মেরিনা মিতু

২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বরের বিকেল। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে বসে আছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একটু পরপর ফোনে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কোনো সমাধান না পেয়ে মলিন মুখেই ফোন রেখে দিচ্ছেন। ফোন দিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও।
এদিকে কার্যালয়ের সামনে থমথমে পরিস্থিতি। কয়েক ঘণ্টা আগেই পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল পুরো এলাকা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ইট-পাটকেল, ভাঙা কাচ আর টিয়ারশেলের খোসা। কার্যালয়ের আশপাশ ঘিরে রেখেছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সদস্য।
দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে চলছে পুলিশের অভিযান, একের পর এক আটক হচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী, খায়রুল কবির খোকন, আবদুস সালামসহ অনেক শীর্ষ নেতা। দলের মহাসচিব, যিনি বছরের পর বছর বিএনপির রাজনৈতিক লড়াইয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ; তিনি বসে আছেন কার্যালয়ের গেটের বাইরে নিঃশব্দে, অসহায় এবং অপেক্ষমাণ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ওই দৃশ্য শুধু একটি দিনের প্রতিচ্ছবি নয়; বরং বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন, দমন-পীড়ন আর নেতৃত্ব সংকটেরও এক প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে বসে থাকা সেই সময়ের ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। বিএনপি রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকা নেটিজেনরাও এই ছবি শেয়ার করে লিখেছিলেন, একজন নেতার দৃঢ়তা ও দলের প্রতি আনুগত্যের কথা।
এদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং রাজনৈতিক চাপ-দমন-পীড়নের কারণে বিএনপির পক্ষে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দল ক্ষমতায় আসার পর সরকার ও দল–দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্য রাখতে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বিএনপি। স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
এদিকে মহাসচিব হিসেবে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবসর ভাবনা এবং নতুন কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যেই এই পরিবর্তনের আলোচনা সামনে এসেছে।
গত এপ্রিলে একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও সরকারি দলের মহাসচিব বলেন, “আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।”
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সবশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর এবার সপ্তম কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চলতি বছরের মধ্যেই তৃণমূল পর্যায়ের কাউন্সিল শেষ করে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করতে চায় দলটি।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এবারের কাউন্সিল আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও অংশগ্রহণমূলক করার চিন্তা রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় পর অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশে কাউন্সিল আয়োজনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এবারের আয়োজনেও ভিন্ন মাত্রা যোগ হতে পারে বলে মনে করছেন নেতারা।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, স্থায়ী কমিটিতে ১৯ জন সদস্য থাকার কথা। তবে বর্তমানে ১৪ জন সদস্য নিয়ে কমিটি পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকজন সদস্য বয়সের কারণে অসুস্থ বলেও দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান চাইলে কাউন্সিলের আগেই শূন্য পদগুলোতে নতুন সদস্য মনোনয়ন দিতে পারেন। ফলে কাউন্সিলের আগে কিংবা পরে স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। ষাটের দশকে ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসা মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন ধরে দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক।
দলীয় কাউন্সিল নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান চরচাকে বলেন, “ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিএনপিকে যেভাবে দমন করে রাখা হয়েছিল, সে কারণে দলের কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। এখন দীর্ঘদিনের লড়াই ও ত্যাগের পর এক নতুন অধ্যায় খুলেছে। সেখানে প্রথমে দলের অঙ্গসংগঠন এবং পরবর্তীতে দলের জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে ভাবা হচ্ছে।”
শেষ পর্যন্ত কে মহাসচিব হচ্ছেন, তা নির্ভর করবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং কাউন্সিলের ওপর। দলীয় নেতারা বলছেন, অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা–এই তিন মানদণ্ডেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আলোচনায় যারা
দলের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ কৌশল সামনে রেখে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে একাধিক নেতার নাম দলীয় পরিমণ্ডলে ঘুরছে। দলীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি কার্যত দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম, সংবাদ সম্মেলন, কর্মসূচি ঘোষণাসহ প্রায় সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে নিয়মিত ব্রিফিং ও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় তৃণমূলেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেও তাকে দলের মুখপাত্রের ভূমিকায় দেখা গেছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ মনে করছে, ‘ফুলটাইম অর্গানাইজার’ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতাই তাকে এই দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে।
রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “জাতীয়তাবাদী আদর্শে আমরা দলের প্রতি অনুগত। পদ নিয়ে আমি ভাবি না। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আদর্শে দলের প্রতি নিষ্ঠা রেখেই আমরা রাজনীতি করি। দল যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই মহাসচিব করবেন।”
তবে আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদও। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই নেতা রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে দক্ষ হিসেবে পরিচিত। অতীতে সাংগঠনিক রাজনীতিতেও তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল।
বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে তাকে মহাসচিব করা হলে দল ও সরকারের ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে–সেই প্রশ্নও আলোচনায় উঠে এসেছে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ‘আস্থাভাজন’ হিসেবে বিবেচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকেও তাকে সক্রিয় দেখা গেছে। তবে দলের ভেতরে অনেকের মতে, মহাসচিব পদে মাঠপর্যায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা বড় বিবেচ্য বিষয়, যেখানে তিনি তুলনামূলকভাবে কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারেন।
মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয়তার কারণে আলোচনায় উঠে এসেছে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নামও। ছাত্ররাজনীতি থেকে কেন্দ্রে উঠে আসা এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং সাংগঠনিক সংকট মোকাবিলায় তার ভূমিকা দলীয় মহলে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়।
শহীদ চৌধুরী এ্যানি চরচাকে বলেন, “মহাসচিব পদ সম্পূর্ণভাবে দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। দলের হাইকমান্ড যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই এ দায়িত্ব দেওয়া হবে।”
এ ছাড়া তৃণমূলভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে আলোচনায় রয়েছেন হাবিব উন নবী খান সোহেল। ছাত্রদল থেকে উঠে আসা এই নেতার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ ‘দৃঢ়’ বলে মনে করা হয়। দল যদি সাংগঠনিক পুনর্গঠনে তৃণমূলকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে তার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও বক্তব্যের কারণে ভিন্নধর্মী আলোচনায় আছেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। মিডিয়ায় সক্রিয় উপস্থিতি ও বিশ্লেষণধর্মী অবস্থানের কারণে তিনি একটি গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে বিবেচিত হলেও সরাসরি সাংগঠনিক দায়িত্বে সীমিত সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
অভিজ্ঞতার বিচারে পিছিয়ে নেই বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমানও। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দল তুলনামূলক তরুণ ও অধিক সক্রিয় নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবশেষে আলোচনায় রয়েছেন খায়রুল কবির খোকনের নামও। সংগঠক হিসেবে পরিচিত হলেও জাতীয় পর্যায়ে তার প্রভাব এখনো সীমিত। তবে দলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এলে ‘চমক’ হিসেবেও তার নাম সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বরের বিকেল। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে বসে আছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একটু পরপর ফোনে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কোনো সমাধান না পেয়ে মলিন মুখেই ফোন রেখে দিচ্ছেন। ফোন দিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও।
এদিকে কার্যালয়ের সামনে থমথমে পরিস্থিতি। কয়েক ঘণ্টা আগেই পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল পুরো এলাকা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ইট-পাটকেল, ভাঙা কাচ আর টিয়ারশেলের খোসা। কার্যালয়ের আশপাশ ঘিরে রেখেছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সদস্য।
দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে চলছে পুলিশের অভিযান, একের পর এক আটক হচ্ছেন রুহুল কবির রিজভী, খায়রুল কবির খোকন, আবদুস সালামসহ অনেক শীর্ষ নেতা। দলের মহাসচিব, যিনি বছরের পর বছর বিএনপির রাজনৈতিক লড়াইয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ; তিনি বসে আছেন কার্যালয়ের গেটের বাইরে নিঃশব্দে, অসহায় এবং অপেক্ষমাণ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ওই দৃশ্য শুধু একটি দিনের প্রতিচ্ছবি নয়; বরং বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন, দমন-পীড়ন আর নেতৃত্ব সংকটেরও এক প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে বসে থাকা সেই সময়ের ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। বিএনপি রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকা নেটিজেনরাও এই ছবি শেয়ার করে লিখেছিলেন, একজন নেতার দৃঢ়তা ও দলের প্রতি আনুগত্যের কথা।
এদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং রাজনৈতিক চাপ-দমন-পীড়নের কারণে বিএনপির পক্ষে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দল ক্ষমতায় আসার পর সরকার ও দল–দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্য রাখতে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে বিএনপি। স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
এদিকে মহাসচিব হিসেবে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবসর ভাবনা এবং নতুন কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যেই এই পরিবর্তনের আলোচনা সামনে এসেছে।
গত এপ্রিলে একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও সরকারি দলের মহাসচিব বলেন, “আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।”
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সবশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর এবার সপ্তম কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চলতি বছরের মধ্যেই তৃণমূল পর্যায়ের কাউন্সিল শেষ করে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করতে চায় দলটি।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এবারের কাউন্সিল আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও অংশগ্রহণমূলক করার চিন্তা রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় পর অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশে কাউন্সিল আয়োজনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এবারের আয়োজনেও ভিন্ন মাত্রা যোগ হতে পারে বলে মনে করছেন নেতারা।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, স্থায়ী কমিটিতে ১৯ জন সদস্য থাকার কথা। তবে বর্তমানে ১৪ জন সদস্য নিয়ে কমিটি পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকজন সদস্য বয়সের কারণে অসুস্থ বলেও দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান চাইলে কাউন্সিলের আগেই শূন্য পদগুলোতে নতুন সদস্য মনোনয়ন দিতে পারেন। ফলে কাউন্সিলের আগে কিংবা পরে স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। ষাটের দশকে ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসা মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন ধরে দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক।
দলীয় কাউন্সিল নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান চরচাকে বলেন, “ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিএনপিকে যেভাবে দমন করে রাখা হয়েছিল, সে কারণে দলের কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। এখন দীর্ঘদিনের লড়াই ও ত্যাগের পর এক নতুন অধ্যায় খুলেছে। সেখানে প্রথমে দলের অঙ্গসংগঠন এবং পরবর্তীতে দলের জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে ভাবা হচ্ছে।”
শেষ পর্যন্ত কে মহাসচিব হচ্ছেন, তা নির্ভর করবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং কাউন্সিলের ওপর। দলীয় নেতারা বলছেন, অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা–এই তিন মানদণ্ডেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আলোচনায় যারা
দলের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ কৌশল সামনে রেখে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে একাধিক নেতার নাম দলীয় পরিমণ্ডলে ঘুরছে। দলীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি কার্যত দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম, সংবাদ সম্মেলন, কর্মসূচি ঘোষণাসহ প্রায় সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে নিয়মিত ব্রিফিং ও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় তৃণমূলেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেও তাকে দলের মুখপাত্রের ভূমিকায় দেখা গেছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ মনে করছে, ‘ফুলটাইম অর্গানাইজার’ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতাই তাকে এই দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে।
রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “জাতীয়তাবাদী আদর্শে আমরা দলের প্রতি অনুগত। পদ নিয়ে আমি ভাবি না। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আদর্শে দলের প্রতি নিষ্ঠা রেখেই আমরা রাজনীতি করি। দল যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই মহাসচিব করবেন।”
তবে আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদও। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই নেতা রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে দক্ষ হিসেবে পরিচিত। অতীতে সাংগঠনিক রাজনীতিতেও তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল।
বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে তাকে মহাসচিব করা হলে দল ও সরকারের ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে–সেই প্রশ্নও আলোচনায় উঠে এসেছে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ‘আস্থাভাজন’ হিসেবে বিবেচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকেও তাকে সক্রিয় দেখা গেছে। তবে দলের ভেতরে অনেকের মতে, মহাসচিব পদে মাঠপর্যায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা বড় বিবেচ্য বিষয়, যেখানে তিনি তুলনামূলকভাবে কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারেন।
মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয়তার কারণে আলোচনায় উঠে এসেছে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নামও। ছাত্ররাজনীতি থেকে কেন্দ্রে উঠে আসা এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং সাংগঠনিক সংকট মোকাবিলায় তার ভূমিকা দলীয় মহলে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়।
শহীদ চৌধুরী এ্যানি চরচাকে বলেন, “মহাসচিব পদ সম্পূর্ণভাবে দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। দলের হাইকমান্ড যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই এ দায়িত্ব দেওয়া হবে।”
এ ছাড়া তৃণমূলভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে আলোচনায় রয়েছেন হাবিব উন নবী খান সোহেল। ছাত্রদল থেকে উঠে আসা এই নেতার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ ‘দৃঢ়’ বলে মনে করা হয়। দল যদি সাংগঠনিক পুনর্গঠনে তৃণমূলকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে তার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও বক্তব্যের কারণে ভিন্নধর্মী আলোচনায় আছেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। মিডিয়ায় সক্রিয় উপস্থিতি ও বিশ্লেষণধর্মী অবস্থানের কারণে তিনি একটি গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে বিবেচিত হলেও সরাসরি সাংগঠনিক দায়িত্বে সীমিত সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
অভিজ্ঞতার বিচারে পিছিয়ে নেই বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমানও। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দল তুলনামূলক তরুণ ও অধিক সক্রিয় নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবশেষে আলোচনায় রয়েছেন খায়রুল কবির খোকনের নামও। সংগঠক হিসেবে পরিচিত হলেও জাতীয় পর্যায়ে তার প্রভাব এখনো সীমিত। তবে দলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এলে ‘চমক’ হিসেবেও তার নাম সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।