চরচা ডেস্ক

লিওনেল মেসির কি কাতার বিশ্বকাপের পরই অবসর নিয়ে নেওয়া উচিত ছিল?
নিদেনপক্ষে আনহেল দি মারিয়ার মতো ২০২৪ কোপা আমেরিকার পর?
আর্জেন্টিনা ভক্ত হলে এতটুকু শুনেই আপনি বিরক্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কোথায় আর্জেন্টিনা আরেকটা বিশ্বকাপে নামার আগে কোথায় মেসির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে আবেগী কথাবার্তা চলবে, তা না, মেসির থাকা উচিত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন!
প্রশ্নটা এ কারণে যে, মেসির লিগ্যাসিই এবার হুমকির মুখে।
মেসি আর্জেন্টিনার জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা তো নতুন করে বলার মতো কিছু নয়! এমনও না যে মেসি এবার বিশ্বকাপ না জিতলে তার ক্যারিয়ারের সব অর্জন ধুলিসাৎ হয়ে যাবে! মেসি কখনো বিশ্বকাপ না জিতলেও তিনি সর্বকালের সেরাদের ছোট্ট তালিকায়ই থাকতেন। কিন্তু বিশ্বকাপ জিতে কিংবা তার আগে-পরের দুই কোপা আমেরিকা জিতে বিদায় বলে দেওয়ার মধ্যে বিজয়মঞ্চকে বিদায়ের মঞ্চ বানিয়ে নেওয়ার একটা গর্ব আছে না!
সে জায়গায় এবার বিশ্বকাপে যদি নকআউট পর্বের শুরুর দিকে, ধরুন শেষ ষোলো বা কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বাদ পড়ে যায়, তাহলে মেসির শেষটা তো হয়ে থাকবে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসে! জনতার বিজয়মিছিলের মধ্যমণি হয়ে, সতীর্থদের কাঁধে সওয়ার হয়ে, সোনালি ট্রফিটা হাতে নিয়ে বিদায়ের সঙ্গে তেমন বিদায়ের পার্থক্য হবে আকাশ আর মাটির।
এবার বিশ্বকাপটাই এমন যে, এখানে মেসির পাওয়ার কিছু আছে বটে, তবে হারানোর আছে আরও বেশি কিছু!
তা মেসির লিগ্যাসি আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া নিয়ে যখন প্রশ্নের মুখে, আরেকটা – টানা দ্বিতীয় - বিশ্বকাপ জেতার জন্য কতটা প্রস্তুত আর্জেন্টিনা? ১৯৩৮-এর ইতালির পর টানা দুই বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি শুধু পেলে-গারিঞ্চার ব্রাজিলই গড়তে পেরেছে। এরপর ৬৪ বছর প্রতি চার বছর পরপর ভিন্ন কারও গলায়ই বিশ্বজয়ের মালা তুলে দিয়েছে। আর্জেন্টিনা কি এবার ছয় দশকেরও বেশি আগে ব্রাজিলের এঁকে দেওয়া পথের ধুলো সরিয়ে রাস্তা তৈরি করতে পারবে?
আলজেরিয়াকে দিয়ে আজ শুরু বিশ্বকাপ মিশনে আর্জেন্টিনা গ্রুপে মুখোমুখি হবে অস্ট্রিয়া আর জর্ডানেরও। তার আগে আর্জেন্টিনা কেন বিশ্বকাপ জিততে পারে, আর কেন জিতবে না – সে হিসাবটা একটু মিলিয়ে নেওয়া যাক -
আর্জেন্টিনা যে কারণে বিশ্বকাপ জিততে পারে
১। মেসি আর্জেন্টিনাকে বয়ে নিচ্ছেন না, বরং উল্টোটাই এখন সত্যি
আর্জেন্টিনা এবার কাতার বিশ্বকাপের মূল খেলোয়াড়দের প্রায় সবাইকেই ধরে রেখেছে। প্রায় বলতে হচ্ছে, কারণ দি মারিয়া অবসর নিয়ে ফেলেছেন। এবং এই প্রথম আর্জেন্টিনা মেসিকে বহন করছে, মেসি আর্জেন্টিনাকে নয়।
একসময় আর্জেন্টিনার সব আলোচনা শুরু হতো মেসিকে দিয়ে, শেষও হতো মেসিকে দিয়েই। ২০১৪ বিশ্বকাপে মেসি প্রায় একাই দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু ২০২২-এ মেসিই টেনেছেন, তবে তার পাশে দে পল, আলভারেসরাও কাঁধ মিলিয়েছেন। ২০২৬-এর আর্জেন্টিনা ভিন্ন।
হুলিয়ান আলভারেস, এনসো ফের্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাকঅ্যালিস্টার, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, এমিলিয়ানো মার্টিনেসের মতো তারকারা এখন আর মেসির পাশের দশজন নন, নিজ নিজ জায়গায় বিশ্বসেরাদের তালিকায়ও আছেন।
মেসি থাকাটা এখনও বিশাল সুবিধা। এখনো মেসি মানেই ভিন্ন কিছুর প্রত্যাশা। কিন্তু এবার আর্জেন্টিনা জিততে চাইলে পুরো ভার আর তার কাঁধে তুলে দিতে হবে না।
২। বিশ্বকাপে অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই
প্রতিভাবান দল বিশ্বকাপের ইতিহাস কম দেখেনি। কিন্তু প্রতিভা মানেই টুর্নামেন্ট জেতার প্রজ্ঞা নয়। সবাই জানে না কীভাবে জিততে হয়। এই আর্জেন্টিনা জানে।
বিশ্বকাপ, তার আগে-পরের দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ…এই আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসেরই সবচেয়ে সফল। ম্যাচে এগিয়ে গেলে কী করতে হবে, পিছিয়ে গেলে কী করতে হবে, অতিরিক্ত সময় বা পেনাল্টিতে মানসিক চাপ কীভাবে সামলাতে হয়— এই দল পোড় খেতে খেতেই তা শিখে গেছে। বিশ্বকাপে এই অভিজ্ঞতার দাম অনেক সময় প্রতিভার চেয়েও বেশি।
একসঙ্গে খেলছেও দীর্ঘদিন ধরে। কোচ লিওনেল স্কালোনিও আট বছরে দলটার ড্রেসিংরুমে মেসিকে কেন্দ্র করেই একটা ভাতৃত্বপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে উঠেছে। দলটার সবাই একসঙ্গে হেরেছে, এরপর একসঙ্গে সর্বজয়ী হয়েছে। কে কখন কোন দৌড়টা দেবে, কার পায়ে বল গেলে কোন দিকে দৌড়াতে হবে সেটা দলের প্রতিটি সদস্যই জানে।
৩। লিওনেল স্কালোনি
এই কারণটা সম্ভবত ব্যাখ্যার কিছু নেই। এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলেই সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাথার দুর্দান্ত ট্যাকটিশিয়ান স্কালোনি। আর্জেন্টাইন কোচ দলের প্রয়োজন আর প্রতিপক্ষের দুর্বলতা দুটির মিশেলে ট্যাকটিকস কীভাবে সাজাতে হয়, তার উদাহরণ বারেবারে রেখেছেন। এবার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলে মেসিদের চেয়ে তাদের ডাগআউটের তারকার অবদান কোনো অংশেও কম হবে না।

কেন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিততে নাও পারে
১. শুধু মেসির বয়স? প্রশ্ন তো আরও আছে
মেসির বয়স নিয়ে আলোচনা হবেই। বিশ্বকাপ চলার সময়েই ৩৯-এ পা দেবেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য আরও বড় প্রশ্ন হলো, দলটি আগের মতো দ্রুত আছে কি না।
দে পল, ওতামেন্দি, তাগলিয়াফিকো, মেসি — দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এখন ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে। পা জোড়া আর আগের মতো চলে না তাদের। অন্যদিকে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো আগের চেয়ে আরও দ্রুত, আরও অ্যাথলেটিক। নকআউটের বড় ম্যাচে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২. দে পল গুরুত্বপূর্ণ, সে কারণেই ঝামেলা
মেসি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু স্কালোনির সিস্টেমে রদ্রিগো দে পল অনেকটা ইঞ্জিনের মতো। তিনি শুধু পাস দেন না, প্রেস করেন, দৌড়ান, জায়গা তৈরি করেন, পজিশনাল কাঠামো ঠিক রাখেন। মেসি মাঠের ভেতরের দিকে ঢুকলে মাঠের পাশের দিকে আর্জেন্টিনার হয়ে ব্যালেন্সটা ঠিক রাখতে ওভারল্যাপ করেন দে পল, আবার দল বল হারালে ছুটে নামেন নিচের দিকে।
কিন্তু ৩২ বছর বয়সেই আমেরিকায় খেলা, আরও দেড় বছর আগে ইউরোপের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূখর ফুটবল ছেড়ে মেসির ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যাওয়া দে পল যদি আগের মতো কার্যকর না থাকেন, তাহলে আর্জেন্টিনার পুরো কাঠামোই কিছুটা নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
৩. ইতিহাস তাদের পক্ষে নয়
৬৪ বছর ধরে কোনো দল টানা দুবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, এই তথ্যটাই তো আর্জেন্টিনার কাজ কতটা কঠিন তা বুঝিয়ে দেয়।
১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর আর কোনো দল যে টানা দুই বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, এর কারণ প্রতিভার অভাব নয়। এর কারণ, একবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলে সবাই আপনাকে হারাতে চায়। প্রতিটি ম্যাচ হয়ে ওঠে আলাদা চ্যালেঞ্জ। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা ছিল শিকারি। ২০২৬ সালে তারা শিকার।
৪. স্পেনের মতো দলই আর্জেন্টিনার মাথাব্যথা
আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য বিশ্বজয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা কারা? সবাই ফ্রান্সের কথাই বলে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারে স্পেন।
কারণ স্কালোনির দল সাধারণত স্বচ্ছন্দ থাকে যখন ম্যাচে ট্রানজিশন থাকে, জায়গা থাকে, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ থাকে। কিন্তু স্পেন যদি বল নিজেদের কাছে রাখে, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে আর্জেন্টিনাকে দৌড়াতে হবে অনেক বেশি। এই ছোট ছোট পার্থক্যই ফল নির্ধারণ করে।
৫। একজন দি মারিয়ার অভাব
আনহেল দি মারিয়া প্রতিভায় মেসির কাছাকাছি, বিনয়ে হয়তো মেসিকেও ছাড়ানো! আর্জেন্টিনা যতগুলো ট্রফি জিতেছে, তার প্রায় সবগুলোতেই ফাইনালে গোল করা দি মারিয়া প্রতিভায় মেসির কাছাকাছি, বিনয়ে হয়তো মেসির চেয়েও এগিয়ে, দলের প্রয়োজনে যেকোনো সময়ে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া…এমন একজনের গুরুত্ব আর্জেন্টিনা কী দিয়ে পূরণ করবে?
৬। এটা প্রস্তুতি!
আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচ নাকি শুধুই একটা ফুটবল ম্যাচ নয়, ভূগোলবিষয়ক শিক্ষাও বটে! আর্জেন্টিনা একেকটা প্রীতি ম্যাচ খেলে, আর নতুন নতুন দেশের নাম জানতে পারে মানুষ। নিদেনপক্ষে দেশগুলো যে ফুটবলও খেলে, সে শঙ্কা ভাঙে। কিন্তু বিশ্বকাপ তো আর ভৌগোলিক জ্ঞানের পরীক্ষা নয়। মৌরিতানিয়া, হনুলুলুর মতো দলের বিপক্ষে খেলে ফ্রান্স-স্পেনের প্রস্তুতি হয় না!

লিওনেল মেসির কি কাতার বিশ্বকাপের পরই অবসর নিয়ে নেওয়া উচিত ছিল?
নিদেনপক্ষে আনহেল দি মারিয়ার মতো ২০২৪ কোপা আমেরিকার পর?
আর্জেন্টিনা ভক্ত হলে এতটুকু শুনেই আপনি বিরক্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কোথায় আর্জেন্টিনা আরেকটা বিশ্বকাপে নামার আগে কোথায় মেসির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে আবেগী কথাবার্তা চলবে, তা না, মেসির থাকা উচিত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন!
প্রশ্নটা এ কারণে যে, মেসির লিগ্যাসিই এবার হুমকির মুখে।
মেসি আর্জেন্টিনার জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা তো নতুন করে বলার মতো কিছু নয়! এমনও না যে মেসি এবার বিশ্বকাপ না জিতলে তার ক্যারিয়ারের সব অর্জন ধুলিসাৎ হয়ে যাবে! মেসি কখনো বিশ্বকাপ না জিতলেও তিনি সর্বকালের সেরাদের ছোট্ট তালিকায়ই থাকতেন। কিন্তু বিশ্বকাপ জিতে কিংবা তার আগে-পরের দুই কোপা আমেরিকা জিতে বিদায় বলে দেওয়ার মধ্যে বিজয়মঞ্চকে বিদায়ের মঞ্চ বানিয়ে নেওয়ার একটা গর্ব আছে না!
সে জায়গায় এবার বিশ্বকাপে যদি নকআউট পর্বের শুরুর দিকে, ধরুন শেষ ষোলো বা কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বাদ পড়ে যায়, তাহলে মেসির শেষটা তো হয়ে থাকবে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসে! জনতার বিজয়মিছিলের মধ্যমণি হয়ে, সতীর্থদের কাঁধে সওয়ার হয়ে, সোনালি ট্রফিটা হাতে নিয়ে বিদায়ের সঙ্গে তেমন বিদায়ের পার্থক্য হবে আকাশ আর মাটির।
এবার বিশ্বকাপটাই এমন যে, এখানে মেসির পাওয়ার কিছু আছে বটে, তবে হারানোর আছে আরও বেশি কিছু!
তা মেসির লিগ্যাসি আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া নিয়ে যখন প্রশ্নের মুখে, আরেকটা – টানা দ্বিতীয় - বিশ্বকাপ জেতার জন্য কতটা প্রস্তুত আর্জেন্টিনা? ১৯৩৮-এর ইতালির পর টানা দুই বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি শুধু পেলে-গারিঞ্চার ব্রাজিলই গড়তে পেরেছে। এরপর ৬৪ বছর প্রতি চার বছর পরপর ভিন্ন কারও গলায়ই বিশ্বজয়ের মালা তুলে দিয়েছে। আর্জেন্টিনা কি এবার ছয় দশকেরও বেশি আগে ব্রাজিলের এঁকে দেওয়া পথের ধুলো সরিয়ে রাস্তা তৈরি করতে পারবে?
আলজেরিয়াকে দিয়ে আজ শুরু বিশ্বকাপ মিশনে আর্জেন্টিনা গ্রুপে মুখোমুখি হবে অস্ট্রিয়া আর জর্ডানেরও। তার আগে আর্জেন্টিনা কেন বিশ্বকাপ জিততে পারে, আর কেন জিতবে না – সে হিসাবটা একটু মিলিয়ে নেওয়া যাক -
আর্জেন্টিনা যে কারণে বিশ্বকাপ জিততে পারে
১। মেসি আর্জেন্টিনাকে বয়ে নিচ্ছেন না, বরং উল্টোটাই এখন সত্যি
আর্জেন্টিনা এবার কাতার বিশ্বকাপের মূল খেলোয়াড়দের প্রায় সবাইকেই ধরে রেখেছে। প্রায় বলতে হচ্ছে, কারণ দি মারিয়া অবসর নিয়ে ফেলেছেন। এবং এই প্রথম আর্জেন্টিনা মেসিকে বহন করছে, মেসি আর্জেন্টিনাকে নয়।
একসময় আর্জেন্টিনার সব আলোচনা শুরু হতো মেসিকে দিয়ে, শেষও হতো মেসিকে দিয়েই। ২০১৪ বিশ্বকাপে মেসি প্রায় একাই দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু ২০২২-এ মেসিই টেনেছেন, তবে তার পাশে দে পল, আলভারেসরাও কাঁধ মিলিয়েছেন। ২০২৬-এর আর্জেন্টিনা ভিন্ন।
হুলিয়ান আলভারেস, এনসো ফের্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাকঅ্যালিস্টার, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, এমিলিয়ানো মার্টিনেসের মতো তারকারা এখন আর মেসির পাশের দশজন নন, নিজ নিজ জায়গায় বিশ্বসেরাদের তালিকায়ও আছেন।
মেসি থাকাটা এখনও বিশাল সুবিধা। এখনো মেসি মানেই ভিন্ন কিছুর প্রত্যাশা। কিন্তু এবার আর্জেন্টিনা জিততে চাইলে পুরো ভার আর তার কাঁধে তুলে দিতে হবে না।
২। বিশ্বকাপে অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই
প্রতিভাবান দল বিশ্বকাপের ইতিহাস কম দেখেনি। কিন্তু প্রতিভা মানেই টুর্নামেন্ট জেতার প্রজ্ঞা নয়। সবাই জানে না কীভাবে জিততে হয়। এই আর্জেন্টিনা জানে।
বিশ্বকাপ, তার আগে-পরের দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ…এই আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসেরই সবচেয়ে সফল। ম্যাচে এগিয়ে গেলে কী করতে হবে, পিছিয়ে গেলে কী করতে হবে, অতিরিক্ত সময় বা পেনাল্টিতে মানসিক চাপ কীভাবে সামলাতে হয়— এই দল পোড় খেতে খেতেই তা শিখে গেছে। বিশ্বকাপে এই অভিজ্ঞতার দাম অনেক সময় প্রতিভার চেয়েও বেশি।
একসঙ্গে খেলছেও দীর্ঘদিন ধরে। কোচ লিওনেল স্কালোনিও আট বছরে দলটার ড্রেসিংরুমে মেসিকে কেন্দ্র করেই একটা ভাতৃত্বপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে উঠেছে। দলটার সবাই একসঙ্গে হেরেছে, এরপর একসঙ্গে সর্বজয়ী হয়েছে। কে কখন কোন দৌড়টা দেবে, কার পায়ে বল গেলে কোন দিকে দৌড়াতে হবে সেটা দলের প্রতিটি সদস্যই জানে।
৩। লিওনেল স্কালোনি
এই কারণটা সম্ভবত ব্যাখ্যার কিছু নেই। এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলেই সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাথার দুর্দান্ত ট্যাকটিশিয়ান স্কালোনি। আর্জেন্টাইন কোচ দলের প্রয়োজন আর প্রতিপক্ষের দুর্বলতা দুটির মিশেলে ট্যাকটিকস কীভাবে সাজাতে হয়, তার উদাহরণ বারেবারে রেখেছেন। এবার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলে মেসিদের চেয়ে তাদের ডাগআউটের তারকার অবদান কোনো অংশেও কম হবে না।

কেন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিততে নাও পারে
১. শুধু মেসির বয়স? প্রশ্ন তো আরও আছে
মেসির বয়স নিয়ে আলোচনা হবেই। বিশ্বকাপ চলার সময়েই ৩৯-এ পা দেবেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য আরও বড় প্রশ্ন হলো, দলটি আগের মতো দ্রুত আছে কি না।
দে পল, ওতামেন্দি, তাগলিয়াফিকো, মেসি — দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এখন ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে। পা জোড়া আর আগের মতো চলে না তাদের। অন্যদিকে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো আগের চেয়ে আরও দ্রুত, আরও অ্যাথলেটিক। নকআউটের বড় ম্যাচে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২. দে পল গুরুত্বপূর্ণ, সে কারণেই ঝামেলা
মেসি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু স্কালোনির সিস্টেমে রদ্রিগো দে পল অনেকটা ইঞ্জিনের মতো। তিনি শুধু পাস দেন না, প্রেস করেন, দৌড়ান, জায়গা তৈরি করেন, পজিশনাল কাঠামো ঠিক রাখেন। মেসি মাঠের ভেতরের দিকে ঢুকলে মাঠের পাশের দিকে আর্জেন্টিনার হয়ে ব্যালেন্সটা ঠিক রাখতে ওভারল্যাপ করেন দে পল, আবার দল বল হারালে ছুটে নামেন নিচের দিকে।
কিন্তু ৩২ বছর বয়সেই আমেরিকায় খেলা, আরও দেড় বছর আগে ইউরোপের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূখর ফুটবল ছেড়ে মেসির ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যাওয়া দে পল যদি আগের মতো কার্যকর না থাকেন, তাহলে আর্জেন্টিনার পুরো কাঠামোই কিছুটা নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
৩. ইতিহাস তাদের পক্ষে নয়
৬৪ বছর ধরে কোনো দল টানা দুবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, এই তথ্যটাই তো আর্জেন্টিনার কাজ কতটা কঠিন তা বুঝিয়ে দেয়।
১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর আর কোনো দল যে টানা দুই বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, এর কারণ প্রতিভার অভাব নয়। এর কারণ, একবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলে সবাই আপনাকে হারাতে চায়। প্রতিটি ম্যাচ হয়ে ওঠে আলাদা চ্যালেঞ্জ। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা ছিল শিকারি। ২০২৬ সালে তারা শিকার।
৪. স্পেনের মতো দলই আর্জেন্টিনার মাথাব্যথা
আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য বিশ্বজয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা কারা? সবাই ফ্রান্সের কথাই বলে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারে স্পেন।
কারণ স্কালোনির দল সাধারণত স্বচ্ছন্দ থাকে যখন ম্যাচে ট্রানজিশন থাকে, জায়গা থাকে, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ থাকে। কিন্তু স্পেন যদি বল নিজেদের কাছে রাখে, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে আর্জেন্টিনাকে দৌড়াতে হবে অনেক বেশি। এই ছোট ছোট পার্থক্যই ফল নির্ধারণ করে।
৫। একজন দি মারিয়ার অভাব
আনহেল দি মারিয়া প্রতিভায় মেসির কাছাকাছি, বিনয়ে হয়তো মেসিকেও ছাড়ানো! আর্জেন্টিনা যতগুলো ট্রফি জিতেছে, তার প্রায় সবগুলোতেই ফাইনালে গোল করা দি মারিয়া প্রতিভায় মেসির কাছাকাছি, বিনয়ে হয়তো মেসির চেয়েও এগিয়ে, দলের প্রয়োজনে যেকোনো সময়ে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া…এমন একজনের গুরুত্ব আর্জেন্টিনা কী দিয়ে পূরণ করবে?
৬। এটা প্রস্তুতি!
আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচ নাকি শুধুই একটা ফুটবল ম্যাচ নয়, ভূগোলবিষয়ক শিক্ষাও বটে! আর্জেন্টিনা একেকটা প্রীতি ম্যাচ খেলে, আর নতুন নতুন দেশের নাম জানতে পারে মানুষ। নিদেনপক্ষে দেশগুলো যে ফুটবলও খেলে, সে শঙ্কা ভাঙে। কিন্তু বিশ্বকাপ তো আর ভৌগোলিক জ্ঞানের পরীক্ষা নয়। মৌরিতানিয়া, হনুলুলুর মতো দলের বিপক্ষে খেলে ফ্রান্স-স্পেনের প্রস্তুতি হয় না!