দুই বছরের ছোট্ট শিশু শিপ্রা। গত সপ্তাহে হামের কবলে পড়ে যমে মানুষে টানাটানির পর আবার মায়ের কোলে ফিরে এসেছে। কিন্তু আগে থেকেই থাকা শ্বাসকষ্টের সাথে হাম পরবর্তী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণে শিপ্রার নেবুলাইজ করতে হয়। কিন্তু, শিপ্রার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার উথলী গ্রামে। সেখানে কখন যে বিদ্যুৎ থাকে তার হিসাব রাখা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“শ্বাসকষ্টের সময় নেবুলাইজ করতে না পারায় ওর কষ্টের তীব্রতা এতোটাই বেড়ে যায় যে ওর দিকে তাকালে কান্না পায়”- বলছিলেন শিপ্রার বাবা আহমদ আলী।
উথলী থেকে জীবননগরের দূরত্ব খুব বেশী না। সেখানকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েও লাভ হয় না। বিকল্প উপায়ে বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা ওই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই।
সেখানকার একজন চিকিৎসক নাম না প্রকাশ করার শর্তে চরচাক বলেন, “বেশ কিছুদিন ধরেই একটা জেনারেটরের অভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং স্বাস্থ বিভাগের সাথে যোগাযোগ করেও এর কোনো সমাধান হচ্ছে না।”
সারাদেশে তীব্র দাবদাহের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সংকটের কারণে জাতীয় গ্রিডে ভয়াবহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গড়ে প্রতিদিন তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি জাতীয় ঘাটতির প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে দেশের স্বাস্থ্যখাতে। মফস্বল ও গ্রামপর্যায়ের হাসপাতালগুলো বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অভাবে রোগীরা হাঁসফাঁস করছেন।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে তাপমাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ফার্মেসি ও চিকিৎসাকেন্দ্রে নষ্ট হতে বসেছে ইনসুলিন, গুরুত্বপূর্ণ বায়োলজিকস ও টিকা (ভ্যাকসিন)।
দর্শনা শহরের আবিদ মেডিকেলের (ফার্মেসি) মালিক শাহাবুবুর রহমান বলেন, “দিনের বেশীরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জীবন রক্ষাকারী ইঞ্জেকশন ও ওষুধ সংরক্ষণ নিয়ে চরম বিপাকে আছি। বিকল্প আইপিএস দোকানে আছে কিন্তু ওই লাইনে ফ্রিজ চালাতে গেলে নেবুলাইজিং এর মতো সেবা দেয়া বন্ধ করে দিতে হয়।”
ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর বাদে এমন চিত্র এখন প্রায় সারাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় দেশে মোট বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট সরবরাহ করে। এই প্রায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটের বিশাল ঘাটতির প্রধান কারণ বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কার্গো খালাস না হতে পারা, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে গ্যাস ঘাটতি এবং ভারতের আদানির কেন্দ্রসহ কয়েকটি বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ কমে যাওয়া।
এদিকে, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ক্লিনিকগুলোতে অনিয়মিত ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম রূপ নিয়েছে। হাসপাতালেও জেনারেটরের মাধ্যমে কোনো রকমে জরুরি কাজ চালানো হলেও সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে ফার্মেসিগুলো। দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াসের নির্ধারিত তাপমাত্রা ধরে রাখতে না পারায় সাধারণ ওষুধের দোকান ও ডিসপেনসারিগুলোতে কোটি টাকার ইনসুলিন এবং ভ্যাকসিনের কোল্ড-চেইন নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘ সময় ফ্রিজ বন্ধ থাকায় নষ্ট জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বাধ্য হয়ে ফেলে দিতে হচ্ছে, এতে জীবনরক্ষাকারী উপকরণের সংকট তৈরির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ দেশের প্রত্যন্ত এলাকার অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই কার্যক্ষম জেনারেটর সুবিধা নেই। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে ভর্তি হওয়া মুমূর্ষু রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, হাসপাতালে এসে গরম ও বিদ্যুৎহীনতার কারণে রোগীর শ্বাসকষ্ট ও সার্বিক শারীরিক অবনতি ঘটছে।
দেশের কোনো কোনো জেলায় দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে বলে তথ্য মিলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিট টার্মিনালে এলএনজি জাহাজ নোঙর করতে না পারা এবং এক্সিলারেট টার্মিনালের ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চালনার ফলে গ্রিডে এই তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার চেষ্টা করছে। জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প পদ্ধতিতে দ্রুত বিদ্যুৎ ঘাটতি কমিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির আশ্বাস দেয়া হলেও প্রান্তিক হাসপাতাল ও স্বাস্থসেবায় স্বাভাবিকতা ফিরতে কতদিন সময় লাগতে পারে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।