়ির ভেতরের দোলন থেকে কম্পন তৈরি হয় এবং তা যিনি পরেন তার কব্জিতে পৌঁছায়। এই জগতে শিল্প, বিজ্ঞান, ফ্যাশন ও আবেগ একসাথে মিশে যায়।
নিউইয়র্কের হোরোলজিক্যাল সোসাইটির পরিচালক নিকোলাস মানোউসোস বলেন, কেউ শুধু সময় দেখার জন্য এত দামি ঘড়ি কেনেন না। মানুষ এগুলো কেনেন যেমন তারা শিল্পকর্ম বা পুরোনো গাড়ি কেনেন। তারা আকৃষ্ট হন কারুকাজ, সৌন্দর্য, ইতিহাস ও মানুষের হাতে তৈরি জিনিসের আবেগে।
ঘড়ি বিষয়ক জনপ্রিয় সাইট হোডিঙ্কির সম্পাদক ট্যানট্যান ওয়াং বলেন, এই ঘড়িগুলোর বিশেষত্ব হলো শিল্প ও বিজ্ঞান একসাথে চলে। সবচেয়ে জটিল ঘড়ির প্রতিটি অংশও সুন্দরভাবে সাজানো থাকে এবং হাতে তৈরি করা হয়।
আজকের দিনে স্মার্টফোন সময় দেখার কাজ সহজ করে দিয়েছে। তবুও মানুষ কেন বিলাসবহুল ঘড়ি কেনে? ওয়াং বলেন, এটি মানুষের নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছার সঙ্গে জড়িত। কেউ মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখে। আবার কেউ দেখে ইতিহাসের জন্য, কেউ প্রযুক্তির জন্য, কেউ ফ্যাশনের জন্য। তাই একেকজনের কাছে ঘড়ির মানে একেক রকম।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল জীবনের ভিড়ে ঘড়ি এক ধরনের শান্তি দেয়। যান্ত্রিক ঘড়ি ছোট হলেও এটি এক ধরনের প্রকৌশল বিস্ময়। অনেক পুরোনো কৌশল আজও ব্যবহৃত হয়। একটি ভালো ঘড়ি প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে। যা আজকের অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে বিরল।

মানোউসোস বলেন, ডিজিটাল যুগে ঘড়ি খুবই সৎ একটি বস্তু। এর গিয়ার, স্প্রিং, এসকেপমেন্ট– সবই চোখে দেখা যায়। এটি মনে করিয়ে দেয়, উদ্ভাবন শুধু কাজের জন্য নয়, এটি সুন্দরও হতে পারে।
ঘড়ি তৈরি কি শিল্প, নাকি বিজ্ঞান– এ প্রশ্নের জবাবে মানোউসোস বলেন, এটি তখনই সেরা হয় যখন দুটো আলাদা করা যায় না। একটি ঘড়িকে শক্তি সঞ্চয়, নিয়ন্ত্রণ ও সঠিকভাবে চালানোর সমস্যা সমাধান করতে হয়। একই সঙ্গে ঝাঁকুনি, তাপমাত্রা ও ঘর্ষণের প্রভাব সামলাতে হয়। সবকিছুই ছোট একটি যন্ত্রে বসাতে হয়। আবার একই সঙ্গে এটিকে সুন্দরও করতে হয়– ডায়াল ডিজাইন, কেস তৈরি, শব্দ তৈরি– সবই শিল্পের অংশ।
ওয়াং বলেন, ঘড়িতে সরাসরি শিল্পও আছে। বিশেষ করে ডায়ালে। গ্র্যান্ড ফু এনামেলিং একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। এতে কাচের গুঁড়ো পানির সাথে মিশিয়ে ডায়ালে আঁকা হয়। তারপর উচ্চ তাপে বারবার পোড়ানো হয়। এই প্রক্রিয়া অনেক সময় ব্যর্থ হয়। কিন্তু সফল হলে সেটি খুব মূল্যবান হয়ে ওঠে।
গত দশকের বড় অগ্রগতি কী? মানোউসোস বলেন, সিলিকনের ব্যবহার বড় পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে হেয়ারস্প্রিং ও এসকেপমেন্টে। সিলিকন হালকা, চৌম্বকবিরোধী এবং খুব নির্ভুলভাবে তৈরি করা যায়। ফলে ঘড়ি আরও স্থিতিশীল ও নির্ভুল হয়।
ওয়াং বলেন, কয়েক বছর আগে পাতলা ঘড়ি বানানোর প্রতিযোগিতা ছিল। প্রতিটি নতুন মডেল আগের চেয়ে আরও পাতলা। কিছু ঘড়ির পুরুত্ব দুইটি ক্রেডিট কার্ডের একটু বেশি মাত্র।
টুল ওয়াচ নিয়ে মানোউসোস বলেন, এগুলো তৈরি হয়েছে নির্দিষ্ট কাজের জন্য। যেমন পাইলট, ডুবুরি, পর্বতারোহী বা মহাকাশচারীদের জন্য। এগুলো শক্তিশালী, টেকসই এবং সহজে পড়া যায়। এতে থাকে স্পষ্ট ডায়াল, আলোকসজ্জা এবং বিভিন্ন মাপার সুবিধা।
ওয়াং বলেন, ওমেগা স্পিডমাস্টর মুনওয়াচ একটি বিখ্যাত টুল ওয়াচ। ১৯৬০-এর দশকে নাসা নভোচারীদের জন্য ঘড়ি বাছাই করেছিল। ১৯৬৫ সালে ওমেগার একটি মডেল সব পরীক্ষা পাস করে। আজও এই ঘড়ির নকশা অনেকটাই আগের মতো। তাই এটি ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
জটিল ঘড়ির বিষয়ে ওয়াং বলেন, কমপ্লিকেশন ঘড়ি তৈরির সীমা বাড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে আরও জটিল ঘড়ি তৈরির প্রবণতা বেড়েছে। ভবিষ্যতেও এই প্রবণতা থাকবে। তবে তিনি আশা করেন, এসব প্রযুক্তি আরও সুলভ হবে। যেমন একটি মিনিট রিপিটার ঘড়ি এখন খুব দামি। কিন্তু একদিন হয়তো সাধারণ মানুষও এটি কিনতে পারবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিলাসবহুল ঘড়ি শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়। এটি ইতিহাস, শিল্প, বিজ্ঞান ও মানুষের আবেগের এক অনন্য মিশ্রণ।