আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
চরচা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে হামলা চালানোর পর ১০০ দিন পার হয়ে গেছে আজ রোববার। এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি করেছে। যুদ্ধটি এখন উপসাগরীয় অঞ্চল এবং লেবাননেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জোট কার পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং কার কেমন আচরণ ছিল–তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
যুদ্ধের শুরু থেকেই (২৮ ফেব্রুয়ারি) উপসাগরীয় দেশগুলো চরম সংকটে পড়েছে। তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এর মধ্যে ওমান মূলত মার্কিন-ইরান পরমাণু আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিল। তারা শুরুতেই এই যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করে একে একটি ‘বিপর্যয়’ ও ‘ভুল হিসাব’ বলে উল্লেখ করেছে। ওমান মার্কিন বা ইসরায়েলি স্বার্থের পক্ষে কাজ করেনি, যার ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানকে সামরিক শক্তির হুমকিও দিয়েছেন। ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ওমানের দুকম ও সালালাহ বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতার তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং রাস লাফানের এলএনজি প্ল্যান্টে হামলার পর ইরানি কূটনীতিক ও সামরিক কর্মীদের বহিষ্কার করেছে। তবে কাতার একই সাথে পাকিস্তান সমর্থিত শান্তি আলোচনা ও কূটনীতির পথ খোলা রেখেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও কুয়েত–এই দুটি দেশ ইরানের হামলার শিকার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইউএই ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি মার্কিন-ইসরায়েলি গোয়েন্দা সহায়তায় ইরানের ওপর পাল্টা বিমান হামলাও চালিয়েছে। কুয়েতও ইরানের ড্রোন হামলার শিকার হয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধের শুরুতে তুরস্ক সব পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকেই এই সহিংসতার মূল কারণ বলে উল্লেখ করে। তবে মে মাসে ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকে পড়লে ন্যাটো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তা ধ্বংস করা হয় এবং তুরস্ক এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের আয়োজক বাহরাইন ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার চেষ্টা করেছে (যা রাশিয়া ও চীন ভেটো দিয়ে আটকে দেয়)।
সৌদি আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানি হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। হরমুজ প্রণালি ইরান অবরুদ্ধ করায় সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি করছে। তারা ইরানের ওপর কিছু অপ্রকাশিত পাল্টা হামলা চালালেও তেহরানের সাথে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর থেকে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরাক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেছে। তবে ইরাকের মাটি এখন ইরান-পন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইরাকের তেল রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে।
তুরস্ক যুদ্ধের শুরুতে সব পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকেই এই সহিংসতার মূল কারণ বলে উল্লেখ করে। তবে মে মাসে ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকে পড়লে ন্যাটো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তা ধ্বংস করা হয় এবং তুরস্ক এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পরবর্তীতে তুরস্ক যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টায় শামিল হয়।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি থাকায় তারা ইরানের সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। জর্ডানের মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার ইরানের হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মিশর শুরু থেকেই এই যুদ্ধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
শুরু থেকেই সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ ও আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছে চীন। তারা ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। জাতিসংঘে বাহরাইনের আনা ইরান-বিরোধী প্রস্তাবে চীন ভেটো দিয়েছে।
রাশিয়া স্পষ্টভাবেই ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানকে একটি ‘নিষ্ঠাবান মিত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের কাছে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে রাশিয়া।
ইউরোপীয় দেশগুলো এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে বা হরমুজ প্রণালি সচল করতে সামরিক হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে। তবে ব্রিটেন তাদের ঘাঁটি থেকে মার্কিন যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি ও অস্ত্র নেওয়ার সুবিধা দিচ্ছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এই যুদ্ধের কারণে আফ্রিকায় খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব (বিশেষ করে জ্বালানি সংকট) মোকাবিলায় নিজেদের মধ্যে পাওয়ার গ্রিড ও জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফিলিপাইন ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকটে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
এই যুদ্ধে পাকিস্তান প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। গত ৮ এপ্রিল মার্কিন ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তার পেছনে পাকিস্তানের বড় ভূমিকা ছিল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনার জন্য পাকিস্তান সফর করেছেন।
ভারতের অবস্থান কিছুটা দ্বিমুখী ও সংকটাপন্ন। যুদ্ধের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফরকে ‘কুসময়ের সফর’ বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। ভারত মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেনি, আবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছে। হরমুজ প্রণালিতে ভারতীয় জাহাজ ইরানের হামলার শিকার হওয়ায় ভারত উদ্বিগ্ন এবং দেশের অভ্যন্তরে জনগণকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করা ও সোনা না কেনার মতো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ এই যুদ্ধের অবসান চেয়েছে এবং যুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে এবং মার্কিন যুদ্ধবিমানকে তাদের বেসামরিক বিমান বন্দরে নামার অনুমতি দেয়নি। তবে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি যুদ্ধজাহাজের ক্রুদের উদ্ধার করে মানবিক সহায়তা দিয়েছে।
আমেরিকা অঞ্চল
কানাডা সম্পূর্ণরূপে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তারা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করেছে এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকাতে মার্কিন পদক্ষেপের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। ব্রাজিল মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা করেছে এবং বিশ্বব্যাপী তেলের সংকট মেটাতে চীন ও ভারতে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে।
মেক্সিকো এই যুদ্ধে কোনো স্পষ্ট পক্ষ নেয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আপত্তির জেরে তারা ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ইরানি জাতীয় ফুটবল দলকে নিজেদের দেশে আতিথেয়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এই সংকটে বিশ্ব সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘ এবং তার মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘ সতর্কবার্তা জারি করে বলেছে যে, ইরানের ওপর এই যুদ্ধ বর্তমানে সম্পূর্ণ ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ হয়ে পড়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।
একটি চরম ও অপূরণীয় বিপর্যয় এড়াতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবিলম্বে সব পক্ষকে যুদ্ধ থামিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসন একদিকে জাতিসংঘকে এড়িয়ে চললেও, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির সংকট নিয়ে জাতিসংঘের ওপর দায় চাপাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জাতিসংঘকে চাপ দিয়ে বলেছেন, তারা যেন ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও মাইন পোঁতা বন্ধ করায় এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে।
এই যুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের পক্ষে কানাডা এবং পরোক্ষভাবে ইউরোপ অবস্থান নিলেও, রাশিয়া ও চীন সরাসরি ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা ও মার্কিন স্বার্থের দোলাচলে পড়ে ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আর পাকিস্তান ও ওমানের মতো দেশগুলো কূটনীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে হামলা চালানোর পর ১০০ দিন পার হয়ে গেছে আজ রোববার। এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি করেছে। যুদ্ধটি এখন উপসাগরীয় অঞ্চল এবং লেবাননেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জোট কার পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং কার কেমন আচরণ ছিল–তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
যুদ্ধের শুরু থেকেই (২৮ ফেব্রুয়ারি) উপসাগরীয় দেশগুলো চরম সংকটে পড়েছে। তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এর মধ্যে ওমান মূলত মার্কিন-ইরান পরমাণু আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিল। তারা শুরুতেই এই যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করে একে একটি ‘বিপর্যয়’ ও ‘ভুল হিসাব’ বলে উল্লেখ করেছে। ওমান মার্কিন বা ইসরায়েলি স্বার্থের পক্ষে কাজ করেনি, যার ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানকে সামরিক শক্তির হুমকিও দিয়েছেন। ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ওমানের দুকম ও সালালাহ বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতার তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং রাস লাফানের এলএনজি প্ল্যান্টে হামলার পর ইরানি কূটনীতিক ও সামরিক কর্মীদের বহিষ্কার করেছে। তবে কাতার একই সাথে পাকিস্তান সমর্থিত শান্তি আলোচনা ও কূটনীতির পথ খোলা রেখেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও কুয়েত–এই দুটি দেশ ইরানের হামলার শিকার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইউএই ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি মার্কিন-ইসরায়েলি গোয়েন্দা সহায়তায় ইরানের ওপর পাল্টা বিমান হামলাও চালিয়েছে। কুয়েতও ইরানের ড্রোন হামলার শিকার হয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধের শুরুতে তুরস্ক সব পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকেই এই সহিংসতার মূল কারণ বলে উল্লেখ করে। তবে মে মাসে ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকে পড়লে ন্যাটো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তা ধ্বংস করা হয় এবং তুরস্ক এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের আয়োজক বাহরাইন ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার চেষ্টা করেছে (যা রাশিয়া ও চীন ভেটো দিয়ে আটকে দেয়)।
সৌদি আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানি হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। হরমুজ প্রণালি ইরান অবরুদ্ধ করায় সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি করছে। তারা ইরানের ওপর কিছু অপ্রকাশিত পাল্টা হামলা চালালেও তেহরানের সাথে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর থেকে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরাক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেছে। তবে ইরাকের মাটি এখন ইরান-পন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইরাকের তেল রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে।
তুরস্ক যুদ্ধের শুরুতে সব পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকেই এই সহিংসতার মূল কারণ বলে উল্লেখ করে। তবে মে মাসে ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকে পড়লে ন্যাটো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তা ধ্বংস করা হয় এবং তুরস্ক এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পরবর্তীতে তুরস্ক যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টায় শামিল হয়।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি থাকায় তারা ইরানের সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। জর্ডানের মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার ইরানের হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মিশর শুরু থেকেই এই যুদ্ধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
শুরু থেকেই সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ ও আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছে চীন। তারা ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। জাতিসংঘে বাহরাইনের আনা ইরান-বিরোধী প্রস্তাবে চীন ভেটো দিয়েছে।
রাশিয়া স্পষ্টভাবেই ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানকে একটি ‘নিষ্ঠাবান মিত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের কাছে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে রাশিয়া।
ইউরোপীয় দেশগুলো এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে বা হরমুজ প্রণালি সচল করতে সামরিক হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে। তবে ব্রিটেন তাদের ঘাঁটি থেকে মার্কিন যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি ও অস্ত্র নেওয়ার সুবিধা দিচ্ছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এই যুদ্ধের কারণে আফ্রিকায় খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব (বিশেষ করে জ্বালানি সংকট) মোকাবিলায় নিজেদের মধ্যে পাওয়ার গ্রিড ও জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফিলিপাইন ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকটে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
এই যুদ্ধে পাকিস্তান প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। গত ৮ এপ্রিল মার্কিন ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তার পেছনে পাকিস্তানের বড় ভূমিকা ছিল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনার জন্য পাকিস্তান সফর করেছেন।
ভারতের অবস্থান কিছুটা দ্বিমুখী ও সংকটাপন্ন। যুদ্ধের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফরকে ‘কুসময়ের সফর’ বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। ভারত মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেনি, আবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছে। হরমুজ প্রণালিতে ভারতীয় জাহাজ ইরানের হামলার শিকার হওয়ায় ভারত উদ্বিগ্ন এবং দেশের অভ্যন্তরে জনগণকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করা ও সোনা না কেনার মতো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ এই যুদ্ধের অবসান চেয়েছে এবং যুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে এবং মার্কিন যুদ্ধবিমানকে তাদের বেসামরিক বিমান বন্দরে নামার অনুমতি দেয়নি। তবে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি যুদ্ধজাহাজের ক্রুদের উদ্ধার করে মানবিক সহায়তা দিয়েছে।
আমেরিকা অঞ্চল
কানাডা সম্পূর্ণরূপে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তারা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করেছে এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকাতে মার্কিন পদক্ষেপের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। ব্রাজিল মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা করেছে এবং বিশ্বব্যাপী তেলের সংকট মেটাতে চীন ও ভারতে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে।
মেক্সিকো এই যুদ্ধে কোনো স্পষ্ট পক্ষ নেয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আপত্তির জেরে তারা ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ইরানি জাতীয় ফুটবল দলকে নিজেদের দেশে আতিথেয়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এই সংকটে বিশ্ব সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘ এবং তার মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘ সতর্কবার্তা জারি করে বলেছে যে, ইরানের ওপর এই যুদ্ধ বর্তমানে সম্পূর্ণ ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ হয়ে পড়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।
একটি চরম ও অপূরণীয় বিপর্যয় এড়াতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবিলম্বে সব পক্ষকে যুদ্ধ থামিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসন একদিকে জাতিসংঘকে এড়িয়ে চললেও, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির সংকট নিয়ে জাতিসংঘের ওপর দায় চাপাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জাতিসংঘকে চাপ দিয়ে বলেছেন, তারা যেন ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও মাইন পোঁতা বন্ধ করায় এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে।
এই যুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের পক্ষে কানাডা এবং পরোক্ষভাবে ইউরোপ অবস্থান নিলেও, রাশিয়া ও চীন সরাসরি ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা ও মার্কিন স্বার্থের দোলাচলে পড়ে ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আর পাকিস্তান ও ওমানের মতো দেশগুলো কূটনীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।