অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ৩৫০ জন চিকিৎসকের অংশগ্রহণে সিডনিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ মেডিকেল সোসাইটিজ অব অস্ট্রেলিয়ার (এফবিএমএসএ) বার্ষিক সম্মেলন ও বৈজ্ঞানিক সিম্পোজিয়াম ২০২৬।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী চিকিৎসকের সংখ্যার বিচারে এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি চিকিৎসকদের এ যাবৎকালের বৃহত্তম সম্মেলন।
বাংলাদেশ মেডিকেল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের আতিথেয়তায় গত শনিবার ও রোববার (২৬–২৭ সেপ্টেম্বর) পেনরিথের ওয়েস্টার্ন সিডনি কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত দুই দিনের এই আয়োজন চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানচর্চা, পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পারিবারিক মিলনমেলার এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
শনিবার সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও নৈশভোজের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সূচনা হয়। চিকিৎসক, তাদের পরিবারের সদস্য এবং সন্তানদের অংশগ্রহণে সংগীত ও নানা পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আসা শিল্পী ও কলাকুশলীদের পরিবেশনার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী নকীব খানের মনোমুগ্ধকর সংগীত পরিবেশনা ছিল সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ। চিকিৎসক ও তাদের পরিবার-পরিজন এই সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করেন।
রোববার সকালে নিবন্ধন ও প্রাতঃরাশকালীন শিক্ষামূলক অধিবেশনের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সিম্পোজিয়ামের কার্যক্রম শুরু হয়। সম্মেলনের প্রধান উপদেষ্টা ডা. জেসি চৌধুরী, আহ্বায়ক ডা. ফাইজুর রেজা (ইমন) এবং সহ আহ্বায়ক ডা. ইকবাল হোসেন ও ডা. শেখ হায়দার তপু বৈজ্ঞানিক সিম্পোজিয়ামের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি ডা. এম মোশাররফ হোসেন খান এবং নিউ সাউথ ওয়েলস চ্যাপ্টারের সভাপতি ডা. মেহেদী ফারহান।
যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডা. আবুল জালাল আহমেদ এবং নিউ সাউথ ওয়েলস চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক ডা. রোকেয়া ফকির (কেয়া)।
এ পর্বে বক্তব্য দেন নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য সরকারের মন্ত্রী জিহাদ ডিব এমপি, অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম বুরহানউদ্দিন, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী এবং অস্ট্রেলিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের নিউ সাউথ ওয়েলস শাখার সভাপতি ডা. ফ্রেড বেট্রোস।
অধিবেশনে ডা. মাজহার হক সংগঠনের পথচলা ও স্মৃতিচারণ নিয়ে একটি বিশেষ তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। এরপর চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানিত চিকিৎসকদের হাতে ‘এফবিএমএসএ প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ তুলে দেওয়া হয়।
দিনব্যাপী বৈজ্ঞানিক অধিবেশনগুলোর সমন্বয় করেন সংগঠনের শিক্ষা সম্পাদক ডা. আকবর আশরাফী এবং নিউ সাউথ ওয়েলস চ্যাপ্টারের শিক্ষা সম্পাদক ডা. মিহির রায়। জুনিয়র চিকিৎসক ও আন্তর্জাতিক মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের পেশাগত দিকনির্দেশনার পাশাপাশি হরমোন ও কিডনি রোগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
হৃদরোগের পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞের কাছে রোগী পাঠানোর দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেন ডা. জামিল আহমেদ ও ডা. ময়েজুর রহমান। ক্যানসার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে বক্তব্য দেন ডা. মোহাম্মদ ইসলাম। আলঝেইমার্স রোগের চিকিৎসায় ডোনানেমাব নিয়ে আলোচনা করেন ডা. মনোয়ার হোসেন এবং রিউমাটোলজির সাম্প্রতিক অগ্রগতি তুলে ধরেন ডা. মুখলেসুর রহমান।
এ ছাড়া, আরএসভি টিকাদান, হাঁপানি, ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তকরণ, মেনোপজ ব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন ডা. লুতফুন্নেসা কুদ্দুস ও ডা. শাহনাজ আক্তারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা।
সম্মেলনে সংগঠনের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া, সংগঠনের স্মারক সাময়িকী ‘এলিক্সির’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা নিয়ে বিশেষ প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ডা. আব্দুল কুদ্দুস, সহযোগী অধ্যাপক রেজা আলী এবং ডা. হাসান সারওয়ার। তারা বাংলাদেশে জরুরি চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন, জেনারেল প্র্যাকটিস কার্যক্রমের প্রসার এবং ঠোঁট ও তালু কাটা রোগীদের চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাপনী পর্বে পুরস্কার বিতরণ ও সম্মিলিত আলোকচিত্র গ্রহণের আয়োজন করা হয়।
আয়োজক কমিটি অংশগ্রহণকারী চিকিৎসক ও তাদের পরিবার, বক্তা, অতিথি, পৃষ্ঠপোষক, শিল্পী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়।
জ্ঞানচর্চা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রত্যয় নিয়ে শেষ হয় দুই দিনের এই সম্মেলন।