অর্ণব সান্যাল

দেশে ভোট হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। এরপর নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেন, নতুন সরকার গঠিত হলো, সেই সরকার কাজও শুরু করল। এই ভোটে নির্বাচিত সরকারের বয়স দুই মাস হলো। ভোটে নির্বাচিত সরকার আসলে কোন পথে হাঁটছে? দেশটা কি সুস্থির হচ্ছে? নাকি আগের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে?
কোনো সরকারের কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুই মাস খুবই অল্প সময়। অন্ততপক্ষে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় দেওয়াটা প্রয়োজন অবশ্যই। তবে অল্প সময়ের পর্যবেক্ষণেও কিছু লক্ষণ তো বোঝা যায়ই। সেগুলোই চলতে থাকবে কি না, খারাপ বা ভালো পথে যাবে কি না–তা নির্ভর করে সময়ের ওপর, পরিস্থিতির ওপর।
বিএনপির বর্তমান সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ফলে সংসদে এক ধরনের একাধিপত্যও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এটি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, কোনো আইন পাস করাতে বিএনপির জন্য বিরোধীদের নিজেদের পক্ষে টানার কোনো নিয়মতান্ত্রিক প্রয়োজন নেই। ফলে একাধিপত্যের এক ধরনের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য ধারণ করারও শঙ্কা থাকে। সেই শঙ্কা কতটা তীব্র হবে বা হয়ে উঠবে, তা ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে।
তবে এরই মধ্যে কিছু লক্ষণ ফুটে উঠছে। সেসব লক্ষণ বলছে, নতুন বছরে নতুন ক্লাসে ওঠার পর যেভাবে শিশুরা হইহই রইরই করে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে দেয়, ঠিক তেমনই একটা উচাটন সময় যেন কাটছে ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকারের। আর এমন ভাবনার পেছনে উসকানি দিচ্ছে ধারাবাহিক কিছু ঘটনা। এসবে মনে হচ্ছে, সরকার যেন নিদ্রামথিত মুডে কিছুটা স্বপ্নাতুর সময় কাটাচ্ছে, ঘুম যেন আর কাটছে না!
ঘটনাগুলো উল্লেখ করা যাক। প্রথম ঘটনাটি হলো–গত রোজার ঈদের আগে বাড়ি ফেরার সময়টা। মানুষ দলে দলে ঢাকা ছেড়ে যেতে শুরু করেছিল যার যার বাড়িতে। এই ঢাকাতে পরিযায়ী বাসিন্দা বেশি। অনেকেই কেবল রুটি, রুজির কারণেই রাজধানীতে থাকে। তাই ঈদের দিনটা পরিবার, পরিজনের সঙ্গে কাটাতে চলে যায় ঢাকা ছেড়ে। আর এই বাড়ি ফেরাটার ব্যবস্থাপনাতেই নতুন সরকার পুরো লেজেগোবরে অবস্থায় চলে যায়। ভোগান্তি আর অব্যবস্থাপনা–এই ছিল গত ঈদযাত্রার বিষয়ে সাধারণ মন্তব্য। আর ঠিক তার বিপরীতেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে অক্লেশে বলতে শোনা গেছে ‘সব ভালো চলছে’ ঘরানার বক্তব্য। অথচ বাস্তবতা ছিল পুরো উল্টো।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি, এবার ঈদে ভাড়া নৈরাজ্য অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। ঈদযাত্রা ঘিরে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন রুটে বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে। ঢাকা-পাবনা, ঢাকা-নাটোর, ঢাকা-রংপুরসহ বিভিন্ন রুটে স্বাভাবিক ভাড়ার দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত আদায় করতে দেখা গেছে। এমনকি লোকাল বাস, ট্রাক-পিকআপেও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এর বাইরে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ বা ক্ষোভ প্রকাশ্যেই আসতে দেখা গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে তা প্রকাশিতও হয়েছে। আবার হতাহত তো আছেই। একটি বাস তো যাত্রীসহ ডুবেই গেল নদীতে। মানুষ মরল একেবারেই অকারণে। এই সবই একটি সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার টুকরো টুকরো ফলাফল।
ঠিক একই সময় দ্বিতীয় ঘটনাটির অবতারণা। সেটি হলো–জ্বালানি তেল। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধাবস্থায় সারা দুনিয়াতেই জ্বালানি তেলের বাজারে প্রবল অস্থিরতা শুরু হয়। সেই আঁচ আমাদের দেশেও আসে। শুরুতেই এখানে সরকার জ্বালানির রেশনিং ব্যবস্থায় চলে যায় এবং একইসাথে এটিও বলে যে–কোনো সংকট নাই। এতদিন পর এসেও সরকার একই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে যে, কোনো সংকট নাই।

অথচ বাস্তবতা তা বলে না। প্রতিদিনই সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা বা রাতে আমরা ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখতে পাই, গাড়ির লম্বা লাইন। তেল না পেয়ে অনেকে গ্যারেজে ঢুকিয়েও দিচ্ছে গাড়ি, মোটরসাইকেল। কারণ, তেল নিতে গিয়ে যে সীমাহীন দুর্ভোগ, সেটি ভোগ করার বদলে গাড়ি বসিয়ে রাখাও অনেকের কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে। উঠেছে বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগও। আবার তেলের লাইনে কারসাজি করা বা ঘুষের বিনিময়ে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি তেল বেচা-কেনার অভিযোগও আছে এন্তার। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে চলছে একটা ভজঘট অবস্থা। তবে তার পরও সরকারের ‘কোনো সংকট নাই’ অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে না। সরকার না পারছে অব্যবস্থাপনা কমাতে, আবার না পারছে সঠিক ব্যবস্থাপনার সূচনা করতে। ভোগান্তির অবসানের তো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু এত কিছুর পরও সরকারের পক্ষ থেকে যদি জনসাধারণের ‘প্যানিক বায়িং’কে সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে–সংকট যদি না-ই থাকে, তবে প্যানিক সৃষ্টির শুরুর প্রদীপে ঘি ঢালল কে? সঠিক পরিকল্পনা কি আদৌ ছিল?
কেউ কেউ অবশ্য বলছেন–জ্বালানি তেলের দাম যে বাড়েনি এখনো, সেটি বর্তমান সরকারের একটি প্রধান সফলতা। হ্যাঁ, সফলতা তো অবশ্যই। এতে করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারের সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি, তথা জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতিকে হয়তো কিছুটা আটকানো যাচ্ছে। কিছুটা, কারণ সাধারণের অনানুষ্ঠানিক ব্যয়বৃদ্ধি ঘটছেই। আর তাতে জনতার ভোগান্তি বিনা অন্য কোনো কিছু অর্জন হচ্ছে না।
তৃতীয় ঘটনাটিরও উদ্ভব ওপরের দুটোর কাছাকাছি সময়েই। সেটি হলো, হাম। এ বছর হুট করেই শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়েছে মারাত্মক আকারে। শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত নানা খবরে বাবা-মায়ের আহাজারি শোনা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে মোট ৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭২ শিশুর। একই সময়ে হামের উপসর্গ থাকা রোগীর মোট সংখ্যা ২০ হাজার ৩৫২। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার ১২৯।
অর্থাৎ, আমাদের এই দেশটায় শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে এমন একটি রোগে, যেটি এর আগে সাম্প্রতিক সময়ে কখনোই প্রাণসংহারী রূপ নেয়নি। কিন্তু তাতেই যখন একের পর এক শিশুর মৃত্যুর খবর শোনা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই নতুন সরকারের দিকে আঙুল ওঠে। যদিও নবনির্বাচিত সরকারের ঘাড়েই এই ঘটনার পুরো দায় চাপে না। আগের সরকারের ওপরও চাপে। তাই বলে, কেবলই আগের সরকারকে দোষ দিয়েই তো পার পাওয়া যায় না। নিতে হয় উপযুক্ত পদক্ষেপ। আর সেই জায়গাতেই কিছুটা ঘাটতি দৃশ্যমান হচ্ছে। মানুষের কষ্টের পুরোপুরি লাঘব না হোক, অন্তত তাদের পাশে দাঁড়ানোটাকে ফুটিয়ে তুলতে হয়। ওই জায়গাতেই কেন জানি সরকারকে অদৃশ্য সত্তা বলে বোধ হচ্ছে।

চতুর্থ ও পঞ্চম ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। সেটি হলো, মব। যদিও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন মবের দিন শেষ, কিন্তু এই দুটো ঘটনায় এটি স্পষ্ট যে, সেটি শেষ আসলে হয়নি। একটি ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ‘সমকামী’ অভিযোগ তুলে কিছু মানুষকে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে আরও অভিযোগ আছে যে, মারধরের শিকার ব্যক্তিরা এ নিয়ে থানা-পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতাও নাকি পাননি। অবশ্য এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও কঠোর কোনো বার্তা শোনা যায়নি তেমন, কিছু প্রচলিত ‘বুলি’ বাদে।
আবার কিছুদিন আগেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম নামের ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। হত্যা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অজ্ঞাতনামা আসামিরা আবদুর রহমানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথার ওপর, ডান চোয়ালের কাছে, ঠোঁটের মধ্যে, থুঁতনিতে, পিঠের বাঁ পাশে ও ডান পায়ের হাঁটুর পেছনে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে এবং বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেধড়ক মারধর করে। এরপর আবদুর রহমানের মৃত্যুও হয়। হত্যা মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসামিরা দরবার শরিফ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করে। অজ্ঞাতনামা আসামিরা আবদুর রহমানের দরবার শরিফে থাকা স্টিলের আলমারি ভেঙে পাঁচ লাখ টাকা ও চার ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে।
কথা হলো, আবদুর রহমানকে প্রকাশ্যে এভাবে হত্যা করার চার দিনেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে। ওই যেমনটা জানায় আর কি!
এমন আরও কিছু ঘটনাও হয়তো উল্লেখ করা যাবে। তবে আর বেশি উদাহরণে কাজ নেই। সমস্যার মূলে ঢোকা যাক। সমস্যা হলো, সাধারণ নাগরিক জীবন নানামাত্রিক নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্ভোগে পড়েছে। এসব থেকে রাতারাতি উদ্ধার হবে–এ দেশের মানুষ অন্তত সেই ফ্যান্টাসিতে ভোগে না। কিন্তু নাগরিকেরা তাদের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে তাদের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে চায়। চায় যে, এই সরকার সমস্যা মেটানোর জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করে যাবে, শুধু বাগাড়ম্বর করবে না।
অথচ, আমরা একটি ভোটে নির্বাচিত সরকারের মধ্যে সক্রিয়তা ও উপযুক্ত প্রতিক্রিয়ার অভাব দেখছি। কেমন যেন একটা গা-ছাড়া ভাব। এমন ভঙ্গি অনির্বাচিত সরকার করলে, তবু মানায়। কারণ গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা অনুযায়ী তাদের জনতার ম্যান্ডেট থাকে না, দায়বদ্ধতাও কম থাকে। কিন্তু ভোটে নির্বাচিত সরকার তেমন গা-ছাড়া ভাব কখনোই দেখাতে পারে না। অবশ্য ভাবভঙ্গিতে তেমনই অনুভূত হচ্ছে। এখন এই নেতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টির দায় সরকারেরই, একে পরিবর্তনের দায়িত্বও তাদেরই।

এক কথায়, সরকারকেই প্রমাণ করতে হবে যে, এই সত্তাটি জনগণের জন্য নিবেদিত। সেই নিবেদন তখনই অনর্থক বোধ হয়, যখন নিবেদন আন্তরিক হয় না। এই নিবেদন কাজেই ফুটে ওঠে, কথায় নয়। আর ঠিক এই জায়গাতেই ঘাটতি। আমরা কথা অনেক শুনছি, কিন্তু সেই অনুপাতে কাজ দেখছি কম। আর ‘সরকারের বয়স কম’–এই আলাপ দিয়েও সব সময় পার পাওয়ার মতো পরিস্থিতি আসলে থাকে না।
নতুন বছরে নতুন ক্লাসে ওঠার পর বাচ্চাদের বেশ উড়ু উড়ু একটা ভাব থাকে। একটু উচ্ছলতা, একটু হাওয়ায় ভাসা ভাব থাকে। কিন্তু যেই তিন/চার মাস পর পরীক্ষার সময় চলে আসে, অমনি চলে আসে চাপ। আমাদের দেশের নতুন সরকারেরও সেই পরীক্ষার সময়টা চলে আসছে ক্রমশ।
তাই রোজার দিনে সেহরির সময় শোনা ডাকের টানেই এখন বলতে হচ্ছে যে, ‘হে সরকার, আপনারা ঘুম থেকে উঠুউউন…কাজ করার সময় হলোওওও…!’
এখন সরকার ডাক শুনে ঘুম থেকে উঠলেই হয়।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

দেশে ভোট হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। এরপর নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেন, নতুন সরকার গঠিত হলো, সেই সরকার কাজও শুরু করল। এই ভোটে নির্বাচিত সরকারের বয়স দুই মাস হলো। ভোটে নির্বাচিত সরকার আসলে কোন পথে হাঁটছে? দেশটা কি সুস্থির হচ্ছে? নাকি আগের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে?
কোনো সরকারের কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুই মাস খুবই অল্প সময়। অন্ততপক্ষে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় দেওয়াটা প্রয়োজন অবশ্যই। তবে অল্প সময়ের পর্যবেক্ষণেও কিছু লক্ষণ তো বোঝা যায়ই। সেগুলোই চলতে থাকবে কি না, খারাপ বা ভালো পথে যাবে কি না–তা নির্ভর করে সময়ের ওপর, পরিস্থিতির ওপর।
বিএনপির বর্তমান সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ফলে সংসদে এক ধরনের একাধিপত্যও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এটি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, কোনো আইন পাস করাতে বিএনপির জন্য বিরোধীদের নিজেদের পক্ষে টানার কোনো নিয়মতান্ত্রিক প্রয়োজন নেই। ফলে একাধিপত্যের এক ধরনের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য ধারণ করারও শঙ্কা থাকে। সেই শঙ্কা কতটা তীব্র হবে বা হয়ে উঠবে, তা ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে।
তবে এরই মধ্যে কিছু লক্ষণ ফুটে উঠছে। সেসব লক্ষণ বলছে, নতুন বছরে নতুন ক্লাসে ওঠার পর যেভাবে শিশুরা হইহই রইরই করে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে দেয়, ঠিক তেমনই একটা উচাটন সময় যেন কাটছে ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকারের। আর এমন ভাবনার পেছনে উসকানি দিচ্ছে ধারাবাহিক কিছু ঘটনা। এসবে মনে হচ্ছে, সরকার যেন নিদ্রামথিত মুডে কিছুটা স্বপ্নাতুর সময় কাটাচ্ছে, ঘুম যেন আর কাটছে না!
ঘটনাগুলো উল্লেখ করা যাক। প্রথম ঘটনাটি হলো–গত রোজার ঈদের আগে বাড়ি ফেরার সময়টা। মানুষ দলে দলে ঢাকা ছেড়ে যেতে শুরু করেছিল যার যার বাড়িতে। এই ঢাকাতে পরিযায়ী বাসিন্দা বেশি। অনেকেই কেবল রুটি, রুজির কারণেই রাজধানীতে থাকে। তাই ঈদের দিনটা পরিবার, পরিজনের সঙ্গে কাটাতে চলে যায় ঢাকা ছেড়ে। আর এই বাড়ি ফেরাটার ব্যবস্থাপনাতেই নতুন সরকার পুরো লেজেগোবরে অবস্থায় চলে যায়। ভোগান্তি আর অব্যবস্থাপনা–এই ছিল গত ঈদযাত্রার বিষয়ে সাধারণ মন্তব্য। আর ঠিক তার বিপরীতেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে অক্লেশে বলতে শোনা গেছে ‘সব ভালো চলছে’ ঘরানার বক্তব্য। অথচ বাস্তবতা ছিল পুরো উল্টো।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি, এবার ঈদে ভাড়া নৈরাজ্য অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। ঈদযাত্রা ঘিরে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন রুটে বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে। ঢাকা-পাবনা, ঢাকা-নাটোর, ঢাকা-রংপুরসহ বিভিন্ন রুটে স্বাভাবিক ভাড়ার দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত আদায় করতে দেখা গেছে। এমনকি লোকাল বাস, ট্রাক-পিকআপেও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এর বাইরে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ বা ক্ষোভ প্রকাশ্যেই আসতে দেখা গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে তা প্রকাশিতও হয়েছে। আবার হতাহত তো আছেই। একটি বাস তো যাত্রীসহ ডুবেই গেল নদীতে। মানুষ মরল একেবারেই অকারণে। এই সবই একটি সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার টুকরো টুকরো ফলাফল।
ঠিক একই সময় দ্বিতীয় ঘটনাটির অবতারণা। সেটি হলো–জ্বালানি তেল। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধাবস্থায় সারা দুনিয়াতেই জ্বালানি তেলের বাজারে প্রবল অস্থিরতা শুরু হয়। সেই আঁচ আমাদের দেশেও আসে। শুরুতেই এখানে সরকার জ্বালানির রেশনিং ব্যবস্থায় চলে যায় এবং একইসাথে এটিও বলে যে–কোনো সংকট নাই। এতদিন পর এসেও সরকার একই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে যে, কোনো সংকট নাই।

অথচ বাস্তবতা তা বলে না। প্রতিদিনই সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা বা রাতে আমরা ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখতে পাই, গাড়ির লম্বা লাইন। তেল না পেয়ে অনেকে গ্যারেজে ঢুকিয়েও দিচ্ছে গাড়ি, মোটরসাইকেল। কারণ, তেল নিতে গিয়ে যে সীমাহীন দুর্ভোগ, সেটি ভোগ করার বদলে গাড়ি বসিয়ে রাখাও অনেকের কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে। উঠেছে বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগও। আবার তেলের লাইনে কারসাজি করা বা ঘুষের বিনিময়ে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি তেল বেচা-কেনার অভিযোগও আছে এন্তার। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে চলছে একটা ভজঘট অবস্থা। তবে তার পরও সরকারের ‘কোনো সংকট নাই’ অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে না। সরকার না পারছে অব্যবস্থাপনা কমাতে, আবার না পারছে সঠিক ব্যবস্থাপনার সূচনা করতে। ভোগান্তির অবসানের তো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু এত কিছুর পরও সরকারের পক্ষ থেকে যদি জনসাধারণের ‘প্যানিক বায়িং’কে সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে–সংকট যদি না-ই থাকে, তবে প্যানিক সৃষ্টির শুরুর প্রদীপে ঘি ঢালল কে? সঠিক পরিকল্পনা কি আদৌ ছিল?
কেউ কেউ অবশ্য বলছেন–জ্বালানি তেলের দাম যে বাড়েনি এখনো, সেটি বর্তমান সরকারের একটি প্রধান সফলতা। হ্যাঁ, সফলতা তো অবশ্যই। এতে করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারের সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি, তথা জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতিকে হয়তো কিছুটা আটকানো যাচ্ছে। কিছুটা, কারণ সাধারণের অনানুষ্ঠানিক ব্যয়বৃদ্ধি ঘটছেই। আর তাতে জনতার ভোগান্তি বিনা অন্য কোনো কিছু অর্জন হচ্ছে না।
তৃতীয় ঘটনাটিরও উদ্ভব ওপরের দুটোর কাছাকাছি সময়েই। সেটি হলো, হাম। এ বছর হুট করেই শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়েছে মারাত্মক আকারে। শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত নানা খবরে বাবা-মায়ের আহাজারি শোনা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে মোট ৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭২ শিশুর। একই সময়ে হামের উপসর্গ থাকা রোগীর মোট সংখ্যা ২০ হাজার ৩৫২। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার ১২৯।
অর্থাৎ, আমাদের এই দেশটায় শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে এমন একটি রোগে, যেটি এর আগে সাম্প্রতিক সময়ে কখনোই প্রাণসংহারী রূপ নেয়নি। কিন্তু তাতেই যখন একের পর এক শিশুর মৃত্যুর খবর শোনা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই নতুন সরকারের দিকে আঙুল ওঠে। যদিও নবনির্বাচিত সরকারের ঘাড়েই এই ঘটনার পুরো দায় চাপে না। আগের সরকারের ওপরও চাপে। তাই বলে, কেবলই আগের সরকারকে দোষ দিয়েই তো পার পাওয়া যায় না। নিতে হয় উপযুক্ত পদক্ষেপ। আর সেই জায়গাতেই কিছুটা ঘাটতি দৃশ্যমান হচ্ছে। মানুষের কষ্টের পুরোপুরি লাঘব না হোক, অন্তত তাদের পাশে দাঁড়ানোটাকে ফুটিয়ে তুলতে হয়। ওই জায়গাতেই কেন জানি সরকারকে অদৃশ্য সত্তা বলে বোধ হচ্ছে।

চতুর্থ ও পঞ্চম ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। সেটি হলো, মব। যদিও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন মবের দিন শেষ, কিন্তু এই দুটো ঘটনায় এটি স্পষ্ট যে, সেটি শেষ আসলে হয়নি। একটি ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ‘সমকামী’ অভিযোগ তুলে কিছু মানুষকে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে আরও অভিযোগ আছে যে, মারধরের শিকার ব্যক্তিরা এ নিয়ে থানা-পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতাও নাকি পাননি। অবশ্য এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও কঠোর কোনো বার্তা শোনা যায়নি তেমন, কিছু প্রচলিত ‘বুলি’ বাদে।
আবার কিছুদিন আগেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম নামের ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। হত্যা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অজ্ঞাতনামা আসামিরা আবদুর রহমানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথার ওপর, ডান চোয়ালের কাছে, ঠোঁটের মধ্যে, থুঁতনিতে, পিঠের বাঁ পাশে ও ডান পায়ের হাঁটুর পেছনে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে এবং বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেধড়ক মারধর করে। এরপর আবদুর রহমানের মৃত্যুও হয়। হত্যা মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসামিরা দরবার শরিফ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করে। অজ্ঞাতনামা আসামিরা আবদুর রহমানের দরবার শরিফে থাকা স্টিলের আলমারি ভেঙে পাঁচ লাখ টাকা ও চার ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে।
কথা হলো, আবদুর রহমানকে প্রকাশ্যে এভাবে হত্যা করার চার দিনেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে। ওই যেমনটা জানায় আর কি!
এমন আরও কিছু ঘটনাও হয়তো উল্লেখ করা যাবে। তবে আর বেশি উদাহরণে কাজ নেই। সমস্যার মূলে ঢোকা যাক। সমস্যা হলো, সাধারণ নাগরিক জীবন নানামাত্রিক নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্ভোগে পড়েছে। এসব থেকে রাতারাতি উদ্ধার হবে–এ দেশের মানুষ অন্তত সেই ফ্যান্টাসিতে ভোগে না। কিন্তু নাগরিকেরা তাদের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে তাদের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে চায়। চায় যে, এই সরকার সমস্যা মেটানোর জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করে যাবে, শুধু বাগাড়ম্বর করবে না।
অথচ, আমরা একটি ভোটে নির্বাচিত সরকারের মধ্যে সক্রিয়তা ও উপযুক্ত প্রতিক্রিয়ার অভাব দেখছি। কেমন যেন একটা গা-ছাড়া ভাব। এমন ভঙ্গি অনির্বাচিত সরকার করলে, তবু মানায়। কারণ গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা অনুযায়ী তাদের জনতার ম্যান্ডেট থাকে না, দায়বদ্ধতাও কম থাকে। কিন্তু ভোটে নির্বাচিত সরকার তেমন গা-ছাড়া ভাব কখনোই দেখাতে পারে না। অবশ্য ভাবভঙ্গিতে তেমনই অনুভূত হচ্ছে। এখন এই নেতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টির দায় সরকারেরই, একে পরিবর্তনের দায়িত্বও তাদেরই।

এক কথায়, সরকারকেই প্রমাণ করতে হবে যে, এই সত্তাটি জনগণের জন্য নিবেদিত। সেই নিবেদন তখনই অনর্থক বোধ হয়, যখন নিবেদন আন্তরিক হয় না। এই নিবেদন কাজেই ফুটে ওঠে, কথায় নয়। আর ঠিক এই জায়গাতেই ঘাটতি। আমরা কথা অনেক শুনছি, কিন্তু সেই অনুপাতে কাজ দেখছি কম। আর ‘সরকারের বয়স কম’–এই আলাপ দিয়েও সব সময় পার পাওয়ার মতো পরিস্থিতি আসলে থাকে না।
নতুন বছরে নতুন ক্লাসে ওঠার পর বাচ্চাদের বেশ উড়ু উড়ু একটা ভাব থাকে। একটু উচ্ছলতা, একটু হাওয়ায় ভাসা ভাব থাকে। কিন্তু যেই তিন/চার মাস পর পরীক্ষার সময় চলে আসে, অমনি চলে আসে চাপ। আমাদের দেশের নতুন সরকারেরও সেই পরীক্ষার সময়টা চলে আসছে ক্রমশ।
তাই রোজার দিনে সেহরির সময় শোনা ডাকের টানেই এখন বলতে হচ্ছে যে, ‘হে সরকার, আপনারা ঘুম থেকে উঠুউউন…কাজ করার সময় হলোওওও…!’
এখন সরকার ডাক শুনে ঘুম থেকে উঠলেই হয়।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা