মাজহারুল ইসলাম

বাংলাদেশের একজন পেসার পাকিস্তানের মাটিতে গতির ঝড় তুলছেন–কল্পনার রাজ্যেও এমন চিন্তা নিশ্চয় আসবে না। তবে ২০২৬ সালে এসে সেটাই এখন বাস্তব। সেই পেসারের নাম রানা, নাহিদ রানা!
ইশ, বাংলাদেশে যদি ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিসের মতো একটা পেসার থাকত… নব্বই দশকে যারা ক্রিকেট দেখে বেড়ে উঠেছেন, এমন আক্ষেপ তাদের জন্য ছিল নিয়মিত ঘটনা। আবার এর আগের প্রজন্মে আক্ষেপের কারণ হয়েছেন ইমরান খান, সরফরাজ নওয়াজরা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটা গতির ঝড় তোলা পেসারের আক্ষেপ বেড়েছে যুগে যুগে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হয়ে গেছে পেস বিপ্লব। গতি দিয়ে সেখানে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হয়ে জ্বলছেন নাহিদ। পাকিস্তান সুপার লিগেও (পিএসএল) তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। পেসারদের দেশে আলোড়ন হচ্ছে এক বাংলাদেশিকে নিয়ে–এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কীইবা হতে পারে।
তবে এই পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। শুরুর দিনগুলো থেকেই বাংলাদেশের বড় এক আক্ষেপ ছিল পেসারের অভাব। আরও স্পষ্ট করে বললে, গতিময় পেসারের শূন্যতা। গোলাম নওশের প্রিন্স, হাসিবুল হোসেন বা শফিউদ্দিন বাবুসহ সেই সময়ের পেসারদের প্রতি সম্মান রেখেই বলতে হয়, স্রেফ গতির কারণেই তাদের বোলিং প্রায়ই হয়ে যেত সাদামাটা। ঘণ্টায় ১২০-১২৫ কিলোমিটার বেগে বাংলাদেশের কেউ বোলিং করলেই তখন ভরসা পেতেন দর্শকরাও।
সেই আক্ষেপ বুকে চেপেই আবার তারা যখন দেখতেন ওয়াসিম, ওয়াকারদের বোলিং, তখন নিজেদের দলেও এমন কাউকে দেখার স্বপ্নটা বেড়ে যেত। তবে ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই পেসারের কাছাকাছি মানের বোলারও পায়নি বাংলাদেশ।
‘টু ডব্লিউ’ খ্যাত এই দুই পেসারের মধ্যে ওয়াসিম অবশ্য গতির চেয়ে স্কিলের জন্যই বিখ্যাত ছিলেন। আর ওয়াকার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ছিলেন গতির রাজা। ইউটিউবে গেলেই দেখা যায় তার এমন কিছু স্পেল, যার উত্তর ছিল না ব্যাটসম্যানদের কাছে। এর মূল কারণ স্কিলের পাশাপাশি ওয়াকারের তুখোড় গতি।
এই দুজনের ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় আবির্ভাব শোয়েব আখতারের। ঘণ্টায় ১৫০-১৫৫ কিলোমিটার বেগে বল করাটাকে নিয়ে যান শিল্পের পর্যায়ে। উপমহাদেশে শোয়েবের বোলিংয়ের প্রভাব এতটাই ছিল যে, নব্বই দশকে পাড়া-মহল্লাতেও কেউ একটু জোরের সঙ্গে বল করলেই সবাই বলে উঠত, “শোয়েব আখতার নাকি!” গতির জাদু এতটাই শক্তিশালী…
সেই সময়েই বাংলাদেশের ক্রিকেটে রাতারাতি তারকা বনে যান একজন তরুণ পেসার। কলার উঁচিয়ে, খ্যাপাটে গতিতে মাশরাফি বিন মোর্তোজাই প্রথম দেখিয়েছিলেন, বাংলাদেশের একজন পেসারও জোরে বল করতে পারেন।
ঠিক এই কারণেই মাশরাফিকে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের পেসারদের অনেকেই আইডল মানেন। কারণ, স্পিনারদের জন্য পরিচিত একটা দেশে তিনিই কিশোরদের মাঝে গেঁথে দিয়েছিলেন গতির ঝড় তোলার বাসনা। চোট-আঘাতের সঙ্গে নিত্য লড়াইয়ে অবশ্য খুব বেশিদিন মাশরাফি আর থাকতে পারেননি ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ হয়ে। গতির সঙ্গে আপস করে খেলতে হয়েছে ক্যারিয়ারের বাকিটা।

তবে তার সমসাময়িকদের মধ্যে তালহা জুবায়ের, শাহাদাত হোসেনরা মাঝে কিছুটা সময় ছিলেন গতিময় বোলিংয়ের বিজ্ঞাপন হয়ে। প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও তালহার ক্যারিয়ার সেভাবে এগোতে পারেনি চোটের প্রভাবে। শাহাদাত অবশ্য কয়েক বছর ছিলেন সেরা ছন্দেই। সেই সময়ে রিকি পন্টিং, কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, রাহুল দ্রাবিড়, ইনজামাম-উল-হকদের মতো ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষেও তিনি দাপট দেখাতে পেরেছিলেন। কেন? ওই যে, গতি!
শাহাদাতের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল গতি। যখনই সেটা কমে গেল, তিনিও ক্রমেই নিজেকে হারিয়ে ফেললেন। এরপর বাংলাদেশ বন্দী হয়ে যায় বাঁহাতি স্পিনারদের জালে। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ মানেই একাদশে দুই থেকে তিনজন বাঁহাতি স্পিনার। পেসাররা থাকতেন বটে, তবে অধিকাংশ সময়েই সহকারীর ভূমিকায়।
২০১৬ সালে এই চিত্রটা একেবারেই বদলে দেন মুস্তাফিজুর রহমান। অভিষেক সিরিজেই ভারতের বাঘা বাঘা সব ব্যাটারকে নাস্তানাবুদ করে বিশ্ব ক্রিকেটে পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন। দশ বছরের ক্যারিয়ারে মুস্তাফিজুর এখন সাদা বলের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পেসার। তবে সেটা গতি দিয়ে নয়, বরং তার স্কিলের অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী দিয়েই।
মুস্তাফিজুর তার অন্য দুই ফরম্যাটের ক্যারিয়ার লম্বা করতে শুরু থেকেই টেস্ট ক্রিকেট কম খেলেছেন। আর এখন তো একেবারেই বিরত রয়েছেন লাল বলের ক্রিকেট থেকে। আর তাই দেশের বাইরে ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে ভালো করার জন্য বাংলাদেশের দরকার ছিল একজন গতিময় পেসার। যিনি রান দেবেন অকাতরে, তবে নিজের দিনে একটা স্পেলেই লণ্ডভণ্ড করে দেবেন প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ।
তাসকিন আহমেদ অবশ্য শুরুর দিকে নিয়মিতই ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার বেগে বোলিং করতে পারতেন। তবে কয়েকটি চোটের পর তার গতি অনেকটাই কমে গেছে। ২০২৪ সালে পাকিস্তান সফরে তাকে পাশে রেখেই সেই জায়গাটা দখলে নেন নাহিদ। ঘরোয়া ক্রিকেটে খুব বেশি ম্যাচ না খেললেও তাকে যেই দেখতেন, সবাই মুগ্ধ হতেন গতি দেখে। বাংলাদেশের একজন পেসার এত জোরে বোলিং করতে পারেন—সেটা তাদের কাছে ছিল এক ঘোর লাগা অভিজ্ঞতা।
নাহিদ সেই ঘোরটা লাগান এমন এক দেশে, যেখানে অলি-গলিতেই মেলে বিশ্বমানের বোলার। পাকিস্তানকে ঘরের মাটিতে ২-০ তে টেস্ট সিরিজ হারানোর যে অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়ে বাংলাদেশ, তার অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন নাহিদই। বাবর আজমের মতো তারকা ব্যাটসম্যান সেই সিরিজে বারবার খেই হারিয়েছেন তার পেসের কাছে। আউটও হয়েছেন একবার। সেই থেকেই মূলত পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা পেয়ে যান নাহিদ।

এমন বোলিংয়ের কারণে তখন থেকেই নাহিদের ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়। মাশরাফির মতো তাকেও সব ফরম্যাটে সব ম্যাচ খেলিয়ে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেওয়া হোক—এমনটা চাননি কেউই। সোনার ডিম পাড়া হাঁস অতিরিক্ত ব্যবহারের লোভটা এখন পর্যন্ত ভালোই সামাল দিতে পেরেছে বাংলাদেশ। নাহিদকে তাই টানা কয়েকটি টেস্ট বা ওয়ানডে খেলানো হয় না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিয়ে সতেজ রাখতেই এই প্রচেষ্টা দলের।
তবে নাহিদের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অংশ নেওয়ায় বাধা দিচ্ছে না বিসিবি। বিপিএলে খেলছেন নিয়মিত। বিপিএলের শেষ আসরেই নাহিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ওয়াকারের। নিজে ডেকে বাংলাদেশের তরুণ সেনসেশনকে দিয়েছেন পরামর্শ। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইন ছিল, ‘পেস ইজ পেস ইয়ার।’ নাহিদ যেন গতির সঙ্গে কোনো আপস না করেন, সেই ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ দেন পাকিস্তানের সাবেক এই পেসার।
ওয়াকারের কথা রেখে চলেছেন নাহিদ। চলমান পিএসএলে খেলছেন পেশোয়ার জালমির হয়ে। এখন পর্যন্ত খেলেছেন তিন ম্যাচ, উইকেট নিয়েছেন ৫টি। এই পরিসংখ্যান দেখে বলতেই পারেন, এ আর এমন কী! তবে না, এই তিন ম্যাচে নাহিদের গতির আগুনে রীতিমতো কাঁপছে পিএসএল। সেরা বোলিংটা করেন করাচি কিংসের বিপক্ষে। চার ওভারে এক মেডেনসহ মাত্র ৭ রান দিয়ে নেন তিন উইকেট।
এই তিন ম্যাচে নাহিদ বল করেছেন ১০ ওভার। মাত্র ১০.৪০ গড়ে ওভারপ্রতি দিয়েছেন ৫ রানের কিছু বেশি! পিএসএল তাই মেতেছে নাহিদের বোলিংয়ে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন বলে দলটির সমর্থকদের মন বেজায় খারাপ। নাহিদ না থাকলে দলটির বোলিংয়ের কী হবে—এটাই তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা।
আর এটাই নাহিদ তথা বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একটা সময়ে পাকিস্তানের পেসারদের দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলতেন যারা, তাদের দেশেই আছেন একজন নাহিদ।
অল্প বয়সেই নাহিদ যা অর্জন করেছেন, সেটা আগামীতে তার ওপর প্রত্যাশার চাপ আরও বাড়িয়ে দিতেই পারে। এর জবাবটা তিনি দিতে পারেন কেবল গতির রাজা হয়েই। নাহিদ কি সেই পথে হাঁটবেন?

বাংলাদেশের একজন পেসার পাকিস্তানের মাটিতে গতির ঝড় তুলছেন–কল্পনার রাজ্যেও এমন চিন্তা নিশ্চয় আসবে না। তবে ২০২৬ সালে এসে সেটাই এখন বাস্তব। সেই পেসারের নাম রানা, নাহিদ রানা!
ইশ, বাংলাদেশে যদি ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিসের মতো একটা পেসার থাকত… নব্বই দশকে যারা ক্রিকেট দেখে বেড়ে উঠেছেন, এমন আক্ষেপ তাদের জন্য ছিল নিয়মিত ঘটনা। আবার এর আগের প্রজন্মে আক্ষেপের কারণ হয়েছেন ইমরান খান, সরফরাজ নওয়াজরা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটা গতির ঝড় তোলা পেসারের আক্ষেপ বেড়েছে যুগে যুগে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হয়ে গেছে পেস বিপ্লব। গতি দিয়ে সেখানে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হয়ে জ্বলছেন নাহিদ। পাকিস্তান সুপার লিগেও (পিএসএল) তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। পেসারদের দেশে আলোড়ন হচ্ছে এক বাংলাদেশিকে নিয়ে–এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কীইবা হতে পারে।
তবে এই পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। শুরুর দিনগুলো থেকেই বাংলাদেশের বড় এক আক্ষেপ ছিল পেসারের অভাব। আরও স্পষ্ট করে বললে, গতিময় পেসারের শূন্যতা। গোলাম নওশের প্রিন্স, হাসিবুল হোসেন বা শফিউদ্দিন বাবুসহ সেই সময়ের পেসারদের প্রতি সম্মান রেখেই বলতে হয়, স্রেফ গতির কারণেই তাদের বোলিং প্রায়ই হয়ে যেত সাদামাটা। ঘণ্টায় ১২০-১২৫ কিলোমিটার বেগে বাংলাদেশের কেউ বোলিং করলেই তখন ভরসা পেতেন দর্শকরাও।
সেই আক্ষেপ বুকে চেপেই আবার তারা যখন দেখতেন ওয়াসিম, ওয়াকারদের বোলিং, তখন নিজেদের দলেও এমন কাউকে দেখার স্বপ্নটা বেড়ে যেত। তবে ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই পেসারের কাছাকাছি মানের বোলারও পায়নি বাংলাদেশ।
‘টু ডব্লিউ’ খ্যাত এই দুই পেসারের মধ্যে ওয়াসিম অবশ্য গতির চেয়ে স্কিলের জন্যই বিখ্যাত ছিলেন। আর ওয়াকার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ছিলেন গতির রাজা। ইউটিউবে গেলেই দেখা যায় তার এমন কিছু স্পেল, যার উত্তর ছিল না ব্যাটসম্যানদের কাছে। এর মূল কারণ স্কিলের পাশাপাশি ওয়াকারের তুখোড় গতি।
এই দুজনের ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় আবির্ভাব শোয়েব আখতারের। ঘণ্টায় ১৫০-১৫৫ কিলোমিটার বেগে বল করাটাকে নিয়ে যান শিল্পের পর্যায়ে। উপমহাদেশে শোয়েবের বোলিংয়ের প্রভাব এতটাই ছিল যে, নব্বই দশকে পাড়া-মহল্লাতেও কেউ একটু জোরের সঙ্গে বল করলেই সবাই বলে উঠত, “শোয়েব আখতার নাকি!” গতির জাদু এতটাই শক্তিশালী…
সেই সময়েই বাংলাদেশের ক্রিকেটে রাতারাতি তারকা বনে যান একজন তরুণ পেসার। কলার উঁচিয়ে, খ্যাপাটে গতিতে মাশরাফি বিন মোর্তোজাই প্রথম দেখিয়েছিলেন, বাংলাদেশের একজন পেসারও জোরে বল করতে পারেন।
ঠিক এই কারণেই মাশরাফিকে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের পেসারদের অনেকেই আইডল মানেন। কারণ, স্পিনারদের জন্য পরিচিত একটা দেশে তিনিই কিশোরদের মাঝে গেঁথে দিয়েছিলেন গতির ঝড় তোলার বাসনা। চোট-আঘাতের সঙ্গে নিত্য লড়াইয়ে অবশ্য খুব বেশিদিন মাশরাফি আর থাকতে পারেননি ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ হয়ে। গতির সঙ্গে আপস করে খেলতে হয়েছে ক্যারিয়ারের বাকিটা।

তবে তার সমসাময়িকদের মধ্যে তালহা জুবায়ের, শাহাদাত হোসেনরা মাঝে কিছুটা সময় ছিলেন গতিময় বোলিংয়ের বিজ্ঞাপন হয়ে। প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও তালহার ক্যারিয়ার সেভাবে এগোতে পারেনি চোটের প্রভাবে। শাহাদাত অবশ্য কয়েক বছর ছিলেন সেরা ছন্দেই। সেই সময়ে রিকি পন্টিং, কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, রাহুল দ্রাবিড়, ইনজামাম-উল-হকদের মতো ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষেও তিনি দাপট দেখাতে পেরেছিলেন। কেন? ওই যে, গতি!
শাহাদাতের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল গতি। যখনই সেটা কমে গেল, তিনিও ক্রমেই নিজেকে হারিয়ে ফেললেন। এরপর বাংলাদেশ বন্দী হয়ে যায় বাঁহাতি স্পিনারদের জালে। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ মানেই একাদশে দুই থেকে তিনজন বাঁহাতি স্পিনার। পেসাররা থাকতেন বটে, তবে অধিকাংশ সময়েই সহকারীর ভূমিকায়।
২০১৬ সালে এই চিত্রটা একেবারেই বদলে দেন মুস্তাফিজুর রহমান। অভিষেক সিরিজেই ভারতের বাঘা বাঘা সব ব্যাটারকে নাস্তানাবুদ করে বিশ্ব ক্রিকেটে পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন। দশ বছরের ক্যারিয়ারে মুস্তাফিজুর এখন সাদা বলের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পেসার। তবে সেটা গতি দিয়ে নয়, বরং তার স্কিলের অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী দিয়েই।
মুস্তাফিজুর তার অন্য দুই ফরম্যাটের ক্যারিয়ার লম্বা করতে শুরু থেকেই টেস্ট ক্রিকেট কম খেলেছেন। আর এখন তো একেবারেই বিরত রয়েছেন লাল বলের ক্রিকেট থেকে। আর তাই দেশের বাইরে ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে ভালো করার জন্য বাংলাদেশের দরকার ছিল একজন গতিময় পেসার। যিনি রান দেবেন অকাতরে, তবে নিজের দিনে একটা স্পেলেই লণ্ডভণ্ড করে দেবেন প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ।
তাসকিন আহমেদ অবশ্য শুরুর দিকে নিয়মিতই ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার বেগে বোলিং করতে পারতেন। তবে কয়েকটি চোটের পর তার গতি অনেকটাই কমে গেছে। ২০২৪ সালে পাকিস্তান সফরে তাকে পাশে রেখেই সেই জায়গাটা দখলে নেন নাহিদ। ঘরোয়া ক্রিকেটে খুব বেশি ম্যাচ না খেললেও তাকে যেই দেখতেন, সবাই মুগ্ধ হতেন গতি দেখে। বাংলাদেশের একজন পেসার এত জোরে বোলিং করতে পারেন—সেটা তাদের কাছে ছিল এক ঘোর লাগা অভিজ্ঞতা।
নাহিদ সেই ঘোরটা লাগান এমন এক দেশে, যেখানে অলি-গলিতেই মেলে বিশ্বমানের বোলার। পাকিস্তানকে ঘরের মাটিতে ২-০ তে টেস্ট সিরিজ হারানোর যে অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়ে বাংলাদেশ, তার অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন নাহিদই। বাবর আজমের মতো তারকা ব্যাটসম্যান সেই সিরিজে বারবার খেই হারিয়েছেন তার পেসের কাছে। আউটও হয়েছেন একবার। সেই থেকেই মূলত পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা পেয়ে যান নাহিদ।

এমন বোলিংয়ের কারণে তখন থেকেই নাহিদের ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়। মাশরাফির মতো তাকেও সব ফরম্যাটে সব ম্যাচ খেলিয়ে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেওয়া হোক—এমনটা চাননি কেউই। সোনার ডিম পাড়া হাঁস অতিরিক্ত ব্যবহারের লোভটা এখন পর্যন্ত ভালোই সামাল দিতে পেরেছে বাংলাদেশ। নাহিদকে তাই টানা কয়েকটি টেস্ট বা ওয়ানডে খেলানো হয় না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিয়ে সতেজ রাখতেই এই প্রচেষ্টা দলের।
তবে নাহিদের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অংশ নেওয়ায় বাধা দিচ্ছে না বিসিবি। বিপিএলে খেলছেন নিয়মিত। বিপিএলের শেষ আসরেই নাহিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ওয়াকারের। নিজে ডেকে বাংলাদেশের তরুণ সেনসেশনকে দিয়েছেন পরামর্শ। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইন ছিল, ‘পেস ইজ পেস ইয়ার।’ নাহিদ যেন গতির সঙ্গে কোনো আপস না করেন, সেই ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ দেন পাকিস্তানের সাবেক এই পেসার।
ওয়াকারের কথা রেখে চলেছেন নাহিদ। চলমান পিএসএলে খেলছেন পেশোয়ার জালমির হয়ে। এখন পর্যন্ত খেলেছেন তিন ম্যাচ, উইকেট নিয়েছেন ৫টি। এই পরিসংখ্যান দেখে বলতেই পারেন, এ আর এমন কী! তবে না, এই তিন ম্যাচে নাহিদের গতির আগুনে রীতিমতো কাঁপছে পিএসএল। সেরা বোলিংটা করেন করাচি কিংসের বিপক্ষে। চার ওভারে এক মেডেনসহ মাত্র ৭ রান দিয়ে নেন তিন উইকেট।
এই তিন ম্যাচে নাহিদ বল করেছেন ১০ ওভার। মাত্র ১০.৪০ গড়ে ওভারপ্রতি দিয়েছেন ৫ রানের কিছু বেশি! পিএসএল তাই মেতেছে নাহিদের বোলিংয়ে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন বলে দলটির সমর্থকদের মন বেজায় খারাপ। নাহিদ না থাকলে দলটির বোলিংয়ের কী হবে—এটাই তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা।
আর এটাই নাহিদ তথা বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একটা সময়ে পাকিস্তানের পেসারদের দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলতেন যারা, তাদের দেশেই আছেন একজন নাহিদ।
অল্প বয়সেই নাহিদ যা অর্জন করেছেন, সেটা আগামীতে তার ওপর প্রত্যাশার চাপ আরও বাড়িয়ে দিতেই পারে। এর জবাবটা তিনি দিতে পারেন কেবল গতির রাজা হয়েই। নাহিদ কি সেই পথে হাঁটবেন?