বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ৫৫ টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এসব দলের নানা কর্মসূচি চলে। গণমাধ্যমে বা রাজপথে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে অনেক মুখ দেখা যায়। অন্যান্য সময়ে বিভিন্ন দল বা তাদের প্রতিনিধিদের সরব উপস্থিতি দেখলেও ভোটের মাঠে সবসময় প্রধান দুটি দলকেই দেখা যায়।
অন্য সময় বিভিন্ন ইস্যুতে যাদেরকে কথা বলতে দেখা যায় তাদের অনেকেই এই প্রধান দুই দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না। জনপ্রিয় বা পরিচিত মুখ হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে সাধারণত সংসদে দেখা যায় না। ভোটের মাঠেও তাদেরকে নিয়ে আলোচনা থাকে না। কেন এমনটা হয়, তা নিয়ে ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মরিস দুভার্জার একটি তত্ত্ব দিয়েছেন। কী সেই তত্ত্ব, কীভাবে কাজ করে?
কেন সবসময় দুটি রাজনৈতিক দলকেই দেখা যায়
মরিস দুভার্জার বলছেন, “ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট-ই (এক ব্যক্তি এক ভোট) এর কারণ। এই তত্ত্বকে বলা হয় দুভার্জার’স ল’। এই তত্ত্বে ফরাসি তাত্ত্বিক দুভার্জার বলছেন, এইরকম নির্বাচন পদ্ধতিতে একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে একজনই নির্বাচিত হন এবং আইনসভার সদস্য হয়ে সংসদে যান। এক্ষেত্রে প্রার্থী নির্দিষ্ট এলাকার কত শতাংশ ভোট পেয়েছেন সেই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ না। বরং সব প্রার্থীদের মধ্যে যিনি ভোটের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন, তাকেই আগামী পাঁচ বছরের জন্য ওই এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধির আসন দিচ্ছে।
কে মরিস দুভার্জার
মরিস দুভার্জার (১৯১৭–২০১৪) ছিলেন একজন ফরাসি আইনজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং রাজনীতিবিদ। তিনি আধুনিক ইউরোপীয় রাজনীতি বিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত। রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর গবেষণা ও তত্ত্ব তাকে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি এনে দেয়। তার বিখ্যাত কাজ পলিটিক্যাল পার্টিজ (১৯৫১)।
দুভার্জার’স ল কী?
এটি মরিস দুভার্জারের সবচেয়ে পরিচিত এবং বিখ্যাত অবদান। এই তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং দলীয় ব্যবস্থার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তার মতে, ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সাধারণত দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা গঠনে সহায়তা করে। অন্যদিকে, তিনি বলেন যে রানঅফ (Runoff) আর পিআর (Proportional Representation-PR) সাধারণত বহুদলীয় ব্যবস্থা তৈরি করে।
এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে
দুভার্জারের মতে তার এই তত্ত্ব দুইভাবে কাজ করে।
প্রথমত, রাজনীতিকেরা জানেন যে কোনো দল স্থানীয় নির্বাচনী এলাকা বা আসনে কেবল তখনই জিততে পারে, যখন তারা সর্বাধিক ভোট পায়, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও সবচেয়ে বেশি ভোট অর্জন করতে হয়। তাই যদি কোনো দল স্থানীয়ভাবে প্রথম দুই দলের মধ্যে না থাকে, তাহলে প্রার্থী দেওয়ারই মানে কী? জাতীয় পর্যায়ে অনেক আসনে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ হয়ে কোনো আসন না জেতার অর্থ নেই। ফলস্বরূপ, তৃতীয় ও চতুর্থ দলগুলো সাধারণত প্রার্থী দেয় না, আর দিলেও দ্রুতই তারা হারিয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, ভোটাররা জানেন যে, কেবল প্রথম দুই দলই প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই তারা এমন কোনো তৃতীয় দলকে ভোট দিতে চায় না যার জয়ের সম্ভাবনা নেই। বরং তারা তাদের ভোটকে অকারণে নষ্ট না করে, এমন কোনো কম পছন্দের হলেও বেশি সম্ভাবনাময় দলকে ভোট দিতে চায়, যার জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। আর এভাবে কোনো দেশে দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়।
আমেরিকাতে ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ এর কারণে দুইটি প্রধান দলের আধিপত্য দেখা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই তত্ত্বের কার্যকারিতা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-এর নির্বাচন প্রায় পুরোপুরিই এই তত্ত্বের প্রতিফলন। প্রায় ৪৫০টি আসনই রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট দলের দখলে থাকে। তৃতীয় কোনো দলের অংশগ্রহণ খুবই কম। অনেক স্থানীয় নির্বাচনী এলাকায় এক দলেরই সুপার-মেজরিটি (৭০–৯০%) দেখা যায়।
অন্যন্য নির্বাচন বা ভোটিং পদ্ধতি
দুভার্জার ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ই (এক ব্যক্তি এক ভোট) ছাড়াও আরও দুই ধরনের নির্বাচনের কথা বলেছেন। রানঅফ আর পিআর।
যখন প্রথম নির্বাচনে কোনো প্রার্থী জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারেন না তখন একটা দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে প্রথম নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দুই দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এটাকে বলে রানঅফ। এটি সাধারণ নির্বাচন বা প্রাথমিক (প্রাইমারি) নির্বাচন দুটিতেই ঘটতে পারে।
দুভার্জার তার ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ’ (১৯৫১) বইতে বলছেন, রানঅফ পদ্ধতি ছোট দলগুলোকে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতির মতো একেবারে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয় না। ছোট দলগুলো দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে বড় কোনো দলকে সমর্থন দিয়ে ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে।
এর ফলে গঠিত হয় জোট বা ব্লকভিত্তিক একটি ব্যবস্থা, শুধুমাত্র ওই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। এরকম নির্বাচন পদ্ধতি রয়েছে বেশ কিছু দেশে, তার মধ্যে ফ্রান্স অন্যতম।
আর পিআর এমন একটি ভোটিং ব্যবস্থা, যেখানে দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পায়।
দুভার্জার মনে করেন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থা বহু দলীয় ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ ছোট দলগুলোও পর্যাপ্ত ভোট পেলে আসন জিততে পারে। ভোটাররা মনে করে না যে তাদের ভোট নষ্ট হবে, তাই তারা পছন্দমতো ভোট দিতে পারে। এর ফলে তৈরি হয় একটি বহুদলীয় ব্যবস্থা, যেখানে একাধিক দলের হাতেই ক্ষমতা থাকে বা জোট সরকার গঠন হয়। বিশ্বের বেশ কিছু দেশে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়, যেমন জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, অস্ট্রিয়া।
অন্যান্য তাত্ত্বিকেরা কী বলছেন
দুভার্জার’স ল সব জায়গাতে কাজ করে এমন না। অনেক তাত্ত্বিকই দুভার্জার’স ল’-এর সমালোচনা করেছেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসির প্রফেসর প্যাট্রিক ডানলেভি’র মতে, দুভার্জারের প্রস্তাবিত তত্ত্ব সব সময় যে সঠিক তা না। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৫ সালে ব্রিটেনের নির্বাচনে দেখা গেছে যে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেমের কারণে দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, স্কটিশ ও ওয়েলশ ন্যাশনালিস্ট দলসহ অন্যান্য দলের বেশ সরব উপস্থিতি ছিল । প্রায় কোনো আসনেই দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোট এককভাবে কোনো দল পায়নি। প্রায় সব নির্বাচনী অঞ্চলে ভোটাররা বিভিন্ন দলের প্রার্থীকে বেছে নিয়েছে। এতে বোঝা যায় যে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সবসময় দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা তৈরি করে না। একইভাবে, ২০০৪ সালের ভারতীয় নির্বাচনে বহুদলীয় রাজনীতির চিত্র আরও স্পষ্ট। খুব কম জেলায় কোনো একক দল স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, এবং অনেক আসন আঞ্চলিক বা ছোট দলগুলোর দখলে গেছে। ফলে গঠিত হয়েছে জোট সরকার এবং প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় রাজনীতি। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে দুভার্জার’স ল’ সব দেশে কার্যকর নয়।
আবার আমেরিকাতেও দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার জন্যে শুধু নির্বাচন পদ্ধতিই দায়ী বলে মনে করছেন না অনেকে। যুক্তরাষ্ট্র ৫০টি রাজ্য নিয়ে একটি বড় দেশ। এই দেশে অনেক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। তাই ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেম থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে কিছুটা বহুদলীয় পদ্ধতি দেখা দেবে বা কিছু রাজ্যে ভিন্ন ধরনের দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠবে (ভারতের মতো) এমনটা আশা করা যেতেই পারত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সবসময়ই দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা বজায় থাকে। এদিক থেকে অন্যান্য বড় দেশের তুলনায় আমেরিকা একটা বিরল উদাহরণ।
তবে এর কারণ কিন্তু শুধুমাত্র ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্টই না। ইলেক্টরাল রিফর্ম সোসাইটিতে প্রকাশিত এক লেখায় ডেটা জার্নালিস্ট ডিল্যান্ড ডিফোর্ড বলছেন, আমেরিকায় অনেক সীমাবদ্ধতার জন্যই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রধান দুই দল একরকম সাংবিধানিক ব্যবস্থার মতো প্রতিষ্ঠিত অভ্যন্তরীণ দলীয় নির্বাচন স্টেট কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে, ভোটাররা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দল সমর্থন নথিভুক্ত করে। এছাড়াও কংগ্রেসের কাঠামো এবং মিডিয়ার বিতর্কও দুই-দলীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা শুধুমাত্র ভোটিং পদ্ধতির কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং বহুবারের প্রথার কারণেই এতটা প্রতিষ্ঠিত।
ডান লেভিও এমনটাই মনে করছেন। তার মতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো যেমন প্রেসিডেনশিয়াল ব্যবস্থা, প্রচারণা ব্যয় নিয়ন্ত্রণের অনিয়ম, এবং অর্থনৈতিক অভিজাত শ্রেণির প্রভাব দ্বিদলীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, শুধুমাত্র ভোটিং সিস্টেম নয়।