স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের শীর্ষ নেতারা কার্ডিফ শহরে গত সোমবার আয়োজিত এক বৈঠকে যুক্তরাজ্য (ইউকে) থেকে নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবিতে এক যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। ঐতিহাসিক এই ঘোষণার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলগুলোতে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের পথ সুগম করতে পারে এবং চূড়ান্তভাবে যুক্তরাজ্যকে ভেঙে দিতে পারে।
যৌথ ঘোষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, ওয়েস্টমিনস্টারের (যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সংসদ) কোনো সরকারেরই গণতন্ত্রকে রুদ্ধ করার কিংবা জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূলনীতিকে ধ্বংস করার অধিকার নেই। নেতৃবৃন্দ এই বিষয়ে একমত হন যে, তিনটি রাজনৈতিক দলের সাংবিধানিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে এবং প্রতিটি জাতি তাদের নিজস্ব উপায়ে ও নির্দিষ্ট সময়ে নিজস্ব ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
সংবাদমাধ্যম ক্রেডেল লিখেছে, যুক্তরাজ্য মূলত ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড—এই চারটি জাতি বা অঞ্চলের সমন্বয়ে গঠিত। যুক্তরাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৪ শতাংশই ইংল্যান্ডে বাস করে, যার ফলে কেন্দ্রীয় সংসদের অধিকাংশ এমপি-ই ইংল্যান্ডের বিভিন্ন সংসদীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেন। কার্ডিফের এই ঐতিহাসিক বৈঠকে স্কটল্যান্ডের স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) নেতা জন সুইনি, ওয়েলসের প্লেইড কামরির নেতা রুন আপ ইওরওয়ার্থ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের সিন ফেইন পার্টির নেতা মিশেল ও'নিল এই যৌথ সনদে স্বাক্ষর করেন। সনদের মাধ্যমে দাবি জানানো হয় যে, ওয়েস্টমিনস্টার সরকার যেন স্থায়িভাবে স্বাধীনতা বা সাংবিধানিক অবস্থান সংক্রান্ত ভোট আটকে না রাখে। ব্রিটিশ সরকারের উচিত এই ধরণের সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি নেওয়া, পরিকল্পনা করা ও তা সহজতর করা।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি একে যুক্তরাজ্যের জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ ও যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করে বলেন যে, এর মাধ্যমে পরিস্থিতি চিরতরে বদলে গেছে এবং এই তিন দেশের জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৪ সালের গণভোটে স্কটল্যান্ডের ৫৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাজ্যের সাথে থাকার পক্ষে এবং ৪৫ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
ওয়েলসে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এই প্রক্রিয়ায় নতুন গতি এনেছে। মে মাসের নির্বাচনে ওয়েলশ লেবার পার্টিকে পরাজিত করে প্লেইড কামরি দল প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে। ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ ইওরওয়ার্থ এই পরিবর্তনকে ওয়েলসের জন্য একটি বড় মোড় হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ওয়েস্টমিনস্টারের শাসন ব্যবস্থা যে আর কাজ করছে না—তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্ষমতাসীন সিন ফেইন পার্টি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্য ত্যাগ করে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের সাথে একীভূত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও'নিল আইরিশ পুনরেকত্রীকরণের জন্য ‘সীমান্ত ভোট’ আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, ওয়েস্টমিনস্টারের শাসকগোষ্ঠী কখনোই পুরো আয়ারল্যান্ড দ্বীপের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করেনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পুরো দ্বীপজুড়েই পরিবর্তনের বাতাস বইছে এবং সম্ভাব্য এই সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
যৌথ ঘোষণায় এই তিনটি দেশের ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক দিকটি তুলে ধরে বলা হয়, তাদের লক্ষ্য ইউরোজোন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে যুক্ত হওয়া। নেতারা যুক্তি দেন যে, ব্রেক্সিটের কারণে তাদের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ইউরোপের সাথে সুসম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা বিবিসি এই প্রেক্ষাপটে মন্তব্য করেছে যে, বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবার স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড—তিনটি অঞ্চলেই এমন ফার্স্ট মিনিস্টাররা ক্ষমতায় রয়েছেন যারা সবাই যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে চান। ক্রমবর্ধমান এই টানাপোড়েনের মধ্যেই আগামী মাসে এই আঞ্চলিক নেতারা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সাথে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন।