শীত আসার আগেই সিরাজগঞ্জের জলাভূমি, খাল ও নদীতে অতিথি পাখি আসতে শুরু করেছে। এতে নিরিবিলি জলাশয়গুলো পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে।
তাড়াশ উপজেলার উলুপুর দিঘির চারপাশের গাছপালা এখন অতিথি পাখির ডাকে মুখর। প্রতিদিন বিকেলে পাখি দেখতে দিঘির পাড়ে ভিড় করছেন দর্শনার্থী, পাখিপ্রেমী ও কৌতূহলী মানুষ।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে জলাভূমিগুলোতে ইতোমধ্যে হাজার হাজার পাখি দেখা গেছে। শীতকালে এই অঞ্চলের জলাশয়গুলো বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থলে পরিণত হয়। এসব পাখির মধ্যে রয়েছে বক, বাদার, লালমন, শোলি, এশিয়ান ওপেনবিল, শিস দেওয়া হাঁস, কাইয়ুম ও বাগার পাখি।
জলাভূমির ওপর দিয়ে বড় বড় ঝাঁকে পাখিদের উড়ে যাওয়া, খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো এবং বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালায় ফিরে আসার দৃশ্য এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশেষ করে উলুপুর দিঘি অতিথি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে। স্থানীয় শিক্ষার্থী ও পাখিপ্রেমীরা জানিয়েছেন, দিঘির চারপাশের গাছপালা ধীরে ধীরে পাখিদের জন্য উপযুক্ত আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। এতে পাখিরা প্রতিবছর ফিরে আসতে উৎসাহিত হচ্ছে।
স্থানীয় এক পাখিপ্রেমী বলেন, “প্রতিদিন বিকেলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে পাখি দেখতে জড়ো হন। প্রতিদিন দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।”
পাখি দেখার সময় অনেক দর্শনার্থী ছবি ও সেলফি তোলেন। তবে মানুষের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি পাখির আবাসস্থলে বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে, এমন উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।
পাখি নিরাপদে এই এলাকায় বিচরণ করতে পারে, সে জন্য দিঘি, আশপাশের গাছপালা ও অন্যান্য জলাভূমি সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পাখিপ্রেমীরা।
পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচণ্ড শীতের কারণে যখন নিজ দেশের আবাসস্থলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন অতিথি পাখিরা তুলনামূলক কম শীত ও খাবার এবং প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে এমন দেশে চলে যায়।
তুলনামূলক মাঝারি শীত ও বিস্তীর্ণ জলাভূমির কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর হাজার হাজার অতিথি পাখিকে আকর্ষণ করে। পাখিগুলো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের নদী, হাওর, বিল, পুকুর ও উপকূলীয় জলাভূমিতে আসে।
অনেক প্রজাতির পাখি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। সাধারণত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে এসব পাখির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে।
প্রাসঙ্গিক পাখির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ৭৪৪ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩০১টি আবাসিক প্রজাতি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, পুকুরের শান্ত পানিতে ও আশপাশের সবুজে হাজার হাজার পাখির বিচরণ এক অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করেছে।
আনোয়ারুল হক বলেন, “পাখিগুলো মূলত খাবার ও নিরাপত্তার সন্ধানে এখানে আসে। শীত শেষ হলে তারা নিজেদের আবাসস্থলে ফিরে যায়।”
তবে অসাধু ব্যক্তিদের হাতে অতিথি পাখি শিকার ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ওই কর্মকর্তা।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, শিকার ও অন্যান্য হুমকির কারণে অনেক জায়গায় পাখির সংখ্যা কমছে। পাখি রক্ষায় জনসচেতনতা ও সতর্কতা বাড়ানোর প্রয়োজন।
শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাই তাড়াশের জলাভূমিগুলো আতিথি পাখিদের শুধু খাবারের জায়গা হয়ে থাকছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের জন্য এসব জলাভূমি মৌসুমভিত্তিকভাবে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যেরও স্মারক হয়ে উঠছে। প্রকৃতিকে নিরাপদে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে এই জীববৈচিত্র্য টিকে থাকে।