‘কোন ভয়ে’ চিকেন’স নেকের নিচে রেললাইন বসাচ্ছে ভারত?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
‘কোন ভয়ে’ চিকেন’স নেকের নিচে রেললাইন বসাচ্ছে ভারত?
চিকেন'স নেক ভারতের অ্যাকিলিস হিল। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

দশকজুড়ে ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকেন’স নেক করিডোরটি সবসময় একটি ‘দুর্বল’ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগকারী একমাত্র স্থলপথটি বারবার চীন এবং সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চাপ বা ভয় প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সব হুমকি বিবেচনা করে এবার ভারত এই করিডোরের নিচ দিয়ে রেললাইন স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চিকেন’স নেক হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি সংকীর্ণ ভৌগোলিক করিডোর, যা ভারতীয় মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত করে। এই রাজ্যগুলো হলো, অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম ও ত্রিপুরা। এই করিডর মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এটি দেখতে অনেকটা মুরগির গলার মতো সরু, তাই এর নাম চিকেন’স নেক। একে শিলিগুড়ি করিডোরও বলা হয়। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির মাঝামাঝি অবস্থিত এই সরু করিডোরের এক পাশে আছে নেপাল ও ভুটান, অন্যদিকে বাংলাদেশ ও চীন (তিব্বতের চুম্বি ভ্যালি)।

এই চিকেন’স নেককে ঐতিহাসিকভাবে ভারতের ‘অ্যাকিলিস হিল’ বা প্রধান দূর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। কারণ, কোনো দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য যখন একটিমাত্র সরু সংযোগপথের ওপর নির্ভর করতে হয়, তখন সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক চোক পয়েন্ট’।

এখন ভারত তার এই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশটিকে ‘অ্যাকিলিসের গোড়ালি’ থেকে ‘জিউসের কপাল’ অর্থাৎ শক্তিশালী করতে আক্ষরিক অর্থেই ‘খনন’ শুরু করছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেতে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চিকেন’স নেক বা শিলিগুড়ি করিডোরের মধ্য দিয়ে মাটির নিচ দিয়ে রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “দেশের বাকি অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে সংযুক্তকারী কৌশলগত করিডোরটির জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে মাটির নিচ দিয়ে রেললাইন স্থাপন এবং বর্তমান ট্র্যাকগুলোকে চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। পশ্চিমবঙ্গের তিন মাইল হাট থেকে রাঙাপানি পর্যন্ত এই ভূগর্ভস্থ রেললাইনগুলো মাটির ২০ থেকে ২৪ মিটার গভীরে স্থাপন করা হবে।”

এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই দুটি স্টেশনকেই বেছে নেওয়া হয়েছে? এর নেপথ্যে রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থান। তিন মাইল হাট পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার রাঙাপানি ব্লকে অবস্থিত, যা শিলিগুড়ি থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে। এটি বাংলাদেশ সীমান্তের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত। পঞ্চগড় জেলা এখান থেকে মাত্র ৬৮ কিলোমিটার দূরে।

চিকেন’স নেক কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের মূল ভূখণ্ড বা মেইনল্যান্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র সংযোগ সেতু হিসেবে টিকে আছে চিকেন’স নেক।  এখানেই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক, রেল সংযোগ, জ্বালানি লাইন এবং সামরিক রসদ সরবরাহের প্রধান পথগুলো অবস্থিত।

কৌশলগতভাবে এর অবস্থান বেশ স্পর্শকাতর। চিকেন’স নেকের দক্ষিণে বাংলাদেশ, পশ্চিমে নেপাল এবং উত্তরে চীনের চুম্বি উপত্যকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুম্বি উপত্যকায় চীনা বাহিনী কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফলে, যেকোনো সংকটের সময় করিডোরটি বহুমুখী চাপের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

এখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা কেবল উত্তর-পূর্বাঞ্চলকেই বিচ্ছিন্ন করবে না, বরং সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশে চীনের সঙ্গে থাকা সীমান্তে ভারতের অবস্থানকেও দুর্বল করে দেবে। বলে রাখা ভালো যে, বেইজিং বহুদিন ধরে অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে।

ভারতের রেল কৌশল

এখন প্রশ্ন উঠছে যে, কীভাবে এই ভূগর্ভস্থ রেললাইন ভারতকে সাহায্য করবে। এটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের একটি ‘ক্ল্যাসিক’ কৌশল। বেশ কিছু কারণে ভূগর্ভস্থ রেললাইন স্থাপনের ঘোষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রেন হলো দ্রুততম মাধ্যম। একটি মালবাহী ট্রেন ৩০০টি ট্রাকের সমান মালামাল বহন করতে পারে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সন্দীপ উন্নিথান ইন্ডিয়া টুডেকে জানিয়েছেন, একটি ভূগর্ভস্থ রেলওয়ে সেকশন একে বিমান হামলা, কামানের গোলা এবং ড্রোনের মতো আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখবে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে, এই ধরনের ভূগর্ভস্থ করিডোর সৈন্যবাহিনী, জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় বেসামরিক রসদপত্রের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে চিকেন’স নেক করিডোরের বেশিরভাগ অবকাঠামো মাটির ওপরে অবস্থিত, যা মিসাইল হামলা বা এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিষয়ে উন্নিথান বলেন, “ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো শনাক্ত করা যেমন কঠিন, তেমনি এটি প্রতিপক্ষের ‘ফার্স্ট-স্ট্রাইক’ মোকাবিলাতেও অত্যন্ত সহনশীল।”

তিনি আরও যোগ করেন, “এটি টানেল বা সুড়ঙ্গ তৈরির ক্ষেত্রে ভারতের অবকাঠামোগত সক্ষমতার পরিপক্বতা এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় প্রকল্প সম্পন্ন করার দক্ষতাকে প্রমাণ করে।” উন্নিথানের মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপটি অন্যতম দ্রুততম কৌশলগত অবকাঠামোগত প্রতিক্রিয়া।

কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই এই ‘দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত দুর্বলতা’ মোকাবিলা করা উচিত ছিল। এক্সে তিনি লিখেন, “প্রস্তাবিত এই ভূগর্ভস্থ রেললাইন একটি বড় ধরণের কৌশলগত সাফল্য, যা উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দেশের বাকি অংশের মধ্যে একটি নিরাপদ ও নিশ্ছিদ্র পরিবহন করিডোর তৈরি করবে।”

কেন ভূগর্ভস্থ রেলপথের প্রয়োজন?

গত এক দশকে চীন ডোকলাম এবং অরুণাচল প্রদেশের কাছে সব আবহাওয়ায় টিকে থাকবে এমন অবকাঠামোর একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে।

গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে কিছু মহল চিকেন’স নেককে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুমকি ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছে। এ ছাড়া, শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে রংপুরের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ দিল্লির প্রতিরক্ষা মহলে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে।

তবে ভারতও বিষয়টিকে হাত গুটিয়ে বসে দেখছে না। আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে ভারত ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমল থেকে পড়ে থাকা অকেজো বিমানঘাঁটিগুলো পুনরায় সচল করার কাজ শুরু করেছে।

পাশাপাশি, ভারত এই অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতিও বৃদ্ধি করেছে। পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া, বিহারের কিষাণগঞ্জ এবং আসামের লাচিত বরফুকনে নতুন সেনাশিবির স্থাপন করা হয়েছে। চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়ায় একটি নতুন নৌঘাঁটিও স্থাপন করা হতে যাচ্ছে।

গত বছর ভারত প্রথমবারের মতো একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে রেল-ভিত্তিক মোবাইল লঞ্চার সিস্টেম থেকে মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘অগ্নি প্রাইম’-এর সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। এর ফলে দেশের বিশাল রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যেকোনো স্থান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহন করা, লুকিয়ে রাখা এবং উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে।

সুতরাং, এই প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়ি করিডোরে ভূগর্ভস্থ রেল প্রকল্পটি কেবল সাধারণ কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়। ‘আক্রমণাত্মক’ চীন এবং ‘শত্রুভাবাপন্ন’ বাংলাদেশের দ্বিমুখী হুমকির মুখে এটি চিকেন’স নেককে একটি শক্ত মেরুদণ্ডে পরিণত করার এক সমন্বিত প্রচেষ্টা।

সম্পর্কিত