পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন কেন জরুরি

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন কেন জরুরি
মানসিক স্বাস্থ্য লিঙ্গভেদে আলাদা নয়। ছবি: ফ্রিপিক

সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের আলোচনায় পুরুষের অবস্থান কিছুটা আড়ালে থাকে। কারণ বহু সংস্কৃতিতেই ‘পুরুষ মানেই শক্ত’, ‘পুরুষরা কাঁদে না’, ‘সমস্যা নিজেরাই সামলাতে হয়’- এই ধরনের ধারণা গভীরভাবে বসে আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানসিক স্বাস্থ্য লিঙ্গভেদে আলাদা নয়। পুরুষের মানসিক সুস্থতা পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজ- সব ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলে।

অনুভূতি প্রকাশের সীমাবদ্ধতা পুরুষদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে। সামাজিকভাবে পুরুষদের এমনভাবে বড় করা হয় যে তারা ভয়, দুঃখ, দুর্বলতা বা উদ্বেগ প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে। ফলে তারা নিজের সমস্যাগুলো চেপে রাখে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি বা ক্রোধের মতো সমস্যায় রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে পুরুষদের ‘চাপ সহ্য করার ক্ষমতা’ নিয়ে একটি অতিরিক্ত প্রত্যাশা থাকে।

পরিবারের স্তম্ভ হিসেবে চাপ মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ভূমিকা রাখে। ছবি: ফ্রিপিক
পরিবারের স্তম্ভ হিসেবে চাপ মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ভূমিকা রাখে। ছবি: ফ্রিপিক

পরিবারের স্তম্ভ হিসেবে চাপ মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ভূমিকা রাখে। পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ- সব কিছুর দায় অনেক সময় পুরুষের ওপর এসে পড়ে। এই অতিরিক্ত দায়বদ্ধতার চাপ তারা মুখে বলুক বা না বলুক, এগুলো ভিতরে ভিতরে মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরা প্রায়ই কর্মজীবন, সম্পর্ক বা আত্মপরিচয় নিয়ে উদ্বেগে ভোগেন, কিন্তু সাহায্য নেওয়া বা কাউন্সেলিংয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

সম্পর্কের টানাপোড়েন পুরুষদের মানসিক স্থিতি নাড়া দেয়। দাম্পত্য সমস্যা, আত্মসম্মানবোধে আঘাত, বিশ্বাসঘাতকতা বা আবেগিক দূরত্ব- এসব বিষয় পুরুষদের ক্ষেত্রেও গভীর মানসিক আঘাত সৃষ্টি করে। তবে তাদের কষ্ট বোঝার মতো সহানুভূতিশীল পরিবেশ সবসময় তৈরি হয় না। ফলে অনেক পুরুষ নানা সময়ে নীরব হয়ে যান, নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন বা আচরণগত পরিবর্তন দেখান।

মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশে পার্থক্য রয়েছে। গবেষণা বলছে, পুরুষরা শব্দে অনুভূতি প্রকাশে দুর্বল হলেও আচরণে তাদের মানসিক সমস্যাগুলো অনেক বেশি স্পষ্ট হয়। রাগ, বিরক্তি, মাদকাসক্তি, অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া বা সামাজিকভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। এই লক্ষণগুলোকে অনেকেই ‘ব্যক্তিত্ব’ বা ‘মুড’ হিসেবে দেখেন, কিন্তু আসলেই এগুলো মানসিক চাপের ইঙ্গিত হতে পারে।

সুস্থ পুরুষ মানেই সুস্থ পরিবার- এটা বোঝা জরুরি। একজন পুরুষ যদি আবেগিকভাবে স্থিতিশীল হন, তিনি পরিবারে নিরাপত্তা, সংযোগ এবং সৌহার্দ্য আনতে পারেন। শিশুরা তাদের বাবার আচরণ দেখে শেখে। তারা সহানুভূতি, আবেগ প্রকাশ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা অনেকটাই বাবার কাছ থেকে পায়। ফলে একজন পুরুষের মানসিক সুস্থতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও আবেগিক বিকাশে প্রভাব ফেলে।

সুস্থ পুরুষ মানেই সুস্থ পরিবার। ছবি: ফ্রিপিক
সুস্থ পুরুষ মানেই সুস্থ পরিবার। ছবি: ফ্রিপিক

সমাধান হিসেবে জরুরি হলো পুরুষদের জন্য নিরাপদ এবং বিচারহীন (নন-জাজমেন্টাল) পরিবেশ তৈরি করা, যাতে তারা নিজেদের অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে পারে। পরিবার, বন্ধু বা সঙ্গী- সবারই উচিত পুরুষের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া। পাশাপাশি কাউন্সেলিং, থেরাপি এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা পুরুষদের জীবনমান উন্নত করতে পারে।

পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য শুধু একজন ব্যক্তির নয়-একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি প্রজন্মের সুস্থতার ভিত্তি। তাই তাদের কষ্ট, চাপ এবং অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এজন্য পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের এগিয়ে আসতে হবে।

তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি হসপিটালস

সম্পর্কিত