একদিকে নারী রাষ্ট্রপ্রধানের মেয়াদের ঐতিহাসিক সূচকে বিশ্বে প্রথম, অন্যদিকে সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্বের সূচকে ১৩৯তম। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা থাকলেও উচ্চশিক্ষায় ব্যবধান রয়ে গেছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ও আয়ের ক্ষেত্রেও পুরুষদের সঙ্গে বড় পার্থক্য দেখা যায়।
বাংলাদেশের লিঙ্গসমতার চিত্রে এমন বৈপরীত্য কেন? কোন কোন ক্ষেত্রে দেশটি এগিয়েছে, আর কোথায় এখনো পিছিয়ে? শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও স্বাস্থ্য, এই চার ক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা দুটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ১৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৯তম। সামগ্রিক লিঙ্গসমতার স্কোর ৭১ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫ সালে ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ ছিল ২৪তম স্থানে। এক বছরে স্কোর কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট, আর অবস্থানের অবনতি হয়েছে ৫৫ ধাপ। তবে ২০০৬ সালের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে।
শিক্ষায় অগ্রগতি, উচ্চশিক্ষায় ব্যবধান
চারটি সূচকের মধ্যে শিক্ষাগত অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। এ ক্ষেত্রে দেশটির স্কোর ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা রয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় কি সেই সমতা বজায় আছে?
তথ্য বলছে, নেই। পুরুষদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ, নারীদের ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সাক্ষরতার হারও পুরুষদের মধ্যে ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আর নারীদের মধ্যে ৭৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সমতা থাকলেও উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের সমান নয়।
কর্মসংস্থান ও আয়ে বড় ব্যবধান
বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে। এই সূচকে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ স্কোর নিয়ে দেশটির অবস্থান বিশ্বে ১৪২তম।
শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার পুরুষদের ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, নারীদের মাত্র ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। সময়ের সঙ্গে এই ব্যবধান কীভাবে বদলেছে? প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার স্কোর ২০০৬ সালে ছিল ৬১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে।
আয়ের ক্ষেত্রেও ব্যবধান বড়। নারীদের আনুমানিক বার্ষিক আয় ৪ হাজার ৬৭০ ডলার, আর পুরুষদের ১২ হাজার ৪৪০ ডলার। আয়ের ক্ষেত্রে সমতার স্কোরও ২০০৬ সালের ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
শুধু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ বা আয় নয়, নেতৃত্বের জায়গাতেও নারীদের উপস্থিতি সীমিত। শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পদে নারীদের হার মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। পেশাগত ও কারিগরি কাজে নারী-পুরুষের সমতার স্কোর ২৬ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০০৬ সালে ছিল ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান, আয় ও পেশাগত নেতৃত্ব, তিন ক্ষেত্রেই বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
রাজনীতিতে বৈপরীত্য: রাষ্ট্রপ্রধানের সূচকে প্রথম, সংসদে ১৩৯তম
রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১২তম, স্কোর ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ। গত ৫০ বছরের হিসাবে নারী রাষ্ট্রপ্রধানের মেয়াদের সূচকে বাংলাদেশ পূর্ণ সমতার স্কোর ধরে রেখেছে। গত ২০ বছরে মন্ত্রিসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্বও ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
কিন্তু সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্বের চিত্র একেবারেই আলাদা। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে সংসদীয় প্রতিনিধিত্বে নারী-পুরুষের সমতার স্কোর মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা বাংলাদেশের জন্য এযাবৎকালের সর্বনিম্ন। এই সূচকে দেশটির অবস্থান ১৩৯তম।
অর্থাৎ, নারী রাষ্ট্রপ্রধানের মেয়াদের ঐতিহাসিক সূচকে শীর্ষে থাকলেও সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো অত্যন্ত কম।
স্বাস্থ্য ও কর্মজীবনেও অসমতা
স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকার সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ শতাংশ, অবস্থান ১২০তম। জন্মকালীন লিঙ্গ অনুপাতের সূচকে দেশটি প্রথম স্থানে রয়েছে। তবে সুস্থ প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালে নারীরা পুরুষদের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই আয়ুষ্কাল ৬৩ দশমিক ১৪ বছর, নারীদের ৬২ দশমিক ৯৮ বছর।
কর্মজীবন ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্যেও ব্যবধান দেখা যায়। কর্মজীবী নারীদের ৯৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে হার ৭৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন হলেও বাবাদের জন্য পিতৃত্বকালীন ছুটি নেই।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে স্নাতকদের মধ্যে নারীদের হার ৮ দশমিক০৮ শতাংশ, পুরুষদের ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ ছাড়া, প্রতিবেদনের প্রাসঙ্গিক তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের ৪৮ দশমিক ৮০ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম, বিশ্বে ৭৯তম
দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে সামগ্রিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। ৭১ দশমিক ২ শতাংশ স্কোর নিয়ে বিশ্বে দেশটির অবস্থান ৭৯তম। অন্যদিকে, মালদ্বীপ ১১৯তম, নেপাল ১২০তম, ভুটান ১২১তম, শ্রীলঙ্কা ১২৯তম, ভারত ১৩১তম এবং পাকিস্তান ১৪৩তম স্থানে রয়েছে।
তবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম হওয়া মানেই সব ক্ষেত্রে সমতা অর্জন নয়। বিশ্বব্যাপী ২০২৬ সালে লিঙ্গসমতার ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ ব্যবধান পূরণ হয়েছে। বর্তমান অগ্রগতির গতি বজায় থাকলে পূর্ণ লিঙ্গসমতা অর্জনে বিশ্বকে আরও ১২০ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বব্যাপী অগ্রগতিও তুলনামূলক ধীর।
বাংলাদেশের চিত্রেও রয়েছে এমন বৈপরীত্য। শিক্ষা ও কিছু রাজনৈতিক সূচকে অগ্রগতি থাকলেও কর্মসংস্থান, আয় ও সংসদে প্রতিনিধিত্বে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। তাই শুধু সামগ্রিক অবস্থান নয়, লিঙ্গসমতার প্রতিটি ক্ষেত্রের স্কোর এবং সময়ের সঙ্গে সেগুলোর পরিবর্তনও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।