Advertisement Banner

তেলাপোকাকে এত ভয় বিজেপির

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
তেলাপোকাকে এত ভয় বিজেপির
ককরোচ জনতা পার্টি। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সাড়া জাগানো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) হ্যান্ডেলটির তীব্র সমালোচনা করেছে। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, ভারতের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট চক্রান্তের অংশ হিসেবে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলনটি চালানো হচ্ছে। এর পেছনে বিদেশি শক্তির সমর্থন বা মদদ রয়েছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ‘জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের’ কারণে এই ককরোচ জনতা পার্টির এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলটি ব্লক বা স্থগিত করার নির্দেশ দেয়। তবে সরকারের এই কঠোর ও আনুষ্ঠানিক অবস্থানের বিপরীতে খোদ বিজেপি দলের অভ্যন্তরীণ কিছু কণ্ঠস্বর এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শরিক দলগুলো ভিন্ন সুর প্রকাশ করছে। তারা তরুণ সমাজের অসন্তোষকে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চেপে না রেখে, তাদের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা এবং নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গভীর সমস্যাজনিত ক্ষোভগুলোকে গুরুত্ব সহকারে শোনার তাগিদ দিচ্ছেন।

বিজেপির আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এবং প্রবীণ বিজেপি সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে এই আন্দোলনকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই সাথে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বর্তমানে বিজেপির কেরালা রাজ্য প্রধান রাজীব চন্দ্রশেখর এটিকে একটি সুপরিকল্পিত এবং ‘সমন্বিত প্রভাব খাটানোর অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চন্দ্রশেখর ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি সরকারের আইটি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত কোনো ক্ষোভের চেয়ে এই আন্দোলনের মাঝে একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে চন্দ্রশেখর দাবি করেন, ককরোচ পার্টির এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারকে টার্গেট করে পরিচালিত একটি ‘সীমান্ত পারের প্রভাব খাটানোর অভিযান’। এটি ভারতকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল দ্বারা নকশা করা হয়েছে এবং দেশের ভেতরের বিরোধী দলগুলোর কিছু উপাদান একে সাহায্য করছে। তবে একই সাক্ষাৎকারে চন্দ্রশেখর এও স্বীকার করেছেন যে, তরুণদের মধ্যে অন্তর্নিহিত কিছু ক্ষোভ রয়েছে এবং তিনি সব ধরনের ভিন্নমতকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিতে চান না। অন্যদিকে, নিশিকান্ত দুবে সরকারের এই অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে জানিয়েছেন যে, বিরোধী দলগুলোর জনসমর্থন কমছে বলেই তারা এই ধরনের পথ বেছে নিচ্ছে। সরকারের জনপ্রিয়তা কমার ভয়ে ভিন্নমত দমন করা হচ্ছে–এমন দাবি সঠিক নয়।

বিজেপির ভেতরে উদ্বেগ এবং তামিলনাড়ু নির্বাচনের শিক্ষা

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুসারে, বাইরে দলটির অবস্থান যতটা কঠোর এবং একরোখা দেখাক না কেন, বিজেপির ভেতরে তরুণদের এই ক্ষোভের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে অত্যন্ত অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ঝড়ের’ রাজনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করার জন্য দলটির ভেতরে ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনা শুরু হয়েছে।

দলের অনেক নেতাই এই পরিস্থিতিকে বুঝতে সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক ঘটনাকে উদাহরণ বা সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে আনছেন। বিশেষ করে তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তরুণদের ওপর ভর করে অভিনেতা বিজয়ের দল টিভিকে-র চমকপ্রদ ও বিশাল জয়কে বিজেপির একটি বড় অংশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাদের মতে, ককরোচ জনতা পার্টির মতো সামাজিক আন্দোলনকে মুখোমুখি সংঘাত বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দমন করার চেয়ে অত্যন্ত সতর্কতা ও সহানুভূতির সঙ্গে সামলানো উচিত। তবে বিজেপির একজন নেতা এই আন্দোলনকে ২০১১ সালের আন্না হাজারের নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া অ্যাগেইন্সট করাপশন’ আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করলেও এর মাঠপর্যায়ের প্রভাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এটি কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ এবং এর বাস্তব বা মাঠপর্যায়ে কোনো শক্তিশালী উপস্থিতি নেই।

শরিক দলগুলোর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও তরুণদের ক্ষোভকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

বিজেপির এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে তাদের নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের শরিক দলগুলো অনেক বেশি সতর্ক এবং বাস্তবসম্মত অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে অন্ধ্র প্রদেশের ক্ষমতাসীন দল টিডিপি বা তেলুগু দেশম পার্টি সরকারের পক্ষ থেকে ককরোচ জনতা পার্টির হ্যান্ডেলটি বন্ধ করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে ভালো চোখে দেখছে না। টিডিপির সংসদীয় দলের নেতা লাভু কৃষ্ণ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, দেশের যুব সমাজ এখন মূলধারার গণমাধ্যম বা ফেসবুকের মতো ঐতিহ্যবাহী প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য নতুন ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভর করছে। তামিলনাড়ুর নির্বাচনে অভিনেতা বিজয়ের জয় এর অন্যতম বড় প্রমাণ।

এক্স হ্যান্ডেল ব্লক করার বিষয়ে লাভু কৃষ্ণ পরিষ্কার করে বলেন, যদি এই ধরনের হ্যান্ডেলগুলো দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য কোনো বহিরাগত বা বিদেশি শক্তির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে থাকে, তবে এগুলোকে স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে দেওয়া উচিত এবং কাজ করতে দেওয়া উচিত।

ককরোচ জনতা পার্টি। ছবি: সংগৃহীত
ককরোচ জনতা পার্টি। ছবি: সংগৃহীত

এনডিএ জোটের অন্য একটি শরিক দলের একজন শীর্ষ নেতাও এই ভাইরাল হওয়া ঘটনাটিকে সরকার এবং সমস্ত রাজনৈতিক দলের জন্য একটি বড় ‘সতর্কবার্তা’ বা সংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, এই দেশের তরুণ সমাজ বা যুব শক্তিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া বা অবহেলা করা যাবে না। তার মতে, তরুণদের এই ক্ষোভ নিরসনের জন্য সরকারের কাছে হয়তো কোনো জাদুদণ্ড নেই। তাই বলে তাদের আসল সমস্যা ও উদ্বেগকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দেশের তরুণদের মধ্যে যে একটি দৃশ্যমান এবং গভীর অসন্তোষ ও নাখোশ ভাব বিরাজ করছে, তা এখন অনস্বীকার্য।

রাজনৈতিক তাৎপর্য

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই বিশেষ প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, ককরোচ জনতা পার্টি, যার প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, তা ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ও বিদেশি চক্রান্ত হিসেবে দেখে প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার ও জোটের ভেতরের একটি বড় অংশ মনে করছে যে, তরুণদের অর্থনৈতিক সংকট এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনাজনিত যে ক্ষোভ রয়েছে, তাকে কেবল নিষেধাজ্ঞা বা সেন্সরশিপ দিয়ে স্তব্ধ করা যাবে না। শরিকদের এই অবস্থান এবং তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের উদাহরণ এটিই প্রমাণ করে যে, আগামী দিনে ভারতের তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে হলে কেবল ডিজিটাল কঠোরতা নয়, বরং তাদের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করা এবং তাদের কণ্ঠস্বর শোনা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

সম্পর্কিত