নতুন এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থী রাজনীতিবিদ মারিন ল্য পেন শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছেন। বলা হচ্ছে, চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বামপন্থী ও মধ্যপন্থী উভয় প্রতিদ্বন্দ্বীদেরই পরাজিত করতে সক্ষম হবেন।
ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম এম৬ ও আরটিএল-এর জন্য ‘তোলুনা হ্যারিস ইন্টারঅ্যাক্টিভ’-এর করা এই জরিপটি গত সোমবার প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, ‘ন্যাশনাল র্যালি’ দলের দীর্ঘদিনের প্রধান ল্য পেন বামপন্থী দল ‘ফ্রান্স আনবোউড’-এর নেতা জঁ-লুক মেলঁশঁ-এর বিরুদ্ধে ৬৭ শতাংশ এবং মধ্যপন্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপের বিরুদ্ধে ৫৬ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন।
ল্য পেন এবং মেলঁশঁ উভয়েই ইউক্রেন ইস্যুতে ন্যাটো ও পশ্চিমা দেশগুলোর নীতির সমালোচনা করেছেন। ল্য পেন ফ্রান্সকে ন্যাটোর সমন্বিত সামরিক কমান্ড থেকে প্রত্যাহার, রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেন সংঘাতের সমাধানের পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে, মেলঁশঁ ফ্রান্সের ন্যাটো ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।
আরএন বারবারই কিয়েভকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক সহায়তা প্রদানের বিরোধিতা করে আসছে এবং এমন সব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে, যা ফ্রান্সকে রাশিয়ার সাথে সরাসরি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ল্য পেন মস্কোর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ল্য পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন, এমন সম্ভাবনা ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্রদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে বলে জানা গেছে। আগস্ট মাসে দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, তিনি নির্বাচিত হলে কিয়েভের জন্য সামরিক ও আর্থিক সহায়তা সমন্বয়ে ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টা এবং যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনে পশ্চিমা সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নির্বাচনের প্রথম ধাপের জন্য যাচাই করা পাঁচটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির সবকটিতেই ল্য পেন ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন। ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে মেলঁশঁ দ্বিতীয় এবং ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ফিলিপ অবস্থান করছেন।
জরিপটিতে ল্য পেনের নেতৃত্বের প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থার বিষয়টিও উঠে এসেছে। উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫১ শতাংশ মনে করেন যে, তিনি একজন ভালো প্রেসিডেন্ট হবেন। এটা আগের জরিপের তুলনায় ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। অন্যদিকে, আরএন-এর প্রেসিডেন্ট জর্ডান বারদেল্লার ক্ষেত্রে এই হার ৪৭ শতাংশ।
ল্য পেন ২০১৭ ও ২০২২, উভয় নির্বাচনেই চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার (রান-অফ) পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তবে প্রতিবারই এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছে পরাজিত হন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ টানা তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। ফ্রান্স যখন ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে, ঠিক তখনই ম্যাক্রোঁর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসছে।
এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ল্য পেনকে নির্বাচিত পদে আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে যে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, জুলাই মাসে প্যারিসের আপিল আদালত তা কমিয়ে আনে। এর ফলে তার জন্য ২০২৭ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ সুগম হয়।
পাশাপাশি, ল্য পেনের দল পার্লামেন্টে নিজেদের অবস্থানও শক্তিশালী করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে, আরএন এবং তাদের মিত্র দল ‘ইউনিয়ন অফ দ্য রাইট ফর দ্য রিপাবলিক’ সিনেটে পর্যাপ্ত আসন লাভ করে, যার ফলে তারা প্রথমবারের মতো একটি পার্লামেন্টারি গ্রুপ গঠনের সক্ষমতা অর্জন করে।
২০২২ সাল থেকেই ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী শিবিরের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, যার ফলে একের পর এক সরকারকে বাজেট পাস করাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। জুন মাসের শেষ নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩.৬ ট্রিলিয়ন ইউরো (৪ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি), যা দেশটির জিডিপির ১১৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এদিকে, খণ্ডিত পার্লামেন্টে ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটটি বিরোধিতার মুখে পড়েছে।