আর্জেন্টিনা ৩ : ২ মিশর
চরচা ডেস্ক

কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছিল না আর্জেন্টিনার।
মেসি পেনাল্টি মিস করেছিলেন। আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে একবার গোল খেল। দ্বিতীয়ার্ধে একবার গোল খেয়ে ভিএআরে কোনোরকমে বাঁচলেও ছয় মিনিট পর আবার গোল খেল। ম্যাচটা শেষ ১৫ মিনিটে যাওয়ার সময়ও আর্জেন্টিনার বিদায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল।
কিন্তু সেখান থেকেই কী অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন আর্জেন্টিনার!
৭৯ মিনিটে মেসির ক্রসে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে আশা জেগেছে, চার মিনিট পর মেসিই গোল করে সমতায় ফেরালেন আর্জেন্টিনাকে। আর যোগ করা সময়ে এনসো ফের্নান্দেসের হেডে মাথা উঁচু করেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। ৩-২ গোলে আর্জেন্টিনা জিতল, বিশ্বকাপ দেখল অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ।
অবিশ্বাস্য সব কাউন্টার অ্যাটাকে আর্জেন্টিনার মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়া মিশর শেষ পর্যন্ত ভাঙা হৃদয় নিয়েই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। তবে যেভাবে খেলেছে মো সালাহর দল, তাতে মিশরীয়দের গর্ব না হয়ে পারে না!
আর ম্যাচের উত্তেজনা শেষে যখন ধীরেসুস্থে ভাবার সময় পাবেন, মেসির ঠোঁট চিরে এক চিলতে স্বস্তির-সুখের হাসি না বেরিয়ে পারে না!
৭৮ মিনিট পর্যন্তও তিনিই যে ছিলেন আর্জেন্টিনার খলনায়ক! প্রথমার্ধে ১৫ মিনিটে ইয়াসের ইব্রাহিমের হেডে এগিয়ে গেল মিশর, তার চার মিনিট পর আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পেলেও তা থেকে গোল করতে পারলেন না মেসি। তার দুর্বল শট বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন মিশর গোলকিপার মোস্তফা শোবেইর।
Back to back penalty miss by Messi. He's no Ronaldo so everyone's cool with it https://t.co/p0n978aV9A pic.twitter.com/te3ozZkJA8
— Irigo Mxx 🌪️ (@irigo_m) July 7, 2026
প্রথমার্ধের শেষদিকে আর্জেন্টিনার আক্রমণ কিছুটা প্রাণ পেলেও এই শোবেইরের কারণেই সমতায় ফেরা হয়নি আর্জেন্টিনার।
দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা ফিরবে কী, উল্টো তাদের নিষ্প্রাণ ফুটবলের বিপরীতে মিশরের ভয়ংকর সব পাল্টা আক্রমণ ভয় ধরিয়ে দিয়েছে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বুকে। ভিএআর নাক না গলালে তো ঘণ্টাখানেক পেরোনোর আগেই আর্জেন্টিনার বিদায়ের শঙ্কা জেঁকে বসত!
মিশরের অবশ্য ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। ৫৮ মিনিটেই দ্বিতীয় গোলটা পেয়ে যাওয়ার কথা ছিল। চোখধাঁধানো পাল্টা আক্রমণে যেভাবে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে ঘোল খাইয়ে নিজেদের বক্সের সামনে থেকে আর্জেন্টিনার জালে পাঠিয়ে দিল মিশর, বেরসিক ভিএআর এসে সেটি বাতিল করে দিল। যে ৭৪ মিনিট মাঠে ছিলেন, ততক্ষণে বারবার পায়ের কাজে মুগ্ধতা ছড়ানো হাইসাম হাসান নিজেদের বক্সের সামনে থেকে দুর্দান্ত এক দৌড়ে আর্জেন্টিনার তিন খেলোয়াড়কে ঘোল খাইয়েছেন, এরপর আর্জেন্টিনার বক্সের সামনে গিয়ে বলটা দেন সালাহর পায়ে। সালাহর পাস ধরে দারুণ শটে বল জালে জড়ান জিকো। কিন্তু ভিএআর জানাল, পাল্টা আক্রমণের আগে ফাউল হয়েছে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রোর ওপর। গোল বাতিল!
Players rugby tackle each other in the box and VAR just sits back and watches, but when Egypt score a goal to potentially put Argentina out the World Cup and VAR intervenes.
— Lea (@Lea_EFC) July 7, 2026
Corruption in plain sight 👀 https://t.co/q354qdTOsO https://t.co/p08bqJV3b5 pic.twitter.com/b9gt0ti1gn
কিন্তু এর ছয় মিনিট পরই আবার মিশরের গোল! এবার আর ভিএআরের অনিশ্চয়তা নয়। আবারও পাল্টা আক্রমণ, আবারও মিশরের দারুণ গতি আর ট্রানজিশনের খেল! আর্জেন্টিনার কর্নার থেকে পাল্টা আক্রমণ শুরু সালাহর পায়ে। রোমেরোকে কাটিয়ে সেই হাইসাম হাসানের পায়ে বল দিলেন সালাহ। হাসান বক্সের এক প্রান্তে মলিনাকে সহজেই কাটালেন, এরপর কাটব্যাক করলেন বক্সে। কাটব্যাক থেকে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে দিলেন কে? সেই জিকো – ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির নামে যার নাম, তিনিই যেন হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার বিদায়ের কারণ!
তখন পর্যন্ত তা-ই মনে হচ্ছিল।
তখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার আক্রমণগুলো মিশর বক্সের আশপাশেই ঘুরঘুর করছিল।
তখন পর্যন্ত মেসি ছিলেন ম্যাচের ‘পেরিফেরাল ফিগার’। নিষ্প্রভ।
কিন্তু আবার এক পানি পানের বিরতিই যেন আর্জেন্টিনাকে বদলে দিল। প্রথমার্ধে পানি পানের বিরতির পর ছন্দ খুঁজে নেওয়া আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়ার্ধেও পানি পানের বিরতির পর একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর্জেন্টিনা কোচ ততক্ষণে আক্রমণে লওতারো মার্তিনেস আর নিকো গনসালেসকেও নামিয়ে দিয়েছেন। মেসি, আলভারেস, লওতারো, নিকো… মিশর বক্স ও এর আশপাশে আকাশি-সাদা জার্সির আনাগোনা বাড়ল, মেসি খেলার আরও জায়গা পেলেন।
অতটুকুই দরকার ছিল আর্জেন্টিনার।
৭৯ মিনিট, ডানদিক থেকে মেসির ক্রস। ছয় গজের বক্সে ফাঁকায় বল গেল ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর মাথায়। তাঁর হেড ঠেকানোর সাধ্য হলো না মিশর গোলকিপারের।
Goals for Argentina Romero make it 1-2
— Madrid TakesX (@MadridTakesX) July 7, 2026
Possible comeback???? pic.twitter.com/tTWAgY9VJy
আর্জেন্টিনার আশা জেগে উঠল। মিশর ম্যাচে প্রথমবারের মতো সন্দিহান হয়ে পড়ল। মেসিরা হয়ে উঠলেন ভয়ংকর!
তখনো একটা গোলের দরকার তো ছিল! ম্যাচের সময় তখন আর মিনিট দশেক বাকি। ম্যাচে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনার খেলায় গতি এল, পাসিং দ্রুততর হলো। হঠাৎ করেই আর্জেন্টিনার সবকিছুর কেন্দ্রে চলে এলেন মেসি।
৮২ মিনিট। ডানদিক থেকে দারুণভাবে ঢুকে মেসি ক্রস করলেন, কিন্তু লওতারো মার্তিনেসের হেড অল্পের জন্য জালের বাইরেই থাকল। আর্জেন্টিনা হতাশ হলো।
কিন্তু মেসি হাল ছাড়লেন না।
এক মিনিট পরই আর্জেন্টিনা আবার আক্রমণে। মেসির ক্রস, মিশর ডিফেন্স ফেরাতে পারল না। লওতারো বাঁদিক থেকে বলটা কোনোরকমে বক্সে রাখলেন, আলভারেস পড়িমরি করে বলটা আরেকটু ঠেলে দিলেন। বলটার দিকে দৌড়ে এলেন আর্জেন্টিনার একজন…মেসি! অল্প জায়গা ছিল, বল লাফিয়ে উঠবে উঠবে করছে, এমন অবস্থায় দৌড়ের গতিতেই মেসির হাফভলি… এবং মেসির শাপমোচন! আর্জেন্টিনা গ্যালারিতে গর্জন, মেসির উদ্যাপনে আনন্দ-স্বস্তি-বুনো উচ্ছ্বাসের মিশেল। আর্জেন্টিনা ২-২ মিশর!
This Goal was sooo personal to him 😭💥
— చిన్నా (@Chinnoooda) July 7, 2026
MESSI - G.O.A.T for a reason 🐐🛐🔥pic.twitter.com/GB98yMfJeS
আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফিরেছে। কিন্তু তখনো জেতা হয়নি। তবু গ্যালারিতে, আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের মনে আপাত স্বস্তি তখন ছিল। আর কিছু না হোক, এই অবস্থায়ই থাকলে অন্তত অতিরিক্ত সময় তো পাওয়া যায়। ৯০ মিনিট পার হলো, রেফারি সময় যোগ করলেন ৭ মিনিট।
কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে যাওয়া আর হলো না মিশরের। ৯২ মিনিট। আর্জেন্টিনার বক্সে মো সালাহর পা থেকে বল কেড়ে নিলেন লিসান্দ্রো। ফাউল কি হলো? তখন দেখার সময় নেই, ভিএআর দেখবে। আর্জেন্টিনা বল নিয়ে ছুটল। লিসান্দ্রোই বাঁদিক থেকে লম্বা পাস পাঠালেন ডানদিকে উঠে যাওয়া লওতারো মার্তিনেসের দিকে। পাল্টা আক্রমণে আর্জেন্টিনা। ম্যাচজুড়ে ভয়ংকর সব পাল্টা আক্রমণ করা মিশর তখন প্রমাদ গুনছে! শেষ মুহূর্তে এভাবে সবাই আক্রমণে উঠে যাওয়ার দরকার কী ছিল!
من هذي الزاوية ، انكشف تمثيل محمد صلاح 😅👇pic.twitter.com/UXAcOp2Bom
— Abokr Omar (@Abokr10) July 8, 2026
ততক্ষণে দুবার গোলের স্বাদ পেয়ে যাওয়া আর্জেন্টিনা তখন জয়ের ঘ্রাণ পাচ্ছে। লওতারো ডানদিক থেকে ক্রস করলেন, মিশর বক্সে তখন দুই ডিফেন্ডারের সঙ্গে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শুধু এনসো ফের্নান্দেস! কিন্তু লওতারোর ক্রস ঠিক এনসোর মাথায়ই গিয়ে পড়ল। এনসোর হেড…বল জালে! অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় এক প্রত্যাবর্তন দেখল বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের স্বপ্ন বেঁচে থাকল।
🇦🇷🇪🇬 The third goal in Argentina’s 3-2 win over Egypt from an aerial view.
— Mario Nawfal (@MarioNawfal) July 8, 2026
TOTAL MADNESS
Writer: Solpic.twitter.com/qpjcfPzJQk https://t.co/B0n9rXMWXG
মিশর গোলটা মানবে না, মানার কারণও নেই। বক্সে লিসান্দ্রো বল কেড়ে নেওয়ার সময় সালাহকে ফাউল করেছিলেন কি না, সে নিয়ে বিতর্ক চলবে। তবে ভিএআরের এ বেলায় রিপ্লে দেখেও ফাউল মনে হয়নি, আর্জেন্টিনা এ নিয়েই আস্তিন উঁচিয়ে তর্কে নামবে।
তর্ক-বিতর্কের মধ্যে আপাতত এটাই সত্যি, অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে কোয়ার্টার ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনা। অসাধারণ প্রদর্শনীর পরও বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে সালাহর মিশরকে।
ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের চোখেই দেখা গেল জল। এবারের আগে কখনো বিশ্বকাপে নকআউট পর্বেই না ওঠা মিশরের খেলোয়াড়দের কান্না খুব কাছে গিয়েও নতুন ইতিহাস লিখতে না পারার।
ওদিকে মেসিও তখন কাঁদছেন। স্বস্তির কান্না, আনন্দের কান্না। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করে বনে গিয়েছিলেন এক বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে পেনাল্টি মিস করা প্রথম খেলোয়াড়। সেই শাপ মোচন করলেন এক গোলে আর এক অ্যাসিস্টে, ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় বনে গিয়ে।
প্রথমার্ধে ‘মানুষ’ মেসি দ্বিতীয়ার্ধে – আরও নির্দিষ্ট করে বললে শেষ ১৫ মিনিটে – বনে গেলেন সুপারম্যান।
সুপারম্যানরাও তাহলে কাঁদে!

কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছিল না আর্জেন্টিনার।
মেসি পেনাল্টি মিস করেছিলেন। আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে একবার গোল খেল। দ্বিতীয়ার্ধে একবার গোল খেয়ে ভিএআরে কোনোরকমে বাঁচলেও ছয় মিনিট পর আবার গোল খেল। ম্যাচটা শেষ ১৫ মিনিটে যাওয়ার সময়ও আর্জেন্টিনার বিদায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল।
কিন্তু সেখান থেকেই কী অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন আর্জেন্টিনার!
৭৯ মিনিটে মেসির ক্রসে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে আশা জেগেছে, চার মিনিট পর মেসিই গোল করে সমতায় ফেরালেন আর্জেন্টিনাকে। আর যোগ করা সময়ে এনসো ফের্নান্দেসের হেডে মাথা উঁচু করেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। ৩-২ গোলে আর্জেন্টিনা জিতল, বিশ্বকাপ দেখল অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ।
অবিশ্বাস্য সব কাউন্টার অ্যাটাকে আর্জেন্টিনার মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়া মিশর শেষ পর্যন্ত ভাঙা হৃদয় নিয়েই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। তবে যেভাবে খেলেছে মো সালাহর দল, তাতে মিশরীয়দের গর্ব না হয়ে পারে না!
আর ম্যাচের উত্তেজনা শেষে যখন ধীরেসুস্থে ভাবার সময় পাবেন, মেসির ঠোঁট চিরে এক চিলতে স্বস্তির-সুখের হাসি না বেরিয়ে পারে না!
৭৮ মিনিট পর্যন্তও তিনিই যে ছিলেন আর্জেন্টিনার খলনায়ক! প্রথমার্ধে ১৫ মিনিটে ইয়াসের ইব্রাহিমের হেডে এগিয়ে গেল মিশর, তার চার মিনিট পর আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পেলেও তা থেকে গোল করতে পারলেন না মেসি। তার দুর্বল শট বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন মিশর গোলকিপার মোস্তফা শোবেইর।
Back to back penalty miss by Messi. He's no Ronaldo so everyone's cool with it https://t.co/p0n978aV9A pic.twitter.com/te3ozZkJA8
— Irigo Mxx 🌪️ (@irigo_m) July 7, 2026
প্রথমার্ধের শেষদিকে আর্জেন্টিনার আক্রমণ কিছুটা প্রাণ পেলেও এই শোবেইরের কারণেই সমতায় ফেরা হয়নি আর্জেন্টিনার।
দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা ফিরবে কী, উল্টো তাদের নিষ্প্রাণ ফুটবলের বিপরীতে মিশরের ভয়ংকর সব পাল্টা আক্রমণ ভয় ধরিয়ে দিয়েছে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বুকে। ভিএআর নাক না গলালে তো ঘণ্টাখানেক পেরোনোর আগেই আর্জেন্টিনার বিদায়ের শঙ্কা জেঁকে বসত!
মিশরের অবশ্য ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। ৫৮ মিনিটেই দ্বিতীয় গোলটা পেয়ে যাওয়ার কথা ছিল। চোখধাঁধানো পাল্টা আক্রমণে যেভাবে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে ঘোল খাইয়ে নিজেদের বক্সের সামনে থেকে আর্জেন্টিনার জালে পাঠিয়ে দিল মিশর, বেরসিক ভিএআর এসে সেটি বাতিল করে দিল। যে ৭৪ মিনিট মাঠে ছিলেন, ততক্ষণে বারবার পায়ের কাজে মুগ্ধতা ছড়ানো হাইসাম হাসান নিজেদের বক্সের সামনে থেকে দুর্দান্ত এক দৌড়ে আর্জেন্টিনার তিন খেলোয়াড়কে ঘোল খাইয়েছেন, এরপর আর্জেন্টিনার বক্সের সামনে গিয়ে বলটা দেন সালাহর পায়ে। সালাহর পাস ধরে দারুণ শটে বল জালে জড়ান জিকো। কিন্তু ভিএআর জানাল, পাল্টা আক্রমণের আগে ফাউল হয়েছে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রোর ওপর। গোল বাতিল!
Players rugby tackle each other in the box and VAR just sits back and watches, but when Egypt score a goal to potentially put Argentina out the World Cup and VAR intervenes.
— Lea (@Lea_EFC) July 7, 2026
Corruption in plain sight 👀 https://t.co/q354qdTOsO https://t.co/p08bqJV3b5 pic.twitter.com/b9gt0ti1gn
কিন্তু এর ছয় মিনিট পরই আবার মিশরের গোল! এবার আর ভিএআরের অনিশ্চয়তা নয়। আবারও পাল্টা আক্রমণ, আবারও মিশরের দারুণ গতি আর ট্রানজিশনের খেল! আর্জেন্টিনার কর্নার থেকে পাল্টা আক্রমণ শুরু সালাহর পায়ে। রোমেরোকে কাটিয়ে সেই হাইসাম হাসানের পায়ে বল দিলেন সালাহ। হাসান বক্সের এক প্রান্তে মলিনাকে সহজেই কাটালেন, এরপর কাটব্যাক করলেন বক্সে। কাটব্যাক থেকে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে দিলেন কে? সেই জিকো – ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির নামে যার নাম, তিনিই যেন হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার বিদায়ের কারণ!
তখন পর্যন্ত তা-ই মনে হচ্ছিল।
তখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার আক্রমণগুলো মিশর বক্সের আশপাশেই ঘুরঘুর করছিল।
তখন পর্যন্ত মেসি ছিলেন ম্যাচের ‘পেরিফেরাল ফিগার’। নিষ্প্রভ।
কিন্তু আবার এক পানি পানের বিরতিই যেন আর্জেন্টিনাকে বদলে দিল। প্রথমার্ধে পানি পানের বিরতির পর ছন্দ খুঁজে নেওয়া আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়ার্ধেও পানি পানের বিরতির পর একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর্জেন্টিনা কোচ ততক্ষণে আক্রমণে লওতারো মার্তিনেস আর নিকো গনসালেসকেও নামিয়ে দিয়েছেন। মেসি, আলভারেস, লওতারো, নিকো… মিশর বক্স ও এর আশপাশে আকাশি-সাদা জার্সির আনাগোনা বাড়ল, মেসি খেলার আরও জায়গা পেলেন।
অতটুকুই দরকার ছিল আর্জেন্টিনার।
৭৯ মিনিট, ডানদিক থেকে মেসির ক্রস। ছয় গজের বক্সে ফাঁকায় বল গেল ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর মাথায়। তাঁর হেড ঠেকানোর সাধ্য হলো না মিশর গোলকিপারের।
Goals for Argentina Romero make it 1-2
— Madrid TakesX (@MadridTakesX) July 7, 2026
Possible comeback???? pic.twitter.com/tTWAgY9VJy
আর্জেন্টিনার আশা জেগে উঠল। মিশর ম্যাচে প্রথমবারের মতো সন্দিহান হয়ে পড়ল। মেসিরা হয়ে উঠলেন ভয়ংকর!
তখনো একটা গোলের দরকার তো ছিল! ম্যাচের সময় তখন আর মিনিট দশেক বাকি। ম্যাচে প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনার খেলায় গতি এল, পাসিং দ্রুততর হলো। হঠাৎ করেই আর্জেন্টিনার সবকিছুর কেন্দ্রে চলে এলেন মেসি।
৮২ মিনিট। ডানদিক থেকে দারুণভাবে ঢুকে মেসি ক্রস করলেন, কিন্তু লওতারো মার্তিনেসের হেড অল্পের জন্য জালের বাইরেই থাকল। আর্জেন্টিনা হতাশ হলো।
কিন্তু মেসি হাল ছাড়লেন না।
এক মিনিট পরই আর্জেন্টিনা আবার আক্রমণে। মেসির ক্রস, মিশর ডিফেন্স ফেরাতে পারল না। লওতারো বাঁদিক থেকে বলটা কোনোরকমে বক্সে রাখলেন, আলভারেস পড়িমরি করে বলটা আরেকটু ঠেলে দিলেন। বলটার দিকে দৌড়ে এলেন আর্জেন্টিনার একজন…মেসি! অল্প জায়গা ছিল, বল লাফিয়ে উঠবে উঠবে করছে, এমন অবস্থায় দৌড়ের গতিতেই মেসির হাফভলি… এবং মেসির শাপমোচন! আর্জেন্টিনা গ্যালারিতে গর্জন, মেসির উদ্যাপনে আনন্দ-স্বস্তি-বুনো উচ্ছ্বাসের মিশেল। আর্জেন্টিনা ২-২ মিশর!
This Goal was sooo personal to him 😭💥
— చిన్నా (@Chinnoooda) July 7, 2026
MESSI - G.O.A.T for a reason 🐐🛐🔥pic.twitter.com/GB98yMfJeS
আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফিরেছে। কিন্তু তখনো জেতা হয়নি। তবু গ্যালারিতে, আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের মনে আপাত স্বস্তি তখন ছিল। আর কিছু না হোক, এই অবস্থায়ই থাকলে অন্তত অতিরিক্ত সময় তো পাওয়া যায়। ৯০ মিনিট পার হলো, রেফারি সময় যোগ করলেন ৭ মিনিট।
কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে যাওয়া আর হলো না মিশরের। ৯২ মিনিট। আর্জেন্টিনার বক্সে মো সালাহর পা থেকে বল কেড়ে নিলেন লিসান্দ্রো। ফাউল কি হলো? তখন দেখার সময় নেই, ভিএআর দেখবে। আর্জেন্টিনা বল নিয়ে ছুটল। লিসান্দ্রোই বাঁদিক থেকে লম্বা পাস পাঠালেন ডানদিকে উঠে যাওয়া লওতারো মার্তিনেসের দিকে। পাল্টা আক্রমণে আর্জেন্টিনা। ম্যাচজুড়ে ভয়ংকর সব পাল্টা আক্রমণ করা মিশর তখন প্রমাদ গুনছে! শেষ মুহূর্তে এভাবে সবাই আক্রমণে উঠে যাওয়ার দরকার কী ছিল!
من هذي الزاوية ، انكشف تمثيل محمد صلاح 😅👇pic.twitter.com/UXAcOp2Bom
— Abokr Omar (@Abokr10) July 8, 2026
ততক্ষণে দুবার গোলের স্বাদ পেয়ে যাওয়া আর্জেন্টিনা তখন জয়ের ঘ্রাণ পাচ্ছে। লওতারো ডানদিক থেকে ক্রস করলেন, মিশর বক্সে তখন দুই ডিফেন্ডারের সঙ্গে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শুধু এনসো ফের্নান্দেস! কিন্তু লওতারোর ক্রস ঠিক এনসোর মাথায়ই গিয়ে পড়ল। এনসোর হেড…বল জালে! অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় এক প্রত্যাবর্তন দেখল বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের স্বপ্ন বেঁচে থাকল।
🇦🇷🇪🇬 The third goal in Argentina’s 3-2 win over Egypt from an aerial view.
— Mario Nawfal (@MarioNawfal) July 8, 2026
TOTAL MADNESS
Writer: Solpic.twitter.com/qpjcfPzJQk https://t.co/B0n9rXMWXG
মিশর গোলটা মানবে না, মানার কারণও নেই। বক্সে লিসান্দ্রো বল কেড়ে নেওয়ার সময় সালাহকে ফাউল করেছিলেন কি না, সে নিয়ে বিতর্ক চলবে। তবে ভিএআরের এ বেলায় রিপ্লে দেখেও ফাউল মনে হয়নি, আর্জেন্টিনা এ নিয়েই আস্তিন উঁচিয়ে তর্কে নামবে।
তর্ক-বিতর্কের মধ্যে আপাতত এটাই সত্যি, অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে কোয়ার্টার ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনা। অসাধারণ প্রদর্শনীর পরও বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে সালাহর মিশরকে।
ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের চোখেই দেখা গেল জল। এবারের আগে কখনো বিশ্বকাপে নকআউট পর্বেই না ওঠা মিশরের খেলোয়াড়দের কান্না খুব কাছে গিয়েও নতুন ইতিহাস লিখতে না পারার।
ওদিকে মেসিও তখন কাঁদছেন। স্বস্তির কান্না, আনন্দের কান্না। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করে বনে গিয়েছিলেন এক বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে পেনাল্টি মিস করা প্রথম খেলোয়াড়। সেই শাপ মোচন করলেন এক গোলে আর এক অ্যাসিস্টে, ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় বনে গিয়ে।
প্রথমার্ধে ‘মানুষ’ মেসি দ্বিতীয়ার্ধে – আরও নির্দিষ্ট করে বললে শেষ ১৫ মিনিটে – বনে গেলেন সুপারম্যান।
সুপারম্যানরাও তাহলে কাঁদে!