গসিপ কি আপনাকে স্মার্ট করে তোলে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
গসিপ কি আপনাকে স্মার্ট করে তোলে?
সমাজে গসিপের ভূমিকা দ্বিমুখী। ছবি: ফ্রিপিক

গসিপ। শব্দটা শুনলেই অনেকের মনে আসে নেতিবাচক ধারণা। আসাটা অস্বাভাবিকও নয়। তবে সমাজে গসিপের ভূমিকা দ্বিমুখী। একদিকে এটি যেমন সামাজিক বন্ধনের রূপক হিসেবে আসে, অন্যদিকে এটি সামাজিক সম্পর্কে বিষ ঢালারও উপকরণ বটে! আবার এর আছে একেবারে দৈনন্দিন ও সাধারণ একটি দিকও।

টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার প্রায় ৬৫ শতাংশই অন্য মানুষদের নিয়ে! অন্যদের সম্পর্কে গল্প বলাই আমাদের একঘেয়ে জীবনে রঙ যোগ করে। অবশ্য সামাজিকভাবে গসিপ প্রায়ই নেতিবাচক রূপে আবির্ভূত হয়।

গসিপ একধরনের মানসিক ‘সোশ্যাল ম্যাপ’ তৈরি করে। ছবি: ফ্রিপিক
গসিপ একধরনের মানসিক ‘সোশ্যাল ম্যাপ’ তৈরি করে। ছবি: ফ্রিপিক

তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, গসিপ আসলে আমাদের মস্তিষ্কের এক চমৎকার কৌশল, যা সামাজিকভাবে টিকে থাকতে এবং বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, গসিপ করা সব সময় খারাপ নয়, বরং অনেক সময় এটি আপনাকে আরও ‘স্মার্ট’ করে তুলতে পারে!

প্রথমেই বোঝা দরকার, গসিপ শুধু অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, এটি হলো সামাজিক তথ্য বিনিময়ের এক মাধ্যম। কে কেমন আচরণ করে, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক ভালো, কোন পরিস্থিতিতে কার ওপর ভরসা করা যায়—এসব তথ্য সমাজে টিকে থাকার জন্য জরুরি। যখন আমরা গসিপ করি, তখন মূলত আমরা এই সামাজিক মানচিত্রটা হালনাগাদ করি। এতে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে এবং আমরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি যে, কার সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ অবচেতনভাবে বুঝতে পারে কার সঙ্গে কী কথা বলা নিরাপদ, বা কার কাছে কোন তথ্য পৌঁছাতে পারে। এই হিসাবটা করতে আমাদের মস্তিষ্ক একপ্রকার সামাজিক গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করে। আমরা বুঝে যাই কে জনপ্রিয়, কে কার কাছের মানুষ, এবং কে কত দূরে। অর্থাৎ, আমরা একধরনের মানসিক ‘সোশ্যাল ম্যাপ’ তৈরি করি। এই মানচিত্র তৈরি করাই আমাদের মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষিত করে, যেখানে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও কৌশল মিলেমিশে কাজ করে।

টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গসিপ আমাদের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বাড়ায়। অন্যদের নিয়ে কথা বলার সময় আমরা শিখি সহানুভূতি, বিশ্লেষণ এবং আচরণের সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরার বিষয়টি।

গসিপ কূটনৈতিক দক্ষতাও বাড়ায়, যা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: ফ্রিপিক
গসিপ কূটনৈতিক দক্ষতাও বাড়ায়, যা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: ফ্রিপিক

কারও বিষয়ে বলার সময় আমরা বুঝতে পারি কোন তথ্য শেয়ার করলে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আর কোনটা নির্দোষ আলাপ। এই সচেতনতা আমাদের আত্মসংযম এবং কূটনৈতিক দক্ষতাও বাড়ায়, যা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে হ্যাঁ, গসিপ কারও জীবন যেমন নষ্ট করতে পারে, আবার দক্ষভাবে ব্যবহার করলে সমাজে টিকে থাকার অস্ত্রও হতে পারে। ঠিক তেমনি বাস্তব জীবনেও, যে ব্যক্তি গসিপের প্রবাহ বোঝে, সে সহজেই বুঝে ফেলে কাকে বিশ্বাস করা যায়, কার কাছ থেকে দূরে থাকা দরকার, কিংবা কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হয়।

তাই বিশ্লেষকদের মতে, গসিপ করার ক্ষমতা একেবারেই পুরোপুরি নেতিবাচক কোনো বিষয় নয়। এটি এক ধরনের মানসিক দক্ষতাও বটে। গসিপের ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্ক অনেকটা দাবাড়ুর মতো কাজ করে, সম্ভাব্য বিপদ বা লাভের হিসাবও শিখিয়ে দেয়।

সুতরাং, গসিপকে কেবল নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখাটা কিছুটা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। বরং এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই দিক সম্পর্কেই জানাটা জরুরি। কারণ এটি মানবিক সম্পর্ক, সুনাম ও তথ্যের প্রবাহ বোঝার একটি কৌশলও বটে। 

সম্পর্কিত