ব্যবসা-চাকরিই কি জীবনের সব?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ব্যবসা-চাকরিই কি জীবনের সব?
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই জেনারেটেড

আমেরিকাতে ওয়ার্কইজম শব্দের প্রচলন বেশি। ওয়ার্কইজম হচ্ছে এমন একটি ধারণা, যাতে বিশ্বাস করা হয়—পেশা বা পেশাগত কাজ শুধু অর্থ উপার্জনের জন্যই প্রয়োজনীয় নয়। বরং একজন ব্যক্তির সামগ্রিক পরিচয় এবং জীবনের মূল উদ্দেশ্যও নির্ধারণ করে এটি। সেই সঙ্গে এই বিষয়টিও বলে যে, মানবসভ্যতার কল্যাণের নিমিত্তেই কাজের কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র ‘অর্থবোধক’ কাজই পারে আপনার জীবনকে সফল করতে, আর কিছু নয়।

এসবের মূল মাজেজা হলো, আপনি জীবনে কাজ ছাড়া আর কিছু বুঝবেন না। আমেরিকাতে এবং কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপে যেমন এই ওয়ার্কইজমকে মূলত পেশার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আর এই বিষয়টিকে এতবার ব্যক্তি মানুষের কানে কানে এবং উচ্চস্বরে বলা হয় যে, এতে বিশ্বাস স্থাপনে বাধ্য হতে শুরু করে মানুষ।

ওয়ার্কইজমের ফাঁদ হলো, আপনি এতে মজে গেলে একসময় ভাবতে থাকবেন, কাজ, পেশা বা চাকরিই আপনার জীবনের সব। অফিস বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে আপনার বাসায় যাওয়াটাই তখন হয়ে দাঁড়ায় সময় নষ্ট। ব্যক্তিগত জীবনের জায়গা নিয়ে নেয় পেশাগত জীবন। সেটিই তখন হয়ে দাঁড়ায় জীবনের জ্বালানি। একজন ব্যক্তি তখন বেশি প্রাধান্যও দেয় কাজকেই, পরিবার বা ব্যক্তিজীবন হয়ে যায় গৌন।

ওয়ার্কইজম আপনার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে নষ্ট করে ফেলে। ব্যক্তিজীবন বলতে তখন আর কিছু থাকে না। সবই হয়ে যায় পেশাজীবন। ফলে অর্থ উপার্জনকারী না হলেই কোনো কাজ আপনার প্রাধান্যের তালিকায় থাকে না।

সমাধান কী

১. পেশাগত কাজ ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ফারাক তৈরি করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সীমানা এঁকে ফেলতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করা প্রয়োজন, যার পরে আপনি শুধু নিজের ব্যক্তিজীবনের জন্যই বরাদ্দ থাকবেন। হ্যাঁ, জরুরি প্রয়োজনে এর কিছুটা এদিক-সেদিক হতেই পারে। কিন্তু পারতপক্ষে এই বিভক্ত ব্যবস্থার ব্যত্যয় করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ড্রিম জব হোক, আর যাই হোক—পেশাজীবন কখনো আপনার জীবনের একমাত্র অর্থ হতে পারে না।

২. শুধু পেশাগত লক্ষ্য নির্ধারণ করলে হবে না। ব্যক্তিজীবনের জন্যও লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এবং সেসব লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টাও করতে হবে। বুঝতে হবে যে, শুধু পেশাজীবনের লক্ষ্য অর্জনই পুরস্কার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না। ব্যক্তিজীবনও দেয়। এবং ব্যক্তিজীবনের লক্ষ্য অর্জনে যে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়, তার স্বাদ সত্যিই তুলনাহীন।

৩. পেশাগত কাজের কোনো ঝামেলাকে ব্যক্তিগত সমস্যার মতো করে দেখা যাবে না। অর্থাৎ, দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এতে করে দেখবেন অফিসের ঝামেলা ঘরে এসে দানা বাঁধবে কম। আবার অফিসের সমস্যাকে ব্যক্তিগতভাবে না নিলে, সেটি সমাধান করতে পারবেন ঠান্ডা মাথায়।

৪. ক্যারিয়ারে কী পেতে চান—সে সম্পর্কে নিজের সাথে খোলামেলা বোঝাপড়া করার চেষ্টা করুন। পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা সমাজ আপনাকে কী হিসেবে দেখতে চায়, সেই ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নিজেকে নিজে কীভাবে দেখতে চান, তা বুঝতে শিখুন।

৫. অনেকে অফিসের সহকর্মীদের মধ্যেই নিজের জীবনকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রেই আমরা জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় ব্যয় করি। তাই অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে ভালো ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা অবশ্যই উপকারী। তবে সেটিই ‘একমাত্র’ হলে ঢের বিপদ। তাই কর্মক্ষেত্রের বাইরেও সময় কাটানোর মতো পরিমণ্ডল তৈরি করে নিতে হবে।

তথ্যসূত্র: দ্য আটলান্টিক, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, সাইকোলজিটুডে ডট কম, দ্য হিল, হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ ও ফোর্বস

সম্পর্কিত