Advertisement Banner

পশ্চিমা চাপ উপেক্ষা করেই রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক অন্য মাত্রায়

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পশ্চিমা চাপ উপেক্ষা করেই রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক অন্য মাত্রায়
পশ্চিমা বিশ্বের প্রবল চাপ ও নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করেই রাশিয়া ও চীন বাণিজ্য সম্পর্ক আগের থেকে আরও কয়েকধাপ উন্নত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

পশ্চিমা বিশ্বের প্রবল চাপ ও নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করেই রাশিয়া ও চীন তাদের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বাণিজ্য, জ্বালানি, অর্থায়ন এবং অবকাঠামোগত খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশের এই সহযোগিতা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মস্কো ও বেইজিং উভয় সরকারের মতে, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক স্তরের এই ক্রমবর্ধমান নেটওয়ার্ক তাদের অর্থনীতিকে বাইরের যেকোনো বৈরী চাপ থেকে রক্ষা করতে এবং বিশ্বমঞ্চে একটি ‘বহুকেন্দ্রিক বা মাল্টিপোলার’ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। বিশেষ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিংয়ে দুই দিনের সাম্প্রতিক সফর এই সম্পর্ককে আরও জোরদার করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

রেকর্ড ভাঙা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য

রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি-এর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গত তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ২০০ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করে আসছে। এর মধ্যে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৫ সালে এই বাণিজ্যের পরিমাণ রেকর্ড ২৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

সর্বশেষ কাস্টমস বা অন্য দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই দুই দেশের বাণিজ্য টার্নওভার ৮৫.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।

এই প্রবৃদ্ধির ফলে চীন টানা ১৬ বছর ধরে রাশিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে রাশিয়াও চীনের শীর্ষ আটটি বাণিজ্য অংশীদারের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এই বাণিজ্যের কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, মস্কো মূলত জ্বালানি, কাঁচামাল এবং কৃষি পণ্য রপ্তানি করছে। এর বিপরীতে বেইজিং সরবরাহ করছে ভারী যন্ত্রপাতি, যানবাহন, ইলেকট্রনিক্স এবং বিভিন্ন ধরনের ভোক্তা পণ্য। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেন সংঘাত শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এই দুই প্রতিবেশীর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

নিজস্ব মুদ্রায় আর্থিক একীকরণ

পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে রাশিয়া ও চীন তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আরটি-এর তথ্যমতে, দুই দেশ তাদের পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে পশ্চিমা মুদ্রা (যেমন মার্কিন ডলার ও ইউরো) প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়েছে। বর্তমানে তাদের মধ্যকার প্রায় সব লেনদেনই সম্পন্ন হচ্ছে রাশিয়ান রুবল এবং চীনা ইউয়ানের মাধ্যমে। রাশিয়ার অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, এই রূপান্তরের ফলে তথাকথিত ‘শত্রুভাবাপন্ন’ দেশের ডলার ও ইউরো-ভিত্তিক আর্থিক অবকাঠামোর ওপর তাদের নির্ভরতা একেবারে কমে গেছে। এর ফলে বহিরাগত নিষেধাজ্ঞা বা আর্থিক ব্ল্যাকমেইলের মুখেও দুই দেশের বাণিজ্য এখন অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক ও নিরাপদ।

পশ্চিমা প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চীন রাশিয়ার জ্বালানি তেলের প্রধান ক্রেতা হয়ে উঠেছে। ছবি: রয়টার্স
পশ্চিমা প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চীন রাশিয়ার জ্বালানি তেলের প্রধান ক্রেতা হয়ে উঠেছে। ছবি: রয়টার্স

অংশীদারিত্বের মেরুদণ্ড: জ্বালানি সহযোগিতা

২০২২ সালে রাশিয়া ও চীন তাদের সম্পর্ককে ‘সীমাহীন’ অংশীদারিত্ব হিসেবে ঘোষণা করেছিল। যার প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে জ্বালানি খাতে। পশ্চিমা নানা বিধিনিষেধ ও মূল্যসীমা নির্ধারণের প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চীন রাশিয়ার জ্বালানি তেলের প্রধান ক্রেতা হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বেইজিংয়ের জন্য অপরিশোধিত তেল, পাইপলাইন গ্যাস, এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এবং কয়লার অন্যতম শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ হলো রাশিয়া।

২০১৯ সালে চালু হওয়া ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া’ পাইপলাইনটি রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানি খাতে একটি বিশাল মাইলফলক ছিল, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তার পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছায়। বর্তমানে মস্কো ও বেইজিং মঙ্গোলিয়ার ওপর দিয়ে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই নতুন রুটটি চালু হলে আগে রাশিয়ার পশ্চিম সাইবেরিয়ার যে গ্যাসক্ষেত্রগুলো ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করত তা সরাসরি চীনের বাজারের সাথে যুক্ত হবে।

আরটি-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ সব রুট মিলিয়ে চীনে রাশিয়ার বার্ষিক গ্যাস রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ঘনমিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা দুই দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে একসূত্রে গেঁথে ফেলবে। পাইপলাইনের পাশাপাশি রাশিয়া ইয়ামাল এলএনজি, আর্কটিক এলএনজি ২ এবং সাখালিন-২ এর মতো দূরপ্রাচ্যের প্রকল্পগুলো থেকে আর্কটিক সাগরের ‘নর্দার্ন সি রুট’ ব্যবহার করে চীনে এলএনজি কার্গো পাঠানো বৃদ্ধি করেছে। বেইজিংয়ের জন্য রাশিয়ার এই জ্বালানি ভৌগোলিক নৈকট্য, সাশ্রয়ী মূল্য এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে একটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে মস্কোর জন্য চীন নিশ্চিত করছে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী বাজার।

সীমান্ত অবকাঠামোর আধুনিকায়ন

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে দুই দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সীমান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। আমুর নদীর ওপর নতুন রেলওয়ে এবং হাইওয়ে সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দুই দেশের স্থলভাগের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সহজ হয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার ব্লাগোভেশচেনস্ক এবং চীনের হেইহে শহরের মধ্যে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক আন্তঃসীমান্ত ক্যাবল কার নির্মাণের কাজ চলছে।

ঐতিহ্যবাহী এই অবকাঠামোর বাইরে গিয়ে মস্কো ও বেইজিং ভারী ও শূন্য কার্বন-নির্গমনকারী ট্রাক চলাচলের জন্য একটি আন্তঃসীমান্ত হাইড্রোজেন মালবাহী করিডোর তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। আরটি উল্লেখ করেছে যে, এই প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশই চীনের বিখ্যাত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই’য়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যা ইউরেশীয় অঞ্চলের সংযোগ বিস্তারে বেইজিংয়ের একটি কৌশলগত অংশ।

ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রযুক্তি ও যৌথ বিনিয়োগ

পশ্চিমা প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা রাশিয়া ও চীনকে নিজস্ব প্রযুক্তির উন্নয়নে এক হতে বাধ্য করেছে। দুই দেশ এখন বিমান চলাচল, পারমাণবিক শক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং যৌথ উদ্ভাবনী প্রকল্পের মতো উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। বিনিয়োগের সুরক্ষা ও প্রচারের জন্য সম্প্রতি একটি হালনাগাদ চুক্তি সই হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার আইনি ভিত্তি মজবুত করেছে।

রাশিয়ান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ কমিশনের আওতায় অবকাঠামো, জ্বালানি এবং লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন রুবল (প্রায় ২৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের ৯০টিরও বেশি যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। টেলিকমিউনিকেশন ক্ষেত্রে ৫জি প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল লজিস্টিকস থেকে শুরু করে কৃষি খাত পর্যন্ত চীনের বিনিয়োগ রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ শিল্পে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পশ্চিমা প্ল্যাটফর্মের ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে আনছে।

পর্যটন, শিক্ষা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা

বাণিজ্য ও ভারী শিল্পের বাইরেও দুই দেশের সাধারণ মানুষের স্তরে যোগাযোগ বাড়াতে পর্যটন, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা এবং নতুন নতুন বিমান রুট চালুর ফলে দুই দেশের মধ্যে পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত বহুগুণ বেড়েছে। একই সাথে রাশিয়া ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ যৌথ গবেষণা, বিনিয়োগ এবং আন্তঃসীমান্ত ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক অংশীদারিত্বকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর যে অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার নীতি চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তা চীনের এই দৃঢ় সহযোগিতার কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ডলার বর্জন, জ্বালানির নতুন বাজার তৈরি এবং যৌথ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মস্কো ও বেইজিং কেবল নিজেদের অর্থনৈতিক সুরক্ষাই নিশ্চিত করছে না, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার একক আধিপত্যের বিপরীতে এক শক্তিশালী বিকল্প মেরু গড়ে তুলছে।

সম্পর্কিত